সর্বশেষ
শনিবার ২৩শে অগ্রহায়ণ ১৪২৬ | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

মাদকের করাল গ্রাসে আচ্ছন্ন যুবসমাজ

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৬

545134882_1474975295.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
মাদক হলো যেকোনো জাতির জন্য এক মারাত্মক অভিশাপ। শহরায়ন ও নগরায়নের অসুস্থ ব্যবস্থাপনা এবং পুঁজিবাদের নাঙ্গা তলোয়ারের মোহিনী আকর্ষণে কোমলমতি তরুণ-তরুণীরা মাদকের কবলে পড়ে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতকে অকালে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। দেশ ও জাতি হারাচ্ছে ভবিষ্যতের কান্ডারিদেরকে।

যারা শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে জাতির ক্লান্তি লগ্নে হাল ধরে জাতিকে ভবিষ্যতে উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখাবে। আজ তারাই মাদকের করাল গ্রাসে পতিত হয়ে নানারকম অপরাধ, হত্যা, রাহাজানি, মারামারি, ছিনতাই, অসামাজিক এবং দেশদ্রোহী কর্মকান্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আর জাতিকে ফেলে দিচ্ছে এক অথৈই অন্ধকারে।

ইউনাইটেড নেশনস অফিস অন ড্রাগস এ্যন্ড ক্রাইম এস্টিমেটস(UNODC)-এর মতে, সারা বিশ্বে ৭০০ কোটি মানুষের মধ্যে ২৩০ মিলিয়ন (৫%) মানুষ জীবনে কমপক্ষে একবার হলেও মাদক সেবন করছে। জনমিতি অনুসারে, এ অবস্থা বিদ্যমান থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ এর সংখ্যা ২৯৫ মিলিয়নে দাড়াবে। প্রতিবছর হিরোইন, কোকেইন ও অন্যান্য মাদক ব্যবহার করার কারণে ২০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে।

সংস্থাটির একটি রিপোর্টে বলা হয়, বিশ্ব জুড়ে প্রতি ১০ জন মানুষের একজনের মৃত্যুর জন্য তামাক দায়ী। প্রতিবছর তামাক সেবন করে ৬০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। তন্মধ্যে ৫০ লাখ লোক সরাসরি তামাক সেবন এবং ৬ লাখ লোক পরোক্ষভাবে তামাকের প্রভাবে মৃত্যু বরণ করছে। যা ২০৩০ সাল নাগাদ ৮০ লাখে দাঁড়াতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে তামাকের প্রভাবে মৃত্যুর সংখ্যা একবিংশ শতাব্দীতে ১ বিলিয়নে দাড়াবে।

একটি রিপোর্টে বলা হয়, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংস্থা মিলে ২০১০ সালে সারাদেশ থেকে ১ লাখ ৪৪ হাজার ১০২ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। ২০১১ সালে  উদ্ধার করা হয় ১ কোটি ১৫ লাখ ২০০০ পিস, ২০১২ সালে ১ কোটি ৮৮ হাজার ইয়াবার পিস এবং ২০১৩ সালে ৩ কোটি পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল এখন ফেনসিডিলের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ২০১০ সালে উদ্ধার করে ৪৬ হাজার, ২০১২ সালে ৫১ হাজার ও ২০১৩ সালে  ৪৭ হাজার বোতল ফেনসিডিল।

আরেকটি রিপোর্টের তথ্যনুযায়ী বাংলাদেশে শহর অঞ্চলে প্রায় ১০ মিলিয়ন মাদক সেবী আছেন যাদের বয়স ১৫ বছরের বেশি। সম্প্রতি সুন্দরী স্মার্ট নারীদের এ মাদক পাচার করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ন্যাশনাল ম্যান্টাল হেল্থ ইনস্টিউট -এর মতে, বাংলাদেশে ১৬ হতে ২২ বছরের নারীরাই মোট মাদসাক্তদের ১৭%। একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্যনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৯০ লাখ মাদকাসক্ত। আর সরকারি হিসাব মতে এর সংখ্যা ৩০ লাখ। এদের মধ্যে ৭০ ভাগ হেরোইনে আসক্ত। আর ইয়াবার চাহিদা বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। শুধু ঢাকা শহরে দৈনিক চাহিদা ১৪ লাখ, চট্টগ্রামে ১০ লাখ এবং কক্সবাজারে এর চাহিদা ৫ লাখ।

তবে বিভিন্ন পরিসখ্যানের তথ্য মতে, বর্তমানে ৯০ লাখের অধিক মানুষ মাদকাসক্ত যার ৮০ ভাগই হচ্ছে তরুণ সমাজ। ৫০ লাখ মাদকাসক্তের মধ্যে ৯১ শতাংশ কিশোর ও তরুণ-তরুণী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, সিটি কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার ছাত্রী মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। মাদক নিরসনে উদ্যোগী  সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মাদকাসক্তদের সাথে আলাপ করে এ সব তথ্য পাওয়া গেছে (সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব)।

মাদকাসক্তদের অধিকাংশই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা এ নেশায় বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। তারা নিজেরা মাদক সেবন করার পাশাপাশি এক সময় এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন।

তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সমাজের অন্যান্য শ্রেণির লোকেরাও মাদকের থাবায় দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত (বসতির যুব সমাজ) শ্রেণির একটি বড় অংশ। যারা পরবর্তীতে সমাজের জন্য বোঝা হয়ে দাড়াচ্ছে। তারা সমাজের মানব সম্পদে পরিণত না হয়ে মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক সমস্যা তৈরি করে সমাজের উন্নয়নের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিচ্ছে।

মাদক সেবনকারীর তালিকায় রয়েছে ফুটপাতের টোকাই থেকে শুরু করে শিল্পপতি এবং নিরক্ষর থেকে উচ্চ শিক্ষিতদের অনেকে। কিছু কিছু উচ্চবিত্ত পরিবারে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মত মাদক সেবন করা একটি ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। মাদকের ছোবলে বিকিয়ে পড়ছে তাদের মানবিক মূল্যবোধ ও সুস্থ চিন্তা-চেতনার।

শুধু তাই নয় এ মাদকের অর্থ সংগ্রহ করতে অনেকে চুরি, ছিনতাই এমনকি নিজের মা-বাবাকেও খুন করছে। যার জাজ্জ্বল্যমান উদাহরণ হল পুলিশ দম্পতির কন্যা ঐশী। সামাজিক বন্ধনের অভাব, ব্যাক্তিকেন্দ্রিকতা, পারিবারিক সুস্থ সামাজিকীকরণের অভাব, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, আকাশ সংস্কৃতির নিরবিচ্ছিন্ন কু-প্রভাব, আমাদের সরকারি-বেসরকারি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার অভাব, নৈতিক শিক্ষার অপ্রতুলতা, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, সাংস্কৃতিক চর্চার নামে অশ্লীলতার চর্চা, পুঁজিবাদীদের সম্পদ আহরণ ও ভোগের অদম্য লিপ্সা, হাজার বছরের সংস্কৃতির স্বকীয়তাকে আধুনিকীকরণের ব্যর্থতা, যুব সমাজের আকাশ সংস্কৃতির দিকে ঝুকে পড়া, হতাশা ও পারিবারিক ভাঙ্গন তথা কথিত আধুনিকতার চাকচিক্যতা ও জৌলুস আকর্ষণ।

বিশেষত উত্তর-আধুনিক যুগের অসীম চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে মা-বাবা অতি ব্যস্ততার কারণে তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্তানকে যখন সময় দিতে পারছেনা, তখন অঝুঝ সন্তানটি সমবয়সীদের সাথে মিশে নিজের অজান্তে ডুবে যাচ্ছে মাদকের অতল গভীরে। অঙ্কুরে বিনষ্ট করছে তার সুন্দর ভবিষ্যত। ধ্বংস হচ্ছে দেশ ও জাতির সম্পদ ও বিবেক।

যারা উচ্চাসনে আসীন তারাই মুলত নেপথ্যে থেকে মাদক ব্যবসার কলকাঠি নাড়ছে। নিজে করছে বা করাচ্ছে। অল্প সময়ে লভ্যাংশ নিয়ে গড়ে তুলছে সম্পদের পাহাড়। হাতে গোনা কয়েকজন মাদক সম্রাট ও সম্রাজ্ঞী সারাদেশে মাদক সরবরাহ করছে। এদের সাথে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃকক্ষের গোপন আতাঁত আছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেকোনো পানের দোকান হতে শুরু করে অভিজাত বিভিন্ন নাইট ক্লাব, বার, অভিজাত হোটেল ও রেস্তোরাতে এমনকি জেলখানা ও কারাগারেও মাদকের ছড়াছড়ি। ইহা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাব, আদালতের ফাঁকফোকড়ের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা।

এশিয়া মহাদেশেই গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্ট নামের এ দুই আন্তর্জাতিক রুটের মাঝে অবস্থিত বাংলাদেশ। যা মাদকের আন্তর্জাতিক রুট হিসাবে কাজ করছে। মায়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইয়াবা উৎপাদনকারী দেশ। এ দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় কমপক্ষে ৩৭টি ইয়াবা তৈরির কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা মংডুতে আছে ২ টি ইয়াবা ফ্যাক্টরি। সেখান থেকে এ মরণ নেশা মাদক রোহিঙ্গা, চায়নার কমিউনিস্ট বিরোধী জাতীয়তাবাদীরা (কুয়ো মিং তাং) যাদেরকে উত্তর বার্মায় (মায়ানমার) নির্বাসিত করা হয়েছে। তারা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ীদের সহায়তায় বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

তবে মাদকের এ কড়াল গ্রাস হতে দেশ, জাতি তথা যুব সমাজকে বাঁচাতে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিবার হলো সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট। এজন্য পারিবারিক নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা, সুস্থ সামাজিকী করণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মপ্রাণ। তাই সকল ধর্মের বাস্তবসম্মত শিক্ষা এ সমাজকে মাদকের মরণব্যাধি নেশা থেকে বাঁচাতে পারে। এ ক্ষেত্রে সুশীল সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক , সাংস্কৃতিক, ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী, ধর্মগুরু, আলেম-ওলামাসহ সবাই একযোগে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে। রুখতে হবে পুঁজিবাদীদের সম্পদ আহরণের এ অদম্য লিপ্সাকে।

সমাজের সকল শ্রেণির মানুষকে অন্তর্ভূক্ত করে সামাজিক আন্দোলন আরো বেশি জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। অভ্যাস মানুষের দাস। সেই হিসাবে একজন মানুষের ইচ্ছা শক্তিই পারে তাকে এ বিষাক্ত ছোবল হতে বাঁচিয়ে একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দিতে। তাই মাদকাসক্তদের যথাযথ পূণর্বাসন ও নৈতিক শিক্ষা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

আমাদের সকলকে পারস্পারিক সহযোগিতার মাধ্যমে চীন ও জাপানিদের মত আমাদের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে এ বিপথগামী যুবসমাজকে বাঁচাতে পারি। নচেৎ অনুতপ্ত হতে হবে এ জাতিকে। কারণ মাও সে তুনের চাইনিজ জাতি তাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাদের যুবসমাজকে কাজে লাগিয়ে নিজেদেরকে যেমন বিশ্বের সেরা জাতিতে পরিণত করেছে তেমনি ভবিষ্যতের ভিত্তিকে করেছে মজবুত।

তাই, আমরা এ বিশাল যুবসমাজকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করতে ব্যর্থ হই তাহলে বাংলাদেশ যে বঙ্গবন্ধুর “সোনার বাংলা” ও মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে তা আশায় গুড়ে বালি হবে। আসুন, জাতি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ভেদাভেদ ভুলে আমরা জাতীয় উন্নয়ন তথা যুবসমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার ব্যাপারে এক ও সোচ্চার হই।

মোঃ আব্দুর রশিদ,
প্রাক্তন ছাত্র, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা, মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ২৬০৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন