সর্বশেষ
রবিবার ৫ই কার্তিক ১৪২৬ | ২০ অক্টোবর ২০১৯

যশোরের দুঃখের আরেক নাম 'ভবদহ'

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬

599498786_1483010668.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
আগের দিনে প্রযুক্তি ছিলনা। ছিলনা আধুুনিকতার চোখ ধাঁধানো জৌলুসতা এবং কৃত্রিমতা। আর উন্নয়নের নামে বাড়ছে চৌর্য্যবৃত্তি। দিন দিন আধুনিক প্রযুক্তির ঝনঝনানি বেড়েছে। ক্রমশ উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। কিন্তু আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে হাতে গনা কয়েকজন মানুষ। যুগে যুগে এরা শোষণ করেছে আর করছে অন্যদের।

আগের দিনে মানুষ প্রকৃতিতে বসবাস করতেন। প্রকৃতির আবহে নিজেকে মানিয়ে নিতেন। প্রকৃতির সাথে ছিল অন্যরকম এক সখ্যতা। কিন্তু আজ মানুষ প্রকৃতিকে আয়ত্ব করেছে। তার গতিকে থামিয়ে দিয়ে মানুষ অনধিকার চর্চা করছে। তাই প্রকৃতিও মানুষের উপর রুষ্ঠ হয়ে তার তাণ্ডব লীলা দেখিয়ে দিচ্ছে। অর্থ্যাৎ প্রকৃতির তার চিরচেনা রূপ দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষকে। যার বাস্তবতা আজকের ভবদহ। পানি তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছেনা। মানব সৃষ্ট বাঁধ আর স্লুইস গেটের কারণে নদী তার নাব্যতা হারিয়ে পলি দ্বারা ভরাট হয়েছে।

ফলে জলাবদ্ধতার করাল গ্রাসে আক্রান্ত এ অঞ্চলের মানুষ আর প্রকৃতি। বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল এবং খুলনা অঞ্চল এক সময় সাগরের তলে নিমজ্জিত ছিল। হিমালয় হতে গড়ে আসা গঙ্গা বাহিত পলি দ্বারা এ অঞ্চল গঠিত হয়েছে। সেই পলির হাত থেকে মানুষ এখনো বাঁচতে পারেনি। অর্থ্যাৎ পরিকল্পনাবিহীন পোল্ডার আর স্লুইস গেটের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পলি পরে নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। আর বিলগুলো জলাবদ্ধতার কঠিন বেড়াজালে আবদ্ধ। নদীগুলো পলি দ্বারা ভরাট হওয়ার কারণে পানির গতিপথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বৃষ্টি বা জোয়ারের পানি বিলগুলোতে আটকে ব্যাপকহারে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। যা মাসের পর মাস মানুষের নিদারুণ কষ্টের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তবে এ বাঁধের পূর্বে এ অঞ্চলের মানুষ অতীত হতেই ভূ-বৈশিষ্টের সঙ্গে খাপ খেয়ে তাদের জীবনযাপন প্রণালি ও চাষ পদ্ধতি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।

তবে জোয়ার-ভাটার সময় বিলগুলো তেমন কোনো সমস্যা তৈরি করেনি। তার অন্যতম কারণ-এ অঞ্চলের মানুষ তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এ সমস্যার সমাধান করতে থাকে। অনেক প্রতিকূলতা সত্বেও এ অঞ্চল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। ৬০-এর দশকে বহুজাতিক কোম্পানিসমূহ 'অধিক খাদ্য ফলাও সবুজ বিপ্লব' শ্লোগানকে সামনে রেখেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী ও স্থানীয় কিছু বুর্জোয়া মিলে বেড়ি বাঁধ ও স্লুইস গেট প্রকল্পের ফর্মুলার প্রেক্ষিতে ১৯৬০-১৯৬৭ সালের মধ্যে ৩৪টি পোল্ডার, ১৫৬৬ বেড়ি বাঁধ ও ২৮২টি স্লুইস গেট নির্মাণ করে। আসলে এসব কোম্পানির মূল উদ্দেশ্য ছিল অধিক খাদ্য ফলাও- এর পাশাপাশি সেচ, সার আর কীটনাশক বিক্রির জন্য বিশ্ব বাজার ব্যবস্থার দ্বারকে আরো উন্মুক্ত করার পথকে সুগম করা।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরবর্তীতে সারা বাংলায় দূর্ভিক্ষ হলেও যশোর আর খূলনা অঞ্চলে কোন রকম দূর্ভিক্ষ হয়নি। কারণ মুক্ত বিলে কৃষক সমাজ পরিবেশ সাশ্রয়ী 'দশের বাঁধ বা অষ্ট মেসো বাঁধ' নির্মাণের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদন করতেন। কিন্তু মানব সৃষ্ট এ বাঁধের কারণে এ অঞ্চলে দূর্ভিক্ষ দেখা দেয়।

বিরাজমান এ পরিস্থিতিতে তৎকালীন পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠী পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা না করে 'সিইপি' নামক এক পরিবেশ বৈরি প্রকল্প চালু করে। এরপরেই মানুষের দু:খ কষ্টের সূত্রপাত হয়। একদিকে বাঁধ নির্মাণ অন্যদিকে স্লুইস গেট-এর কারণে নদীগুলো অধিক পলি জমা হওয়ায় নাব্যতা হারাতে থাকে। অতিরিক্ত পানি উপচিয়ে বিলে প্রবেশ করে। বাঁধের ফলে জোয়ার-ভাটার অন্য কোন পথ না পেয়ে নদী বক্ষে পলি জমতে শুরু করে। স্লুইস গেটগুলোও অকেজো হয়ে পড়ে। পানি চলাচলের রাস্তা না থাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করে।

আশির দশকে সর্বপ্রথম বিল ডাকাতিয়ায় মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এছাড়া মানুষ হারিয় ফেলে লবণ জলে জন্মানো অসংখ্য প্রজাতির মাছ। এ অবস্থাতে অনেক কমিউনিস্ট নেতা বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। এ সময় তাদেরকে 'কমিউনিস্টদের চর' বলা হত। তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়।

পলি দ্বারা নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা এ অঞ্চলের স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। অসংখ্য মানুষ আশ্রয়হীন ও কর্মহীন অবস্থায় বাঁধ, রাস্তা ও সরকারি স্কুলগুলোতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়ছে শিশু, নারী ও শিশুরা। গরীব মানুষ অতি অল্প মূল্যে তাদের জমি বিক্রি করে দিচ্ছে স্থানীয় বুর্জোয়াদের কাছে। এসব ঘের মালিকগণ অনেক সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে জমি দখল করে নিচ্ছে।

বিশেষত, ১৯৯৭ সালে হাজার হাজার মানুষ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বিল ভায়নার বাঁধ কেটে দিয়ে নদীর স্বাভাবিক গতি আনতে চেষ্টা করে। জনগণ সফলও হয়। পরবর্তীতে সরকার এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা দুর করতে স্থানীয় লোকদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিল কেদারিয়া ও বিল খুকশিতে টিআরএম প্রকল্প চালু করে। মানুষ জলাবদ্ধতার কবল থেকে মুক্তি লাভ করে।

কিন্তু বিল কপালিয়ায় টিআরএম প্রকল্প পদ্ধতিগত জটিলতা, জনগণকে তাদের জমির যথাযথ মূল্য বুঝিয়ে না দেয়া, জমির মূল্য বুঝিয়ে দিতে নানারকম জটিলতা, অবকাঠামোগত সমস্যা, পরিকল্পনাগত সমস্যা, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ইত্যাদি কারণে আটকে আছে। আর এর সাথে যুক্ত হয় রাজনৈতিক দলাদলি। ফলে টিআরএম প্রকল্প আজ হুমকির সম্মুখীন।

বিল খুকশিয়া এবং বিল কপালিয়াতে টিআরএম প্রকল্পের ডিজাইনগত সমস্যার কারণে কপালিয়ায় অধিবাসীদের মাঝে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়। বিলের ঘের মালিক ও খাস জমির ভোগদখলকারীরা জনগণের এ নেতিবাচক মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য টিআরএম বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে। কারণ হলো ফসল আবাদ উঠে গিয়ে এ অঞ্চল এখন মাছের ঘেরে বর্তমানে জমজমাট হয়ে উঠেছে। বাধ্য হয়ে অনেকে তাদের পূর্বপুরুষের পেশাকে পরিহার করে মাছ চাষ করছে। কিন্তু মাছ চাষের টাকা তার পকেটে না গিয়ে তা যায় মহাজনের পকেটে। তাই মহাজনেরা কখনও এমন চায়না যে ঘের উঠে যাক। আর জলাবদ্ধতা থাকলে নতুন নতুন প্রকল্প আসবে, কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ হবে। আর সেই টাকার হরিলুট হবে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-প্রকৌশলী শওকত হোসেন বলেন, 'ঘের মালিকেরা সমস্যা সৃষ্টি করছে। তাদের কাগজপত্র নেই, মালিকানা নেই। জোর করে দখল করে খাচ্ছেন। সরকারকে কর দিচ্ছেন না। অন্যদিকে গরীব মানুষ ঘের মালিকদের ভয়ে কথা বলছে না।'

কেশবপুরের উপজেলা চেয়ারম্যান এএইচএম আমির হোসেন বলেন, 'জলাবদ্ধতার কারণে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, উৎপাদন ঝুঁকির মুখে রয়েছে।'

সৈয়দ রেজওয়ানা হাসান বলেন, 'জলাবদ্ধতার কারণে এই অঞ্চলের মানুষ ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতির কারণে এই অঞ্চলের মানুষ সাংবিধানিক সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ভ্রান্ত উন্নয়নের কারণে এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।'

বর্তমানে জলাবদ্ধতা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের মানুষের জন্য স্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ জলাবদ্ধতাকে 'যশোরের দুঃখ' নামে অভিহিত করেছে স্থানীয়রা। মাসের পর মাস এ জলাবদ্ধতা প্রকট রূপ নিয়ে জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।

তাই এ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম দাবী হলো-জরুরি ভিত্তিতে ভবদহ অঞ্চলে তিনটি স্কেভেটর আনতে হবে। বিল কপালিয়ায় টিআরএম চালু করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পূনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমডাঙ্গা খাল প্রশস্ত করে রাজাপুর খালের সাথে সংযোগ প্রদান করতে হবে। মুক্তেশ্বরী নদীর সাথে ভৈরব-মাথাভাঙ্গার সংযোগ ও সংস্কার করতে হবে।

মনোহরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জনাব মশিউর রহমান বলেন, 'আমাদের এ অঞ্চলের অন্যতম সমস্যা জলাবদ্ধতা। এ অঞ্চলে প্রায় ১০০টি বিল রয়েছে। তবে টিআরএম প্রকল্প অব্যহত রাখার মাধ্যমে এ বিলগুলোকে বাঁচানো সম্ভব।'

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী বলেন, 'টিআরএম প্রকল্প হলো পলি রাখার বাক্স। এটি এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমাধানের অন্যমত উপায়। স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কিছু মানুষকে হাত করে এ প্রকল্পের বিপক্ষে দাড়িয়েছে। আমাদের মাঝে এমন দ্বিধা বিভক্তির ফলে বিল কপালিয়ায় টিআরএম প্রকল্প চালু হতে দেরি হচ্ছে।'

দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের জলাবদ্ধতা আজ জাতীয় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। সরকার, জনগণ আর স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যাক্তিবর্গকে একসঙ্গে এ সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। সকলকে দেশ ও জাতির স্বার্থে প্রতিনিধিত্বমূলক ও অংশীদারিত্বমূলক আচরণ করতে হবে। তবেই আসবে সহজ সমাধান। মিলবে মুক্তি হাজারো দুঃখী মানুষের। ফিরে আসবে আগের মত সোনালী দিন। সবুজ, সুফলা আর শস্য-শ্যামলা হবে আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিমের অঞ্চলটি।

মোঃ আব্দুর রশিদ, সহকারী ব্যবস্থাপক (কার্যক্রম বিভাগ),
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।






ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৯, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // জে এস এই লেখাটি ২৪২০ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন