সর্বশেষ
বৃহঃস্পতিবার ১০ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ | ২৪ মে ২০১৮

সিনেমাকেও হার মানায় পপির জীবনের গল্প

সোমবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭

popi.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

তার নাম পপি রানী দাস। পরিবার পর্যাপ্ত যৌতুক দিতে পারেনি বলে স্বামী প্রায়ই তাকে মারধর করতো। কিন্তু সেই স্বামী এসিড খাওয়াতে পারে; এই কথা কখনো কল্পনাও করেননি পপি। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখিই হতে হয়েছে তাকে। প্রতারক স্বামীর দেয়া এসিড খেয়ে জীবন হারাতে বসেছিলেন পপি।

একরাতে জ্বর নিয়ে বিছানায় যান তিনি। সেদিন খুব খারাপ লাগছিল তার। পিপাসা লাগায় স্বামীর কাছে পানি চান পপি। স্বামী অন্ধকারে তাকে গ্লাস এগিয়ে দেন। কোনো কিছু চিন্তা না করেই স্বামীর দেয়া গ্লাসে চুমুক দেন পপি। তারপর দুঃসহ যন্ত্রণায় মা বলে চিৎকার দেন। এরপর তার স্মৃতি অন্ধকারে হারিয়ে যায়।

ঘটনার পর পপির খাদ্যনালী, শ্বাসনালী, পাকস্থলীসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাকে ভর্তি করা হয় এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। কয়েকটি অপারেশনের পর চিকিৎসকরা তার খাদ্যনালীর তেমন কোনো সংস্কার করতে পারেননি। তাদের পক্ষে তেমন কিছু করার ছিলও না। ব্লেন্ডারে খাবার তরল করে নলের সাহায্যে তাকে খাওয়াতে হতো। ব্লেন্ডার চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন পড়তো, আর এই বিদ্যুৎ সুবিধার জন্যই পপি হাসপাতালে থেকে যান।

অনেকদিন ধরেই পপি সেখানে ছিলেন। তিনি যে সেখানে আছেন চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রায় ভুলেই গেছিলেন। এখানেই হয়েতো থেমে যেতে পারতো তার জীবন। কিন্তু পপির জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় এরপর। কানাডার একদল সার্জন এই হাসপাতালে যান।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পপিকে এই চিকিৎসক দলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে না দিলেও টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ নেটওয়ার্কের পুনর্গঠনমূলক সার্জন ডা. টনি ঝং তাকে জানালাবিহীন একটি ঘরে থাকতে দেখে তার ঘটনা শুনতে চান।

১০টি অপারেশনের পরও পপির এই সামান্য অগ্রগতি দেখে ডা. ঝং বিস্মিত হয়ে বলেন, 'আমি দেখছিলাম দীর্ঘদিন ব্যথা বয়ে বেড়ানো পপি ছোট্ট চিকন নল দিয়ে খাচ্ছিলেন। পপি দিন দিন তার ওজনও হারাচ্ছিলেন। এই দৃশ্য দেখা সত্যিই কষ্টকর ছিল।'

এরপর পপির চিকিৎসা এবং অপারেশনের বিস্তারিত জেনে ডা. ঝং বলেন, 'চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য টরেন্টোতে নিয়ে আমার দলের অন্য সার্জনদের দেখাই। পপিকে উপযুক্ত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব জেনে তাকে টরেন্টোতে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। পপি এবং তার চিকিৎসকদের আশাই আমাকে আশান্বিত করেছিল।'

কানাডার 'দি হারবি ফান্ড' বিভিন্ন দেশ থেকে শিশুদের নিয়ে জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা দিয়ে থাকে, কিন্তু পপির মতো বয়স্কদের ক্ষেত্রে তারা কাজ করে না। কিন্তু ডা. ঝং নিজ উদ্যোগে 'পপি ফান্ড' গঠন করেন। শত শত হাজার হাজার ডলার তহবিল গঠন করেন। পরে এটি 'ইউএইচএন হেলপস' নামে নতুন একটি ফাউন্ডেশনে রূপান্তিরত হয় এবং উন্নয়নশীল দেশ থেকে রোগীদের কানাডায় এনে চিকিৎসা দেয় শুরু হয় ।

গত ফেব্রুয়ারিতে পপি টরেন্টোতে যান। তিনটি অপরেশনের মাধ্যমে চিকিৎসকরা তার কণ্ঠনালী ঠিক করেন। পপির বাহু থেকে টিস্যু নিয়ে তার খাদ্যনালীও মেরামত করেন। পাকস্থলী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তার ক্ষুদ্রতন্ত্র নিয়ে পেট ও বুক বরাবর নতুন খাদ্যনালীতে স্থাপন করেন। চিকিৎসকরা তার পেছনে সময় ব্যয় করেন এবং হাসপতালের খরচ বহন করেন দাতারা।

এভাবে গত আট মাসে পপিকে পুনরায় খাবার খেতে ও গিলতে শিখেছে। তিনি অল্প করে খাবার খান, যা তার পাকস্থলীতে না গিয়ে সরাসরি ক্ষুদ্র অন্ত্রে যায়। আগের মতো জীবনযাপন করতে পেরে চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞ পপি।

পপি বলেন, কানাডায় আসার আগে আমার জীবন ছিল অন্ধকারে। এটি আমার জন্য খুবই কষ্টের ছিল। এখন আমি সবার মতো স্বাভাবিকভাবে চলতে ফিরতে পারি, খেতে পারি, নিজের যত্ন নিতে পারি।

পপি আরও বলেন, সম্ভবত আমার স্বামীকে কখনই বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না। আমার মা সেই স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, কিন্তু তাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে পুলিশ জানায়।

ডা. ঝং বলেন, আমি আমার হাসপাতালের চিকিৎসক দল, সামাজিক কর্মীসহ যারা সহযোগিতা করেছেন সকলের জন্য আনন্দিত। পপির ক্ষেত্রে আমি যা চেয়েছি, তারচেয়ে বেশি পেয়েছি। পপির কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাওয়া ইউএইচএন হেলপস ফাউন্ডেশন ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজ করে যাবে। আমাদের চিকিৎসক দল নিয়মিতই বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। কিন্তু এখন থেকে পপির মতো অনেক রোগী এখানে চিকিৎসার জন্য আনা হবে।

পপি এখন মায়ের সঙ্গে বসবাসের জন্য বাংলাদেশে (তার ঠিকানা প্রকাশ করা হয়নি) ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার মা এই চিকিৎসক দলসহ যারা তার মেয়েকে সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

বাস্তবতা হলো এসিড হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। বাংলাদেশে প্রতিমাসে এ ধরনের পাঁচটি ঘটনা ঘটে। নারী এবং শিশুরাই মূলত এ ধরনের হামলার শিকার। সূত্র: চ্যানেলআই


ঢাকা, সোমবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এস আর এই লেখাটি ১৬১৩ বার পড়া হয়েছে