সর্বশেষ
মঙ্গলবার ১৭ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭ | ০১ ডিসেম্বর ২০২০

সাতক্ষীরার শ্যামনগরবাসীর ঘুরে দাড়ানো কি টেকসই হবে?

রবিবার, অক্টোবর ৯, ২০১৬

880427834_1476078716.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
কয়েক হাজার যুগ পূর্বে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ একসঙ্গে ছিল। মহাদেশ দুটির আরব জাহান ও সাহারা মরূভূমির বেশ কিছু এলাকা জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।  কিন্তু, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূমিকম্পের কারণে সেই বিশাল জঙ্গল মাটির নীচে চাপা পড়ে এবং এশিয়া ও আফ্রিকা দুটি আলাদা মহাদেশে পরিণত হয়। শুধু তাই নয় জঙ্গলটি মাটির নিচে চাপা পড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির চাপ ও পাতনের ফলে আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্য তেলের খনিতে পরিণত হয়েছে।

তাই বলাই যায়, জলবায়ু পরিবর্তন নতুন কোনো বিষয় নয়। পৃথিবীর শুরু থেকে জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে আসছে। তবে পূর্বের তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনের হার বর্তমান সময়ে অনেক বেশি। আর এ জন্য দায়ী মানুষ। মানবসৃষ্ট বলার অন্যতম কারণ হলো- শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কল-কারখানা, যানবাহন, দৈনন্দিন কাজে ব্যাপক হারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। এছাড়াও, নির্বিচারে বন উজাড় করা, বনভূমির গুণগত মান নষ্ট হওয়া, নতুন বনভূমি সৃষ্টি না হওয়া, কৃষিকাজে অনিয়ন্ত্রিত সার, কীটনাশক, অদক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জৈবিক পচনের ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে।

আইপিসিসি-এর চতুর্থ সমীক্ষা মতে, গত শতাব্দীতে বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জিভূত গ্রিনহাউস গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ২৫%, নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ ১৯% এবং মিথেনের পরিমাণ ১০০% বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো-এ দেশটির আছে দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল, সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে অধিকাংশ এলাকার উচ্চতা স্বল্প, দেশটি সমতল ও ব-দ্বীপ এবং ঋতু বৈচিত্র্য ব্যাপক।

মার্কিন যুক্তরাষ্টের বার্ষিক মাথাপিছু গড় গ্যাস উদগীরণের পরিমাণ প্রায় ২২ টন। সার্বিকভাবে উন্নত বিশ্বের ক্ষেত্রে এই গড় ১০-১৫ টন। উন্নয়নশীল বিশ্বের শিল্প-অগ্রসর দেশসমুহের (চীন, ভারত, ব্রাজিল, মেক্সিকো,দক্ষিণ আফ্রিকা) ক্ষেত্রে এই হার ২-৬ টন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ ০.৩ টন। অর্থ্যাৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে তথা পৃথিবীর উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের দায়ভার বাংলাদেশের একেবারেই নেই। তারপরেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার। তাই, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতের কারণে যে ক্ষতির শিকার হচ্ছে তার জন্য উন্নত বিশ্ব তথা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল হতে প্রয়োজনীয় অর্থ-প্রযুক্তি ও সহযোগিতা পাওয়ার নৈতিক অধিকার বাংলাদেশের আছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশেষত উপকূল অঞ্চল আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে পতিত হতে যাচ্ছে। গাবুরা, পদ্মপুকুর, কয়রা,দা-কোপ, পাথরঘাটা আর শরণখোলাসহ উপকূলীয় অঞ্চল বিপর্যয়ের মুখে। বিশ্ববাসী যার বাস্তবতা অবলোকন করেছে ২০০৭ এবং ২০০৯ এর প্রলয়ঙ্করকারী সিডর এবং আইলাতে।

২০০৯ সালের মে মাসে আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে যায় উপকূলীয় অঞ্চলসমুহ। বিশেষ করে, দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট এবং সাতক্ষীরা আইলাতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। সাতক্ষীরায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল গাবুরা ইউনিয়নবাসী। চারিদিকে লবণ পানির ঘের ও লবণাক্ত মাটি। সবুজের কোনো দেখা নেই। মানুষের কর্মসংস্থান নেই। লবণের মরুভূমিতে সবজি চাষ করতে পারছে না তারা। বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে বিভিন্নরোগে আক্রান্ত হচ্ছে এলাকাবাসী।

এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবি। কিন্তু আইলাতে সব ঘের ভেসে যায়। যারা ঘেরে দিনমজুর হিসাবে কাজ করতেন তাদের জীবিকার সংকট সৃষ্টি হয়। লবণাক্ততার কারণে সব জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বাঁচার তাগিদে অনেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পাশ্ববর্তী দেশে গেছেন কাজের সন্ধানে। স্যানিটেশনের অবস্থা খুবই নাজেহাল হয়ে পড়ে। নারী ও শিশুরা খুবই নাজুক অবস্থার মুখোমুখি হয়। খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়।

তখন থেকেই মানুষ বাচাঁর জন্য মরণপণ চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহকে এখনো দূর করা সম্ভব হয়নি। যেমন আইলা ও সিডর উপদ্রূত অঞ্চলের প্রধান সমস্যা লবণাক্ততা দূরীকরণে সরকার বা স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। লবণাক্ততার কারণে দিন দিন কৃষি জমি মাছের ঘেরে পরিণত হচ্ছে। উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না প্রয়োজনীয় খাদ্য শষ্য।

বাস্তবতা হলো যে, কৃষি জমি মাছের ঘেরে পরিণত না করে কৃষকের কোনো উপায় নেই। কৃষি জমির পাশে লবণ পানির মাছের ঘের থাকলে লবণাক্ত পানি চুঁইয়ে-চুঁইয়ে কৃষি জমির উর্বরতা কমিয়ে দেয়। জমিতে দিনদিন ফসল উৎপাদন কমতে থাকে। ফসল ফলাতে কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসে ফসলী জমিতে হানা দেয়। কৃষি জমিতে পাশ্ববর্তী নদীর লোনা জলের সাথে তখন ঢুকে পড়ে অতিরিক্ত লবণ।

এজন্য পরবর্তী দু-তিন বছর কৃষককে বসে থাকতে হয় ফসলের আশায়। এ সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির শিকারে পরিণত হয় অসহায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা স্বল্প টাকার বিনিময়ে বেশ কয়েক বছরের জন্য কৃষকের নিকট হতে জমি লিজ নিয়ে চিংড়ী চাষের ঘের-এ পরিণত করে। বর্তমানে শতকরা ৮০ ভাগ কৃষক তাদের নিজস্ব জমি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির মাছের ঘেরের জন্য লিজ দিয়েছেন। এসব কৃষকরা বিছিন্নভাবে কৃষিকাজে ফিরে যেতে চাইলেও আর সম্ভব হয় না। খাদ্য শস্য উৎপাদনের জন্য উর্বর এ অঞ্চলে এখন ধানের আবাদ প্রায় হয়না বললেই চলে।

যদিও বর্তমানে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র গন্ডির ভেতর ধান ও অন্যান্য ফসল আবাদ হচ্ছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। এসব কিছু এলাকার বেকার সমস্যা বৃদ্ধিতে এবং খাদ্য দ্রব্যের মূল্যের উর্ধ্বগতিতে ভূমিকা রাখছে। এ অঞ্চলে ধানের আবাদ না হওয়ায় মৌসুমী বেকারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দরিদ্র মানুষ আরো দরিদ্রতর হচ্ছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য পার্শ্ববতী এলাকা হতে এনে বেশি দামে বিক্রি করায় স্থানীয় অধিবাসীদের জীবন-যাপন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

লবণাক্ততার কারণে শুধু কৃষি জমি নয়, স্থানীয় মানুষের বসতভিটায় থাকা গাছ-গাছালি, ফল-মূল ও শাক-সবজির উৎপাদনের উপর নেতিবাচক প্রভাব এখনো লক্ষ্য করা যায়। লবণাক্ততার প্রভাবে বসতভিটায় গাছের সংখ্যা দিনদিন যেমন কমে যাচ্ছে, তেমনি নারকেল, খেজুর, তালসহ অধিকাংশ গাছ বছরের পর বছর নিষ্ফলা থাকছে।

তবে বসতভিটায় বর্ষার সময় বা তৎপরবর্তী সময়ে সীমিত পর্যায়ে সবজির চাষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে তা বাজারজাতকরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। সারাবছর ধরে ব্যাপক সবজি চাষ কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। সবজি চাষের জন্য পর্যাপ্ত মিষ্টি পানির অভাবই এ সমস্যার মূল কারণ। আইলা কবলিত এসব এলাকায় সুপেয় পানি পাওয়া বড়ই দুষ্কর আর খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। এছাড়া বর্ষার জল নিষ্কাশনের জন্য এলাকার খালসমূহে সারাবছর লবণাক্ত পানি থাকায় তা ফসল উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। উল্লেখ্য, এসব খালসমূহের মাধ্যমেই নদী থেকে লবণাক্ত পানি এনে মাছের ঘেরে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সুপেয় মিষ্টি পানির অভাব শুধু খাদ্য শস্য বা সবজি উৎপাদনে বাধা নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপনকে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভুগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হওয়ায় বহু বছর ধরে স্থানীয় অধিবাসীরা এলাকার বড় কোনো পুকুরের পানি পান করে থাকেন। আইলা ও আইলা পরবর্তী সময়ে সকল পুুকুরের পানি লবণাক্ত ও দূষিত হয়ে পড়ায় মানুষের জীবন ধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ সময় পার্শ্ববর্তী এলাকা হতে নিরন্তর খাবার পানি উপদ্রুত এলাকায় সরবরাহ করতে হয়েছিল। বর্তমানে কিছু পুকুর সংস্কার করা হলেও এসব পুকুরের পানি খাবার ও নিত্য প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তা ফসল উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের জন্য একেবারে অপ্রতুল। এছাড়া লবণাক্ততার করাল গ্রাসে দিনদিন নতুন এলাকা এবং উক্ত এলাকার পুকুর ও ভুগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় তা আর ব্যবহার উপযোগী থাকছে না।

এছাড়াও বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি জ্বালানির প্রয়োজন। পূর্বে এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জ্বালানী ছিল গরুর গোবর ও ধানের নাড়া-কুঁটো। এছাড়া বসতভিটায় গাছের ডাল-পালা, মরা পাতা ইত্যাদিও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। লবনাক্ততার কারণে এ অঞ্চলে ধানের উৎপাদন প্রায় হচ্ছেই না, বসতভিটার গাছ-গাছালিও দিনদিন মরে যাচ্ছে। ফলে গো-খাদ্য যেমন বিচলি বা ঘাস উৎপাদিত না হওয়ায় গবাদি পশু লালন পালন যাচ্ছে না। এতে জ্বালানি সমস্যা মানুষের জীবনকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। বর্তমানে এলাকার অধিকাংশ অধিবাসী সুন্দরবন থেকে চোরাইপথে আনা কাঠ কিনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছে। এটি সুন্দরবনের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যের সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে।

আইলা উপদ্রুত অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়াদি পূর্বের ন্যায় এখনো অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। অঞ্চলটি দূরবর্তী এবং যাতয়াত ও নাগরিক সুবিধা বঞ্চিত হওয়ায় বহু পূর্বেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় হতে প্রদেয় স্বাস্থ্য সুবিধাসমূহ ঠিক মতো প্রদান করা হতো না। আইলা হওয়ায় স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অসুবিধাদি আরো বহুলাংশে বেড়েছে। পাশাপাশি লবণাক্ততার কারণে এ অঞ্চলটি দিনদিন গাছ-পালা হারিয়ে সবুজহীন বিবর্ণ হয়ে পড়ছে।

ফলে স্থানীয় পরিবেশ, জীব-বৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান বিপর্যস্থ হয়ে পড়ার পাশাপাশি মানুষের নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এসব সমস্যার প্রধান শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। পূর্বের ন্যায় এখনো পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত না করায় অধিবাসীদের জীবন-যাপন কঠিনতর হয়ে পড়েছে।

আইলা উপদ্রুত অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি একাধিক এনজিও নানা ধরনের কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে। জিও এবং এনজিও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিষ্টি পানির পুকুর খনন, পানির ট্যাংক প্রদান, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ), পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করণ পূণঃনির্মাণ করণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু, এখনও অনেককে ২-৩ মাইল দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। লবণাক্ততা এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবই এ এলাকার মানুষের এখন প্রধান সমস্যা। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ সময় অনেক সহায়তা করেছে। বিশেষ করে, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন “সংযোগ” কর্মসূচির আওতায় সহযোগী সংস্থাসমূহকে অর্থায়নের মাধ্যমে এখানকার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য মৌলিক প্রয়োজন মিটানোসহ মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্বক কাজ করে। ফাউন্ডেশন ২০০৬ সাল হতে দেশের বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে মঙ্গাক্রান্ত অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ‘মঙ্গা নিরসনে সমন্বিত উদ্যোগ (সংযোগ)’ কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করছে।

‘সংযোগ’ কর্মসূচি বর্তমানে দেশের ১১টি জেলার অতিদারিদ্র্যপ্রবণ ৫০টি উপজেলায় ৩০৯টি শাখার মাধ্যমে প্রায় ৫.২০ লক্ষ অতিদরিদ্র খানায় সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কাজ করছে। বর্তমানে প্রায় ৫.১২ লক্ষ অতিদরিদ্র পরিবারকে সেবা প্রদান করছে। ‘সংযোগ’ কর্মসূচির মাধ্যমে নমনীয় সহনীয় ক্ষুদ্রঋণ, আপদকালীন ঋণ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়নমূলক এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কারিগরি সেবা, কাজের বিনিময়ে অর্থ কার্যক্রম শুরু করা হয়। কারিগরি সেবার মাধ্যমে সবজি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফাউণ্ডেশন ২০১০-২০১১ সালে দক্ষিণাঞ্চলে ৬টি উপজেলায় ৯টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ এবং খুলনার ডেকোপ ও কয়রা উপজেলাতে “সংযোগ” প্রকল্প শুরু করে।

প্রথমে, ২০১১-১২ মৌসুম ভিত্তিক বিনামূল্যে সবজির বীজ বিতরণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২-১৩ অর্থবছরে বসতবাড়িতে সবজি চাষের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মৌসুম ভিত্তিক বীজ বিতরণ করা হয়। তখন দেখা যায় প্রায় ৬০% বসতবাড়িতে সবজি উৎপাদন বেড়ে যায়। পরবর্তী ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে রবি মৌসুমের বীজ বিতরণ, বসতবাড়িতে সবজি চাষ, বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সবজি চাষের যে সব প্রদর্শণ স্থাপন করা হয়েছে। কারিগরি সেবার মাধ্যমে সেই সব প্রদর্শনী এবং বীজ বিতরণের মাধ্যমে প্রায় ৯০% বসতবাড়িতে সবজি উৎপাদন দেখা মিলেছে। স্বল্প হলেও এসব কর্মকাণ্ডের সুফল মানুষের নিকট পেীঁছানো সম্ভব হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বা উদ্যোগ টেকসই কিনা। খুব সরল পর্যবেক্ষণে এটা পরিস্কার যে, উপদ্রুত অঞ্চলের প্রধান সমস্যা লবণাক্ততা। এ সমস্যাকে কেন্দ্র করেই এলাকার প্রধান আয়বর্ধনমূলক কর্মকান্ড চিংড়ি চাষ এবং বেকার সমস্যাসহ অন্যান্য সকল সমস্যা আবর্তিত হচ্ছে। এটি জিইয়ে রেখে কোনোভাবেই জীবন-জীবিকার সমস্যা টেকসইভাবে দূরীকরণ সম্ভব নয়। কারণ লবণাক্ততার জন্যই জীবন-জীবিকা সম্পর্কিত সমস্যাসমূহ দিন দিন আরো ঘনীভূত হচ্ছে।

এ পর্যায়ে যে প্রশ্নটি অবধারিতভাবে সবার মনে জাগতে পারে তাহলো - লবণাক্ততা সমস্যা দূরীকরণে যথাযথ কর্মকাণ্ড কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না। কারণ এনজিও এককভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। কারণ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এনজিও’র কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। এমনকি নীতি বাস্তবায়নে এনজিও’র ভূমিকা প্রধানত- জনসচেতনতা তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ। লবণাক্ততা দূরীকরণের ক্ষেত্রে সরকারের নীতি-নির্ধারণ ও নীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ ও বলিষ্ট ভূমিকাই অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে।

এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর উন্নতিতে প্রথমেই যা করা উচিৎ তাহলো কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানির চিংড়ী চাষ বন্ধ করা। যদি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নাও হয় তবে লবণাক্ত পানির চিংড়ী চাষের জন্য প্রাথমিকভাবে এলাকা সীমিতকরণ বা জোনিং করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমানে চিংড়ির চাষের পাশাপাশি কাঁকড়া চাষের জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এ উপকূল অঞ্চলে।

আইলাতে বিধ্বস্ত জনগোষ্ঠী এখন সংকটাপন্ন অবস্থা থেকে ঘুরে দাড়ানোর চেষ্টা করছে। বেসরকারি সংস্থাসমূহের সাহায্য ও সহযোগিতায় মৌলিক প্রয়োজন মিটানোর পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, হাস-মুরগি, গরু-ছাগল, কবুতর ও কয়েল পাখি পালন, কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ, বসতবাড়িতে সবজি চাষ, ভেড়া পালন ইত্যাদি আয়বর্ধন কর্মকান্ড করে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ।

গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা মাসুমা বেগম বলেন, আইলার আগে আমার সবকিছুই ছিল। কিন্তু, আইলার পর আমার সবকিছুই হারিয়ে যায়। তবে আল্লাহর শুকরিয়া যে আমি এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছি।

পদ্মপুকুর ইউনিয়নের সোনাখালী গ্রামের বাসিন্দা দীপন সরকার বলেন, পদ্মপুকুরে আগে সবকিছুই আবাদ হত। অথচ এখন লবণাক্ততার কারণে তা সম্ভব হচ্ছেনা। তবে কিছু কিছু জায়গায় এখন সবধরনের ফসল উৎপাদন হওয়া শুরু হয়েছে। আইলার পরে ধান জন্মাত না, এখন ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন হচ্ছে।

কৃষি ও খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উল্লেখ করেন, দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। এ অঞ্চলে গত চার বছরে ধানের উৎপাদন ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন বেড়েছে ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ ও আলু উৎপাদন। লবণাক্ততার কারণে আগে দক্ষিণের জেলাগুলোতে বছরে একবার বোরো ধান চাষ হতো। বাকি সময় কৃষকরা চিংড়ির চাষ করত। কিন্তু, চিংড়িতে লোকসান হওয়ায় কৃষকরা বিকল্প হিসাবে কাঁকড়া মোটাতাজাকরণের দিকে ঝুঁকছে। এ পদক্ষেপ উন্নয়নের পথে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

ইফপ্রি-এর তথ্যনুযায়ী, গত চার বছরে দক্ষিণাঞ্চলে ২০টি জেলায় ধানের উৎপাদন বেড়েছে ২ শতাংশ, আমন ধানের চাষ বেড়েছে প্রায় ৩০০ শতাংশ, ভুট্টার ৩৮০ শতাংশ, ডাল ৩০ শতাংশ, তেলজাতীয় শস্য ৩৫ শতাংশ এবং আলুর চাষ ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট জেলায় মাছ ও চিংড়ি চাষের পাশাপাশি সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখী, মুগ, মসুর ডাল ও খেসারি এবং মাছের ঘের ও পুকুর পাড়ে সবজি চাষ মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিব্যবস্থার উন্নতির জন্য একটি মহাপরিকল্পনা নিয়েছিল। তাতে দেখা যায়, ৫০ শতাংশ জমিতে বছরে ফসল হয় মাত্র একবার।

বাংলাদেশ মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন সংস্থার (এসআরডিআই)পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী খুলনা, সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট উচ্চ লবণাক্ত এলাকা। বর্ষার তিন মাস ছাড়া চাষ করা যেতনা। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গত চার বছরে মোট ২০টি নতুন জাতের ধান উদ্ভাবন করেছে। যার অর্ধেকই দক্ষিণাঞ্চলের উপযোগী লবণাক্ততা, খরা ও ঠান্ডা সহিষ্ণু জাত। কৃষক পর্যায়ে ওই জাতগুলো জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। আশার কথা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে আইলা উপদ্রুত অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক সবুজ উদ্যোগ বশে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৭টি লক্ষমাত্রাকে অর্জনের জন্য “গ্লোবাল গোল্স-২০৩০” যাত্রা শুরু হয়েছে। যেখানে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে- সকলের ক্ষুধা দূর করা, সবার জন্য টেকসই পানি ব্যবস্থপনা ও পয়োঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা, পরিবেশ উন্নয়নে সাগর, মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা, সবার জন্য স্থায়ী, অন্তর্ভূক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক কার্যক্রম উৎসাহিত, পরিপূর্ণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং উপযুক্ত কর্মের নিশ্চয়তা প্রদান করা, টেকসই উৎপাদন ও ভোগ নিশ্চিত করা, স্থলজ বাস্তুতন্ত্রের সংরক্ষণ, পূণরুজ্জীবন ও টেকসই ব্যবহার, মরুকরণ প্রতিহত এবং ভূমির মানে অবনতি রোধ ও জীববৈচিত্র্যের রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা।

“গ্লোবাল গোল্স-২০৩০” এবং “ভিশন-২০২১” যাই বলা হোক না কেন এ জনগোষ্ঠী এখনও তাদের যথাযথ অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। এখনও লবণাক্ততার কারণে গাবুরাবাসী বছরে শুধু একবারই চাষাবাদ করে। অবকাঠামো উন্নয়ন এখনও পুরোপুরি হয়নি। অপর্যাপ্ত অবকাঠামোগত উন্নয়ন। স্যানিটেশনের ব্যবস্থা সবার দুয়ারে পৌছে দেয়া সম্ভব হয়নি। খাবার পানির সংকট কাটেনি। এলাকার পুরুষ মানুষ বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান। অনেকে স্থায়ীভাবে পার্শ্ববর্তী জেলাতে চলে গেছেন। কিন্তু তাদের ঘুরে দাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যহত রয়েছে।

যেভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হচ্ছে তাতে আরেকটি আইলা সংঘটিত হলে তদেরকে সবকিছুই হারিয়ে ফেলতে হবে। জীবন হয়ে পড়বে বিপন্ন। তাদের ঘুরে দাড়ানোর স্বপ্ন হবে ধুলিস্যাৎ। আবারও তাদেরকে মানবেতর জীবন-যাপন করতে হবে। সরকারের “এসডিজি” এবং “ভিশন-২০২১” লক্ষমাত্রা অর্জন করা দূরহ হয়ে পড়বে। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের দাবি যে তাদের জন্য স্থায়ী সুরক্ষা ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করা হোক। এ জন্য দেশি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডবিডব্লিউএম)-এর গবেষণার তথ্য মতে, আগামী ২০৫০ সাল নাগাদ উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাবে। কারণ, এ অঞ্চলে শুকনা মৌসুমে ভূ-অভ্যšরে পানির লবণাক্ততা ০-১ পিপিটি হতে ২ পিপিটি বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত এ লবণাক্ত পানি উঠে যাবে। যা পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা এবং ঝালকাঠি জেলাকে মারাত্বকভাবে ক্ষতিগস্থ করবে। আর এ সময় সাতক্ষীরা এবং খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিমাণ ২০৫০ সাল নাগাদ ২৫ পিপিটি হতে ৩৫ পিপিটি পৌছবে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত খারাপ সংবাদ।

আশা করব, সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন যাতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনে গ্রহণযোগ্য পরিবেশ বান্ধব ও কৃষিভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন আনয়ন সম্ভব হয়। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাসমূহের কাজের সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের পাশাপাশি আইলা উপদ্রুত অঞ্চলের অধিবাসীদেরও ইতিবাচক ও সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।


মো. আব্দুর রশিদ (সহকারী ব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ),
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
সহযোগিতায় - মোঃ আশরাফ হোসেন, উপ-ব্যবস্থাপক, পিকেএসএফ।

ঢাকা, রবিবার, অক্টোবর ৯, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ৩২৪৪ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন