সর্বশেষ
শুক্রবার ৫ই আশ্বিন ১৪২৬ | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সড়ক দুর্ঘটনায় সুফিয়ানের মতো মৃত্যু কারো কাম্য নয়

রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৬

285731023_1474162461.jpg
বিডিলাইভ রিপোর্ট :
বেশ কিছুদিন ধরে আমার শখ জেগেছে সমাজের হালচাল, পারিপার্শ্বিক অসঙ্গতি, জনসচেতনতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এই সব বিষয়াদি নিয়ে বিলেতের কর্মব্যস্ত জীবনেও মাঝেমধ্যে একটু একটু মাতব্বরি করি, লিখি। লক্ষ্য করছি লিখতে আমার বেশ ভালোই লাগে। লিখার জন্য দরকার ভাব, আর সেই ভাব সবসময় আপনার মধ্যে উপস্থিত থাকবে তা ভাবা ঠিক না। কিন্তু যখনি ভাবের উপস্থিতি আপনার মধ্যে দৃশ্যমান হবে তা কাজে লাগানোর দায়িত্ব আপনারই।

অদ্য কয়েকদিন ধরে একটি বিষয় নিয়ে লিখব লিখব বলে নিজেকে নিজেই ফাঁকি দিচ্ছি। অনেকটা অলস মানুষেরা যা করে। বিষয়টি হচ্ছে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ভয়ংকর একটি বিষয়। এই ভয়ংকর বিষয়টি নিয়ে আজ একটু আলোচনা-সমালোচনা করতে চাই অত্যন্ত শোকাহত ব্যথিত মনে। কেন শোকাহত বললাম নিচের প্যারাগ্রাফে বলছি!

ঘুম থেকে জেগে প্রথমেই যে খবরটি আমাকে ব্যথিত, আবেগে আপ্লুত, বাকরুদ্ব করেছে তা হলো সড়ক দুর্ঘটনায় আমার মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মুন্সীবাজার রূপষপুর গ্রামের ৮ ব্যক্তির মৃত্যু। অত্যন্ত নম্র-ভদ্র আলেমেদ্বীন মাও. আবু সুফিয়ান কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের রূপষপুর গ্রামের আদিউর রহমান সরফর এর ছেলে। বিয়ের জন্য পাত্রী নির্বাচন করেন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার বিজয় নগরের মাও. আবু হানিফা'র মেয়ে মাহমুদা ইয়াসমীন'কে। দুর্ঘটনার দিন ১৬ সেপ্টেম্বর ছিল মাও. আবু সুফিয়ানের শুভ বিবাহর দিন। জীবন সাথীকে বরণ করতে ভোর বেলায় একটি মাইক্রোবাসে বাবাসহ ৮ জন যাত্রী নিয়ে রওনা দেন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া কনের পিত্রালয়ের উদ্দেশ্যে।

যাওয়ার পূর্বে মাকে কথা দিয়েছিলেন বউ ঘরে তুলে তাকে ডা. দেখাতে নিয়ে যাবেন। বরযাত্রী হিসেবে সাথে ছিলেন তার পিতা আদিউর রহমান সরফর, ছোট ভাই কামরান আহমদ, চাচা মতিউর রহমান মুর্শিদ, চাচাতো ভাই ১০ বছরের শিশু আলী হোসেন, মামা দুরূদ মিয়া, এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি হাজী আব্দুল হান্নান, আত্নীয় সাইদুর রহমান সোহাগ, মুকিত চৌধুরী মুক্তার ও জাকির হোসেন।


এদের কেউ কি জানতেন রব (জামাই) সহ তাদেরকে লাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হবে? জন্ম, মৃত্য, বিয়ে এই তিনটি শ্বাশত সত্য নির্ধারিত হয় আল্লাহর মাধ্যমে। এই নিয়ে আমরা কেউ কাউকে দোষারোপ করতে পারি না। প্রতিবেশীর মৃত্যুশোকে শোকাহত হয়ে অনেকটা বাকরুদ্ধ, ভাষা হারিয়ে ফেলেছি কিন্তু মনের মধ্যে অনেক যুক্তি পরামর্শ আমাকে তাড়া দিচ্ছে কি ভাবে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা বহুলাংশে নিচে নামিয়ে আনা যায়। যাতে করে এইভাবে সুফিয়ানের মতো কোনো ভাইকে স্ত্রী বরণ করতে গিয়ে পথিমধ্যে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে না হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আশা-ভালবাসা বুকভরা স্বপ্ন যাতে ভেঙে চুরমার না হয়। একটু ইমোশনাল হয়ে পড়ছি, ব্যক্তিগত ভাবে যদিও তাদের কারো সাথে আমার তেমন একটা পরিচয় নেই। নামগুলো পরিচিত মনে হচ্ছে ,সবাই আমার প্রতিবেশী কমলগঞ্জের। আল্লাহ পাক রাব্বুল আল আমিনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি, মাগফেরাত কামনা করছি এবং বেহেস্তের সর্বোত্তম প্রসংশিত স্থানে তাদের অধিষ্ঠিত করা হোক এই কামনা করছি। আহতদের জন্য সুস্থতা কামনা করছি। আল্লাহ পাক রাব্বুল আল আমিন যেন তাদের পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধারণের তৌফিক দান করেন, আমিন।

যা নিয়ে আলোচনা করতে চাই -বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা। এ নামটা যেন নিত্যদিনের ঘটনা, এটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন ঝরে যাচ্ছে বহু তাজা প্রাণ। থমকে যাচ্ছে বহু পরিবার। টিভি চ্যানেলে বাংলাদেশের একটি পঙ্গু হাসপাতালের ভয়াবহতা দেখে নিজের মধ্যে সহজেই উপলদ্ধি হয়েছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ বা বেঁচে থাকার জন্য বেঁচে থাকা- কি যে ভয়াবহ চিত্র জীবনের তরে। বহু পরিবার সড়ক দুর্ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাই সমাজের মানুষ এর থেকে পরিত্রাণের পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো ভাবেই এর থেকে উত্তরণ ঘটানো যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত আমরা সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছি। এখন প্রশ্ন হলো, কেন এত সড়ক দুর্ঘটনা? এর প্রতিকার কি কোনো ভাবেই সম্ভব নয়?

আলোচনা সমালোচনা সমস্যা উত্তরণ সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার পূর্বে একজন ভদ্রলোককে ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা দিলে কেমন হয়? আমরা তো কৃতজ্ঞতা ধন্যবাদ জানাতে লজ্জাবোধ করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের সেই সৎ সাহসও নেই! তিনি হচ্ছেন বাংলাদেশের সামাজিক আন্দোলন 'নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)' এর প্রধান অত্যন্ত পরিচিত অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে। সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি তার প্রিয় স্ত্রীকে হারিয়ে সমগ্র বাংলাদেশসহ বহির্বিশ্বে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা আন্দোলন বাংলাদেশের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা ট্রাফিক আইন সচতনেতা সৃষ্টি করছেন যা অতন্ত্য প্রশংসনীয়। এই ধরণের সামাজিক আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করে কিভাবে সড়ক দুর্ঘটনা একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় আপনার চিন্তা পরামর্শ স্টাডি হতে পারে একটি সঠিক দিক নির্দেশনা।

বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা নামক এই ভয়ংকর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকটা ঝামেলায় পড়ে গেলাম এত বড় একটি বিষয় নিয়ে কিভাবে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যায়। শুরু করছি আমার ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতা বর্ণনা দিয়ে। ----
তিন বছর বয়সে লন্ডনে আমার মেয়ে ইকরা ইসলামকে যখন নার্সারি স্কুলে নিয়ে গেলাম লক্ষ্য করলাম স্কুলের শিক্ষকরা আমার ঐ ছোট মেয়েটিকে তার রুটিন স্টাডির পাশাপাশি -রোড ট্রাফিক, হাইওয়ে সিগন্যাল, গ্রিন লাইট, হলুদ লাইট, রেড লাইট, স্পিড রাস্তা পারাপারে ট্রাফিক নিয়ম নীতি সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছেন --আমি মনে মনে ভাবছিলাম -বড় হয়ে আমার মেয়ে ট্রাফিক অফিসার হবে নাকি? কচি বয়সে তাকে রোড ট্রাফিক নিয়ে এতো জ্ঞান দেয়া হচ্ছে কেন? দেরিতে হলেও আমার মধ্যে ঐ প্রশ্নের উপলব্ধি হয়েছে- ছোট বয়সে আমাদের যা শিখানো হয় তা আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনি শিখি, অভ্যাসে পরিণত করি যা আমাদের ব্যক্তি জীবনে সামাজিক জীবনে পারিবারিক জীবনে কাজে লাগে।

আমাদের দেশে স্কুল পর্যায়ে পাঠ্যসূচির মধ্যে এই বিষয়টি অন্তর্ভূক্তকরন কোনো রকেট সাইন্স বলে আমি মনে করি না। এক্সট্রা কোনো বাজেটের ও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু বোধশক্তি দিয়ে বিষয়টি পাঠ্যবইয়ে সংযোজন করা -যা অত্যন্ত জরুরি। ঐ জায়গা থেকেই শুরু করতে হবে। দেরিতে হলেও আমাদের বাচ্চাদের মধ্যে যদি একটু স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয় তাহলে পরিবারের অন্যদেরও তারা সাহায্য করতে পারে রোড ট্রাফিক রাস্তা পারাপার আইন-কানুন সম্পর্কে। দেশের মানুষের হাঁটাচলা রাস্তা পারাপার দেখলে মনে হয় তারা একটা ভাব নিয়েই রাস্তা পারাপার করছে এক্সিডেন্ট হলে হবে, তাতে কি!

সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশে সব সময়ই সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয়। প্রতিদিন খবর সামাজিক মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি সড়ক দুর্ঘনার বীভত্স চিত্র, দেখতে পাচ্ছি স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেক কারণ-ই দায়ী উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ আলোচনা করব এবং তার সমাধান মনোনিবেশে সরকার, ড্রাইভার, গাড়ির মালিক, পথচারী সবাইকে আন্তরিক হতে হবে মানবিক মূল্যবোধে।

আঁকাবাঁকা ছোট রাস্তায় ডিভাইডার না থাকা। দেশের জেলা উপজেলা মহাসড়কগুলোতে যানবাহন খুবই বিপদসীমার উপর দ্রুতবেগে চলাচল। সড়কে দ্বিমুখি (মুখোমুখি) যানবাহন চলাচল করে, সড়কগুলো প্রশস্ত নয় কোনো ডিভাইডরও নেই। যার ফলে যানবাহনগুলো যখন পাশাপাশি চলে আসে তখন তাদের মধ্যে নিরাপদ দূরত্ব না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। নিরাপদ দূরত্ব রাখতে গিয়ে যানবাহন রাস্তা ছেড়ে নিচে নেমে আসে। ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এটাই হচ্ছে খাদে পড়ে দুর্ঘটনার কাহিনী! এর থেকে উত্তরণের কোনো চিন্তা নেই! খবরের কাগজে শুধু শুধু হেডলাইন খাদে পড়ে এক্সসিডেন্ট-অথচ কেন খাদে পড়ল ভাববার মতো কেউ নেই।  
 
পুরনো ও ত্রূটিপূর্ণ যানবাহন ফিটনেস ছাড়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে চলাচল। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অসংখ্য পুরাতন ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে যেগুলো দুর্ঘটনা ঘটানোর অন্যতম প্রধান কারণ। উন্নতমানের টেকসই সড়কের অভাব, দেশের রাস্তাঘাটগুলোর বেলায় দেখা যায় যে জোড়াতালি দিয়ে এ গুলো তৈরি করা হচ্ছে। তৈরির ছয় মাসের মধ্যেই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যে কোনো ধরনের সড়ক নির্মাণে আমারা যত্নবান নই, নেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। আজকাল বাঁশের বিভিন্ন মুখি ব্যবহার চোখে পড়ছে। যুগোপযোগী টেকসই সকলের ব্যবহার উপযোগী প্রশস্ত রাস্তা যাতে হয় তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের নজরদারি নেই বললেই চলে। স্বজনপ্রীতি অনিয়ম আকাশচুম্বী ধরা চোঁয়ার বাইরে
ডিজিটালাইজড!

অদক্ষ চালক দুর্ঘটনার জন্য প্রায়ই দায়ী। চালকদের বিরুদ্ধে আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। আবার এটাও সত্য যে বিপুল সংখ্যক চালকের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার মতো অবকাঠামো এখনও নেই। স্বাধীনতার এত বছর পরে এসেও একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা অনেকটা হতাশার মধ্যে ফেলে দেয়। আমাদের দেশে ড্রাইভিংকে এখনও নিম্নমানের পেশা হিসেবে দেখা হয়। বাস ও ট্রাক ড্রাইভাররা দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬-১৮ ঘণ্টাই পরিশ্রম করেন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পথ ঘাটে গাড়িতে থাকতে গিয়ে তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয় যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ত হওয়ার কারণ যার ফলে তারা ড্রাইভিংএ মনোনিবেশ করতে পারেন না। এটিও দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হিসাবে চিন্তা ও যুক্তি দুই-ই এড়িয়ে যাওয়া না।

সনাতনী ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা দেশে এখনো বিদ্যমান। ট্রাফিক সিগনালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। গতি পরিমাপক, ওজন পরিমাপক জিপি এস প্রযুক্তি ইত্যাদির অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সমূহসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। বিকল্প যানবাহন রেল, লঞ্চ ইত্যাদি সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকা। আমাদের দেশে অনেক জেলা উপজেলা এখনও রেল যোগাযোগের বাইরে রয়েছে। সড়ক পথের বিকল্প হিসেবে রেলপথ ও জলপথের প্রচলন সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কারণ একটি নির্দিষ্ট পথে যখন যাত্রী সংখ্যা বেশি হবে তখন স্বভাবতই ওভার ক্রাউড ঝুঁকি থাকবে। রেল যোগাযোগ সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারলে সড়ক পথের ওপর থেকে চাপ কমবে।

সড়ক দুর্ঘটনার অনেক কারণ রয়েছে-আলোচনা শেষ করতে হবে-- চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানাে, রোড সাইন না বুঝে যেখানে সেখানে ওভারটেক করা, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, রাস্তার ক্রটি, ক্রটি যুক্ত গাড়ি ব্যবহার, পথচারীদের পথ চলার নিয়ম না জানা, বিশ্রাম ব্যতীত একটানা গাড়ি চালানাে, গাড়ির ইঞ্জিন এবং চাকা চেক না করে গাড়ি বের করা, রাত্রিকালীন সময়ে বড় গাড়িগুলো নিয়ম না মেনে হাইভিম ব্যবহার করা, হাইওয়েতে বাজার স্থাপন, রাস্তার উপর বালু বা মাটি রাখা, গাড়ি চালানাের সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালনা, গাড়ির মালিকেরা চালকদের প্রতি উদাসীনতা, ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে লোক বা মাল বহন করা, সঠিক পদ্ধতিতে লাইসেন্স গ্রহণ না করা, যাত্রীরা চালককে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালনায় উৎসাহিত করাসহ আরো কিছু কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হয়।

উল্লেখিত সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বক্তব্য বাণী বিবৃতিতে বিশেষ সমস্যার সমাধান কখনই সম্ভব নয়। আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের অভাব বিদ্যমান ট্রাফিক আইন সংশোধন ও তার যথাযথ প্রয়োগ একান্ত প্রয়োজন। রাস্তাঘাটে অবৈধ চালক ফিটনেসহীন গাড়ি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আটক করেন অর্থের বিনিময়ে তা আবার বৈধ হয়ে যায়। মামলা কাগজ-কলমেই থাকে এই বিষয় আইন কি বলে ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। থাকতে হবে একটি সঠিক ইউনিক গাইড লাইন

সম্ভাব্য দু’টি পদ্ধতিতে সড়ক দুর্ঘটনা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব। প্রথমত বেশিরভাগ দুর্ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত বাস এবং ট্রাক চালকেরা, তাদের বেপরোয়া খামখেয়ালী ওভারটেকিং এর কারণে দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। আমাদের দেশে যে সব মহাসড়ক আছে তা কোনো ভাবেই আন্তর্জাতিক মানের মহাসড়ক বলা যায় না। তাই প্রতিটি বাস এবং ট্রাকে বি.আর.টি.এ. কর্তৃক সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় সরকার কর্তৃক ০০-০০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দিতে হবে। একজন চালক ইচ্ছামত নির্ধারিত গতির অধিক গতিতে গাড়ি চালাতে পারবে না। যদি ড্রাইভার ওভার স্পিডে গাড়ি চালান অবশ্যই গাড়ি আটকের মাধ্যমে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ড্রাইভারদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে যা অন্য ড্রাইভারদের চোখে পড়ে।

লিখতে গিয়ে কর্ম পরিসরে লন্ডনে আমার কলিগ বশির বুদাকারের সাথে আলাপ করে জানলাম তাদের দেশ মরোক্ষ Morocco- তে রোড দুর্ঘটনার মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে সরকার ট্রান্সপোর্ট আইনকে ইম্প্লিমেন্ট করেছে এই ভাবে যে,  মটরওয়েতে হাইয়েস্ট ৯০ কিলোমিটার, অন্য রোডে ৭০ কিলোমিটার। এর বেশি স্পিডে কোনো ড্রাইভার যদি ড্রাইভ করে আর পথচারী হিসেবে তা যদি আপনার চোখে পড়ে তাহলে ফ্রি নাম্বারে ফোন দিয়ে ট্রান্সপোর্ট পুলিশকে তাৎক্ষণিক জানিয়ে দিলেই পুলিশ ঐ ড্রাইভারকে পরবর্তী এক্সিটে স্টপ করে আইনগত অ্যাকশন নিবে। অদৃশ্য কোনো শক্তি, ফোন কল, মামা ভাগনা, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, আঁতি নেতা, পাতি নেতা কিছুই কাজে আসবে না। এটা রাজনৈতিক কোনো সমস্যা নয়। আইনের প্রতি সন্মান থাকলে আইনের প্রয়োগ যে কোনো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি একটি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

দ্বিতীয়ত যেহেতু সড়ক দুর্ঘটনায় চালকরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী তাই তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জেলা পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশকে পরীক্ষামূলকভাবে স্পীড ডিটেক্টর সরবরাহ করা যেতে পারে। স্পীড ডিটেক্টর সম্পর্কে আমাদের দেশে এখনও অনেকের ধারণা নেই। এটা দেখতে অনেকটা মুভি ক্যামেরার মতো। একজন পুলিশ সদস্য কোনো গাছের আড়ালে দাড়িয়ে গাড়ির গতি স্পীড ডিটেক্টর এর মাধ্যমে সনাক্ত করে। আগে থেকে নির্ধারিত দূরত্বে অবস্থানকারী টিমকে ওয়াকিটকির মাধ্যমে অবহিত করে সেই গাড়ির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন দিলে চালক গাড়ি চালানোর সময় সতর্ক থাকবে। সে বুঝতেও পারবে না কোথা থেকে তার গাড়ির গতি সনাক্ত করা হয়েছে। তখন প্রত্যেক চালক মনে করবে অতিরিক্ত গতি বা বেপরোয়া চালানোর কারণে যে কোনো সময় মহাসড়কে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। যেহেতু চালকের কারণে এই মামলা হবে তাই এর জরিমানা চালককেই বহন করতে হবে। জরিমানা দেওয়ার ফলে ঐ চালক পরবর্তীতে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাবে না। এই টিমের সঙ্গে একজন ম্যাজিষ্ট্রেটও থাকতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতি জেলায় একটি টিম হলেই চলে। এই সিম্পল কাজটি করতে হলে গাড়ির ড্রাইভার লাইসেন্স গাড়ির মালিক ও গাড়িটির একটি ওয়েব ডাটা বেইস থাকতে হবে অর্থাৎ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন খুঁজলে ড্রাইভার মালিকের  ঠিকানা চলে আসবে। ড্রাইভার ও মালিক পক্ষ যে ডিস্ট্রিকের বাসিন্দা হোক না কেন তাদের দ্বারা সম্পাদিত অপরাধটি সেখানেই হস্তান্তর হবে যা ঐ এলাকার লোকাল পুলিশ অথবা ট্রান্সপোর্ট পুলিশ খতিয়ে দেখবে। গাড়ি এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকবে পুলিশ স্টেশনে যতক্ষণ না পর্যন্ত বিষয়টি সুরাহ হচ্ছে।

মহাসড়কে চালক অপরাধ করলে নগদ জরিমানা আদায়ের ব্যবস্থা রেখে একটা টিম ফোর্সকে একটি নির্দিষ্ট কিলোমিটার এলাকা নির্ধারণ করে দিলে এবং তারা স্থান পরিবর্তন করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রসিকিউশন দ্বারা নগদ জরিমানা আদায় অব্যাহত রাখলে চালকেরা বেপরোয়া ও মাত্রাতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে সাহস পাবে না।

মহাসড়কে শৃংখলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রতিটি জেলায় কম পক্ষে ২/৩টি টিম থাকতে পারে। আর তার সার্বিক দায়িত্বে জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপার উভয়ই যদি হাইওয়েতে নিয়োজিত টিমগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ সুপারভিশন করেন তাদের দিক নির্দেশনা দেয় তাহলে তাদের কাজের গতি বাড়বে এবং মহাসড়ক সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসবে। এই পুলিশ টিমের সঙ্গে যারা জড়িত থাকবে তাদের পুলিশ সুপার কর্তৃক বাছাই করে স্মার্ট ইন্টিলিজেন্ট সৎ এবং পজিটিভ মনের অধিকারী সদস্যদের এই কাজে অন্তর্ভূক্ত করলে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবে।

উল্লেখিত ব্যবস্থাগুলো চিন্তায় এনে কাজ শুরু করা গেলে সড়ক নিরাপত্তায় একটি ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে বলে আমি মনে করি। আপনারা হয়ত ভাবছেন এই ভদ্রলোক বিদেশি আইন-কানুন বাংলাদেশে ইমপ্লিমেন্ট করতে চাচ্ছেন। আইনের মধ্যে দেশি-বিদেশি কিছুই নেই। যা প্রয়োগ করলে বা যে প্রক্রিয়া শুরু করলে সড়ক দুর্ঘটনা নামক এই ভয়ংকর মহামারি থেকে আপনি, আমি, আপনার প্রতিবেশী রক্ষা পাবে সেটাই আমরা চাই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এরচেয়ে বেশি কার্যকরী প্রক্রিয়া পরামর্শ সরকার ট্রান্সপোর্ট ডিভিশন আপনাদের যে কারো থাকতে পারে।
 
দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি আমরা যারা ভালবাসায় অন্ধ আমাদের একমাত্র দাবি মা. আবু সুফিয়ানের মতো আর কোনো ভাই যেন বর হয়ে গন্তব্যে পৌঁছার পূর্বে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে না হয়। ইহা বড়ই কষ্টের শোকের! আর যারা প্রতিদিন স্বজন হারাচ্ছেন হারিয়েছেন তাদের জন্য ভয়ংকর স্মৃতি!  

আজকের পরামর্শ মতামত, মাতব্বরি শেষ করবার পূর্বে আবারো কয়েকটি লাইনের পুনরাবৃত্তি করতে চাই তাহল আমার বিশ্বাস সারাদেশে মহাসড়কে যদি একযোগে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থান পরিবর্তন করে স্পীড ডিটেক্টর দ্বারা গাড়ির গতি সনাক্ত করে নগদ জরিমানা আদায় চলতে থাকে। জরিমানা অনাদায়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স সিজ, ড্রাইভার গাড়ির মালিককে লোকাল পুলিশ স্টেশনে শোকজ তা হলেই মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সারাদেশের মহাসড়কে গাড়ি চালানাের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। দেশের মানুষ অনেকাংশেই রক্ষা পাবে অভিশপ্ত দুর্ঘটনার কবল থেকে। আপনাদের হয়ত নিশ্চয় মনে আছে কেয়ারটেইকার গভর্মেন্ট ফখরুদ্দীন আহমেদ এর কথা। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের কার্যক্রমকে সাপোর্ট করি না। কিন্তু লক্ষ্য করেছি তাদের আমলে কিছুদিনের জন্য হলেও দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ জন্মেছিল। আমরা আর অকাল মৃত্যু দেখতে চাই না। আমরা চাই নিরাপদ সড়ক, ঝুঁকিমুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা।

নজরুল ইসলাম
ওয়ার্কিং ফর ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস, লন্ডন।
মেম্বার, দি ন্যাশনাল অটিষ্টিক সোসাইটি ইউনাটেড কিংডম।

ঢাকা, রবিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // এ এম এই লেখাটি ৯৪০৭ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন