সর্বশেষ
রবিবার ৬ই কার্তিক ১৪২৫ | ২১ অক্টোবর ২০১৮

জিডি কেন এবং কখন জিডি করবেন?

শুক্রবার, মে ২৯, ২০১৫

550857831_1432902345.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :

ইংরেজি ‘জেনারেল ডায়েরি (General Diary)’ শব্দ দু’টির সংক্ষিপ্ত রূপ হলো জিডি (GD)। এটি আসলে থানায় রক্ষিত অপরাধ ও অন্যান্য সংবাদ বিষয়ক একটি রেজিস্টার। সহজ সরল ভাষায় বলতে গেলে অপরাধ ও অন্যান্য সংবাদ বিষয়ক থানায় রক্ষিত ডায়েরিকে জিডি বলে। আর ২০০ পৃষ্ঠার একটি খাতা বা বইয়ে একটি থানার ২৪ ঘণ্টার যাবতীয় সবকিছু অন্তর্ভূক্ত থাকে। প্রতিদিন সকাল ৮টায় শুরু হয়ে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার সংবাদ রেকর্ড করে পরের দিন সকাল ৮টায় তা বন্ধ করা হয়।

জিডির গুরুত্ব:
জিডির আইনগত মূল্য অনেক। কেবলমাত্র একটি জিডির ভিত্তিতেই একটি মামলা শুরু হতে পারে। কোনো অপরাধের আশঙ্কা থেকে একটি জিডি করার পর ওই অপরাধটি সংঘটিত হলে আদালতে ওই জিডি সাক্ষ্য হিসেবেও গৃহীত হয়ে থাকে।

কেন এবং কখন জিডি করবেন?
যদি আপনার গুরুত্বপূর্ন কোনো জিনিস যেমন কোনো দলিল, পাসপোর্ট চেক বই, ডেবিট কার্ড/ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল বা অন্য কোনো কাগজপত্র যা বেহাত হওয়ার কারণে আপনার ক্ষতি হতে পারে এবং যা পুনঃউত্তোলন করা দরকার; কোনো ধরনের হুমকি পেলে; কোনো ব্যক্তি হারিয়ে গেলে (শিশু/বয়স্ক/গৃহকর্মী), নিখোঁজ কোনো ব্যক্তি অনেক চেষ্টার পরও যাকে পাওয়া যাচ্ছে না; অহেতুক কারো উপস্থিতি; কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিপদাশঙ্কা; ইভটিজিং ইত্যাদি বিষয়ে আপনি থানায় জিডি করতে পারেন।

জিডি সাধারণত তিন শ্রেণীর হয়ে থাকে:  যেমন-
১। ধর্তব্য অপরাধের (আমলযোগ্য) জিডি, যা থানায় অন্তর্ভূক্ত হওয়ার সাথে সাথেই তদন্ত করতে হবে।

২। অধর্তব্য অপরাধের (অআমলযোগ্য) জিডি, যা তদন্ত করার জন্য ফৌজদারী কার্যবিধির ১৫৫(২) ধারার বিধান মোতাবেক আদালতের অনুমতি নিতে হয়।

৩। খাদ্য শষ্য, বাজারমূল্য, বন্যা, দূর্যোগ ইত্যাদি বিষয়ে শুধু ডায়েরিতে অন্তর্ভূক্ত করলেই চলে, পিআরবি’র ৩৭৭(ই) প্রবিধান অনুসারে এর তদন্ত করতে হয় না।

জিডি যেভাবে করবেন-
আপনি থানায় গিয়ে জিডি লিখতে পারেন অথবা আপনি আপনার বক্তব্য হাতে লিখে বা কম্পিউটার কম্পোজ করে নিয়ে থানায় যেতে পারেন। এজন্য আপনি একটি সাদা কাগজের বাম পাশে দুই ইঞ্চি মার্জিন রেখে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাবরে আপনার বক্তব্য হাতে বা কম্পিউটারে কম্পোজ করে এবং এর আরো দু’টি ফটোকপি অর্থাৎ আপনার লিখিত বক্তব্যের মোট তিনটি কপি নিয়ে থানায় যাবেন। জিডিতে অবশ্যই আপনার সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরটি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।

থানার কর্তব্যরত কর্মকর্তার (ডিউটি অফিসার) কাছে গিয়ে আপনার আগমনের উদ্দেশ্য তাকে জানান এবং সঙ্গে নিয়ে আসা দরখাস্তের তিনটি অনুলিপিই তাকে দিন। তিনি আপনার লেখা দরখাস্তের বাম পাশে রাখা মার্জিনে থানায় রাখা ডায়েরিতে অন্তর্ভূক্ত বিষয়াবলীর ক্রমানুযায়ী একটি নম্বর লিখবেন এবং তাতে স্বাক্ষর ও সীল মোহরাঙ্কিত করে একটি কপি আপনাকে দিবেন। বাকী দু’টি কপির একটি থানায় থাকবে এবং আরেকটি তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া হবে তদন্ত করার জন্য। এজন্য থানায় আপনাকে কোনো টাকা পয়সা খরচ করতে হবে না। ব্যাস হয়ে গেল আপনার জিডি। আপনাকে দেয়া জিডির নম্বরযুক্ত কাগজটি বাসায় এনে যত্ন করে কোনো একটি ফাইলে রাখুন। প্রয়োজনের সময় যাতে আপনি খুঁজে পান। এ অবস্থায় আপনার আর করনীয় কিছু নেই। এরপর যা করার তা পুলিশই করবে।

এবার পুলিশ জিডিতে আপনার বর্ণিত বিষয়ে তদন্ত শুরু করবে। অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা পাওয়া গেলে পুলিশ তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যেমন যদি আপনি কারো হুমকির পেয়ে জিডি করে থাকেন সেক্ষেত্রে সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রসিকিউশন রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবে আদালতে। যার উপর ভিত্তি করে একটি নন এফআইআর মামলার কার্যক্রম শুরু হবে। আর যদি কোনো হারানো দ্রব্যের বা নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে জিডি করে থাকেন সেক্ষেত্রে তা বা তাকে খুঁজে পেলে পুলিশ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।

কখনো কখনো শোনা যায় যে, থানা জিডি নেয়নি। সেক্ষেত্রে আপনি আদালতের মাধ্যমেও জিডি করতে পারেন। এজন্য আপনি আপনার আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে এগুবেন।

জিডি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি আপনাকে আইনি সুরক্ষা যেমন দিতে পারে তেমনি যথাসময়ে যথাযথ জিডি না করার কারণে আইনি প্রক্রিয়ায় আপনি অনেক পিছিয়ে যেতে পারেন। তাই জিডি করার ক্ষেত্রে কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেবেন না। প্রকৃত সত্য তুলে ধরুন। কাউকে ফাঁসানোর অসৎ উদ্দেশ্যে জিডি করতে যাবেন না। এটি আপনার জন্য বুমেরাং হতে পারে। জিডিতে আপনার কোন বক্তব্য আসা উচিৎ এবং কোনটি আসা উচিৎ নয় সে ব্যাপারে আপনি দ্বিধান্বিত হলে আইনজীবীর সহায়তা নিন। এমনকি আপনি থানা পুলিশের সহায়তাও নিতে পারেন।

জিডি সম্পর্কে ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্টের ৫নং আইনের ৪৪ ধারায়, ফৌজদারী কার্যবিধির ১৫৪ ও ১৫৫ ধারায় এবং পিআরবি’র ৩৭৭ প্রবিধানে বিস্তারিত বলা হয়েছে।

১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্টের ৫নং আইনের ৪৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিটি থানার (পুলিশ স্টেশন) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অবশ্যই একটি ডায়েরি সংরক্ষণ করিবেন, যাতে সময়ে সময়ে সরকারের নির্দেশনা, অভিযোগ গ্রহণ, অভিযোগকারীদের নাম, গ্রেপ্তারকৃতদের নাম, তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, তাদের নিকট থেকে উদ্ধারকৃ অস্ত্র/ সম্পত্তির বিবরণ এবং সাক্ষিদের নাম ও ঠিকানা থাকবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওই ডায়েরি পরিদর্শন করতে পারবেন।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৫৪ ও ১৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট কেউ কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তা আমলযোগ্য বা আমলঅযোগ্য যাই হউক না কেন তিনি ওইসব সংবাদ থানায় থাকা সরকার নির্ধারিত রেজিস্টিারে লিখে রাখবেন বা তার অধীনস্থ কাউকে লিখিতে নির্দেশ দিবেন। উক্ত লিখিত সংবাদটি সংবাদদাতাকে পড়ে শুনাতে হবে এবং সংবাদদাতা তার প্রদত্ত ও লিখিত সংবাদের নীচে স্বাক্ষর করবেন।

পিআরবি (Police Regulations, Bengal.) ৩৭৭ প্রবিধানে বলা হয়েছে, প্রত্যেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থানায় রক্ষিত ৬৫নং বিপি ফরমে কার্বন পেপার যুক্ত করে দিন ও সময় উল্লেখপূর্বক তার গোচরে আনা প্রত্যেকটি ঘটনা বা সংবাদের বিবরণ তা আমলযোগ্য বা অআমলযোগ্য যাই হউকনা কেন তা সঠিক ও যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ করবেন। ওই ডায়েরিতে সংবাদদাতা/অভিযোগকারীদের নাম-ঠিকানা, গ্রেপ্তারকৃতদের নাম-ঠিকানা, তাদের নিকট থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র বা বস্তু সামগ্রী, সাক্ষিদের নাম-ঠিকানা অন্তর্ভূক্ত করিতে হইবে। শুধু তাই নয় কখন কাকে কোথা থেকে গ্রেপ্তার করা হলো, কখন তাকে থানা হাজতে নিয়ে আসা হলো, কখন তাকে আদালতে পাঠানো হলো, এজন্য কত খরচ হলো এসবও ওই ডায়েরিতে লিখিতে হইবে।

এছাড়াও ফসল, রাস্তা, নদী, ইত্যাদি সেতু, রেলওয়ের বেড়া, সরকারি ভবন, ফেরি, বাঁধ, গাছ, টেলিগ্রাফ লাইন, বৃহৎ দাবানল, প্লাবন, ঝড়, রেল বা অন্যান্য গুরুতর দুর্ঘটনার সংবাদ; কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব, ব্যাপকতা, কলেরা, বসন্ত, জ্বর বা অন্যান্য মহামারী রোগের তথ্য, ব্যাপক হারে গবাদি পশুর রোগ; গলিতে বা কোনো স্থানে বা স্টেশনে ব্যাপক জনসমাগম; বন্দীদের আগমনের, প্রস্থানের, কোনো হত্যাকাণ্ড সংঘটন, ব্যাপকভাবে কোনো লেনদেন এবং থানার কর্তব্যরতদের দায়িত্ব বণ্টন; কর্মকর্তা, থানার প্রহরী পরিবর্তনের মধ্যে দায়িত্ব বিতরণ; থানায় নতুন কোনো পুলিশ সদস্য বা অফিসারের আগমন বা বিদায়, কর্তব্যরতদের কারো কোনো ধরনের অসদাচরণ, প্যারেড, সজ্জা পরিদর্শন, ব্যারাক পরিদর্শন, ছুটি থেকে ফেরা, কর্মকর্তাদের নতুন আগমন; সৈন্যবাহিনীর প্যারেড তাদের দ্বারা সজ্জিত বা তথ্য সন্দেহজনক অক্ষর, বিদেশিদের বা উপজাতিদের বিচরণ, অস্বাভাবিক জনসংখ্যার উপস্থিতি ইত্যাদি তথ্যাবলীও অন্তর্ভূক্ত হইবে।


ঢাকা, শুক্রবার, মে ২৯, ২০১৫ (বিডিলাইভ২৪) // এস আর এই লেখাটি ১৫১৫ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন