সর্বশেষ
শনিবার ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৭ নভেম্বর ২০১৮

'সিলেটীরা লাঙ্গল টু লন্ডন' মন্তব্য প্রসঙ্গে

রবিবার, জানুয়ারী ৩, ২০১৬

387510529_1451827297.png
বিডিলাইভ ডেস্ক :
'সিলেটীরা লাঙ্গল টু লন্ডন' মন্তব্য প্রসঙ্গে বাংলাদেশের স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী আব্দুল গাফফার চৌধুরী ইংল্যান্ডের চ্যানেল এস বাংলা টিভিতে এক সাক্ষাৎকারে সিলেটবাসীকে নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ অমূলক, অযৌক্তিক এবং বাস্তবতা বর্জিত। তার উক্তি প্রসঙ্গে আমার এ লেখাটি।

বৃহত্তর সিলেট জেলায় অফুরন্ত সক্রিয়তা প্রবাহমান। ধন সম্পদ ও প্রাচুর্য যেমন এ অঞ্চলকে মহিমান্বিত করেছে তেমনি নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য একে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। পরিবেশ এ অঞ্চলের মানুষকে করে তুলেছে সরল সহজ, মমত্ববান ও মেধাবী। যুগে যুগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সিলেটের মেধাবী সন্তানরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে উজ্জ্বল অবদানের স্বাক্ষর রাখার পাশাপাশি তারা দেশ ও জাতির জন্য অভূতপূর্ব অবদান রেখেছেন।

শুধু সিলেট নয়, সমগ্র বাংলাদেশর মানুষের জন্য বয়ে এনেছেন বিপুল মর্যাদা এবং গৌরব। আজ অত্যন্ত দুঃখের সাথে লিখতে হচ্ছে গাফফার চৌধুরী জেনেশুনে সিলেটের মানুষকে অবহেলা ও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে দেশে বিদেশে সিলেটবাসীর কিছু ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরলাম।

গাফফার চৌধুরী একজন স্বনামধন্য সাংবাদিক। তাই প্রথমেই সাংবাদিকতায় সিলেটের আবদানের কথা তুলে ধরলাম। পাকিস্তানের জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা DAWN এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন সিলেটের অহংকার জনাব আলতাফ হুসাইন। পাকিস্তানের জনক মো. আলী জিন্নাহ সিলেটের মেধাবী তরুণ সাংবাদিক আলতাফ হুসাইনকে চিনতে ভুল করেননি। আলতাফ হুসাইন তার বস্তুনিষ্ট লেখার মাধ্যমে DAWN পত্রিকাকে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা হিসাবে দাঁড় করান।

১৫ বছর তিনি পত্রিকার প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তখনকার সময় DAWN পত্রিকাকে বলা হতো দক্ষিণ এশিয়ার দর্পণ। বাংলাদেশের ক্রীড়া সাংবাদিকতার রোল মডেল মনে করা হয় জনপ্রিয় দৈনিক মানব জমিন পত্রিকার সম্পাদক জনাব মতিউর রাহমান চৌধুরীকে। জনাব মতিউর রাহমান চৌধুরী ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক যিনি ফুটবল জাদুকর ম্যারাডোনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক ইংরেজি পত্রিকা THE DAILY STAR এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম সিলেটের অধিবাসী। তরুণ প্রজন্মের সাহসী সাংবাদিক পীর হাবিবুর রাহমান এ প্রজন্মের অহংকার। তাছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকের সাহসী সাংবাদিক ছিলেন জনাব হাসান সাহারিয়ার ছিলেন বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি। জনাব গাফফার সাহেব, ওরা সবাই কি আপনার দৃষ্টিতে মূর্খ? আপনার বিবেকের কাছে আমার প্রশ্ন।

এবার আসা যাক প্রশাসনে সিলেটীদের আবদান প্রসঙ্গে। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে যে কয়েকজন সিএসপি অফিসার উঁচু প্রশাসনে কাজ করেছেন তাদের প্রতি তিন জনে একজন ছিলেন সিলেটের। যার নাম বলতেই হয় তিনি হচ্ছেন জনাব হেল্লাল উদ্দিন আহমদ।

বৃহত্তর সিলেটের সন্তানরা ঐতিহাসিকভাবে সবসময় রাজনৈতিক সচেতন। ১৯৪৭ সালে আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গণভোটের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয় সিলেট অঞ্চল। সিলেটের কৃতি সন্তান জনাব হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর মাতা বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের প্রথম নির্বাচিত মহিলা সদস্য।

আজকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে মহিলাদের উত্থান তাদের রোল মডেল হচ্ছেন সিলেটের এই মহিয়ষী নারী। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার গৌরব অর্জন করেন। কুটনৈতিক পেশায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উনি ছিলেন একজন রোল মডেল যিনি আটটি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কথা বলতে পারতেন।

বাংলাদেশের প্রথম সফল পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন সিলেটের। স্বাধীনতার পর সিংহভাগ সময় অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন সিলেটের তিন কৃতি সন্তান এম. সাইফুর রহমান, এস,এম কিবরিয়া, আবুল মাল আব্দুল মুহিত।

ব্রিটিশ রাজনীতিতেও কম যাননি সিলেটের লোকেরা। ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জনাব আনোয়ার চৌধুরী, টাওয়ার অব হেমলেটের প্রথম নির্বাচিত মেয়র লুৎফুর রাহমান এবং লেবার পার্টির হাউস অফ লর্ড রুশনারা আলী এমপি যার মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম। ব্রিটেনের বাঙ্গালী কমিউনিটির ইতিহাসে ব্যারোনেস মানযিলা পলা উদ্দিন একটি নাম, একটি ইতিহাস।

প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে ১৯৯৮ সালে তিনি বিলেতের পার্লামেন্টের হাউস অব লর্ডসে সদস্য হবার গৌরব অর্জন করেন। বিশ্বের শীর্ষ দশ জন প্রভাব বিস্তারকারী তরুণদের একজন সাবিরুল ইসলাম যে ৩য় প্রজন্মের একজন বাংলাদেশি ব্রিটিশ। এরকম রয়েছে জানা অজানা আরো অনেক নাম যাদের পূর্বপুরুষ সিলেটের।

আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে রয়েছে সিলেটীদের গৌরবজ্বল ইতিহাস। একাত্তরে স্বাধীনতা সংগ্রামের কমান্ডার ইন চীফ এম এ জি ওসমানী এবং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন সি আর দত্ত ছিলেন সিলেটের সন্তান। বিদেশে থাকার কারণে স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব প্রবাসী অংশগ্রহণ করতে পারেননি তারা সবাই আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে বাংলাদেশে গণহত্যা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সিলেটী প্রবাসীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিজের প্রয়োজনে না দিয়ে দান করেছেন প্রিয় মাতৃভূমিকে। গাফফার সাহেব কি করে ভুলে গেলেন তাদের অবদানের কথা।

শিল্প ও সাহিত্যে গৌরবজ্বল সিলেটীদের রয়েছে আবদান। সৈয়দ মুজতবা আলি, আব্দুল মালিক চৌধুরী, আরজুমন্দ আলী, কবি দেলোয়ার, দেওয়ান মহাম্মদ আজরফ, বাংলার শেলি খ্যাত সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ সিলেটের সন্তান। এবার আসি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ তরুণ উদ্যোক্তা, লেখক ও বক্তা সাবিরুল ইসলামের কীর্থি গাঁথায়।

২০১০ সালে পৃথিবীর ২৫ তরুণ শিল্প-উদ্যোক্তার একজন নির্বাচিত হন সাবিরুল। ইতোমধ্যে তিনি তিনটি বই লিখেছেন। তার লেখা তরুণদের ব্যবসা শেখার গেম 'টিন-ট্রাপেনার' যুক্তরাজ্যের ৬৫০টি স্কুলে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের খেলতে দেওয়া হয়। এটি পাওয়া যায় ১৪টি দেশে।

প্রবাসে নিজেরা স্বপ্ন দেখি, অন্যদের মধ্যে স্বপ্নের গল্প ছড়িয়ে দেই, আর চেষ্টা চালিয়ে যাই যেন আজকের বাংলাদেশ গতকালের চেয়ে একটু বেশি সুখী এবং সুন্দর হয়। আমরা কখনও আঞ্চলিকতায় বিশ্বাস করিনা। ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প, ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য এবং অভিন্ন ঐতিহাসিক স্মৃতির বন্ধনে আমরা আবদ্ধ।

প্রবাস জীবনে কোন ব্যক্তি বা অঞ্চলকে কটূক্তি বা সমালোচনা করা কোনো দেশপ্রেমিকের কাছে কাম্য হতে পারেনা। গাফফার চৌধুরী সাহেব, এবার আপনার বিবেকের কাছে আমাদের প্রশ্ন, আপনি যে কটূক্তি করেছেন তা কি সঠিক ছিল?

 এম এ সবুর, মন্ট্রিয়াল, কানাডা

ঢাকা, রবিবার, জানুয়ারী ৩, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // আর এস এই লেখাটি ১৩২৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন