সর্বশেষ
শনিবার ৬ই আশ্বিন ১৪২৬ | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সব স্কুলেই পড়ুক ইরিনা, শারমিনরা

সোমবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৭

1139194027_1484572617.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
ফুটফুটে দুটি মেয়ে। কী মায়াবী চেহারা তাদের! কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তারা কথাও বলতে পারে না, কানেও শুনতে পায় না। কিন্তু এই সমস্যা তাদের পড়াশোনা আটকাতে পারেনি। ২০১৬ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় দুই বোনই পাস করেছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর হচ্ছে, প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো বিদ্যালয়ে তারা পড়ালেখা করছে না। করছে সাধারণ বিদ্যালয়েই পড়ালেখা।
গত বুধবার প্রথম আলোর চট্টগ্রাম সংস্করণে এই দুই বোনের সাফল্যের খবর প্রকাশিত হয়। তাদের নাম ইরিনা আক্তার ও শারমিন আক্তার। শোনা ও বলার বাধা ডিঙিয়ে তাদের এই সাফল্য সত্যিই আমাদের বিস্মিত করে। চারদিকে যখন নেতিবাচক খবরের ছড়াছড়ি, তখন ইরিনা ও শারমিনের খবর আমাদের মনে আশার আলো জাগায়। আমরা আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখি। ইরিনা ও শারমিন আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, যদি লক্ষ্য অটুট থাকে, তাহলে জীবনের কোনো বাধাই বাধা নয়।
ইরিনা ও শারমিন থাকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাইছড়ি গ্রামে। সেখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোনো স্কুল নেই, তাই বাধ্য হয়ে তাদের বাবা স্থানীয় একটি পাটকলের শ্রমিক আবদুল আজিজ তাদের সাধারণ স্কুলে ভর্তি করান। প্রতিবন্ধী বলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাদের পড়ালেখার খেয়াল রাখলেও পরীক্ষাকেন্দ্রে বাড়তি কোনো সুবিধা পায়নি তারা। অতিরিক্ত কোনো সময় দেওয়া হয়নি। ইরিনা ও শারমিনেরও হিয়ারিং এইড বা শ্রবণযন্ত্রের দরকার ছিল। এতে হয়তো তারা তাদের পড়াটা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। দুই বোনের কানের চিকিৎসা ও শ্রবণযন্ত্র স্থাপনের জন্য কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকা প্রয়োজন। কিন্তু তাদের দরিদ্র বাবার পক্ষে এই পরিমাণ টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের কানের চিকিৎসাও শুরু হতে পারেনি। তারপরও তারা পাস করেছে এটাই বড় কথা।

এ রকম কত ইরিনা ও শারমিন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার খোঁজ কেই বা রাখে। তাদের বেশির ভাগই হয়তো পড়ালেখার কোনো সুযোগ পায়নি। কারণ আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধীরা সবচেয়ে অবহেলিত। তাদের পড়ালেখার কথা কেউ ভাবে না। কানে শোনে না, কথা বলতে পারে না। তাদের আবার পড়ালেখা কী। কিন্তু এখন আমাদের ভাবতে হবে তাদের কথা। কারণ তারা দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের মতো আরও অনেকে দেখিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবীতে কোনো কিছু অসম্ভব নয়।

দেশে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা কত সে বিষয়ে সরকারের কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শ্রবণ প্রতিবন্ধী ও ৩ দশমিক ৯ হচ্ছে বাক-প্রতিবন্ধী। এরা শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তুলনায় পিছিয়ে আছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যমাত্র সাতটি স্কুল রয়েছে। যেগুলোতে আসন রয়েছে মাত্র ২৭০টি এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য রয়েছে ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের সেখানে পড়ার সুযোগ নেই।

দেশের সাধারণ স্কুলগুলো প্রতিবন্ধী শিশুদের সহায়ক নয়। স্কুলের পরিবেশ ও অবকাঠামো প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়াশোনা ও যাতায়াতের জন্য সহজ নয়। এতে করে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা দিচ্ছে। তাদের পড়ালেখা নির্বিঘ্নে সম্পাদনের জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষা উপকরণ দরকার। কিন্তু তা তারা ঠিকমতো পাচ্ছে না। বাক্ ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের ইশারা ভাষায় শিক্ষাদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষকের ইশারা ভাষার ওপর কোনো প্রশিক্ষণ নেই। বেশির ভাগ স্কুলে হেডফোন, শ্রবণসহায়ক যন্ত্র নেই।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) প্রকাশিত ‘বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১৩’ প্রতিবেদনে একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার সুযোগের পরিধি বিস্তার করার সুপারিশ করা হয়েছে। আমরাও ইউনিসেফের সঙ্গে একমত। আমরা চাই সাধারণ স্কুলে প্রতিবন্ধী শিশুরা পড়ালেখার সুযোগ পাক। বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের জন্য ইশারা ভাষায় দক্ষ এমন শিক্ষক স্কুলগুলোতে নিয়োগ হোক। তাদের দেওয়া হোক শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংগঠনগুলোকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। আসুন আমরা সকলে মিলে ইরিনা ও শারমিনদের পাশে দাঁড়াই। তাদের এগিয়ে দিই উন্নত জীবনের দিকে।

লেখক- রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক

সূত্র: প্রথম আলো

ঢাকা, সোমবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ১৯৮৮ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন