সর্বশেষ
সোমবার ২৬শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১০ ডিসেম্বর ২০১৮

জনি লিভারের হাসির অন্তরালের গল্প

রবিবার, জুন ২৪, ২০১৮

Johny-Lever-2.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

দুর্দান্ত এক অভিনেতা জনি লিভার। বলিউডের সেরা কয়েকজন কৌতুক অভিনেতাদের নাম নিলে প্রথমেই জনি লিভারের নাম নিতে হয়। তিনি নব্বইয়ের দশক থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষকে আমোদিত করার কাজটি করে এসেছেন। অদ্ভুত তার অঙ্গভঙ্গি ও অভিনয় যা দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল লাগতে বাধ্য।

কৌতুকাভিনেতা হিসেবে একাই পুরো বলিউড কাঁপিয়েছেন, মানুষকে হাসাতে হাসাতে অস্থির করে ফেলেছেন তিনি। কিন্তু তার জীবন কি শুরুর দিকে এমন হাসি খুশিতে ভরপুর ছিল? তার জীবন কি শুরুর দিকে আনন্দ বিনোদনের হাত ধরে কেটেছে?

জনি লিভারের আজকের জীবন ও ক্যারিয়ার যতটা চাকচিক্যময়, তার প্রথম জীবন ছিল ততটাই বিবর্ণ ও সীমাহীন কষ্টের ছিল। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি রাস্তায় রাস্তায় কলম বিক্রি করেছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোগাড় করার জন্য। অথচ আজ সেই ব্যক্তিই হাজার লোকের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার সক্ষমতা রাখেন। জেনে নিন জনি লিভারের জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শৈশব সম্পর্কে।

১৯৫৭ সালে এই স্বনামধন্য অভিনেতা ভারতে অন্ধ্রপ্রদেশে একটি তেলেগু নিম্নবিত্ত খ্রিস্টান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রকাশ রাও জানামালা, মাতা কারুনুমালা জানুমালা। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে জনি লিভারই ছিলেন বড়। লিভার লিমিটেডের শ্রমিক জনির বাবার পক্ষে পাঁচ সন্তানের এই বিশাল পরিবারের অন্ন সংস্থানের জোগান দিতেই অনেক কষ্ট হতো আর লেখাপড়া তো সেখানে বিলাসিতা ভিন্ন কিছু নয়। যার ফলাফল হিসেবে জনি সপ্তম শ্রেণিতে থাকাকালীন অবস্থায় স্কুল ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে রাস্তায় রাস্তায় কলম বিক্রি শুরু করেন।

জনি লিভার রাস্তায় রাস্তায় কলম বিক্রি শুরু করলেও তিনি কিন্তু গতানুগতিক হকারদের মতো করে কলম বিক্রি করতেন না। তার কলম বিক্রির পন্থাটা ছিল ভিন্ন। আর তার এই পন্থা শুধু কলম ক্রেতাদেরই আকৃষ্ট করত না, আকৃষ্ট করত তার চারপাশের সব পথচারীকে। জনি লিভার কী করতেন জানেন? জনি লিভার বলিউডের বিভিন্ন অভিনেতার কণ্ঠস্বর অনুকরণ করে নেচে নেচে কলম বিক্রি করতেন। নেচে নেচে কলম বিক্রি করাটাই ছিল আসল চমক। নিশ্চয়ই জনি লিভার তার অন্তরে বলিউড অভিনেতাদের অভিনয় লালন করতেন। এ জন্যই হয়তো রাস্তায় রাস্তায় কলম বিক্রি করতে গিয়ে ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভা একটু একটু করে জেগে উঠতে শুরু করে।

অমিতাভ বচ্চনসহ বলিউডের অনেকেই যে নামে সবার কাছে পরিচিত তা পিতৃপ্রদত্ত নাম নয়। বলিউডে নাম লেখাতে গিয়ে নাম বদলাতে হয়েছে তাদের। তেমনই ‘জনি লিভার’ নামটিও জনি লিভারের আসল নাম নয়। তবে কি তিনিও অন্যদের মতো বলিউডে নাম লেখানোর সময় নাম বদলে ফেলেছেন? না, তাও কিন্তু না। তাহলে কখন, কেন তিনি তার নাম পরিবর্তন করলেন?
জনি লিভারের বাবা কাজ করতেন লিভার লিমিটেড এ। জনি সেখানকার অনুষ্ঠানে কমেডিয়ানের চরিত্রে অভিনয় করতেন। একবার প্রোগ্রামে জনি লিভার লিমিটেডের বড় বড় কর্তাদের হুবহু অনুকরণ করে দেখান। আর তা দেখে সবাই এতটাই মুগ্ধ হয় যে, সে দিন থেকেই তারা জন প্রকাশ রাও জানুমালাকে ভালোবেসে জনি লিভার বলে ডাকা শুরু করেন। এভাবেই জন প্রকাশ রাও জানুমালা হয়ে যান জনি লিভার।

কলম বিক্রেতা জনি লিভার পরবর্তী জীবনে কোম্পানিতে কাজের পাশাপাশি হয়তো ভেবেছিলেন তার ভেতরে থাকা প্রতিভার দম তো কম না। অতএব প্রতিভার মূল্যায়ন করা উচিত বলে হয়তো মনে করেন তিনি। আর এরকম ভাবনা থকেই জনি কাজের পাশাপাশি স্টেজ পারফর্ম শুরু করেন। এভাবেই শুরু হয়ে যায় তার কমেডিয়ান হিসেবে পথচলা। নিয়মিত চলতে থাকে স্টেজ পারফরমেন্স। পাশাপাশি ভালোভাবে উপার্জনও শুরু করেন।

ততদিনে জনির আরেকধাপ ওপরে ওঠার সুযোগ হয়। এই একধাপ ওপরে ওঠাকে বলা যায় জনির জীবনের প্রথম সাফল্যের সিঁড়ি। যেখান থেকে তিনি টিভি শো করবেন, সুনীল দত্তের নজরে পড়বেন, খুঁজে পাবেন নতুন জীবনের হাতছানি। তিনি যোগ দেন কল্যাণজী-আনন্দজীর মিউজিক্যাল গ্রæপে। এখানে তিনি নিয়মিত শো করা শুরু করেন। জনি তখন নিয়মিত শো করছেন। বলা চলে দেশে-বিদেশে শো করে তিনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। হাতে রয়েছে প্রচুর শো। এর মধ্যে ১৯৮২ সালে সুযোগ আসে সারা পৃথিবী ভ্রমণের। তাও কার সঙ্গে জানেন? বলিউডের নাম্বার ওয়ান ম্যান, বলিউডে যিনি আজো অপ্রতিদ্ব›দ্বী সেই ব্যক্তির সঙ্গে। অমিতাভ বচ্চন বা বিগ বি। কথায় আছে, একবার যার হাতে সাফল্য ধরা দেয়, সাফল্য আপনা থেকেই তার কাছে এসে ধরা দেয়। সুযোগ যেন পছন্দ করে ফেলল জনিকে। তাই সে বারে বারে তার কাছে আসতে লাগল। জনির এই শোগুলোর একটি দেখেছিলেন বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা সুনীল দত্ত। একটি শো দেখেই সুনীল বুঝেছিলেন, শুধু শো করার জন্যই জনির জন্ম হয়নি। বলিউডকেও অনেক কিছু দেয়ার আছে জনির। সুনীল দত্তই জনিকে তার প্রথম মুভি ‘দার্দ কা রিশতায়’ সুযোগ দেন। এভাবেই শো থেকে শোবিজে পা রাখেন জনি লিভার। জনি এবার সিনেমা ও টিভি শোকে পুরোদস্তুর পেশা হিসেবে নেন। সিনেমা ও টিভি শোকে পাশাপাশি নিয়ে পথচলা শুরু করেন তিনি।

১৯৯০ সাল। জনি ততদিনে পাক্কা চলচ্চিত্র কমেডিয়ান। অভিনয় করেছেন লাভ ৮৬, সুরিয়া, চালবাজসহ বেশকিছু ছবিতে। কিন্তু বাজিতে জিততে পারেননি তখনো। দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেলেও দর্শকদের তাক লাগিয়ে দিয়ে তাকে অন্যরকম ভাবানোর মতো কিছু করতে পারেননি। এবার যেন জনির জন্য সেই বাজি জেতার সুযোগ এল। ১৯৯৩ সালে তার অভিনীত বাজিগর মুভি তার জীবনে নিয়ে এল সবচেয়ে বড় সাফল্য। বাজিগরের এই সাফল্যই যেন জনিকে বাজি জিতিয়ে দিল। এরপর থেকে জনি হয়ে গেলেন তার অভিনীত মুভিগুলোর নির্ভরযোগ্য অভিনেতা। আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। একে একে অভিনয় করে গিয়েছেন রাজা হিন্দুস্থানি, ক্রিমিনাল, জুদাই, অশোকা, লজ্জা, আনারি নাম্বার ওয়ান, রেসসহ অসংখ্য অসংখ্য চলচ্চিত্রে। তার সামনে শোভা পেয়েছে শুধু সাফল্যের সিঁড়ি। আর তিনি সেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছেন সাফল্যের চ‚ড়ায়।

জনি লিভার তার দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য ১৩ বার মনোনীত হয়েছেন এবং দুবার জিতেছেন ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসহ জিতেছেন অনেক পুরস্কার। জনি লিভারের অভিনীত বেশকিছু মনে রাখার মতো চলচ্চিত্র রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বাবুলাল, আসলাম ভাই-এর কথা বলা যেতে পারে। আর জুদাই সিনেমায় তার সেই ডায়লগ ‘আব্বআ, ডাব্বা, জাব্বা’ কেউ কি ভুলতে পারবে? যেমন কাজ করেছেন আব্বাস মাস্তান থেকে মহেশ ভাট পর্যন্ত সবার সঙ্গে তেমনি বলিউড ছাড়িয়ে অভিনয় করেছেন তেলেগু, তুলু প্রভৃতি চলচ্চিত্রে।

ব্যক্তিজীবনে জনি সম্পূর্ণ খ্রিস্টান এক ধার্মিকের জীবনযাপন করেন। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। তার স্ত্রীর নাম সুজাতা। তার মেয়ে জ্যামি লিভার তো বাবার মতোই কমেডিকেই পেশা হিসেবে নিয়েছেন। নিজেকে তৈরি করতে চান বাবার মতো করেই। সাফল্য ছেলের হাতের মোয়া নয়। প্রতিটি সাফল্যের পেছনেই রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্পগাথা। জন প্রকাশ রাও জানুমালার জনি লিভার হয়ে ওঠার গল্প যেন সেই কথাই বলে দেয়।


ঢাকা, রবিবার, জুন ২৪, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ২৭৭৭ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন