সর্বশেষ
শনিবার ৬ই আশ্বিন ১৪২৬ | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

‘জীবন্ত কিংবদন্তি’ খাদিজা, ‘পাষণ্ড প্রেমিক’ বদরুল

বৃহস্পতিবার, মার্চ ৯, ২০১৭

714393859_1489029634.jpg
মিজানুর রহমান খান :
সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আকবর হোসেন মৃধা আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীর পক্ষে একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন। আমরা নারী দিবসে বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ জানাই এ কারণে যে তাঁরা আজই একটি কঠিন রূঢ় সত্য উচ্চারণ করেছেন: ‘তাঁরা প্রতি পদে পদে নিগৃহীত, নির্যাতিত, হত্যা ও যৌন নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছেন। এর জন্য আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও মানসিকতা দায়ী।’ আসুন, আজ আমরা বিচারকের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, ‘এ অসহায় অবস্থা থেকে বাংলাদেশের নারীদের বের হয়ে আসতে হবে।’

বিচারক বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বহুল উচ্চারিত পঙ্‌ক্তিমালার আশ্রয় নিয়েছেন। ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। খাদিজার প্রতি বদরুলের প্রেমের দাবি প্রসঙ্গে বিচারক যথার্থ বলেন: ‘মানবমানবীর মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা চিরন্তন। অন্যথায় পৃথিবীর পথচলা থেমে যেত। প্রেম-ভালোবাসায় মিলন-বিরহ থাকবেই। প্রেম বিরহে বা প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে এহেন পৈশাচিক, নৃশংস আচরণ মোটেই কাম্য ও আইনসমর্থিত নয়। ভিকটিম খাদিজার প্রতি আসামি বদরুলের এহেন নৃশংস ও বীভৎস কর্মকাণ্ড সামাজিক মাধ্যম ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশবাসী তার প্রতি নিন্দা ও ধিক্কার জানায়, ওঠে প্রতিবাদের ঝড়।’

বিচারকের কথায়, ‘ভিকটিম খাদিজা অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া এক জীবন্ত কিংবদন্তি নারী। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত পাষণ্ড প্রেমিকের চাপাতির নৃশংস আঘাতে ক্ষতবিক্ষত খাদিজা দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মৃত্যুর কাছে হেরে না যাওয়া সমগ্র বিশ্ব নারী সমাজের প্রতিভূ, বিজয়িনী, প্রতিবাদকারিণী। আমার বিশ্বাস, আসামির ওপর সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপের মাধ্যমে প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হাজার হাজার বদরুলরা (তথাকথিত রোমিও বা উত্ত্যক্তকারীরা) ভবিষ্যতে এহেন কাণ্ড থেকে বিরত থাকবে এবং আমাদের নারী সমাজ সুরক্ষিত হবে।’

দণ্ডবিধির যে ধারায় বদরুল যাবজ্জীবন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, সেই ধারার আওতায় তাঁকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়তো সম্ভব ছিল। কিন্তু তাঁকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়াটা বিচারক যথাযথ মনে করেছেন। বদরুল রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় যদিও দাবি করেছেন যে তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। কিন্তু বিশ্ব নারী দিবসের রায়ে শাশ্বত প্রেমের প্রতি বদরুলের পৈশাচিক অবমাননার প্রতিকার মিলেছে। খাদিজার প্রতি তাঁর প্রতিশোধের কারণ হিসেবে তিনি মূলত এটাই দাবি করার চেষ্টা করেন যে খাদিজার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

এটা লক্ষণীয় যে সংগত কারণেই এটা বিচার্য ছিল না যে বদরুলের সঙ্গে খাদিজার প্রেমের সম্পর্ক ছিল কি ছিল না। তদুপরি বিচারকের রায়ে যখন এই মন্তব্য দেখি যে খাদিজার সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। তখন তা আমাদের আবেগ-অনুভূতিতে আরও বেশি তীব্রতায় আঘাত হানে। বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ এটা স্বীকার করেছেন, বদরুল খাদিজাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিল।

নারীর বিরুদ্ধে যে সহিংসতা ঘটছে, সেখানে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে একজন খাদিজার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার রায় পাওয়ার একটা তাৎপর্য রয়েছে। এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যখন বিচারকের রায়ে বাংলাদেশে নারীর অবস্থানের একটা বিবরণ বিস্তারিত জায়গা করে নিতে পেরেছে। বদরুল খাদিজার ওপরে যে নিষ্ঠুরতা ও তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, তাঁর স্বীকারোক্তি ও তাঁর জবানবন্দিতেই (যা সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত) স্পষ্ট। কিন্তু তাঁর আইনজীবী তাঁকে রক্ষায় দৃশ্যত শঠতার আশ্রয় নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, খাদিজাকে কোপানোর আগে বদরুল নাকি মাদক নিয়েছিলেন। বিচারক তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘আসামিপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী তাঁর যুক্তিতর্কে উল্লেখ করেন, ঘটনার আগে আসামিকে নেশাজাতীয় ড্রাগ খাওয়ানো হয়, যার জন্য আসামি কী করেছে বলতে পারেন না।’

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপক্ষের ও বাদীর মামলা হলো আসামি বদরুল ২০১০ সালে কিছু সময়ের জন্য ভিকটিম খাদিজাদের বাড়িতে লজিং মাস্টার হিসেবে খাদিজার ছোট ভাইকে পড়াতেন এবং ভিকটিমদের বাড়িতে থাকার সুবাদে আসামি বদরুল ভিকটিম খাদিজাকে প্রেম নিবেদন ও উত্ত্যক্ত করার কারণে তাঁদের বাড়ি থেকে আসামিকে বিতাড়িত করা হয়। আসামি বদরুল তাঁর দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ভিকটিম খাদিজাদের বাড়িতে তিনি গৃহশিক্ষক থাকাকালে খাদিজার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক হয়। আসামি বদরুল খাদিজাকে অন্য কোনো ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখার অনুরোধ করেন এবং তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক না ভাঙার জন্যও ভিকটিমকে অনুরোধ করেন। যদি ভিকটিম তাঁকে বিয়ে না-ও করে, তবু যেন প্রেমটাকে বাঁচিয়ে রাখে।’

বিচারক অবশ্য তাঁর রায়ে এটা আগে বলে নিয়েছেন, ‘সাক্ষীগণকে জেরা করে ইহা প্রমাণিত হয়নি যে আসামির সঙ্গে ভিকটিম খাদিজার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।’ বিচারক এটাও উল্লেখ করেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে যুগল ছবি সৃষ্টি করা খুবই সহজ।’ কিন্তু তদুপরি বিচারক আকবর হোসেন মৃধা মন্তব্য করেন, ‘অবস্থাগত, পারিপার্শ্বিক, আসামি কর্তৃক দাখিলকৃত পত্রিকার রিপোর্টিং, যুগল ছবি ইত্যাদি বিচার-বিশ্লেষণে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে আসামি বদরুলের সঙ্গে ভিকটিম খাদিজার প্রেমের সম্পর্ক থাকলে থাকতেও পারে।’ যদি এটা আদৌ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে আমরা বলব, বদরুল তাঁর নিষ্ঠুরতার জন্য যুগ যুগ ধরে আরও বেশি নিন্দিত ও অভিশপ্ত হবেন। তিনি প্রেমিক নন, নির্দয় ঘাতক। তাঁর জন্য কোনো অনুকম্পা নয়, ধিক্কারই তাঁর প্রাপ্য।

বিচারক লিখেছেন, ‘আমি আসামিকে ৩২৬ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়া আইনসংগত মনে করি। ৩২৬ ধারায় উল্লেখ করা আছে, কোনো অপরাধী উক্ত ধারায় অপরাধ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা কারাদণ্ড যা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থ দণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।’

বিচারক একপর্যায়ে তাঁকে এই ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যে পর্যবেক্ষণ দেন তা এ রকম: ‘প্রকৃতিগত ও শারীরিকভাবে নারীরা দুর্বল হলেও বাংলাদেশের নারীদের অর্জন উল্লেখযোগ্য। এ দেশের নারীরা দীর্ঘকাল ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদে সমাসীন আছেন। তা ছাড়া এ দেশের বর্তমান স্পিকার নারী, বেশ কয়েকজন নারী মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী সাংসদ, বিচারপতি ও বিচারক আছেন।

‘এ দেশের নারীরা কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা, পুলিশ, সেনাবাহিনী, আইন পেশা, ব্যবসা ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছেন। গার্মেন্টস সেক্টরে নারীদের অবদান দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করে দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করছেন। এ দেশের দুই নারী হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়াও আরোহণ করেছেন। দেশের কৃষিতে এবং নির্মাণকাজেও নারীদের ভূমিকা কম নয়। এ দেশের নারীরা এখন জনপ্রতিনিধি হিসেবে জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ইত্যাদিতে প্রতিনিধিত্ব করছেন।

‘এ দেশের নারীরা ক্ষমতায়নে এবং স্বয়ম্ভরতা অর্জনে ও শিক্ষায় বিশ্বে রোলমডেল। এ দেশের নারীরা এখন নারীশিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কথিত অন্দরমহলের অবরোধবাসিনী নন। এতত্সত্ত্বেও এ দেশের নারীরা অনেকটা অরক্ষিত। ভিকটিম খাদিজার ঘটনা তা-ই প্রমাণ করে।’ বিচারক আকবর মৃধা তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন, ‘নারীদের সুরক্ষার জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০, যৌতুক নিরোধ আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ ইত্যাদি দেশে বলবৎ আছে।’

কিন্তু সেখানে যার উল্লেখ নেই তা হলো, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত দেশের ৭২টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। খাদিজার নিজের বিভাগ সিলেটের চারটি জেলায় বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি নারী নির্যাতনের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আমরা তাই মনে রাখব, নারীরা কিন্তু দ্রুত বিচার থেকে বঞ্চিত। এমনকি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বলেই নারীর দায়ের করা মামলাগুলোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ‘মিথ্যা’ হিসেবে প্রতিপন্ন হচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ, পুলিশসহ জনপ্রশাসনের কোনো অংশকেই নারীবান্ধব বলা যাচ্ছে না। যারা তাদেরকে মিথ্যা মামলা বা আইনের অপব্যবহারে প্ররোচিত করেন, সেসব কুশলীবদের বড় অংশই কিন্তু পুরুষ। তবে সব দোষ মুখ্যত নারীকেই বহন করতে হচ্ছে।

যদিও কাগজে-কলমে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ-১৯৭৯-এর বাংলাদেশ একটি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র।
বিচারক লিখেছেন, ‘ইসলামসহ সব ধর্মীয় বিশ্বাসমতে নারীরা পুরুষদের সহোদরা। তাদেরকে পুরুষের তুলনায় হীন ও নীচ মনে করা সম্পূর্ণ জাহেলি ধ্যানধারণা। নারীরা দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্ধাংশ।’ কিন্তু ধর্মের নামে এই জাহেলি ধ্যানধারণার চাষাবাদ যারা করেন, তাদের অনুভূতির প্রতি আঘাত নয় বরং ইদানীং আমরা নানা ঘটনায় রাষ্ট্রকে ওই শক্তির অনুভূতির প্রতি প্রলেপ দিতে দেখছি।

জেলা জজ আকবর মৃধার পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমরা একমত হতে পারি যখন তিনি বলেন: ‘আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই দিবসে ভিকটিম খাদিজাকে নৃশংস ও বর্বরোচিতভাবে কোপানোর অভিযোগে আসামি বদরুলের ওপর যথোপযুক্ত শাস্তি নারীদের সুরক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এ মামলার ঘটনা, চাপাতি দিয়ে আঘাতের বীভৎসতা, নৃশংসতা, ভিকটিম খাদিজার দীর্ঘদিন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় লাইফ সাপোর্টে থাকা এবং তাঁর বেঁচে থাকার ঘটনা বিরল ঘটনা বিবেচনায় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তার অতিরিক্ত ৫০০০/০০ টাকা জরিমানা দণ্ডে দণ্ডিত করলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।’

লেখক: সাংবাদিক

সূত্র: প্রথম আলো


ঢাকা, বৃহস্পতিবার, মার্চ ৯, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // আর কে এই লেখাটি ২৯১৮ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন