সর্বশেষ
শুক্রবার ৪ঠা কার্তিক ১৪২৫ | ১৯ অক্টোবর ২০১৮

ফেইসবুকে কমেন্টস কেমন হওয়া উচিত?

সোমবার, অক্টোবর ৮, ২০১৮

iiiiiii.jpg
প্রবাসী ডেস্ক :

সাম্প্রতিককালে আমাদের যতগুলো সামাজিক মিডিয়া আছে, ফেইসবুক সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়। বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষই ফেইসবুকের সাথে জড়িত, কেউ সময় দিচ্ছেন নিজের পার্সোনাল ওয়ালে, আবার অনেকে সময় দিচ্ছেন বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে। ফেইসবুক গ্রুপ গুলোও বর্তমানে অনেক আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে; এডুকেশন থেকে শুরু করে, ইনফরমেশন, রান্না, স্পোর্টস, ফিটনেস, বাই এন্ড সেল, গেমস এবং ফান সহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ফেইসবুক গ্রুপ তৈরী হয়েছে এবং মানুষও সেখানে সময় দিচ্ছে। ফলে অনেকেই আজকাল নিজের ব্যাক্তিগত ফেইসবুক ওয়ালে বা বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে মজার মজার বিষয় নিয়ে লেখা, ছবি, লিংক পোস্ট দিচ্ছেন, যার মাঝে থাকছে বিভিন্ন শিক্ষামূলক, সমাজ উন্নযন, পরিবার ও সামাজিক এক্টিভিটি, ভ্রমণ কাহিনী ও বিভিন্ন বিষয়ে এবং সাথে থাকছে মজার মজার ইমেজ বা ছবি।

ফেইসবুক জগতে লাইক, কমেন্টস ও শেয়ার একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বিষয়। এটা শুধু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়, এমন কি ফেসবুকের এই লাইক, কমেন্টস ও শেয়ারের সাথে জড়িত আছে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা যারা ই-কমার্স, এফিলেট মার্কেট ও অ্যাড ব্যাবসার সাথে জড়িত আছেন তাদের কাছে।

ফেইসবুকের লাইক ও কমেন্টস একদিকে যেমন অনেক মূল্যবান ও গুরুত্বপুর্ণ, অন্যদিকে এর সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার কারণে এটি আবার একটি বিড়ম্বনার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ফেইসবুকে লাইক ও কমেন্টস কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা অনেক মূল্যবান বক্তব্যও পেশ করছেন এবং তৈরী হয়েছে ফেইসবুক কোড অফ কন্ডাক্ট।

ফেইসবুকে কমেন্টস করার আগে আমাদের প্রত্যেকেই বোঝা উচিত, যে ফেইসবুক হল একটি ডিজিটাল পাবলিক মিডিয়া, যা সবাই দেখতে পায় অতি সহজে পৃথিবীর যে কোন প্রান্ত থেকে। তাই, ফেইসবুকে আমরা যা লিখি ও কমেন্ট করি, তা মুহূর্তের মধ্যে চলে যাচ্ছে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এ, যা সবাই দেখছে খুবই সহজে। তাই ফেইসবুকে কোন কমেন্টস করার পূর্বে তা আমাদের খুব বিবেচনা করা একান্তই জরুরী।

ফেইসবুকে কমেন্টস হল একটি মানুষের রুচি, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, তার প্রফেশনালিজম এবং চিন্তা শক্তির বহিঃপ্রকাশ। ফেইসবুকের কমেন্টস দেখে একটি মানুষকে সহজেই যাচাই করা হয়, সে মানুষটি কেমন। অন্য দিকে আমরা প্রত্যেকে এক একটি আইকন বা মডেল এবং আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে একটি পজিশন বহন করছি, তাই ফেইসবুকে কমেন্টস লেখার সময় আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান ও পজিশন বিবেচনা করেও কমেন্টস করা উচিত। অনেকে এই কমেন্টস এর উপর ভিত্তি করে নতুন কাউকে ফ্রেন্ড লিস্ট এ অ্যাড করেন, আবার কাউকে আনফ্রেন্ড বা ব্লকও করেন। এতে বুজা যায় ফেইসবুকের কমেন্টস শুধুই কমেন্টস নয় এর পসিটিভ ও নেগেটিভ এফেক্ট অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়।

ফেইসবুকে কমেন্টস লেখার সময় আমাদের ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখা একান্তই জরুরী। কমেন্ট এর মাধ্যমে কাউকে আঘাত করা বা কাউকে খাটো করা মোটেই উচিত নয়। আবার এই কমেন্টস এর কারণে, কখনও দুজনের মাঝে ভুল বোঝা বুঝি হয়ে গেলেও তা যতসম্ভব তারা তারি সমাধান করা জরুরী।

আমাদের কারো পোস্টে বা লেখায় দ্বিমত থাকতেই পারে, তাই এই ব্যাপারে আমাদের কমেন্টস হওয়া উচিত গঠনমূলক, যেমন মনে করুন আপনি কারো একটি পোস্টকৃত লেখা পড়লেন এবং তা পড়ার পর কিছু বিষয় আপনার কাছে মিসিং মনে হয়েছে, সেখানে আপনি এভাবে কমেন্টস করতে পারেন "আপনার লেখা খুবই চমৎকার হয়েছে, তবে আপনার লেখায় যদি এই.এই. বিষয় গুলোতে যোগ করা হত তবে লেখাটি আরও সুন্দর হত, ধন্যবাদ"।এতে লেখক বা পোস্ট দাতা যেমন একদিকে খুশি হবেন, অন্যদিকে তিনি আগামীতে লেখা/পোস্টকে আরোও আকর্ষণীয় করার জন্য মনযোগী হবেন এবং সর্ব বিষয় দিকে খেয়াল রেখে তিনি লিখবেন। কিন্তু আপনি তা না করে, যদি তাকে খাটো করার জন্য আজে বাজে বা আক্রমণাত্মক কমেন্ট করেন, তাহলে সে আপনার প্রতি রেগে যাবে এবং আপনি তার শত্রু হয়ে গেলেন, অন্য দিকে সে মনে মনে আঘাত পেয়ে ভবিষৎতের জন্য লেখাই ছেড়ে দিল। এতে লাভটা কি হল? এতে একদিকে আপনার একজন শত্রু তৈরী হল, অন্য দিকে আপনি এবং পাঠকরা একজন লেখককে হারালো!

একজন লেখক বা পোস্টদাতা যখন কোন একটি বিষয়ে লিখে পোস্ট করেন, সে লেখকের উদ্দেশো থাকে সাধারণত মানুষের ও সমাজের কল্যাণের। তিনি যখন লিখেন, সেখানে সে তার ব্যাক্তিগত শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞাতার আলোকে লিখেন এবং তা পোস্ট করেন। কিন্তু সেই লেখা যখন পাঠকের হাতে পৌঁছে, দেখা যায় পাঠকরা কমেন্ট করছেন (১) সহমত (২) ঠিক (৩)১০০% সঠিক (৪) কেউ কেউ আবার আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরের মত কমেন্ট করেন (যা লেখা হয়েছে তার সম্পর্কে নয়, বরং কমেন্ট করেন অন্য বিষয় সম্পর্কে) (৫) অনেকের কমেন্টস আবার কনফ্লিক্ট ও তৈরি করছে, যার ফলাফল হয় সম্পর্কের মাঝে বিচ্ছেদ এবং ব্লক খান বন্ধুদের কাছ থেকে।

সত্যি বলতে একজন লেখক তার লেখা পোস্ট করার পর সে জানতে চায়, পাঠক তার লেখা সম্পর্কে কতটুকু বুজতে পেরেছে এবং পাঠক কি মনে করেন তার লেখা সম্পর্কে, এখানে একজন পাঠক কোন লেখকের লেখা পড়ে তার মন্তব্য নিজের ভাষায় কমেন্টস লিখবেন, তাই সে প্রত্যাশা করেন, সহমত বা ঠিক বা ১০০% সঠিক সাধারণত কোন লেখক এমন কমেন্টস প্রত্যাশা করেন না, কেবল মাত্র ব্যাতিক্রম কোন বিশেষ বিষয় ছাড়া। অবশ্যই কেউ আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরের গল্প শুনতেও চান না, সবাই চান যে টপিক নিয়ে পোস্ট করা হয়েছে সে সম্পর্কে কমেন্টস। অন্য দিকে কোন কমেন্টস লিখতে গিয়ে কারো সাথে কনফ্লিক্ট তৈরি হওয়া অবশই সঠিক হতে পারে না, সে ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেকেই সতর্ক থাকা একান্তই জরুরী।কোন কমেন্টস করতে গিয়ে যদি কারো সাথে সম্পর্কের ঘাটতি হতে পারে বলে মনে হয়, সেক্ষেত্রে কমেন্টস না করাই ভাল।

পরিশেষে বলবো, আমাদের প্রত্যেককে "জেন্টেলম্যান এগ্রিমেন্ট" মেইনটেইন করা একান্তই জরুরী, যেখানে কমেন্টস করার সময় একজনের প্রতি আরেকজনের (১) সম্মান -ভক্তি-শ্রদ্ধা (২) মায়া -মমতা (৩) ম্যানার ও মোরাল ভ্যালু মেইনটেইন করা প্রয়োজন। আশা করি আমরা সবাই ফেইসবুকে কমেন্টস করার সময় উপরের "বেসিক কোড অফ কন্ডাক্ট" গুলো মেনে চলবো, তবেই ফেইসবুক ব্যবহারকারী একজনের সাথে আরেক জনের সাথে বন্ধুত্ব ও বন্ধন আরও মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে ।

চলুন এবার দেখি এব্যাপারে আমাদের ফেইসবুক ব্যবহারকারী এক্সপার্টরা কে কি বলেন:

রোকসানা হাবিব লুবনা, বার্মিংহাম- যুক্তরাজ্য থেকে বলেন, ফেইসবুকের কমেন্ট হওয়া উচিৎ ঐ পোস্ট বা স্ট্যাটাসের বিষয় বস্তুর উপর ভিত্তি করে লেখা। ফেইসবুক বন্ধুদের মনে রাখা উচিৎ এটা পাবলিক স্পেস / সবাই দেখবে, তাই কমেন্টটা অবশ্যই শালীন হওয়া উচিৎ। কেউ যাতে আঘাত না পায় অথবা কেউ আঘাত পাবে বুঝতে পারলে আগেই বিষয়টা সুন্দরভাবে বলা উচিৎ এবং ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিৎ। একটা পরিচ্ছন কমেন্ট দেখে কমেন্টকারির মানসিকতা বোঝা যায় তাই সবাইকে কমেন্ট করার সময় তার শিক্ষা এবং মানসিকতার দিকে লক্ষ রাখা উচিৎ বলে আমার মনে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে ফেইসবুকে এ্যাড হওয়া মানুষের কমেন্ট দেখেই তার মানসিকতা বিচার করি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি - তার বন্ধু লিস্টে কি আমি থাকবো নাকি বেড় হয়ে আসবো ? সুতরাং কমেন্ট আমার কাছে সত্যি খুব মুল্যাবন।

শিহাব উদ্দিন, মন্ট্রিয়ল- কানাডা থেকে বলেন, - প্রথমতঃ কমেন্ট লেখার সময় তা পোস্টের সাথে প্রাসঙ্গিক হওয়া উচিত। তারপরে উচিত লক্ষ্য রাখা যাতে সেটা ব্যক্তিগত বা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গন্ডি পেরিয়ে সামষ্টিক বা সাৰ্বজনীন হয়। সেটা হতে পারে কোন পজিটিভ অভিব্যক্তি, গঠনমূলক সমালোচনা কিংবা এমন কোনো প্রশ্ন যা মূল পোস্টকে পরিপূর্ণ করে। তবে গঠনমূলক সমালোচনা হলে তা হতে হবে স্পষ্ট, কোনো রকম ব্যাঙ্গত্বক শব্দ কিংবা ইঙ্গিত বর্জিত। আর একটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিত, যে কোনো পোস্ট দেখলেই কমেন্ট করতে হবে, বিষয়টা সেরকম নয়। মনে রাখা উচিত যে কমেন্ট দেখেই কারো রুচি, মানসিকতা, সংবেদনশীলতা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞানের গভীরতা এমন কি বংশ পরিচয় খুব সহজে মূল্যায়ন করা যায়।

আরিফ চৌধুরী, টরন্টো- কানাডা থেকে বলেন, আমাদের কমেন্টসে কোন ধরনের অশ্লীলতা, নগ্নতা, মানহানি বা ঘৃণা বক্তব্য থাকা উচিত নয়। ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করতে বা হুমকি হতে পারে এমন কোন কমেন্টস না দেওয়া। বাণিজ্যিক উদ্দেশে কোনোরূপ বিজ্ঞাপন না দেওয়া বা দেওয়ার জন্য অনুরোধ না করা। এটা কোন অবৈধ কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে পারবেন না। চুরি করা যাবে না। কমেন্টস লেখার সময় কোনরূপ পার্সোনাল ইনফরমেশন না দেওয়া, কারণ এতে কেউ কেউ আবার প্রতারণার শিকারও হতে পারেন।

ফরহাদ আহমেদ মিশু, টরন্টো- কানাডা থেকে বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করার সময়, আমাদের জনসাধারণের মনোভাব সম্পর্কে খুব সতর্ক থাকা উচিত। এটি যে কোন ধরণের পোস্ট হতে পারে, যদি আমরা এটি অপছন্দও করি, তারপরও আমাদের কমেন্টস গঠনমূলক হওয়া উচিত। আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিত সময় সংবেদনশীল, আমাদের সহনশীল মনোভাব থাকা উচিত, এবং আমাদের মনে রাখা উচিত মানুষের কাছে থেকে সম্মান পেতে হলে মানুষকেও সম্মান করতে হয়।

নাসির আহমেদ নিউইয়র্ক- আমেরিকা থেকে বলেন, ফেইসবুকে কমেন্টস আমার কাছে খুবই গুরুত্ব পূর্ণ, আমরা যখন কোন কমেন্টস লিখি, আমাদের বিবেচনা করে লেখা উচিত আমার লেখায় কাউকে খাটো করা বা কষ্ট দেয়া হচ্ছে কিনা। কেউ যদি আপত্তি কর কমেন্টস লিখে আমি তাকে সাথে সাথে ব্লক করে দেই, এভাবে আমার অনেক কাছের বন্ধুরাও এখন আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে আর নেই। আমি মনে করি কারোর লেখায় কমেন্টস করার ফলে যদি তার সাথে সম্পর্কের ঘাটতি হতে পারে মনে হয়, আমি মনে করি সেক্ষেত্রে কমেন্টস না করাই উত্তম, কারণ কমেন্টস করার চেয়ে বন্ধুত্বের মূল্য অনেক বেশী।

আশা করি আপনারাও আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ গুলো শেয়ার করে পাঠকদের উপকৃত করবেন। ধন্যবাদ সবাইকে।

ফারুক আহমেদ
লেখক: কলামিস্ট চিলড্রেন এন্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট


ঢাকা, সোমবার, অক্টোবর ৮, ২০১৮ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ৩৭৮ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন