সর্বশেষ
সোমবার ১লা আশ্বিন ১৪২৬ | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

শেষ পর্যন্ত ভালোবাসাও ‘পণ্য’!

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২০, ২০১৭

378465406_1487578320.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
বৈষম্যের চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে মানবিক বোধ। ভোগের লালসায় নি:শেষ হয়ে গেছে অনুভূতির শেষ বিন্দুও। লাগামহীন পুঁজির বিনিয়োগে ‘পণ্য’ হয়ে যায় সব। এমনকি ভালোবাসাও। এই মানুষের, এই সময়ের সত্যিকারের পরিচয় কী? উপাসক! আমরা ক্রমান্বয়ে উপাসক হয়ে উঠছি। আমাদের রক্তে, মাংসে, মজ্জায় শুধু উপাসনা। পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের প্রভূ। এই বাংলাদেশের এক একজন মানুষ এক একজন পণ্য-উপাসক। পুঁজি, প্রযুক্তি, প্রচারমাধ্যম- সব একাট্টা হয়ে আমাদের শিরায় শিরায়, আমাদের মননে আর মগজে অবিরাম বয়ান করে চলেছে- আরো চাও, আরো চাও। আমাদের জীবন শেষ হয়, চাওয়া শেষ হয় না।

আমরা তো চেয়েছিলাম মুক্তি। শুধু একটি মানচিত্র আর পতাকা চাইনি। আমরা তো চেয়েছিলাম স্বাধীনতা। শুধু লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড করতে চাইনি। আমরা তো চেয়েছিলাম ভালোবাসা। নরম, কোমল, দখিণা হাওয়ার মতো স্নিগ্ধ নি:স্বার্থ ভালোবসা। পণ্যের মোড়কে ভোগসর্বস্ব ভালোবাসা নয়। আমরা প্রেমিক হতে চেয়েছিলাম। আমাদেরকে বানানো হয়েছে ভোক্তা। বিশ্বাস করুন, ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নেই। “যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়,” ভালোবাসা দিবসের প্রেম সেই প্রেম নয়। এই প্রেম বোঝে পুঁজি আর ভোগ। না হলে ভালোবাসার মতো এমন কোমল মানবীয় বিষয়ের উদযাপনে দিবসের প্রয়োজন হবে কেন? এটি পুঁজিবাদের সৃষ্টি এবং দিন শেষে পুঁজির কাছেই এর আত্মসমর্পন। যতো দিবস, ততো উদযাপন। উদযাপনের নানা রঙ্গীন আয়োজনে পুঁজির বিনিয়োগ। পণ্য উৎপাদন। অত:পর সেই পণ্যই হয় আমাদের উদ্দীষ্ট। আস্তে আস্তে আমরা হয়ে পড়ি পণ্যের উপাসক। অবিরাম ভোক্তা। ভোগের এই দুষ্টচক্রে ভালোবাসা তো হারায়ই; সবচেয়ে বেশি হারায় মানবিক বোধ। তার রেশ রয়ে যায় জীবনের সর্বত্র। গড়ে ওঠে বৈষম্যের অমানবীয় এক সমাজ।

মাস্টারকার্ডের “কনজ্যিুমার পারচেজিং প্রায়োরিটিজ” শীর্ষক এক জরিপে দেখা যায়, এবারের ভালোবাসা দিবসে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষেরা নিজেদের ভালোবাসার মানুষকে উপহার দিতে প্রত্যেকে গড়ে ৬৮০ টাকা (৭১ ডলার) করে ব্যয় করবে। জরিপে ১৮টি দেশের নয় হাজার ১২৩ জন ব্যক্তি অংশ নেয়, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৬৪ বছর। এই ৬৮০ টাকার (কোথাও কোথাও টাকার পরিমাণ আরো অনেক বেশি) বিনিয়োগই হলো পুঁজিবাদের মূলমন্ত্র! ভালোবাসা দিবস না থাকলে এই খরচটি হতো না। তাই এটি একটি অহেতুক খরচ। অপ্রয়োজনের খরচ। পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখার এই হলো তরিকা। প্রয়োজনের চাহিদা পূরণের ক্ষমতা অর্জনের পর পণ্য উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দরকার অপ্রয়োজনের “চাহিদা” সৃষ্টি। ৬৮০ টাকার উপহার তাই আর ভালোবাসার প্রকাশ নয়; প্রকারন্তরে পুঁজিরই প্রসার। এই পুঁজির হাতেই বর্তমান বিশ্ব নিজেকে সপে দিয়েছে। ভোগের বাইরে পৃথিবীর আর কোনো বাস্তবতা নেই।

অথচ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, প্রতি রাতে বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি লোক ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায় (দৈনিক ইত্তেফাক, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৬)। আমাদের বাংলাদেশেও কতো মানুষ এখনো দু’বেলা পেট ভরে খেতে পারে না। অভাবের তাড়না সইতে না পেরে আত্মহত্যার মতো নির্মম ঘটনাও ঘটছে এই বঙ্গদেশে। ফরিদপুরের নগরকান্দায় অর্থকষ্ট সইতে না পেরে পঙ্গু কৃষক শেখ সহিদ আত্মহত্যা করেছে গলায় ফাঁস দিয়ে ( দৈনিক যায়যায় দিন, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭)। ঋণের কিস্তির টাকা দিতে না পারায় লালমনিরহাটের আদিতমারিতে আত্মহত্যা করেছে খোরশেদ আলম নামের এক কৃষক (যুগান্তর, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৭)। এমন আরো অনেক উদাহরণের মাঝেও থেমে নেই আমাদের ভোগ বিলাস।

বৈষম্যের পাহাড় রচনা করে চলেছি প্রতিনিয়ত। সোনারগাঁহোটেলে এক কাচ চায়ের দাম ১৯৪ টাকা। অথচ যাদের শ্রমে আর ঘামে চা উৎপাদিত হয়, সেই চা বাগানের একজন শ্রমিকের প্রতিদিনের মজুরি ৬৯ টাকা! এই ঢাকার শহরে কতো পরিবার আছে যাদের প্রতিদিনের সকালের নাস্তা যায় ফাইভ স্টার হোটেল থেকে! অথচ ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার বিলকিস বেগমের কাছে জীবন কতো নিষ্ঠুর! অভাবের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মাত্র পাঁচ শত টাকার বিনিময়ে দেড় বছরের শিশু সন্তানকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন এই গর্ভধারিণী মা (যুগান্তর, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৭)।

কুড়িগ্রামের রেবি খাতুন তার ২২ দিনের সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছেন। সন্তান বিক্রির টাকা দিয়ে কোনোমতে তুলেছেন একটি ঘর (বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম)। সাভারের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে টাকা দিতে না পারায় দুই রোগীকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাসপতালে আটকে রাখা হয়। এদের একজন মানিকগঞ্জের রাজবানু আবার এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী (প্রথম আলো, ২০ নভেম্বর, ২০১৫)! মুক্তিযোদ্ধাদেরই কী অবস্থা! ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিযোদ্ধা আজিজুলের হকের দিন কাটে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়ে (সকালের খবর, ১৮ ডিসেম্বর, ২০১৬)। এমন আরো অনেক উদাহরণে ভরপুর আমাদের এই বাংলাদেশ। যাদের ত্যাগে ও রক্তে এই বাংলাদেশ, সেখানে আজ আদ্যপান্ত ভোগের চাষাবাদ।

আমাদের আর কতো হলে আমরা বলবো- আর দরকার নেই। পুঁজিবাদের চাতালে নিজেদেরকে ‘পণ্য’ করবার এমন উৎসব কবে বন্ধ হবে? একদিনের ভালোবাসার উদযাপন-খরচ দিয়ে কতো মানুষের চোখের পানি মুছে দেওয়া যায়! চোখের পানি মুছে দেওয়ার ভালোবাসা-ই তো সত্যিকারের ভালোবাসা। চোখের পানিকে ‘পণ্য’ করতে নেই; ‘পণ্য’ করতে নেই ভালোবাসাকেও।

রফিকুজজামান রুমান: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কলাম লেখক


ঢাকা, সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২০, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এস এ এই লেখাটি ১৪৩৪ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন