সর্বশেষ
শুক্রবার ২রা ভাদ্র ১৪২৫ | ১৭ আগস্ট ২০১৮

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাই মুদ্রানীতির ছাপ

বুধবার, আগস্ট ৮, ২০১৮

5_0.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

বাংলাদেশের যে কোনো নির্বাচনে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। স্থানীয় নির্বাচনে এ প্রবাহ থাকে সীমিত পরিসরে। আর জাতীয় নির্বাচনে তা বিস্তৃত হয় কয়েকগুণ। তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়ে এর প্রভাব।

নির্বাচনের যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে কালো টাকা। অপ্রদর্শিত অর্থ ছাড়া যেন নির্বাচনী প্রচার পূর্ণতা পায় না। আর কালো-সাদা অর্থ প্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে, অর্থনীতির নীরব ঘাতক মূল্যস্ফীতি। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কৌশল থাকে সরকারের কাছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি কাঠামোর আলোকে তা একটা স্তরে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে থাকে। আগাম বার্তা দিয়ে দেয়। পরিসংখ্যানে তা হয়তো অনেক সময় মেলে; কিন্তু যাপিত জীবনে মানানো যায় না। তবে পরিসংখ্যান আর সূচক নির্ভরতায় আত্মতুষ্টিতে ভোগেন নীতিনির্ধারকরা।

তাই সমাজের নিচের তলার বাসিন্দা বরাবরই মুদ্রানীতি আর মূল্যস্ফীতি নিয়ে তেমন ভাবেন না। একে ছেড়ে দেয়া হয়েছে অনেকটা নিয়তির উপর। এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্বাচনী বছরে মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির গড় হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। গেল অর্থবছরের বাজেটে যা ৫ দশমিক ৪ শতাংশ রাখা হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে মুদ্রানীতি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। প্রধান লক্ষ্য থাকছে মূল্যস্ফীতির ওপর জোর দেয়া। এবার বাজেটে সঞ্চয়পত্রের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে সরকারি খাতের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। আর এতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লাগাম টানতেই হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তবে সরকার তো চায়, এ বছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে। সরকার অনেকটা আপস করে, সুবিধা দিয়ে ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবনা বেশ সাংঘর্ষিক। চলতি অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে আসবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এতেও মূল্যস্ফীতি চাপে পড়বে। এজন্য মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, তারল্য সংকট নিরসন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

মুদ্রানীতিতে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মতো সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাসমূহ বিবেচনায় রাখা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বৈশ্বিক, অভ্যন্তরীণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতিকে বিবেচনায় রেখেই এই নীতি প্রণয়ন করে।

এ সময়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটলে, তা সমন্বয় করা হয়। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অনিশ্চিত। তবে বাংলাদেশের বাণিজ্যের প্রধান অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে- এমন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

এ পরিবর্তন মুদ্রানীতির রূপরেখা তৈরিতে প্রভাব ফেলেছে। মুদ্রানীতির মূল লক্ষই হল ব্যাপক মুদ্রা বা এম.২ অর্থাৎ ব্যাংকের সব চলতি এবং সঞ্চয়ী আমানতের সমষ্টির নিয়ন্ত্রণ। এম.২ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সহনীয় মাত্রায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বাস্তবমুখী প্রাক্কলনের ওপর।

সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দামস্তর বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা মোকাবেলা করা হয়।

বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে বিপুল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের বাস, সেখানে খাদ্যদ্রব্য ও নিজ প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মুদ্রানীতি কতটুকু কার্যকর- এ নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন আছে।

প্রতি বছর দুইবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একবার বছরের শুরুতে। আরেকবার মুদ্রানীতি ঘোষণা হয় বছরের মাঝামাঝিতে। সাধারণত মুদ্রার গতিবিধি প্রক্ষেপণ করে মুদ্রানীতি। এর অন্যতম কাজ হল মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করা।

সাধারণ ভোগ্যপণ্যের দামস্তর, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। মুদ্রানীতির ‘টুল’ বা যন্ত্র দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে আগামীতে নিত্যপণ্যের দাম প্রবাহ বোঝা যায়।

চাকরির সুযোগ তথা কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনের রূপরেখাও থাকে মুদ্রানীতিতে। জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করাও এর লক্ষ। বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে গেলে মুদ্রাস্ফীতি হয়। এতে মুদ্রার মান কমে যায় এবং মুদ্রা দুর্বল হয়ে পড়ে।

গত অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নির্বাচনী বছরে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতার ফলে চাপ একটু বেশি থাকবে। এর মধ্যে আবার ব্যাংক ঋণের সুদহার কমিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে চাইছে সরকার। এ রকম পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ।

গত জানুয়ারিতে ঘোষিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয় ১৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। সর্বশেষ মে পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

গত জানুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের আগে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়তির দিকে ছিল। ঋণের লাগাম টানার এ উদ্যোগের পর সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসা সুদহার বেড়ে ডাবল ডিজিটে ওঠে।

নির্বাচনের বছরে অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের ব্যয় বাড়বে। আবার চলমান পদ্মা সেতু, এলএনজি, বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেলের মতো কাজেও গতি বাড়বে। আর স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনের বছরে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা হয় না।

তবে সুদহার কমানোর মাধ্যমে এবার সরকার চাইছে বিনিয়োগ বাড়াতে। প্রকল্প ব্যয় বাড়াতে তৎপরতা শুরু হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার দিনে ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে নেয়া হয়েছে চার হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, গত ৩০ জুনে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯০ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, গত ৪ জুলাই শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৯৫ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনের বছরে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বেশি হারে বাস্তবায়ন হবে।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বেশি অর্থের প্রয়োজন হবে। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে ও কাঙ্ক্ষিত হারে বিদেশি ঋণ না এলে ব্যাংক ঋণ বেশি হারে নিতে হবে। যদিও কয়েক বছর ধরে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে ফেরত দিয়েছে। এতে কমে গিয়েছিল সরকারের ব্যাংক ঋণের স্থিতি।

তবে বিপরীতে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ রেকর্ড হারে বেড়েছে। নির্বাচনী বছরে প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের দীর্ঘসূত্রতা থেকে বের হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এখন থেকে যে কোনো প্রকল্পের পরিচালক জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকেই সরাসরি বরাদ্দের অর্থ খরচ করতে পারবেন।

সরকারের চলমান আর্থিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অবমুক্তি ও ব্যবহার নির্দেশিকায়’ সংশোধনী এনেছে অর্থ বিভাগ। নতুন প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালকদের প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় থেকে বিভাজন আদেশ জারি ও অর্থছাড় করার প্রয়োজন হবে না। প্রকল্প পরিচালকরা বাজেট বরাদ্দের আলোকে জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকেই সরাসরি অর্থ ব্যবহার করতে পারবেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত রেপো ও রিভার্স রেপো রেটের মাধ্যমে মার্কেটে সুদের হার কেমন হওয়া উচিত, তার একটি সংকেত পাঠিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে এ দুটি হারের কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। বেশ কিছুদিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের এ দুটি হাতিয়ার কার্যকর হয়েছে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ব্যাংকের সুদের হার বা স্প্রেডের হারের পরিবর্তন চাইছে। অন্তত এ সংকেত যাচ্ছে বাজারে। উন্নয়নশীল দেশে মুদ্রানীতি প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মূল্যস্ফীতির ধরনের কারণেও মুদ্রানীতির ভূমিকা তেমন জোরালো নয়।

গত তিন দশক ধরে খাদ্যপণ্যের দাম সার্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর ভূমিকা রেখে চলেছে। অর্থাৎ খাদ্যমূল্য সহনীয় থাকলে সার্বিক মূল্যস্ফীতিও কম থাকে। আর গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির ওপর মুদ্রা সরবরাহের প্রভাব অত্যন্ত সীমিত।

তাই মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে বা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা কার্যকর হয় না। খাদ্যমূল্য সহনীয় রাখাটা বড় চ্যালেঞ্জ। আর খাদ্যমূল্য মূলত নির্ভর করে খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতি ও খাদ্যের জোগানের ওপর।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও রক্ষণশীল মুদ্রানীতির ফলে বিনিয়োগের তথা ব্যক্তিখাতের ঋণপ্রবাহের শ্লথগতি বজায় রয়েছে। এ বৃত্ত ভাঙার লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার হাতে থাকা নানা ধরনের টুল ব্যবহার করতে পারে।

সাজ্জাদ আলম খান: সাংবাদিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
sirajgonjbd@gmail.com
সূত্র: যুগান্তর


ঢাকা, বুধবার, আগস্ট ৮, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // জে এইচ এই লেখাটি ১৫৪ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন