সর্বশেষ
শনিবার ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৭ নভেম্বর ২০১৮

যেভাবে এসবি ইন্সপেক্টর মামুনের লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়

বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮

download.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

বন্ধু রহমত উল্লাহ'র ডাকে এক মডেল ও অভিনেত্রীর জন্মদিনে যোগ দেওয়ার জন্য বনানীর একটি বাসায় গিয়েছিলেন এসবির ইন্সপেক্টর মামুন ইমরান খান। সেখানে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে ফাঁদ পেতে সেই মডেল ও অভিনেত্রীর সঙ্গে অশ্লীল ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হয়। মামুন নিজের পরিচয় দিলে তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে মারা যায় মামুন। সারারাত তার লাশ নিয়ে বসে থাকে সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যরা। পরদিন সকালে বস্তায় লাশ ভরে রহমতের প্রাইভেটকারের ব্যাকডালায় তোলা হয়। লাশ নিয়ে সারাদিন তারা গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানার উলুখোলা রাইরদিয়ার রাস্তার পাশে নির্জন এলাকায় গাড়ি দাঁড় করায়। এর আগে তারা একটি পাম্প থেকে সাত লিটার পেট্রোল কেনে। পরে গাড়ি থেকে লাশ বের করে বাঁশঝাড়ে ফেলে দিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারপর যার যার গন্তব্যে চলে যায় সবাই।

পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ইন্সপেক্টর মামুন ইমরান খান হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টার এমন চাঞ্চল্যকর বিবরণ দিয়েছেন গ্রেফতার হওয়া এক ব্যক্তি। মঙ্গলবার রাতে প্রকৌশলী রহমত উল্লাহ (৩৫) নামের এই অভিযুক্ত আসামিকে রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেফতার করা হয়। বুধবার তাকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হলে আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে তাকে মিন্টো রোডে গোয়েন্দা হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় বনানী থানায় নিহত মামুনের ভাই জাহাঙ্গীর আলম খান বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। ইতোমধ্যে রহমত উল্ল্যাহ নামে এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ ও সহযোগীদের নাম বলেছে। মামুন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্য আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শোবিজ মিডিয়ায় মাঝে মধ্যে অভিনয় করার সুবাদে রহমত উল্লাহ'র সঙ্গে পরিচয় ছিল মামুনের। রহমত উল্লাহ পেশায় প্রকৌশলী হলেও শোবিজ মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। গত রবিবার বিকেলে রহমতের সঙ্গে ফোনে কথা হয় মামুনের। এ সময় রহমত তাকে মডেল ও অভিনেত্রী মেহেরুন নেছা আফরিন ওরফে আন্নাফি আফরিনের জন্মদিনের পার্টি আছে বলে জানায়। মোটরবাইক নিয়ে মামুন যায় বনানীর ২/৩ সড়কে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করা রহমত তাকে নিয়ে যায় ওই সড়কের ৫ নম্বর বাসার এ-২ ফ্ল্যাটে। ওই ফ্ল্যাটেই আন্নাফি আফরিনসহ স্বপন, মিজান, আতিক, শেখ হৃদয় ওরফে আপন ওরফে রবিউল, সুরাইয়া আক্তার কেয়া, ফারিয়া বিনতে মীম ওরফে মাইশা অপেক্ষা করছিল। আগে থেকেই তারা একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেছিল। সেখানে মামুন ও রহমত যাওয়ার পর পূর্ব-পরিকল্পনা মতো অশ্লীল ছবি তুলে মামুনকে আটকে রেখে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে সংঘবদ্ধ এই চক্র। কিন্তু মামুন নিজেকে পুলিশ পরিচয় দেন। এ সময় আগে থেকেই ইয়াবা সেবন করা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সদস্যরা তাকে বেদম মারধর করে। এতে অচেতন হয়ে যান মামুন। পরে রাতভর লাশের সামনে বসেই লাশ গুমের পরিকল্পনা করে তারা।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রহমত উল্লাহ জানিয়েছে, সকালে সে গাড়িটি বাসার গ্যারেজে নিয়ে যায়। পরে একটি বস্তা সংগ্রহ করে তার ভেতরে ঢোকানো হয় মামুনের লাশ। সকাল ৮টার দিকে লাশসহ বস্তাটি রহমতের নিজের গাড়ির ব্যাকডালায় ঢোকায়। এতে তাদের সহযোগিতা করে ওই বাসার অফিস স্টাফ দিদার। পরে গাড়িটি নিয়ে রহমত, স্বপন, মিজান ও আতিক বেরিয়ে যায় গাজীপুরের উদ্দেশে। তারা গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় লাশ নিয়ে ঘোরাফেরা করে। কিন্তু লাশ গুমের সুযোগ পায় না। এর আগেই তারা একটি পাম্প থেকে সাত লিটার পেট্রোল কেনে গাড়িতে রাখে। সন্ধ্যায় তারা কালীগঞ্জের উলুখোলা রাইদিয়া এলাকার নির্জন জায়গায় যায়। সেখানে একটি বাঁশঝাড়ের মধ্যে লাশসহ বস্তাটি নিয়ে যায়।

রহমত উল্ল্যাহর ভাষ্য, বাঁশঝাড়ের ভেতরে লাশের বস্তাটি ফেলার পর সে তাতে নিজেই তেল ঢেলে দেয়। তার অন্য সহযোগীরা আগুন ধরিয়ে দিলে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে। তারা সেখানে আর অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে চলে যায়। ঢাকায় আসার পর যার যার গন্তব্যে চলে যায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘গত রোববার রাত থেকে মামুনের মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। পরদিন এসবি কার্যালয়ে গিয়ে তার খোঁজ করেন। তাকে না পেয়ে সবুজবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এসবি ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের খিলগাঁও জোনাল টিম যৌথভাবে বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করে। পরে প্রযুক্তির সহযোগিতায় তারা কিছু তথ্য পায়। সেই সূত্র ধরে গাজীপুরের সেই বাঁশঝাড় থেকে লাশ খুঁজে বের করে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার করা হয় রহমত উল্লাহকে। গ্রেফতারের পর রহমত উল্লাহ জিজ্ঞাসাবাদে সব স্বীকার করে।’

ফাঁদ পেতে নিয়মিত অর্থ আদায় করতো চক্রটি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কথিত মডেল ও অভিনেত্রীসহ ১০-১২ জনের এই সংঘবদ্ধ চক্রটি ফাঁদ পেতে বিভিন্ন লোকজনের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতো। নজরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি এই চক্রের মূলহোতা। চলতি বছরের মে মাসে বনানীর ২/৩ সড়কের ৫ নম্বর ভবনের এ-২ ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেয় নজরুল। সেখানে বায়িং হাউস ও মায়ের আঁচল নামে একটি বৃদ্ধাশ্রমের প্রধান কার্যালয় ও শোবিজ মিডিয়ার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের কথা বলে। শেখ হৃদয় ওরফে আপন ওরফে রবিউলকে এই কার্যালয় চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। শেখ হৃদয় এই বাসায় নিয়মিত মদ-জুয়ার আসর বসাতো। এসব আসরে থাকতো কথিত অভিনেত্রী ও মডেল শেখ আন্নাফি ওরফে মেহেরুন নেছা ওরফে আফরিন, ফারিয়া বিনতে মিম ওরফে মাইশা ও সুরাইয়া আক্তার কেয়া। স্বপন, মিজান ও আতিক মিলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র তৈরি করে। তারা মদ-জুয়ার আসরের আড়ালে কৌশলে এসব অভিনেত্রী ও মডেলদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করতো। এছাড়া অর্থের বিনিময়ে নিয়মিত দেহ ব্যবসাও চলতো এই বাসায়।

বুধবার বিকেলে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, বাসাটি পুলিশ তালাবদ্ধ করে রেখেছে। বাসার কেয়ারটেকার মিরাজ জানান, মে মাস থেকে ৪৫ হাজার টাকা ভাড়ায় নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বাসাটি ভাড়া নেয়। মিডিয়া হাউসের নামে বাসাটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৬০০ স্কয়ার ফিটের বাসাটিতে মাত্র একটি টেবিল, তিনটি চেয়ার ও অন্য কক্ষে একটি তোষক বিছানো হয়েছিল। এই মাসে তারা ইন্টেরিয়র ডিজাইন করবে বলে জানিয়েছিল। কিন্তু নিয়মিত ভাড়া না দেওয়ায় তাদের বাসা ছেড়ে দিতে বলা হয়।

মিরাজ জানান, ওই বাসায় শেখ হৃদয়ের স্ত্রী পরিচয় দিয়ে এক নারীসহ আরও কয়েকজন নারী নিয়মিত যাতায়াত করতেন। মিডিয়ার কার্যালয় বলে তারা এসব বিষয়কে কিছু মনে করতেন না। সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল তাদের। কিন্তু এখানে একজনকে হত্যার পর সেই লাশ পুড়ে গুম করার চেষ্টা করা হতে পারে এমন বিষয় কল্পনাতেও ছিল না তাদের।

শাজাহানপুর কবরস্থানে মামুনের লাশ দাফন
লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার দুপুরে শাজাহানপুরে স্থানীয় কবরস্থানে মামুনের লাশ দাফন করা হয়েছে। মামুনের বাবার নাম মৃত আজহার আলী খান। গ্রামের বাড়ি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ থানার রাজারামপুর এলাকায়। শাজাহানপুরের ১২৯ নম্বর মধ্য বাসাবোর বাসায় বড় ভাই জাহাঙ্গীর ও মায়ের সঙ্গে থাকতেন। ২০০৫ সালে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে পুলিশে যোগ দেন তিনি।

মামুন ঢাকার বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা কার্যালয়ে চাকরি করেছেন। ২০১৫ সালে পদোন্নতি পেয়ে ইন্সপেক্টর হয়ে চট্টগ্রামে বদলি হন। মাস চারেক আগে আবারও বদলি হয়ে তিনি ঢাকায় এসবিতে আসেন। পুলিশের চাকরির পাশাপাশি তিনি নিয়মিত নাটক- টেলিফিল্মে ওঅভিনয় করতেন। মামুনের বড় ভাই জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ভাইকে তো হারিয়েছি। এখন আমরা চাই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের যেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। সূত্র:বাংলাট্রিবিউন


ঢাকা, বৃহস্পতিবার, জুলাই ১২, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ২৩০৭ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন