সর্বশেষ
সোমবার ১লা আশ্বিন ১৪২৬ | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

টেকসই উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ দরকার

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০১৭

1020205946_1486491054.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনার দেশ হিসেবে গড়ে উঠছে তা আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকার করা  হচ্ছে। পৃথিবীর অন্যতম ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস্ পরবর্তী উদীয়মান ১১টি অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যে বাংলাদেশের নাম তালিকাভুক্ত করেছে। পোশাক শিল্পখাত, কৃষি খাত এবং রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী শ্রমশক্তি বাংলাদেশের এই সাফল্যের পিছনে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশের জিডিপির আকার প্রায় ১৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ১৯৯৬ সালে ছিল প্রায় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষিখাতের অবদান ১৬ শতাংশের মতো আর শিল্পখাতের অবদান ৩০ শতাংশের মতো।  এদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশই আসে পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট খাত হতে।

এ খাতে কাজ করা কয়েক লাখ শ্রমিকের মাঝে বেশিরভাগই নারী, যারা গ্রামের দরিদ্র পরিবার হতে উঠে এসে আয় রোজগার করে চলেছেন। নারীর হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করেছেন। জিডিপিতে অবদান রাখছেন। অন্যদিকে গ্রামের মায়া মমতা ত্যাগ করে, বিদেশে শ্রম বিক্রি করতে যাওয়া মানুষদের পাঠানো টাকার প্রভাবে এখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

এ রিজার্ভ দিয়ে ছয় মাসের আমদানী ব্যয় মেটানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১৪৬৬ মার্কিন ডলার বলে দাবী করা হচ্ছে। বাংলাদেশ যে দ্রুত উন্নতি করছে, এসব তথ্য তারই প্রমান দেয়।

তবে , এই উন্নয়নের ধারাবহিকতা ধরে রাখতে হলে আমাদের সুষম উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। সুষম উন্নয়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। সুষম উন্নয়নের জন্য সুষম বিনিয়োগ প্রয়োজন। দুই একটি শহর কেন্দ্রিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে, উন্নয়ন সুষম হবে না। উন্নয়ন সুষম না হলে আয় বৈষম্য থেকে যাবে। ফলে, এলাকা ভিত্তিক দারিদ্র্যের হারের পার্থক্য প্রকট হতে থাকবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), বিশ্বব্যাংক এবং জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচী (ডাব্লিউএফপি) যৌথভাবে ২০১৪ সালের অগাষ্ট মাসে বাংলাদেশের দারিদ্র্য মানচিত্র প্রকাশ করেছিল।  এতে বলা হয়েছে, দেশের দরিদ্র মানুষের ৩২ দশমিক ৩ শতাংশই বসবাস করে ঢাকা বিভাগে। আর সিলেটে বাস করে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। জেলাওয়ারী হিসাবে দেখানো হয়েছে, কুষ্টিয়ায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে কম - ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, সবচেয়ে বেশী  দরিদ্র মানুষ বসবাস করে দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম জেলায়।

এ জেলার ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষই দরিদ্র, গরিব। উল্লেখ করা যেতে পারে কুড়িগ্রাম জেলার লোক সংখ্যা ১৮ লক্ষের মতো। আমাদের সিলেটের হিসাবটা বাদ দিতে হবে কারণ এই জেলায় প্রবাসী মানুষের সংখ্যা অন্য জেলার চেয়ে অনেক বেশী। ঢাকা বিভাগের দরিদ্র মানুষের হারের বিষয়ে বলা হয়েছে, ঢাকা বিভাগে বেশী মানুষ বসবাস করে বলেই গরিব মানুষের সংখ্যাও বেশী। কথাটা ঠিক। কিন্তু সেই সাথে একটা প্রশ্নও উঠে আসে আমাদের মনে, বিশ্বের বসবাস অনুপযোগী শহর হওয়া সত্ত্বেও এতো মানুষ ঢাকায় বসবাস করে কেন? উত্তরটাও বোধ হয় সহজ। কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে যেটুকু শিল্পায়ন হয়েছে, যতটুকু বিনিয়োগ হয়েছে বা হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই ঢাকা বা চট্রগ্রাম কেন্দ্রিক। ঢাকা ও চট্টগ্রাম এলাকায় বিনিয়োগ তথা শিল্পায়ন বেশি হচ্ছে বলে এই এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি তৈরী হচ্ছে। কর্মের খোঁজে, শ্রম বিক্রির খোঁজে গরিব মানুষগুলো এই সকল শিল্পঘন এলাকায় ভিড় করছে। ফলে শ্রমের অভিবাসন হচ্ছে যা টেকসই উন্নয়নের জন্য ভবিষ্যতে বাধা হতে দাঁড়াতে পারে। টেকসই বা স্থায়ী উন্নয়নের জন্য সুষম উন্নয়ন জরুরী। সুষম উন্নয়ন না হলে শ্রমশক্তির অভিবাসন হওয়াটাই স্বাভাবিক। শ্রমশক্তির অভিবাসন অব্যাহত থাকলে স্থানীয় শ্রমের মূল্য বেড়ে যেতে পারে। শ্রমই দরিদ্র মানুষের বড় সম্পদ।

শিল্পায়ন হলে শ্রমের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাবে। মানুষ তার শ্রমশক্তি বিক্রির মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত হতে পারবে। শিল্পায়ন না হলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হ্রাস করা কঠিন হয়ে যেতে পারে। আবার শিল্পায়নের জন্য বিনিয়োগ দরকার।  ইতোমধ্যে আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিনত হয়েছি। এখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই।

ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি বেশী জরুরী। আমাদের মোট বিনিয়োগের সিংহভাগই ব্যক্তিখাতের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। ব্যাংকঋণের সুদের হার , ঋণ প্রক্রিয়াকরণ জটিলতা, অবকাঠামোগত দূর্বলতা, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ইত্যাদি কারণে বিনিয়োগের গতি বাধা প্রাপ্ত হয়ে থাকে। আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশ হারে অর্জন করতে হবে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে মোট জিডিপির ৩০  থেকে ৩৩ শতাংশের সমান বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে বলা হচ্ছে। যেখানে কিনা বিনিয়োগ পরিস্থিতি ৩০ শতাংশের নিচে ওঠানামা করছে। দারিদ্র হ্রাস করতে হলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের বাজার সৃষ্টির বিকল্প নাই।

বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে না। আবার কর্মসংস্থান শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক হলে হবে না। সুষম উন্নয়ন তথা টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। দেশের অনুন্নত অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ইত্যাদিসহ উৎপাদনের জরুরী উপকরনের সহজলভ্যতা কিভাবে সৃষ্টি করা যায়, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেখা যাচ্ছে, দেশের এক অঞ্চল উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করলেও অন্য অঞ্চল একেবারেই সুবিধাবঞ্চিত হয়ে আসছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা তার আশেপাশের শ্রমিক যে দরে তাদের শ্রম বিক্রি করছেন, কুড়িগ্রাম ,নীলফামারী বা কুষ্টিয়ার শ্রমিক সে দরে শ্রম বিক্রি করতে পারছেন না।

ফলে, দেশের অভ্যন্তরে আয় বৈষম্য তৈরী হচ্ছে। ঢাকা বা তার আশেপাশের কৃষক ফসল উৎপাদন করে যে মূল্য পাচ্ছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষক একই ফসল উৎপাদন করে সে পরিমান মূল্য পাচ্ছেন না। যদিও এই দুই প্রান্তের কৃষকের শ্রমের মূল্য ব্যতিত উৎপাদনের অন্যান্য উপকরনের মূল্যে তেমন কোন পার্থক্য থাকেনি। তারা একই দরে ইউরিয়া, পটাশ বা কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করে উৎপাদন করেছেন। স্থানীয়ভাবে ভোক্তা কম হওয়ায় তারা উৎপাদিত উপকরনের মূল্য কম পাচ্ছেন। আবার অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ না হওয়ার কারণে মূল বাজারে প্রবেশ করতে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছেন।

অবশ্য অতি সম্প্রতি ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নয়ন হলে এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন আসবে। পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে ঐ অঞ্চলের অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে বলে আশা করা যায়। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের আরো একটি সমস্যা হলো ভুমির অভাব। দেশের শিল্পকারখানা বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে ভূমির সমস্যা থাকবে বলে মনে হয় না। শ্রমের অভিবাসনও কমে যাবে। শিল্পকারখানা বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ কমে আসবে। ক্যাপিটাল মেশিনারিজের খরচ স্থির হওয়ায় উৎপাদনের মূল উপাদান - শ্রম, যার মূল্য স্থানীয়ভাবে কম হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে আসবে। সেই সাথে স্থানীয় শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধি যেমন পাবে তেমনি স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরী হবে। ভোক্তা বাজারের আকার বৃদ্ধি পাবে। শ্রমের অভিবাসনের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পাবে।

কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান, সেটা যত ব্যয় বহুল স্থানেই হোক, সেখানে শ্রমিক তার শ্রম বিক্রি করতে যাবে, এটাই স্বাভাবিক, তবে যেখানে শ্রম সস্তা, সহজলভ্য যেখানে কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে, শ্রমিক এবং উদ্যোক্তা দুই পক্ষের সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে। উন্নত বিশ্বের বিনিয়োগকারীগণ বাংলাদেশে বিনিযোগ করছেন তুলনামূলকভাবে সস্তা শ্রমের বাজারের জন্য।
 
গবীর, দরিদ্র মানুষের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না । ফসল উৎপাদনের জন্য নূন্যতম উপকরনও  নেই অনেকের। তবে তাদের শ্রমশক্তি আছে। কাজ করার অদম্য ইচ্ছা আছে। বিনিয়োগ বিকেন্দ্রীকরণ করে ঢাকা ও চট্ট্রগ্রামের বাইরে শিল্পকারখানা স্থাপন বা স্থানান্তর করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলে দারিদ্র্য হারের ব্যবধান বা দারিদ্র্যের যে বৈষম্য তা  দ্রুত কমানো যেতে পারে। অন্যথায় দেশের দরিদ্র বা  অতি দরিদ্র মানুষ যদি তাদের ভাগ্যের চাকা পরিবর্তনের জন্য নিজের যৎসামান্য ভিটে মাটি, যেখানে সে পরম মমতায় বড় হয়ে উঠেছে, তা ত্যাগ করে শ্রম বিক্রির জন্যে , একটু ভালো থাকার জন্য,  শ্রমঘন পরিবেশে অভিগমন করে, তাহলে দেশের দুই একটা শহর মানুষের চাপে ভরপুর হতেই থাকবে। দারিদ্র্যের ব্যবধানও বাড়তেই থাকবে তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না।

খন্দকার রাহাত মাহমুদ,
সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, রুপালি ব্যাংক



ঢাকা, বুধবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // ম র এই লেখাটি ১৪৯৪ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন