সর্বশেষ
সোমবার ১১ই আষাঢ় ১৪২৫ | ২৫ জুন ২০১৮

কার্ল মার্কসের অর্থনীতি কি এখনও প্রাসঙ্গিক?

বুধবার, নভেম্বর ৮, ২০১৭

545452678_1510132672.jpg
সাজ্জাদ আলম খান :
২০০৮ সাল; মন্দায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি। হতবাক হয়ে পড়েন বরেণ্য অর্থনীতিবিদরা। বিপর্যয়ের মুখে পড়ে অর্থনীতি। উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে দেশে দেশে। দেউলিয়া হয় বেশ কয়েকটি বৃহৎ ব্যাংক। নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করে অর্থনীতির প্রাণভোমরা টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নেয়। অতলান্ত সংকটে নিমগ্ন হয় বিশ্ব শেয়ারবাজার। কারণ হিসেবে উঠে আসে ফটকাবাজ, মুনাফাবাজদের কারসাজি আর অনুপযুক্ত কর ব্যবস্থাপনা।

বিশ্বপুঁজিবাদকে চ্যালেঞ্জ করে মার্কিন মুল্লুকে, ২০০৭-র গ্রীষ্মকালে আবাসন শিল্পের ফানুসটা ফাটতে শুরু হয়। তারপর ছড়িয়ে পড়ে আর্থিক খাতে ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকা শিল্পে। এ যেন তাত্ত্বিক ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার এন্ড অব হিস্ট্রি বা ইতিহাসের ইতি তত্ত্বকে বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয়া। তিনি যুক্তি দেখান, এখন থেকে দু’মেরুকেন্দ্রিক বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের সমাপ্তি ঘটেছে। পুঁজিবাদ বিশ্বজয়ী মতাদর্শে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর সব রাষ্ট্র এখন থেকে পুঁজিবাদ গ্রহণ করবে তাদের আর্থ-সামাজিক মতাদর্শ হিসেবে।

অর্থশাস্ত্র বলছে, দীর্ঘ সময় ধরে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ধীরগতিই হচ্ছে মন্দা। এ সময় জিডিপি, চাকরি, বিনিয়োগ, উৎপাদন ক্ষমতার ব্যবহার, পারিবারিক আয়, ব্যবসায়িক লাভ অনেকাংশে কমে যায়। সরকার নানা ধরনের সম্প্রসারণমূলক কাজকর্ম ও বৃহদাকার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ এবং টাকার জোগান বাড়িয়ে মন্দা মোকাবেলা করার চেষ্টা করে। করের পরিমাণও যথাসম্ভব কমিয়ে আনা হয়।

এ সময় আবারও নতুন করে আলোচনায় আসে মলিন হয়ে যাওয়া কাল মার্কসের দাস ক্যাপিটাল। এক সময় বলা হয়েছিল, বইটির মৃত্যু হয়েছে। পৃথিবীতে এর আর ব্যবহার উপযোগিতা নেই। তবে অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে এ বই কি কোনো ভূমিকা রাখবে, এমনটা হয়তো ভাবা হয়নি। তবে মন্দার কারণ অনুসন্ধানে তা সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হয়। এ বইতে আছে কীভাবে পুঁজিবাদ গড়ে ওঠে এবং কীভাবে তা ভেঙে পড়বে। আর তাই ২০০৮ সালে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে এ বইয়ের কদর হঠাৎ করে বেড়ে যায়। চলতি বছরে পালন করা হচ্ছে অক্টোবর বিপ্লবের শতবার্ষিকী। আর এ বইটি তৈরি করেছিল বিপ্লবের দার্শনিক ভিত্তি। দেড়শ’ বছর আগে কার্ল মার্কস সমাজতন্ত্রের যে আদর্শ প্রচার করেছেন রাষ্ট্র দর্শনে তা একেবারেই নতুন ছিল না। এ বিষয়ে গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর লেখনীতে উঠে এসেছিল চিত্র। তবে তা কাল্পনিক হিসেবে আখ্যায়িত হয়। সমাজতন্ত্রকে কল্পনার রাজ্য থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন মার্কস। সমাজতন্ত্রকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও তার হাতে দেয়া। তিনি পুঁজিবাদী সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি তুলে ধরেন। এ বিষয়ে ‘উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্ব’ নামে মৌলিক তত্ত্বের আবিষ্কার করেন। তিনি মানুষের শ্রমশক্তিকে একটি পণ্য বলে বিবেচনা করেছেন। শ্রমেরও বিনিময় মূল্য এবং ব্যবহারিক মূল্য আছে। শ্রম সংগ্রহ করার জন্য শ্রমিককে যে মূল্য দেয়া হয় তা বিনিময় মূল্য; কিন্তু শ্রমের ফলে সৃষ্ট দ্রব্যাদি বাজারজাত করে যে মূল্য শিল্পপতিরা অর্জন করে তা হল ব্যবহারিক মূল্য। মার্কস প্রথমে দেখান, শ্রমিককে প্রদত্ত পারিশ্রমিকের চেয়ে এর ব্যবহারিক মূল্য সব সময় বেশি থাকে। ব্যবহারিক মূল্যের এ বাড়তি অংশকে তিনি ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বলে অভিহিত করেছেন। মার্কসের তত্ত্ব অনুসারে, প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থা তার বিশেষ অর্থনৈতিক উৎপাদন ব্যবস্থারই ফল। উৎপাদনের মাধ্যমগুলো যখন যে শ্রেণীর হাতে সংরক্ষিত থাকে তখন সেই শ্রেণী সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে প্রাধান্য লাভ করে। এ উৎপাদন ব্যবস্থায় মানবসমাজ পুঁজিপতি ও সর্বহারা- এ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয়। শ্রেণী-সংগ্রাম সম্পর্কে তিনি বলেন, শিল্প বিপ্লবের পর থেকে আধুনিক সমাজগুলো সুস্পষ্ট দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত।

১৮৬০-এর দশকের প্রথম দিকে তিনটি খণ্ড রচনা করেন কার্ল মার্কস। প্রথম খণ্ড হচ্ছে থিওরিস অব সারপ্লাস ভ্যালু। ১৮৬৭ সালে তা প্রকাশিত হয়। প্রথম খণ্ডে ডেভিড রিকার্ডোর মূল্যের শ্রমনীতিকে সমর্থন করেন মার্কস। সে দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বৃত্ত মূল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শ্রমিকদের শোষণকারী পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার বিশ্লেষণ করেন। এতে বলা হয়, উদ্বৃত্ত মূল্য ও শোষণের কারণে এক সময় লাভের হার একেবারে কমে যাবে। এর এক পর্যায়ে পুঁজিবাদের পতন ঘটবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড মার্কসের জীবদ্দশায় পাণ্ডুলিপি পর্যায়েই রয়ে যায়। তার মৃত্যুর পর এঙ্গেলস এগুলো প্রকাশ করেন। দ্বিতীয় খণ্ডের উপনাম পুঁজির সঞ্চালন প্রক্রিয়া। এখানে মার্কস ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে পুঁজির গতিবিধি, আবর্তন, নিয়োজিত পুঁজির পণ্যে রূপান্তর ও পরিশেষে বাজারপদ্ধতির মধ্যে বিনিময় ব্যবস্থায় বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও মূল্যমানের মধ্যে ভারসাম্য-অবস্থায় সরল পুনরুৎপাদন পদ্ধতির প্রচলন আলোচনা করেছেন। তৃতীয় খণ্ডটির উপনাম ধনতান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র। এখানে মার্কস বিশেষ বিশেষ মূল্যমানের প্রশ্ন, পুঁজির মুনাফার হার ও উদ্বৃত্ত মূল্যের বিভাজন থেকে প্রাপ্ত মুনাফার কথা বলেছেন। মার্কস দেখিয়েছেন, পণ্যোৎপাদনে পুঁজির মালিকের ব্যয়ের পরিমাণ ও পণ্যের যথার্থ উৎপাদন ব্যয় সমান নয়। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব বিষয়ের নোটগুলো একত্রিত করেন এবং এগুলো পরে পুঁজির চতুর্থ খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হয়। কার্ল মার্কস তার কাজকে দু’ভাগ করেছেন। একটি দর্শন, আরেকটি অর্থনীতি। রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল ধারণা তিনি নিয়েছেন এডাম স্মিথ এবং ডেভিড রিকার্ডো থেকে। মার্কস দর্শনের প্রধান দিক বস্তুবাদ এবং দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি। বস্তুবাদ দর্শনের মূল কথা হল, বস্তুই সব; তা সর্বদা গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দ্বন্দ্বের মূল হল শ্রম ও পুঁজির মধ্যে দ্বন্দ্ব।

দাস ক্যাপিটাল বহুল পঠিত এক গ্রন্থ। সামাজিক-অর্থনৈতিক বিবর্তন নিয়ে লেখা এ বইয়ে অর্থনৈতিক অসম বণ্টনের মাধ্যমে কীভাবে শোষক এবং শোষিত শ্রেণী সৃষ্টি হয় তার ব্যাখ্যা রয়েছে। দাস ক্যাপিটাল ব্যক্তি অর্থনীতির চেয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর জোর দেয় বেশি। সমাজ প্রগতির সঙ্গে অর্থনীতির জটিল সম্পর্ক মার্কসবাদের প্রধান উপজীব্য। মার্কস দেখিয়েছেন, যে কোনো ঐতিহাসিক যুগ সমকালীন পণ্যোৎপাদন ব্যবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জোর দিয়েছেন উৎপাদন সম্পর্কের ওপর। এ বই প্রসঙ্গে অক্টোবর বিপ্লবের মধ্যমণি লেনিন লিখেছিলেন, ‘পুঁজি হল মার্কসবাদের প্রতিভাদীপ্ত রচনা। মার্কস তার জীবনের প্রধান গ্রন্থটি রচনা করে চার দশক ধরে- ৪০ এর দশকের প্রারম্ভ থেকে শুরু করে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। অর্থনৈতিক অবকাঠামো হল মূল ভিত্তি, যার ওপরে গড়ে উঠেছে রাজনৈতিক অতিকাঠামো- একথা স্বীকার করে ঠিক এ অর্থনৈতিক কাঠামো অধ্যয়নের ব্যাপারে মার্কস সবচেয়ে বেশি নজর দেন।’

তবে কার্ল মার্কস দেড়শ’ বছর ধরেই সমালোচিত ব্যক্তিত্ব। শোষণ-বঞ্চনার আর বৈষম্যের যারা অবসান ঘটাতে চান তারা তাকে পথপ্রদর্শক হিসেবে ভাবেন। শোষকগোষ্ঠীর কাছে তিনি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। তবে কার্ল মার্কস নিজের মতবাদকে আপ্তবাক্য বলে মনে করেননি। গতিশীল সমাজে চূড়ান্ত জ্ঞান বলে কিছু নেই। মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতাও বাংলদেশে যথেষ্ট রয়েছে; কিন্তু দর্শন আত্মস্থ করলে তো চলে না, তার সফল প্রয়োগ প্রয়োজন। সে কাজটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ বয়ে চলছে। এর অনেক বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে। পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র অর্জন করেছে। পুঁজি হয়েছে আরও সচল। রুশ বিপ্লব মানবমুক্তির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। ৭০ বছর স্থায়ী হওয়ার পর সোভিয়েত ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, সমাজতন্ত্রের পতন নয়, সমাজতান্ত্রিক চিন্তা থেকে সরে আসার ফল। যদিও এই ভেঙে পড়ার একটি কারণ ছিল পুঁজিবাদীদের উৎপাত। চাকচিক্য মানুষের দৃষ্টি কাড়ে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে হৃদয় জয় করতে পারে না। তাই মার্কসীয় দর্শনের অন্তর্নিহিত শক্তি আবারও উদ্ভাসিত হবে- এমন প্রত্যাশা অনেকেরই।

সাজ্জাদ আলম খান : সাংবাদিক
sirajgonjbd@gmail.com

ঢাকা, বুধবার, নভেম্বর ৮, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ৩৫৮ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন