সর্বশেষ
সোমবার ১লা আশ্বিন ১৪২৬ | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হলে ভিক্ষাবৃত্তি কমে যাবে

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০১৭

471090949_1487274232.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
আপনি গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির সাথে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। হেঁটে যাওয়ার ফাঁকে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কোন আলাপটাও সেরে ফেলার পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু, হঠাৎই বুঝলেন কেউ একজন আপনার সামনে হাজির হয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দু'টাকা দাবি করে দাঁড়িয়ে গেছেন। আপনি বুঝতে পেরেছেন, এ বেচারা আর কেউ নয়, শুধুই ভিক্ষুক।

আপনি ভদ্রলোক বিধায়, পকেট হতে দু'টাকা বের করে দিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। তারপর অষ্পষ্টভাবে বললেন, এদের জ্বালায় আর দেশে থাকা যাচ্ছে না। দেশটা যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

আপনি মার্কেটে গেছেন। দেখবেন, মার্কেটের গেটের সামনে বা ভিতরে একটা শিশু ঘুমিয়ে আছে। তার পাশে আর একটা মহিলা বসে দু'হাত পাতিয়ে তার চিকিৎসার জন্য অর্থ চেয়ে যাচ্ছেন। আপনি দিচ্ছেন অথবা দিচ্ছেন না। যার মনে দয়ার সৃষ্টি হচ্ছে, যার মনে অনুগ্রহের বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে সে সহায়তার জন্য অর্থ দিচ্ছে।

এই যে শিশু ঘুমিয়ে আছে, এরা কারা। কে এদেরকে ঘুমিয়ে রাখছে। তারা কি সত্যই অসুস্থতার জন্য ঘুমিয়ে আছে! হয়তো কিছু লোক সত্যই অসুস্থ। আবার অনেকেই ভান করছেন, ভান করানো হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ ভিক্ষা বৃত্তি।

আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, হঠাৎই দেখবেন বিকলাঙ্গ বিকৃত চেহারার ভয়ংকর রোগীদের উপস্থিত করে ভীতিকর বা অনুগ্রহের পরিবেশ তৈরী করে অধিক ভিক্ষা লাভের কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। কেউ আবার পাগলের রূপ ধারণ করে অস্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে ভিক্ষাবৃত্তি করে যাচ্ছে।

প্রায়শঃই বলা হয়ে থাকে, এক শ্রেনীর অসাধু লোক বিভিন্ন স্থান থেকে শিশু কিশোর অপহরণ করে তাদের নানানভাবে বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করছে। আবার সমাজের অসহায়দের ইচ্ছাকৃতভাবে অন্ধ বা অঙ্গহীন করে ভিক্ষার করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বা বাধ্য করা হচ্ছে।

ভিক্ষাবৃত্তি কোন স্বীকৃত পেশা নয়, ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক সমস্যা। দরিদ্রতা ভিক্ষাবৃত্তির পিছনে অন্যতম কারণ হলেও এর সাথে সমাজের এক শ্রেণির অসৎ মানুষ জড়িত আছে বলে মনে করা হয়।

বলা হয়ে থাকে, কিছু সংখ্যাক ভিক্ষুক নাকি মুখোশধারী এক শ্রেণির মানুষের ভাড়াটিয়া হিসাবে ভিক্ষা করে দেন। দিন শেষে ভিক্ষার অর্জিত অর্থ ভাগাভাগি হয়ে যায় তাদের মধ্যে। এটা এক ধরনের সিন্ডিকেশন। দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির মানুষ এসব অনৈতিক কাজ করে থাকে।

সে যাই হোক, দরিদ্রতার চরম কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে অনেকেই ভিক্ষা বৃত্তি বেছে নেয়। আবার অর্থ উপার্জনের সহজ পথ হিসাবেও ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসাবে নেয় অনেকে। যারা অধিকতর অলস এবং শ্রমমুখী কর্মে যাদের অনীহা তারা ভিক্ষা বৃত্তি বেছে নেয়। কারণ এ পেশায় শ্রম দিতে হয় না। দু'হাত সামনে পাতালেই অর্থ আসে। কেউ কম দেয়, কেউ বেশি দেয়। দিন শেষে যা হয়, তা দিয়ে দিনটা বেশ চলেই যায়।

দেশে সন্ত্রাস বিরোধী আইন আছে। তা দিয়ে সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার পর তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। সমাজের দুইটি অংশ হতে সন্ত্রাসী বের হয়ে আসছে। একটি অংশ শ্রেণি পরিচয়হীন। আরেকটি অংশের অর্থের যথেষ্ট জোগানের উৎস আছে। একটি গরীবের ঘরে জন্মগ্রহণ করা শিশু আর ধনী, ধনকুবের ঘরে জন্ম গ্রহন করা শিশুর মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে কোন পার্থক্য থাকে না । সময়ের সাথে সাথে আর্থিক সংকটের কারণে পার্থক্য প্রকট হতে থাকে।

আজকে জন্মগ্রহন করা একটা শিশু, সে যখন রাস্তায় বড় হচ্ছে, রাস্তা তাকে মায়ের মমতা দিয়ে বড় করছে আর রাত হলে, রাস্তায় নির্বিচারে ঘুমিয়ে পড়ছে, দিন হলে, ভবঘুরের মতো চষে বেড়াচ্ছে সারাদিন এ গলি হতে ও গলি। সে যখন বুঝতে পারছে না মায়ের মমতা কি, পরিবারের বন্ধন কি, সামাজিক দায়বদ্ধতা যখন তাকে কোন ভাবেই স্পর্শ করতে পারছে না, তখন সে কী দিতে পারে জাতিকে।  জাতিই বা আশা করবে কিভাবে?

সমাজের দুষ্টু লোক যখন তাকে কয়েকটা টাকা দিয়ে বলছে, ঐ কাজটা করে দিতে হবে। তখন তার ভাবার সময় কোথায় যে কাজটা ন্যায় নাকি অন্যায়। অবহেলায় বড় হওয়া শিশু কি বুঝতে পারবে কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়। এরাই বড় হয়ে সন্ত্রাসী হচ্ছে, সমাজে অন্যায় কাজ করছে। সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। তারপর আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। আমাদের সমস্যার মূলে যেতে হবে। অবহেলায়, অনাদরে, রাস্তায়, ফেরীতে, স্টেশনে পিতা-মাতার স্নেহ বর্জিত হয়ে বড় হওয়া মানুষের একটা অংশ ভিক্ষায় নামছে।
 
আবার কোন কোন গবীর পরিবারের ছেলে মেয়ে বড় হয়ে আলাদা সংসার গড়ে তুলছে। শিক্ষার অভাব থাকায় পারিবারিক দায়বদ্ধতার ভাবনা তাদের মধ্যে কাজ করছে না। ফলে, বয়স্ক পিতা মাতা তাদের সন্তানদের নিকট হতে আর্থিক বা মানসিক কোন সহায়তাই পাচ্ছে না। কোন উপায় না পেয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে তাদের। বৃদ্ধ বয়সে এসে মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে,  কোন মতে বেঁচে থাকার তাগিদে। রাষ্ট্র, সরকার বা সমাজের বিত্তশালী লোকেরা কোনভাবেই এই দায় এড়াতে পারেন না।  

যে সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি প্রচলিত সে সমাজের বিত্তশালীগণ যেমন সম্মানিত বোধ করতে পারেন না তেমনি ভিক্ষুক জনগোষ্ঠীর শাসকগণও গর্ববোধ করতে পারেন না। ভিক্ষুকরা আমাদের সমাজেরই অংশ। মানুষ হিসাবে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে।

যতদূর জানা যায়, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এনজিও-দের মাধ্যমে ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো। সরকারের ‘একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প’ও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। তবে মনে রাখতে হবে , একজন ভিক্ষুককে টাকা দিয়ে যদি কোন শ্রম সাধ্য কাজে প্রথমেই প্রবেশ করানো হয়, তাহলে তা কখনোই কাজে আসবে না। কারণ, ভিক্ষাবৃত্তি শ্রম সাধ্য কাজ নয়। এটা একধরনের ভবঘুরে কাজ। সুতরাং, ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ঐসব প্রকল্পই হাতে নিতে হবে, যাতে তাদের প্রথম অবস্থায় কম শ্রমের প্রয়োজন হয়। তারপর ধীরে ধীরে শ্রম সাধ্য কর্মের ভিতরে নিয়ে যেতে হবে।

ভিক্ষুক যে পরিশ্রম ও সময় ব্যয় করে ভিক্ষা করে, তাতে কোন উৎপাদন হয় না। ফলে জাতীয় আয়ে ভিক্ষার অবদান থাকে না। বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশে যে পরিমান মানুষ অসহায়ত্বের জন্য ভিক্ষা করে, তার চেয়ে বেশি মানুষ ভিক্ষা করে কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহের ঝামেলা থেকে রেহায় পাওয়ার জন্য। ভিক্ষা করতে পুঁজি লাগে না, ভিক্ষাবৃত্তিতে কোন অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকি নাই। ভিক্ষাবৃত্তি অনেকটা লাভজনক ব্যবসা যেখানে কিনা কোন বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। ভিক্ষাবৃত্তি একটি আয়করবিহীন উপার্জনের উপায়। অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন।

বিকলাঙ্গ এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে পরিশ্রমের অনুপোযুক্তদের চিহ্নিত করে তাদের যথাযথ পুনর্বাসন করে ভিক্ষাবৃত্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যারা চলাফেরা করতে পারে না কিন্তু বসে কাজ করতে পারে তাদের হাতের কাজ দেওয়া যেতে পারে। বয়স্ক ও দূর্বলদের তুলনামূলকভাবে সহজ কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে।

আমাদের দেশের আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে দেশের সকল নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিবর্গ যদি আন্তরিকতার হাত বাড়িয়ে দেন, তবে এদেশের ভিক্ষুকদেরকে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আনা অসম্ভব বলে মনে হয় না।

ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার ধাকলেও ভিক্ষাবৃত্তি যেমন কখনোই প্রযোজ্য হতে পারে না তেমনি কোন সমাজে ভিক্ষুক থাকলে সে সমাজের ধনী ব্যক্তিরা তার দায় কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ভিক্ষাবৃত্তি একটা বড় অন্তরায়। মনে রাখতে হবে ভিক্ষাবৃত্তি শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সৃষ্টি করে না, বর্হিবিশ্বের কাছেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করে।  

আমাদের মাথাপিছু আয় ২০১৪ সালে ১ হাজার ৮০ মার্কিন ডলার ছিল যা কিনা বর্তমানে ১৪৬৬ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) -এর সতেরটি গোলের প্রথম এবং দ্বিতীয় গোল সরাসরি দারিদ্রের সাথে সর্ম্পকিত। এসডিজি অর্জন করতে হলে ক্ষুধামুক্ত দেশ গড়তে হবে। দেশ থেকে ক্ষুধা হটাতে পারলে ভিক্ষাবৃত্তি কমে যাবে। ভিক্ষাবৃত্তি হতে ভিক্ষুকদের মুক্ত করতে হলে তাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ভিক্ষুকদের মাঝে আত্মসম্মানবোধ ও আত্মচেতনাবোধ জাগ্রত করতে হবে।

এক্ষেত্রে, সরকার, রাজনীতিবিদ বিত্তশালীসহ দায়িত্বশীল নাগরিকগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করতে পারলেই দেশ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি কমে যাবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: খন্দকার রাহাত মাহমুদ, ব্যাংকার ।
ইমেইল: champookgm@gmail.com
মোবাইল: ০১৭২০-০৯৫৫০১




ঢাকা, শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ১৭, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ১৬৮০ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন