সর্বশেষ
শনিবার ১৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ | ৩০ মে ২০২০

বাড়াবাড়ি হচ্ছে বলার এক মাস পরেই করোনায় মৃত্যু যাজকের

সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২০

j.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

আমেরিকায় লুইসিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নিউ অর্লিয়েন্স শহরের ধর্মযাজক ল্যানডন স্প্রাডলিন বলেছিলেন কোভিড-১৯ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। হাসিখুশি মেজাজের এই ধর্মযাজক খ্রিস্টান ধর্মীয় উৎসব মার্ডি গ্রাস উদযাপন উপলক্ষে গির্জায় গিয়েছিলেন। এর এক মাস পর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।

ল্যান্ডনের কন্যা জেসি বলেন, 'বাবা খুব হাসিখুশি মানুষ ছিলেন। গিটার বাজাতে ভালবাসতেন। যখন তার গিটার বাজানো উচিত ছিল না, তখনও তিনি গিটার বাজিয়েছেন।'

প্রায় এক মাসের কিছু আগে ৬৬ বছর বয়স্ক যাজক ল্যান্ডন স্প্রাডলিন, তার স্ত্রী জিনকে নিয়ে ভার্জিনিয়ায় তাদের বাসা থেকে দেড় হাজার কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে লুইসিয়ানায় যান ওই খ্রিস্টান পার্বনে ধর্মোপদেশ দিতে।

ধার্মিক খ্রিস্টানরা তাদের পবিত্র ইস্টার পালনের আগের চল্লিশ দিন উপবাস করেন, কৃচ্ছ্বসাধন করেন যেটাকে লেন্ট বলা হয়। লেন্ট শুরুর আগের দিন তারা খুব খাওয়া-দাওয়া করেন, নাচগান হৈহুল্লোড় করেন যেটাকে মার্ডি গ্রাস বলা হয়। এই মার্ডি গ্রাস খুব বড় করে উদযাপিত হয় নিউ অর্লিয়েন্সে।

ল্যান্ডন বিশ্বাস করতেন যে কয়েক লক্ষ মানুষ এই উৎসবে অংশ নেবেন, আনন্দ ও সঙ্গীতের মাধ্যমে তারা তাদের মনকে শুদ্ধ করতে পারবেন। তার মেয়ে জানান, 'সঙ্গীতের মাধ্যমে তিনি মানুষকে বলতে চেয়েছিলেন যিশু তাদের ভালবাসেন'।

ল্যান্ডনের দুই মেয়েও এসেছিলেন টেক্সাস অঙ্গরাজ্য থেকে ওই উৎসবে যোগ দিতে। জেসি বলেন, 'নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ারে ইংরেজি নববর্ষের আগের রাতে যেরকম উপচে পড়া মানুষের ভিড় হয়, এখানে মার্ডি গ্রাসে দেখবেন সেরকম জনসমুদ্র। লাখ লাখ মানুষ আনন্দ উৎসব করতে পথে নামে। বাবাও প্রচুর হৈচৈ করেছিলেন, উচ্চৈস্বরে গান গেয়েছিলেন।'

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ল্যান্ডন গির্জার বাইরেও মানুষের কাছে যিশুর বাণী পৌঁছে দেবার জন্য পথে পথে গান গাইতেন। আরও মানুষের কাছে খ্রিস্ট ধর্মের কথা তুলে ধরাটা ছিল তার একটা স্বপ্ন।

চার বছর বয়স থেকে তিনি নানাধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। ২০১৬ সালে তিনি ব্লুস্ সঙ্গীত ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। তবে তিনি মনে করতেন তরুণ বয়সে যখন তার বিশের কোঠায় বয়স, তখন মদ ও ড্রাগসের নেশা থেকে তাকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছিল ধর্ম। সেটা ছিল তার জীবনের একটা অন্ধকার অধ্যায়। তাই তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্ম মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোতে ফেরার পথ দেখাতে পারে, বলছিলেন তার মেয়ে জেসি।

মার্ডি গ্রাস উৎসবে তারা পুরো পরিবার মিলে নিউ অর্লিয়েন্সের ব্যস্ত জ্যাকসন্ স্কোয়ারে তাদের ব্যান্ডসঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। তারা তখন জানতেন না তারা কী ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। ল্যান্ডনের আরেক মেয়ে ২৬ বছরের নেওমি স্প্রাডলিন বলেন, 'আমরা করোনাভাইরাস নিয়ে কোন কথাই বলিনি। বাবার মৃত্যুর পর আমরা অনেক ভেবেছি। এই ভাইরাসের কোন কথাই তখন ওঠেনি'।

আমেরিকায় করোনাভাইরাসের প্রথম রোগী শনাক্ত হয়েছিল এক মাসেরও বেশি আগে। কিন্তু মার্ডি গ্রাস উৎসব পরিকল্পনা অনুযায়ীই হয়েছিল। ধারণা করা হয় এই উৎসব থেকেই যাজক ল্যান্ডন স্প্রাডলিন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

ওই উৎসবের পর করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা সেখানে ব্যাপকভাবে বাড়ার জন্য শহরের কর্মকর্তারা সরকারের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছে।

যাজক ল্যান্ডন স্প্রাডলিন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু তার শরীরে কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফল এসেছিল নেগেটিভ। অসুস্থ হবার পরেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা তার মন্তব্য ছিল: ভাইরাস নিয়ে লোকে উন্মাদ আচরণ করছে।

১৩ই মার্চ তিনি ফেসবুকে সোয়াইন ফ্লু-র সঙ্গে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর তুলনা টানা বিভ্রান্তিমূলক বলে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। ওই পোস্টে এমন কথা বলা হয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে এসব বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। ওই একই দিনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও এক সংবাদ সম্মেলনে এমন কথাই বলেছিলেন।

ল্যান্ডনের ছেলে আইজ্যাক বলেন তিনি ও তার বাবা বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা করেছিলেন এবং তারা একমত হয়েছিলেন যে এই উন্মাদনা অযৌক্তিক এবং এ বছরে যেহেতু প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে তাই হয়ত এই ভাইরাস নিয়ে ভীতি ছড়ানোর এবং সেটা রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর একটা চেষ্টা চলছে।

তিনি জানান, 'তবে আমার বাবা কিন্তু এটাকে ভুয়া তথ্য বলে মনে করেননি, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন এই ভাইরাসের খবর সঠিক, কিন্তু মিডিয়া যেভাবে এটা নিয়ে যেভাবে ভয় ছড়াচ্ছে তাতে হতাশ হয়ে তিনি ওই পোস্ট দিয়েছিলেন।'

মার্চ মাসের মাঝামাঝি নাগাদ তার শরীরের অবস্থা হঠাৎ করে খুব খারাপের দিকে যায়। তারা গাড়িতে দ্রুত নিউ অর্লিয়েন্স থেকে ভার্জিনিয়া ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। আইজ্যাক জানান, 'পথে নর্থ ক্যারোলিনাতে তিনি জ্ঞান হারানোর পাঁচ মিনিট আগে তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম, শ্বাস নিতে তার কষ্ট হচ্ছে। আমি বলেছিলাম, যেভাবেই হোক তোমাকে বাসায় পৌঁছতে হবে। কিন্তু বাবা আর ফিরতে পারেননি।'

যাজক ল্যান্ডন স্প্রাডলিনকে নর্থ ক্যারোলাইনার হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। তার দুই ফুসফুসেই নিউমোনিয়া ধরা পড়ে এবং তার করোনাভাইরাসের টেস্ট পজিটিভ আসে। আট দিন নিবিড় পরিচর্যায় থাকার পর তিনি মারা যান।

তার স্ত্রী জিনকে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হয়েছিল। সেই কোয়ারেন্টাইনে শেষ হবার পর তার স্বামীর শেষকৃত্য হয়েছে খুবই সাদামাটাভাবে। তার মেয়ে জেসি বলছেন এই ভাইরাস নিয়ে এত মিশ্র তথ্য ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং অনেক মানুষ যেহেতু মিডিয়ার ওপরেও আস্থা রাখতে পারছে না, তাই এই ভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। এই ভাইরাস নিয়ে রাজনৈতিক খেলাও চলছে। এক দল আরেক দলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। আমরা সবাই দলমত নির্বিশেষে যে একই ঈশ্বরের সন্তান সেটা আমরা ভুলে গেছি।

জেসির মতে আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে যেহেতু রাজনৈতিক মেরুকরণ দীর্ঘদিনের একটা ব্যাপার, 'তাই কোন তথ্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত আর কোনটা নয়, সেটা বোঝা আমাদের মত সাধারণ মানুষদের জন্য কঠিন হচ্ছে।'

আমেরিকায় করোনাভাইরাস নিয়ে রাজনৈতিক মত পরিস্কারভাবে বিভক্ত। রিপাবলিকানরা মনে করে এই মহামারি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে। আর ডেমোক্রাটরা মনে করে এটাকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হচ্ছে না।

জেসি বলছেন, 'মানুষ যেখানে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে সেখানে রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। সত্যিকার সমাধান খুঁজতে চাইলে আমাদের একটা জাতি হিসাবে এই সঙ্কট মোকাবেলায় কাজ করতে হবে।' সূত্র: বিবিসি


ঢাকা, সোমবার, এপ্রিল ৬, ২০২০ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ৪৪৮ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন