সর্বশেষ
বৃহঃস্পতিবার ২৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

'মুস্তাফিজ বলছিল ভাই আর পারব না, আমার তো মাথায় হাত'

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

Mashrafe1-52095-1537040496.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

মুস্তাফিজুর রহমানের তখন সবে শেষ হয়েছে ৫ ওভার। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে প্রায় কাহিল অবস্থা। ডিহাইড্রেশনে ক্র্যাম্প করতে শুরু করেছে পায়ের পেশি। ওভার শেষে এই বাঁহাতি পেসার গিয়ে অধিনায়ককে বললেন, ‘ভাই আর পারব না’। মাশরাফি বিন মুর্তজার মাথায় হাত; মুস্তাফিজকে ঘিরেই তো সাজিয়ে রেখেছেন স্লগ ওভারের পরিকল্পনা! ম্যাচ জিততেই হবে। অধিনায়ক হাল ছাড়লেন না। লেগে থেকে মুস্তাফিজকে নানাভাবে উজ্জীবিত করে আদায় করে নিলেন ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স!

শেষ ওভারে মুস্তাফিজের অসাধারণ বোলিংয়ে রোববার আবু ধাবিতে আফগানিস্তানকে হারায় বাংলাদেশ। শেষ ওভারে আফগানদের প্রয়োজন ছিল কেবল ৮ রান। উইকেটে ছিলেন সামিউল্লাহ শেনওয়ারি ও রশিদ খানের মতো আক্রমণাত্মক দুই ব্যাটসম্যান, বাইরে অপেক্ষায় তখনও গুলবদিন নাইব। কিন্তু দুর্দান্ত শেষ ওভারে মুস্তাফিজ দেন কেবল ২ রান, লেগ বাই থেকে আসে আরও ২ রান। রোমাঞ্চকর ম্যাচ বাংলাদেশ জিতে নেয় ৩ রানে।

তবে একটা পর্যায়ে ওই শেষ ওভার পর্যন্ত যাওয়ার অবস্থায় ছিলেন না মুস্তাফিজ। শরীর টানছিল না, মন মানছিল না। ৫ ওভারের পর থেকেই পায়ে করছিল ক্র্যাম্প। মাশরাফি তবু তার কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছেন আরও ৪ ওভার!

এ দিন বল হাতে নিয়ে প্রথম বলেই মুস্তাফিজ নিয়েছিলেন উইকেট। প্রথম স্পেলের ৩ ওভার করার পর পরের দিকের জন্য তরতাজা রাখতে তাকে বিশ্রামে রাখেন অধিনায়ক। আবার বোলিংয়ে আনেন ৩৩ ওভারের পর। সেই স্পেলেই ২ ওভারের পর থেকে ক্র্যাম্প করতে থাকে পায়ে।

মাশরাফি তখন থেকেই তাকে বলতে থাকেন, যে করেই হোক বোলিং চালিয়ে যেতেই হবে। দ্বিতীয় স্পেলেও করেন ৩ ওভার। শেষ স্পেলের ৩ ওভার শুরু করেন ৪৫ ওভার শেষে। এর মাঝেই দেখা গেছে পায়ের স্ট্রেচিং করছেন মাঠে, সময় নিচ্ছেন, লড়ছেন নিজের সঙ্গে। সেসব সামলেই ওই বীরোচিত শেষ ওভার।  সেই লড়াইয়ের গল্প শোনালেন অধিনায়ক।

“ওর ৫ ওভারের পর থেকেই বলছিল, ‘ভাই, আমি আর পারব না’। আমার তো মাথায় হাত! আজকে রুবেলও নেই। ম্যাচ তো জিততেই হবে, ওকে আমার লাগবেই। ওর ১০ ওভার তো হিসাব করা আমার। আমি বারবার ওকে বলেছি, পারতেই হবে। বলেছি নিজেকে পুশ করতে। চেষ্টা করেছি ছোট স্পেলে ওকে বোলিং করাতে।”

“ওর কাফ মাসলে টান লাগছিল। এফোর্ট দিতে পারছিল না, ইয়র্কার পারছিলই না শেষ দিকে। আমি বললাম যে, অন্তত রান আপে আস্তে আস্তে দৌড়ে গিয়ে হলেও কাটার দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে। চেষ্টা করেছি সাহস দিতে। তবে আমার কাজ তো ছিল স্রেফ বলা, আসল কাজ সে করেছে। এই অবস্থার মধ্যেও যেভাবে বোলিং করেছে, ওকে কৃতিত্ব দিতেই হবে।”

৪২ ওভার যখন শেষ হলো, মুস্তাফিজ ও সাকিব আল হাসানের তখন ৪টি করে ওভার বাকি। মাশরাফির পরিকল্পনা ছিল এমনটিই। কিন্তু মুস্তাফিজের পায়ে ক্র্যাম্প তো ছিলই, শিশির ও ঘাম মিলিয়ে বেকায়দায় ছিলেন সাকিবও। বল ঠিকভাবে গ্রিপই করতে পারছিলেন না। অভিষিক্ত নাজমুল ইসলাম অপুকে কঠিন চ্যালেঞ্জে ঠেলে দিতে চাননি। বাধ্য হয়ে অধিনায়ক নিজেও স্লগ ওভারের দায়িত্ব কিছুটা নেন। সাকিব ও মুস্তাফিজকে একটি করে ওভার থেকে মুক্তি দিয়ে ওই দুই ওভার করেন নিজে। স্লগ ওভারে বোলিং তার খুব শক্তির জায়গা নয়। একটি ছক্কা হজম করলেও ওই দুই ওভারে কেবল ১৩ রান দিয়ে শেষটা ভালোভাবেই করেছেন।

মাঠে দেখা গেছে, অধিনায়ক নিজেও ডিহাইড্রেশনে ভুগেছেন। ধুঁকছিলেন বেশ। ক্র্যাম্প তারও হচ্ছিল। কিন্তু সেসবকে পাত্তা দেওয়ার মানুষ তো তিনি কখনোই নন!

“আমারও কষ্ট হচ্ছিল প্রচণ্ড। শরীর সাপোর্ট দিচ্ছিল না। কিন্তু আমি যদি নিজের এসব কথা বলি, অন্যরা আরও দমে যাবে। এজন্যই চেষ্টা করেছি ওদেরকে যত সাপোর্ট দেওয়া যায়। মাঠে শিশির ছিল, ঘাম তো দরদর করে ঝরছিল। হাতে বল গ্রিপ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। অনেকবার আমরা মাটিতে হাত ঘষেছি। লাভ বেশি হয়নি। সাকিবের কাজটা কঠিন হয়ে পড়ছিল।”

“শিশির আর ঘামে ভিজে বল ব্যাটে যাচ্ছিল ভালোভাবে। আমার, মুস্তাফিজের অনেকগুলো কাটার গ্রিপ করেনি। অন্তত ৬টি কাটার গ্রিপ করেনি। শেষ দিকের ছক্কাটি খেলাম বল গ্রিপ করেনি বলেই। এরপরও শেষ পর্যন্ত ভালোয় শেষ করতে পেরেছি, এটাই আসল কথা।”

প্রথম দুই স্পেলে ব্যর্থ মাশরাফি এ দিন তৃতীয় স্পেলে তুলে নেন দুই উইকেট। আসগার আফগান ও হাশমতউল্লাহ শহিদির জুটি যখন আফগানদের এগিয়ে নিচ্ছে জয়ের পথে, দুজনকেই ফিরিয়েছেন অধিনায়ক। যে দুই উইকেটে বাংলাদেশের প্রথম বোলার হিসেবে স্পর্শ করেছেন আড়াইশ ওয়ানডে উইকেটের মাইলফলক।

নিজে জোড়া আঘাত হানার আগে তার আরেকটি বোলিং পরিবর্তনও কাজে লেগে গিয়েছিল দারুণভাবে। নিজের দ্বিতীয় স্পেল শেষ করেই বাইরে চলে গিয়েছিলেন। একটু পর মাঠে ফিরেই বল তুলে দেন মাহমুদউল্লাহকে। ব্যাট হাতে দুর্দান্ত খেলা মাহমুদউল্লাহ প্রথম ওভারেই তুলে নেন উইকেট। ফিফটি করা মোহাম্মদ শাহজাদকে বোল্ড করে ভাঙেন জুটি। অধিনায়ক শোনালেন সেটির পেছনের ভাবনাও।

“মোসাদ্দেক ছিল না, রিয়াদের বোলিংটা এদিন লাগতই হয়ত। অন্যদের একটু বিশ্রাম দেওয়ার ব্যাপারও ছিল। আর বাইরে যাওয়ার পর মাঠে ফিরেই মনে হলো এখন রিয়াদকে আনলে কাজে লাগতে পারে।”

মাশরাফির বোলিংয়ের মূল শক্তির জায়গা যেটি, সেখানে অবশ্য বিবর্ণ ছিলেন কিছুটা। পরপর দুই ম্যাচে নতুন বলে পেলেন না উইকেট। নিজের শরীর ও বোলিংকে খুব ভালো করে জানেন তিনি। তাই জানেন না পারার কারণও।

“আমার শরীরের জন্য ম্যাচের পর রিকভারি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চার দিনের মধ্যে তিনটি ম্যাচ খেলতে হয়েছে, রিকভারির সময়ই পাচ্ছে না শরীর। এটাকে অবশ্য অজুহাত দেওয়ার সুযোগ নেই। কষ্ট করেই খেলতে হবে এবং পারফর্ম করতে হবে।”

নিজের সঙ্গে লড়াই তিনি বছরের পর বছর ধরেই করছেন। পারফরম্যান্সও ধারাল হবে আবার নিশ্চিতভাবেই। কিন্তু এই যে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই, নতুন বলে বিবর্ণ থেকেও পুরোনো বলে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেট নেওয়া, মিইয়ে যাওয়া মুস্তাফিজকে তাজা করে তোলা, কঠিন কন্ডিশনেও শেষ পর্যন্ত দলকে প্রাণবন্ত রাখা, সব মিলিয়ে এই ম্যাচও আরেকটি প্রমাণ, কেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে একজন মাশরাফি অমূল্য!

সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর


ঢাকা, সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ১২৫৬০ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন