সর্বশেষ
শুক্রবার ২৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৬ | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

ইনোভেশনের অনন্য দৃষ্টান্ত মাগুরা জেলার 'পারিবারিক সাক্ষরতা'

সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯

14352001_134625970327829_4969031814920261085_o.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

মাগুরা জেলায় জানুয়ারি ২০১৯ থেকে 'টেকসই সাক্ষরতা ও জীবন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্প (৬৪জেলা) বাস্তবায়নে পারিবারিক সাক্ষরতা ধারণা সম্পৃক্তকরণ' নামে একটি উদ্ভাবনী ধারণার পাইলটিং চলমান। ধারণাটি জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো এর সহকারী পরিচালক সরোজ কুমার দাস কর্তৃক প্রণীত। বাস্তবায়ন সহযোগি হিসাবে রোভা ফাউন্ডেশন ও ইসাডো নামে দু’টি সংস্থা কাজ করছে। এটি মনিটরিং করছেন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর ইনোভেশন কমিটির সদস্য সচিব মূরশিদা বেগম।

পারিবারিক সাক্ষরতা মূলত এমন একটা ধারণা, যা একটি পরিবারের আন্তঃসদস্য মিথস্ক্রিয়া বৃদ্ধি করে। এটি পরিবারের দৈনন্দিন কাজ এবং শিশু ও পিতা-মাতার পারস্পারিক কিছু কাজ সম্পাদনের মধ্যেই নিহিত। আন্তঃসদস্য শিখন, বিনোদন ও আলাপচারিতার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন এবং পারিবারিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির একটা মেলবন্ধন, সৃজন ও লালনে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এটির প্রয়োগ সকল ধরণের পরিবারেই হতে পারে।

এই ধারণাটি গ্রহণের একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ করে বয়স্ক শিক্ষায় অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি ও সাক্ষরতা ধরে রাখাসহ জীবন দক্ষতার অন্যান্য ধারণা ও অনুশীলন খুব দ্রুত ম্রিয়মান হয়ে যায়। ফলে শিক্ষা/সাক্ষরতা ও জীবন দক্ষতা টেকসই হয়না। এ সমস্যার একটা উল্লেখ্যযোগ্য দিক হলো পরিবারের একজনের শিক্ষা বা ধারণার সাথে অন্যজনের শিক্ষা বা ধারনা শেয়ার না করা। একসাথে বসে বা অন্যকোন কাজের সময় পরিবারের সকল সদস্যদের মধ্যে শিখন প্রক্রিয়া বা শিখন বিষয়বস্তু আলাপচারিতা ও অনুশীলন এর সুযোগ সৃষ্টি না করা। পারিবারিক শিক্ষার অভাব একটি পরিবারের শিক্ষা ও জীবন দক্ষতাকে উন্নত করার পরিবর্তে আরোও দুর্বল করে দেয়। এছাড়াও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রেম, ভালবাসা ও স্নেহের বন্ধনকেও যথেষ্ট মজবুত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টিতে বিঘ্ন ঘটায়।

এ অবস্থার সমাধান কল্পে চলমান বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচিতে পারিবারিক সাক্ষরতার ধারণা প্রয়োগ একটি সফল উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এটি এমন একটি ধারণা যার মাধ্যমে একটি পরিবার তার সদস্যদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সাক্ষরতা তথা শিক্ষা ও জীবন দক্ষতার অধিকতর উন্মেষ ঘটিয়ে পরিবারের তথা সমাজের অধিকতর কল্যাণ সাধন করতে পারে। যেমন: ১৫-৪৫ বছর বয়সী নিরক্ষর শিক্ষার্থীরা মূলত মৌলিক সাক্ষরতা প্রকল্পের অন্তর্ভূক্ত। একটি কেন্দ্রে পিতা ও পুত্র বা মাতা ও কন্যা শিক্ষার্থী থাকতে পারেন। আবার ঐ পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য স্কুল/কলেজের শিক্ষার্থী থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে যদি ঐ পরিবারের স্কুল বা কলেজ পড়ুয়া সদস্য বয়স্ক শিক্ষার বই পড়ে তাহলে ঐ সদস্য জীবন দক্ষতার অনেক ধারণা পাবে যা তার পাঠ্য বইয়ে নেই। আবার সে ঐ বই পড়ার সময় পরিবারের যিনি কেন্দ্রের শিক্ষার্থী তাকে পড়তে ও বুঝতে সাহায্য করতে পারেন। একই রকমভাবে বয়স্ক শিক্ষার্থী পরিবারের অন্য সদস্যদেরকে বই থেকে প্রাপ্ত জীবন দক্ষতার বিষয়গুলো বোঝাতে পারেন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অধিকতর কনিষ্ঠ সদস্যকে বই পড়তে সাহায্য করতে পারেন।

ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সাক্ষরতার অনুশীলন ত্বরান্বিত হবে এবং পরিবারটি সমাজের তথা রাষ্ট্রের একটি অব্যাহত শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রেম, ভালবাসা ও স্নেহের বন্ধন যথেষ্ট মজবুত হবে। সুতরাং পরিবারগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সাক্ষরতা চর্চা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে এবং এ চর্চা অব্যাহত রেখে এসডিজি গোল ৪ এর মান সম্মত শিক্ষার বিষয়ে বর্ণিত আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরী করার বিষয়টিতে অবদান রাখার উদ্দেশ্যে কাজ করে যাওয়ার অভিপ্রায়ে ধারণাটি গ্রহণ করা হয়েছে।

সাক্ষরতা পড়া লেখার দক্ষতা অর্জনের চাইতেও বেশী কিছু। লেখা ও পড়ার দক্ষতা অর্জনের ফলস্বরুপ একজন ব্যক্তি পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর সামর্থ্য অর্জনে এগিয়ে যায়। প্রযুক্তিক সমাজে একজন ব্যক্তি প্রয়োজনীয় দক্ষতার সামগ্রিক যোগান নিশ্চিত করাও এখন সাক্ষরতারই কাজ বা সাক্ষরতাতার অন্তর্ভূক্ত। উদাহরণস্বরুপ সাক্ষরতা এখন আরও ব্যাপক অধিক্ষেত্রে  যেমন- মিডিয়া লিটারেসী, কম্পিউটার  লিটারেসী ও নাগরিক সাক্ষরতা প্রভৃতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকেও বুঝায়।

পরিবার হচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক। সামাজিক খাতের উন্নয়নমূলক কোন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে গেলে যদি পরিবারকে লক্ষ্যভূক্ত করা যায় তাহলে পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র এর সুফল পায়। প্রতিটি পরিবার পারিবারিক সাক্ষরতা চর্চার আওতায় এলে প্রতিটি পরিবার এক একটি সাক্ষরতা কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে। সাক্ষরতা যখন জীবনঘনিষ্ঠ হয় অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত হয় তখন এ চর্চা অব্যাহত থাকে, তখন পরিবারগুলো অব্যাহত শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে টেকসই সাক্ষরতা ও জীবন দক্ষতা নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে, পরিবারের শান্তি নিশ্চিত হবে, আয় বৃদ্ধি পাবে, ছোট-বড় কেউই বিপথগামী হবে না। এতে সমাজ থেকে মাদক, বাল্য বিবাহ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ইভটিজিং এর মত জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হ্রাস পাবে। সুতরাং পারিবারিক সাক্ষরতার ক্ষেত্রে বিশ্বে যে সেবা সমূহ রয়েছে তার আলোকে আমাদের পরিবেশ ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নির্ধারিত কিছু কাজ নিয়ে পারিবারিক সাক্ষরতার ধারণাটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

ধারণাটির আওতায় উল্লেখযোগ্য কাজ সমূহ যথাক্রমে- ১। পরিবারের একে অন্যের সাথে পড়ালেখায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা ২। পরিবারের স্বল্প শিক্ষিত বয়স্ক সদস্যদেরকে স্কুল/কলেজ পড়ুয়া শিশুর কাছে লেখাপড়া শিখনে উদ্বুদ্ধকরণ ৩। পরিবারের শিশুদেরকে লেখাপড়া, সামাজিকতা,  বিভিন্ন সচেতনতা যেমন- শিশু, বয়ঃসন্ধিকালিন স্বাস্থ্য, ধর্মীয়  জ্ঞান, পারিবারিক ও সাংসারিক কাজ, কৃষি কাজ, খেলা ধুলা, নীতি আদর্শ  ইত্যাদি শেখানোয় বয়োজৈষ্ঠ্যদের উদ্বুদ্ধকরণ ৪। ইভটিজিং বিষয়ে করণীয় ৫। পরিবারের সকল সদস্য (অধিকাংশ)  মিলে এক সাথে বিনোদন (গান বাজনা/খেলাধুলা) এ অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ ৬। শিশু সহ/অধিকাংশ সদস্য একত্রে ভ্রমণে উদ্বুদ্ধকরণ ৭। পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকলের অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধকরণ; ৮। পড়া, লেখা, মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স, খেলাধূলা, নাচ-গান, বাজার করা প্রভৃতির মধ্যে সাক্ষরতার লক্ষ্যে সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও উদ্বুদ্ধকরণ ৯। ধর্মীয় ও অন্যান্য পুস্তিকা পড়ার অভ্যাস সৃষ্টি  ১০। সংসারের আয় ব্যয় লিখন অভ্যাস তৈরী ও ১১। শিশুরা যখন পড়া লেখা করবে তখন পরিবারের বড়রা নিয়মিতভাবে কিছুটা সময় তাদের পাশে অবস্থান করবে।

বয়স্ক শিক্ষা প্রকল্পের পাঠদান চলাকালে প্রতিদিনই (সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যতিত) কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের সাথে পারিবারিক সাক্ষরতা বিষয়ে তাদেরকে পরামর্শ প্রদান করেন। তবে বয়স্ক শিক্ষা প্রকল্প সমাপ্ত হওয়ার পর এখন উপরের কাজ গুলো পরিবারের অভ্যন্তরে সংগঠিত করার জন্য সহায়িকাগণ নিয়মিতভাবে পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ প্রদান করেন এবং প্রতি মাসে একবার প্রত্যেক পরিবার থেকে একজন করে সদস্য (মেনটর) নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেন।

ধারণাটি বাস্তবায়নে প্রস্তুতিমূলক যে সকল কার্যক্রম করা হয়েছে-
 
১. কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণ ম্যানুয়েলের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে ২. লিফলেট, পোস্টার ও ফেস্টুন তৈরী ৩. ব্রুশিয়ার তৈরী ৪. মাঠ পর্যায়ে কর্মী প্রশিক্ষণ ৫. শিক্ষক-শিক্ষিকা প্রশিক্ষণ ৬. মাঠ পর্যায়ে জরিপ কার্যক্রম সম্পাদন ৭. মাঠ পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম ৮. জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ ৯. বিভিন্ন উপকরণ ও মনিটরিং টুলস্ তৈরী।

প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল:

৬০০ টি পরিবার, সমাজের তথা রাষ্ট্রের অব্যাহত শিক্ষা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠবে; লক্ষিত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সাক্ষরতার অনুশিলন ত্বরান্বিত ও টেকসই এবং জীবনঘনিষ্ট হবে; জীবনদক্ষতা বৃদ্ধি পাবে; সংশ্লিষ্ট এলাকায় মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে আরও ৩০০০ টি পরিবারের মধ্যে সাক্ষরতা অনুশীলন সম্প্রসারিত হবে; পরিবার গুলোর সদস্যদের মধ্যে আলাপচারিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের উন্নয়ন হবে, সমাজে ছোট বড়দের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পাবে এতে করে পরিবারের সকল সদস্যই অসামাজিক বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত থাকবে; কর্ম এলাকায় বাল্য বিবাহ, ইভটিজিং হ্রাস পাবে, মাদক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ হবে।

উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রকল্পের প্রভাব:

প্রকল্প বাস্তবায়নে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় যে প্রভাব পড়বে তা অতিব গুরুত্বপূর্ণ। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার যতগুলো কম্পোনেন্ট রয়েছে, যেমন বয়স্ব শিক্ষা, সব ক্ষেত্রেই  পারিবারিক সাক্ষরতা প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রকল্পটি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার অন্যান্য প্রকল্পের সহায়ক কর্মসূচী হিসাবে পরিচালিত হবে। এই প্রকল্পটি বিদ্যমান উপানুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রয়োগের মাধ্যমে লক্ষ্য দলের সাক্ষরতা চর্চা বহুগুণ বেড়ে যাবে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার সকল কম্পোনেন্টে শিক্ষার্থীর প্রান্তিকযোগ্যতা অর্জনের হার বৃদ্ধি পাবে ও সাক্ষরতা টেকসহিতা নিশ্চিত হবে।

ধারণাটি বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশংসিত ও আলোচিত। দেশের নিরক্ষরতা দূরীকরণে সামাজিক ও পারিবারিক শৃংখলা আনয়নে অবদান রাখতে সক্ষম। প্রাথমিকভাবে বয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচির সাথে সম্পূরক প্রকল্প হিসাবে এটির প্রয়োগ শুরু হলেও প্রকল্পটি আলাদা ভাবে এখনও চলমান। এই ধারণাটি ব্যাপক বাস্তবায়ন সম্ভব হলে “শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ” এই ব্রান্ডিং শ্লোগানটির সার্থক রূপায়ণ সম্ভব হবে।

প্রকল্প প্রণয়ন ও তত্ত্বাবধানে
সরোজ কুমার দাস
জেলা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো, মাগুরা।  



ঢাকা, সোমবার, নভেম্বর ২৫, ২০১৯ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি ৮৭৬ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন