সর্বশেষ
সোমবার ৯ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ব্যবস্থা না নিলে খাবার পানির সঙ্কট ২০৫০ সালে

রবিবার, মার্চ ২২, ২০১৫

1341408804_1427029128.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর পানি ব্যবস্থাপনার চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। শিল্পকারখানাসহ গৃহস্থালী কাজের জন্য ব্যবহৃত পানির যথেষ্ট সঙ্কট রয়েছে যা শুষ্ক মৌসুমে আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। আর এর জন্য জলাধার, ভূগর্ভস্থ পানি এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনায় সরকারি সংস্থাগুলো দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে না বলে অভিযোগ পরিবেশবাদী সংগঠন পবা’র।

সংগঠনের নেতারা বলছেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করে বরং পানি উত্তোলন ও ব্যবহারেই অধিক মনোযোগ দিচ্ছে। তাই পানি সম্পদ আজ হুমকির সম্মুখীন। এমতাবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ এ প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও মনে করছেন এই পরিবেশবাদিরা।

প্রকৃতির বিবর্তিত রূপ-বৈচিত্রে যখন আমরা সেই ভয়াবহ শুষ্ক মৌসুমে অবগাহন করতে যাচ্ছি তখন ২২ মার্চ বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘পানি এবং স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন’।

বিশ্ব পানি দিবসের সূচনা ১৯৯২ সালে। ওই বছর ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনে রিওতে জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক অধিবেশনে একটি বিশেষ দিনকে স্বাদু পানি দিবস হিসেবে পালন করার কথা সুপারিশ করা হয়। পরের বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মতিক্রমে ১৯৯৩ সালের ২২ মার্চকে প্রথম আন্তর্জাতিক পানি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর স্বাদু পানির উপর এক একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

এছাড়াও এ সময়ের মধ্যে ‘পানি ও জীবন’ শিরোনামে একটি পানি দশক (১৯৯৫-২০০৫) পালিত হয়েছে এবং ২০১৩ সাল ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার অফ ওয়াটার কোঅপারেশন’ বা পানি নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বছর হিসেবে পালিত হয়েছে বিশ্ব জুড়ে।বিশ্ব পানি দিবসের আগের দিন বৃহস্পতিবার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) কার্যালয়ে দিবসটি উপলক্ষে ‘পানি সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় পরিবেশবাদিরা এসব অভিমত ব্যক্ত করেন।

নীতি বিশ্লেষক ও পবা সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন, ওয়াসা পানি ব্যবহার ও দূষণ করছে। কিন্তু পানি সম্পদ সংরক্ষণ বা পানি রিচার্জ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণে সংস্থাগুলো দায়িত্বশীল নয়। অপরদিকে রাজউকের কারণে এ নগরে পানি রিচার্জের অন্যতম অধার উম্মুক্ত স্থান ও জলাধারগুলো ধ্বংস হচ্ছে। যা পানি সঙ্কটকে ত্বরান্বিত করবে। পানি সম্পদ সংরক্ষণের সাথে ৪০টির বেশি সংস্থা এবং প্রায় ২০টি বেশি আইন রয়েছে। এরপরও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর পানি সম্পদ সংরক্ষণে এমন উদাসীনতা বাংলাদেশ সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৮ক এর পরিপন্থি।’

ঢাকা সিটি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের প্রফেসর ড. মশিউর রহমান তার মূল প্রবন্ধে শুধু ঢাকা নয়, দেশের সার্বিক পানিসম্পদ ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ এবং খুলনা বিভাগে কৃষিকাজের জন্য গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে অতিমাত্রায় পানি অহরণ করা হচ্ছে। সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়ার কারণে শুকনো মৌসুমে নদীর প্রবাহ দ্রুত শুকিয়ে যায়। পুকুর, জলাশয় এবং হস্তচালিত নলকূপ থেকে সাধারণ মানুষ তার প্রয়োজনিয় পানি তখন আর সংগ্রহ করতে পারে না। সেখানকার মানুষের জীবন যাপনে সৃষ্ট এই সঙ্কট নিরসনকল্পে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা না হলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়টি অনিশ্চিতই থেকে যাবে।’

এ থেকে উত্তোরণের জন্য নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগকেই গুরুত্ব দিয়েছেন এই ভূগোল ও পরিবেশবিদ।

পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন ও এর স্তর প্রসঙ্গে তথ্য দিয়ে বলেন, ‘২০১০ সালে বিশ্বে যে ১৫টি দেশ সবচেয়ে বেশি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে তাদের মধ্যে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, ইরানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।’

বিএডিসির তথ্যানুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অগভীর নলকূপের সাহায্যে সেচের পরিমাণ ১৪,৪৪১ বর্গ কিলোমিটার থেকে কমে ১৩,৬৯১ বর্গ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। মার্চ এবং এপ্রিল মাসে ১৬ লাখ অগভীর নলকূপের মধ্যে ৪ লাখ অকেজো হয়ে পড়ে।দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বিগত ৩০ বছর (১৯৮১-২০১০) ধরে বার্ষিক গড় ১.৪ শতাংশ হারে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নেমেছে রাজশাহীতে।

প্রতি ইউনিট এলাকায় নলকূপের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে প্রতিটি নলকূপের আওতাধীন এলাকা ১৯৮৪-৮৫ সালের তুলনায় ২০১০-১১ সালে এসে তা কমে ১৪.৫ থেকে ২.৮ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। গড়ে নদীর পানির স্তর ১৯৮১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ২০ মিটার থেকে কমে ১৯ মিটারে দাঁড়িয়েছে। এই হ্রাস প্রবণতা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার সাথে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কযুক্ত। ১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমের মোট জলাভূমির প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ হারিয়ে গেছে। এসব সূচক থেকে ধারণা করা যায় যে দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার টেকসই বা দীর্ঘস্থায়ী নয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সার্বক্ষণিক সদস্য মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আদি বুড়িগঙ্গা মরা ছিল সেই বুড়িগঙ্গা এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পানিসম্পদ রক্ষায় আমরা অনেক পদক্ষেপ নিয়েছি কিন্তু লোকবলের অভাবে এগুতে পরিনি। এছাড়াও এ সংক্রান্ত ৫৪টি আইন আছে কিন্তু কোন সংস্থা, কোন আইন প্রয়োগের দায়িত্বে আছে তা আমাদের সঠিক জানা নেই। এমন কি আইনের বিধিও আমাদের জানা নেই। ২০১৩ সালে যে পানি আইন হয়েছে এবং যে সংস্থা বা যারা এর দায়িত্বে রয়েছে আমার ধারণা তারাও এ আইনের ধারা ও শাস্তির বিধান সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত নয়। দায়িত্বরত সবাই অচেতন তাই দেশের মানুষকে সচেতন হতে হবে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের কাছে এ বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।’

অবিলম্বে পানি সম্পদের উৎসগুলো সংরক্ষণ ও পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পরিবেশবাদিদের এ আলোচনা সভা থেকে আসা সুপারিশগুলো হলো: নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওড়, লেক, দিঘী-পুকুর, নিম্নাঞ্চল, জলাভূমি দখল, ভরাট ও দূষণ বন্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রাপ্য ন্যায্য সম্পদ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আমাদের আরো অধিকতর টেকসই জীবনযাত্রার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা; ভূগর্ভস্থ পানির রিচার্জ এবং ভূপৃষ্ঠস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির প্যাটার্ন ও ব্যাপ্তি অনুসরণের জন্য উপযুক্ত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা; বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে পানির স্তর রিচার্জের লক্ষ্যে একটি জাতীয় কৌশল গ্রহণ করা।

সেই সঙ্গে পানির স্তর রিচার্জ, নিষ্কাশন, মাটির আদ্রতা পরিবর্তন ও পানি সঞ্চয়ের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পানি বাজেট প্রস্তুত করা; টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যেমন আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ও আর ডি এ মিলিতভাবে উদ্ভাবিত সেচের পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতি অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইয়িংয়ের উপর সচেতনতা এবং অ্যাডভোকেসি প্রচারণা জোরদার করা; বোরো ধানের পরিবর্তে উচ্চ মূল্যের ফসল উৎপাদনে জোর দেয়া উচিৎ; কম পানি প্রয়োজন ও ব্যয় সাশ্রয়ী ফসল আলু, ডাল, গম চাষে অগ্রাধিকার দেয়া; বুড়িগঙ্গা নদীকে গতিশীল রাখার জন্য এর সাথে ধলেশ্বরী-কালিগঙ্গা নদীর সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুকনো ঋতুতে মজা নদীর খাতে ফসল চাষের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; পরিকল্পিতভাবে শাখা নদীগুলোর খাত খননের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে; ছোট বা বড় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এমন কার্যক্রম গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে; প্লাবন ভূমিতে গভীর নল স্থাপন করে ভূগর্ভস্থ পানির আধারস্তরে বৃষ্টি ও বর্ষার পানি সঞ্চালনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকা মহানগরীসহ সকল শহরে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে উন্মুক্ত মাটির আঙ্গিনা রাখার বাধ্যতামূলক ভবন নির্মাণ বিধি সন্নিবেশিত করা প্রয়োজন, যেন বৃষ্টির পানি মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে; নগরের ভবন নির্মাণের বিধিমালায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং তা আবাসিক প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায় এমন অবকাঠামো ভবনের নক্সায় বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভূক্ত রাখতে ও তা বাস্তবায়ন করতে হবে;

মধুপুর চত্বর অঞ্চলের নদী যেমন বংশী, বানার, কাওরাইদ, সুতি, খিরু, বালু, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ প্রভৃতির অংশ বিশেষে পরিকল্পিতভাবে রাবার ড্যাম স্থাপনের মাধ্যমে স্থানীয় বৃষ্টিপাতের পানি সংরক্ষণ এবং সেই পানি ভূগর্ভস্থ পানির আধারস্তরে (ডুপিটিলা) প্রবিষ্ট করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

ঢাকা মহানগর এবং অন্যান্য শহরের সরকারি অফিস আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ খেলার মাঠ, উদ্যান ও বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে নল বা কূপ স্থাপন করে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ ডুপিটিলা স্তরে সঞ্চালনের ব্যবস্থা অতিজরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ঢাকা, রবিবার, মার্চ ২২, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এ এম এই লেখাটি ২৩২০ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন