সর্বশেষ
শুক্রবার ৫ই আশ্বিন ১৪২৬ | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নৈতিক অবক্ষয়ই সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬

1470885396_1474435567.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
দিন দিন মানুষ বদলে যাচ্ছে আর অস্থির হয়ে উঠছে সমাজ। বেপরোয়া হয়ে উঠছে মানুষের কর্মকান্ড। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে শিশু হত্যা, নির্যাতন, গুম, হানাহানি, মারামারি, কাটাকাটি, ঠগ-বাটপারি, প্রতারণা-প্রবঞ্চনা, ধর্ষনের মতো আরো জঘন্য সব কর্মকাণ্ড। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি গ্রহণ করেও দুর্নীতি করছে। জাতির কারিগর হয়েও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠান প্রধান হয়ে সুযোগের প্রায় সময়ই অপপ্রয়োগ করছেন তারা।

মূলত, আধুনিকতা আমাদের গতি-প্রকৃতি বদলে দিলেও ছিনিয়ে নিয়েছে আমাদের পারস্পারিক মায়া-মমতা আর ভালবাসা। যে যার মত চলছে। দায়িত্ববোধ, কর্তব্য নিষ্ঠা, সততা ইত্যাদি আজ খুইয়ে বসেছে সমাজ। সিলেটে রাজন হত্যা, হবিগঞ্জে শিশু হত্যা, সর্বশেষ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনুর উপর নির্মম পাশবিকতা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর উপর যৌন নিপীড়ন ইত্যাদি বলে দেয় মানুষের আচার-আচরণে কি রকম পশুত্ব স্বভাব বিরাজ করছে। পুজিবাদের নগ্ন থাবায় মানুষ যেমন স্বার্থপর ও আত্বকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে তেমনি হয়ে উঠেছে নির্মম ভোগবাদি।

আজকের পুজিবাদই ঘটিয়েছে ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়ার মত নরক। কত হাজার হাজার মানুষ আজ নির্মমতার শিকার। যারা সুযোগ পাচ্ছে জীবন বাঁচার তাগিদে নিজ ঘর-বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আজ অন্য দেশে গিয়ে হচ্ছে অভিবাসী। একজন বাবা মা তার কন্যা সন্তানকে বাইরে পাঠিয়ে কেন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছেনা। একজন জাতির কারিগরের কাছে সন্তানকে পাঠিয়ে কেন শান্ত থাকতে পারছেনা? কেন একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী ব্যাক্তি নৈতিকতা সম্পন্ন হতে পারছেনা? অপূর্ণতা কোথায় থেকে যাচ্ছে? তাহলে কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অসম্পন্ন?

আমাদের সমাজে এহেন অবস্থার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো -নৈতিকতার অবক্ষয়। আর এ নৈতিক অবক্ষয়ের কারণগুলো হলো - পরিবারগুলোতে নৈতিক শিক্ষা দিনদিন কমে যাচ্ছে। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে তথা সংগঠন, প্রতিষ্ঠানে বা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে যথার্থ নৈতিকতার প্রয়োগ হচ্ছেনা। কোড অব কনডাক্ট থাকলেও তা মানা হচ্ছেনা। সামাজিক অসমতা, বেকারত্ব, অন্যায্য বন্টন ব্যবস্থা, দারিদ্র্যতা, হতাশা, বাবা-মা সন্তানদের বেশি সময় না দেয়া, অবষন্নতা, বিষন্নতা ইত্যাদির কারণে আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ক্রমশই ত্বরান্বিত হচ্ছে।

আর সেখানে স্থান করে নিচ্ছে আকাশ সংস্কৃতির নগ্ন থাবা। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে আজ বিজাতীয় সংস্কৃতি বেশি অনুকরণীয় হচ্ছে। বর্তমান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির মূল্যায়ণ। সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কারণে আজ বিদেশি চ্যানেলগুলোর আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব টের পাচ্ছে আমাদের এ সমাজ।

এছাড়াও ছোটরা যেমন বড়দের শ্রদ্ধা করবে আর বড়রা তেমনি ছোটদের স্নেহ করবে তা অনেকাংশে কমে যাচ্ছে। সঙ্গে কমে যাচ্ছে একে অপরের প্রতি পারস্পারিক সহযোগিতার প্রবণতা। বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, হানাহানি-কাটাকাটি, খুন আর রাহাজানিতে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা। অনৈতিকতা ও দুর্নীতি গ্রাস করছে আমাদের এ সমাজকে। জীবনমান আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেলেও কমে গেছে কর্তব্যনিষ্ঠা আর সহনশীলতা।

আমাদের ব্যর্থতা এক্ষেত্রে কম নয়। একটি জাতি হিসেবে আমাদের যে স্বকীয়তা আর বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তা আজ আমরা হারিয়ে বসেছি। শিশুর প্রতি একটি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের যে দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকা দরকার তা কিন্তু যথার্থভাবে পালিত হচ্ছে না। শিশুর যথার্থ সামাজিকীকরণ হচ্ছেনা। একটি শিশুকে ছোটো থেকেই যথার্থ নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে সে সাধারণত অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হবেনা। বড়দের যথার্থ শ্রদ্ধা করা, ছোটদের স্নেহ করা, দুঃখী মানুষের পাশে দাড়ানো ইত্যাদি শিক্ষা দিবে পরিবার।

পরিবারের মত সমাজেরও অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ রয়েছে। পারস্পারিক সাহায্য-সহযোগিতা, সম্মিলিতভাবে অন্যায়ের প্রতিবাদ, দুর্নীতি রোধ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ শিখাতে পারি। সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোও নৈতিকতা শিক্ষার দায় এড়াতে পারেনা।

তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো রাষ্ট্রের। কারণ একটি রাষ্ট্র পারে আমাদেরকে একটি চমৎকার সমাজ উপহার দিতে। যথার্থ আইনের শাসন, ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার নিশ্চয়তা, সততা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নৈতিকতা ভিত্তিক সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। যেমন - আজ জাপান সারা বিশ্বের কাছে অনুসরণীয় ও বরনীয় একটি দেশ। দেশটিতে একটি পরিবারে সবচেয়ে ভালো থাকা ও খাওয়ার জায়গাটি হলো সবচেয়ে যিনি বয়োজ্যেষ্ঠ। কখনও ভুলক্রমে কাউকে আঘাত করলে তারা একটি অইনের শাস্তির পাশাপাশি নিজেই নিজেকে শাস্তি দেয়। সামাজিক কোনো কাজ করতে ব্যর্থ হলে তারা আত্মহুতিও দেয়।

এই মূহুর্তে আমাদের সামাজিক সংগঠন যেমন- মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা, মন্দির, গীর্জা, চার্চে নৈতিকতা শিক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ নৈতিকতা বিষয়টি মূলত আসে ধর্ম থেকে। স্কুল হতে শুরু করে দেশের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলাদাভাবে নৈতিকতার উপর কোর্স চালু করতে হবে প্রতিটি শ্রেণিতে। যাতে দৈনন্দিন আচার-আচরণের উপর নম্বর থাকবে। উন্নত চরিত্রাধিকারীকে সামাজিকভাবে পুরস্কৃত করতে হবে। আর অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে সমাজ তাদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড চায় না। এভাবে আমাদের সমাজে একটি সুন্দর মননশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে হবে।

মোঃ আব্দুর রশিদ
সহকারী ব্যবস্থাপক (কার্যক্রম বিভাগ)
পিকেএসএফ, ঢাকা।

ঢাকা, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ১৭৯২ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন