সর্বশেষ
সোমবার ৫ই ভাদ্র ১৪২৫ | ২০ আগস্ট ২০১৮

টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে ধর্ষণ নিয়ে হাস্যরস, সমালোচনার ঝড়

রবিবার, এপ্রিল ১, ২০১৮

a8759c8fb84eb60432923569523dcf91-5ac0b7053ed6e.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

বেসরকারি টেলিভিশন আরটিভিতে সম্প্রতি প্রচারিত ‘এবং পূর্ণিমা’ অনুষ্ঠানে খলনায়ক মিশা সওদাগরের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ধর্ষণ নিয়ে হাস্যরস করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে নাগরিক সমাজ, সমাজকর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে।

গত ২৪ মার্চ প্রচারিত এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক নায়িকা পূর্ণিমা অতিথি মিশা সওদাগরের কাছে জানতে চান, ‘আপনি সিনেমাতে কতবার ধর্ষণ করেছেন? (হাসি) আপনার কয়শ’ ছবি হয়েছে, প্রত্যেকটা ছবিতেই কি ধর্ষণের সিন ছিল? কার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন ধর্ষণের সিন করতে?’

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ে এভাবে হাস্যরস করা অনুচিত উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, ‘এই আচরণ নিন্দনীয়।’ এদিকে সমাজ গবেষকরা বলছেন, ‘পূণির্মাকে দিয়ে ধর্ষণ নিয়ে হাসাহাসি করিয়ে এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে যে ধর্ষণ খুবই হাসির ঘটনা, এটা নিয়ে হাসাহাসি করা যায়।’

তবে এ ব্যাপারে আরটিভি প্রশাসন বলছে, ‘এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়নি বা হাস্যরসের জন্যও করা হয়নি, আলোচনার ধারাবাহিকতায় চলে এসেছে।’

‘এবং পূর্ণিমা’ অনুষ্ঠানটিতে মিশা সওদাগরকে নিয়ে করা অনুষ্ঠানটি ২৪ মার্চ প্রচার হয়েছে। ২৪ মিনিটের অনুষ্ঠানে ১৩ মিনিট ২০ সেকেন্ডে এসে ধর্ষণ নিয়ে হাস্যরস করা শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে হিরোদের প্রসঙ্গে মিশাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কোন হিরোর সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন? আর নারীদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সিনেমার দৃশ্যে ধর্ষণ নিয়ে হেসে হেসে আলাপ করা হয়। নায়িকা পূর্ণিমা জানতে চান, ‘আপনি সিনেমাতে কতবার ধর্ষণ করেছেন? কার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন? ধর্ষণের সিন করার প্রশ্নের জবাবে মিশা সওদাগর পূর্ণিমা ও মৌসুমীর কথা বললে সঞ্চালক পূর্ণিমা পাল্টা প্রশ্ন করেন (হাসি), ‘কেন আমরা দুজনই কেন?’

এদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংখ্যাগত প্রতিবেদনে বলা হয়, সারাদেশে ২০১৮ সালের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮৭ নারী। এরমধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ জনকে এবং আত্মহত্যা করেছেন দুইজন। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ২১ নারীকে।

আসকের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে ৪৬ জন। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ২৭ জন। এর ফলে আত্মহত্যা করেছেন একজন নারী, প্রতিবাদ করায় নিহত হয়েছেন দুজন পুরুষ। এছাড়া হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৩২ জন নারী ও পুরুষ। এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমে ধর্ষণ নিয়ে হাস্যরস কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয় সে নিয়ে চলছে তোলপাড়।

এমন পরিস্থিতিতে টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এরকম আলোচনার ব্যাপারে মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমি হতভম্ব। এ ধরনের প্রশ্ন কেউ করতে পারে? যিনি প্রশ্ন করেছেন, যারা প্রিভিউ করেছেন, যারা সম্পাদনা করেছেন, কারোর কানেই লাগলো না, একটা অশ্রাব্য প্রশ্ন কীভাবে করতে পারে? যার নিজের ও মেয়েদের মযাদা সম্পর্কে কিংবা সামাজিক নিয়মনীতির বিষয়ে বিন্দুমাত্র সংবেদনশীলতা সচেতনতা আছে, তার পক্ষে এসব প্রশ্ন করা সম্ভব না। এটা খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার।’

সমাজ গবেষক দিলশানা পারুল মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতিতে পোশাক এবং ‘পূণির্মা বিতর্ক’ যারা সামনে আনতে চায় তারা দুষ্টবুদ্ধির দুষ্টলোক। ফাঁদে পা না দেওয়ার পরামর্শ দিযে তিনি বলেন, ‘পূণির্মাকে দিয়ে ধর্ষণ প্রসঙ্গে হাসাহাসি করিয়ে এইটাই প্রমাণ করার চেষ্টা চলছে ধষর্ণ খুবই হাসির ঘটনা। এটা নিয়ে হাসাহাসি করা যায়। এইটাও ডিসট্রাকশন, আপনার নজর যেন আসল ঘটনা থেকে অন্য জায়গায় যায়। আসল ঘটনা কোনটা? গত তিন মাসে রিপোর্টেড ধর্ষণের ঘটনা ১৮৭টা, এইটা আসল ঘটনা। গত আড়াই বছরে ধর্ষণের ঘটনা সাড়ে আট হাজার, এইটা আসল ঘটনা। ৯৯ শতাংশ ধর্ষণের মামলা বিচারের মুখ দেখে না, এইটা আসল ঘটনা। আওয়াজ তোলেন, বিনা বাক্যব্যয়ে ধর্ষণ মামলা নিতে হবে, তদন্ত করার আগে পুলিশ বলতে পারবে না এইটা মিথ্যা মামলা।’

এ ধরনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম অসংবেদনশীল হয়ে উঠছে কিনা প্রশ্ন তুলে একাত্তর টেলিভিশনের সাংবাদিক নাজনীন মুন্নী বলেন, ‘ধর্ষণ যতনা শারীরিক তারচেয়ে অনেক বেশি মনের কষ্ট। আমি কেবল ভাবি, অসীম বীভৎস আর কুৎসিত সেই ঘটনা কোনও মেয়ে ভোলে কিনা? ব্লেড দিয়ে কেটে অঙ্গ বড় করে ধর্ষণ বা দেড় বছরের শিশু ধর্ষণ- কী ভয়াবহ খবর। সেই ধর্ষণ নিয়ে কেউ মজা করতে পারে, বিস্ময়ে হতবাক হতে হয়। যে মিডিয়া প্রতিদিন গরজ করে খবরটা দিতে পারে না, সেই মিডিয়া কেমন করে ধর্ষণ নিয়ে এমন হাস্যরস করতে পারে, আমার বোধের বাইরে। মিডিয়াকর্মী হিসেবে আমি লজ্জিত।’

ওই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আরটিভির অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান দেওয়ান শামসুর রকিব বলেন, ‘এটা হাস্যরসের জন্য না। ওখানে মিশা সওদাগর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উনি সজ্জন মানুষ। (ধর্ষণ দৃশ্য) সিনেমার স্ক্রিপ্টের মধ্যে থাকে, এটা তাদের অন কাইন্ড অফ পার্ট। এটা উসকানো বা হাস্যরসের জন্য করা হয়নি।’

রেকর্ডেড অনুষ্ঠানে এ ধরনের সেনসিটিভ বিষয়ে এভাবে প্রশ্ন করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, “এটা পুরো জীবনের বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান হয়। নায়ক শুভ এলো, যখন তাকে ‘কতগুলো প্রেম করেছেন’-এর মতো প্রশ্ন করা হয় এবং খলনায়কদের ক্ষেত্রে মারামারি, রক্তারক্তির বিষয় আলোচনা চলে আসে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু করা হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, ‘ছবির আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে। নাটকের ক্ষেত্রে এভাবে আলোচনা হয় না। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয় নাই, আলোচনার ধারাবাহিকতার মধ্যে চলে এসেছে। এছাড়া শিল্পী সমিতি, ব্যক্তিগত বিষয়ে আলাপ হয়েছে।’ -বাংলা ট্রিবিউন


ঢাকা, রবিবার, এপ্রিল ১, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ৩০৩৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন