সর্বশেষ
বুধবার ১১ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আবেগের চর্চা নয়, চর্চা হোক মেধা আর যুক্তির

বুধবার, জুলাই ২৭, ২০১৬

458636705_1469633767.jpg
বিডিলাইভ রিপোর্ট :
কোনো আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে লিখতে হলে সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকাটাই আবশ্যকীয়। শুধু তাই নয় সেই বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে পড়তে হবে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, দেশ সমাজ বহিঃর্বিশ্বে কি হচ্ছে তা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা নিতে হবে। একটি নির্দিষ্ট গন্ডি থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে বৃহৎপরিসরে, যেখানে মানুষের চিন্তা-ভাবনা সৃজনশীলতা বাস্তবসম্মত ও কল্যাণকর, একেবারেই হুজুগি নয় আবেগিও নয়, বাস্তবতার নিরিখে।

কিন্তু আমাদের কি সেই সময় আছে? এখন তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুজুগি খবর-সবরে সয়লাব! বুঝে না বুঝে ভিত্তিহীন কথা-বার্তা বেসামাল চলছে। সবাই ইনডিভিজুয়ালি ফেইসবুক সাংবাদিক, বিশ্লেষক-গবেষক। ঐদিন ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজনের বেকারি রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার ঘটনায় পরেরদিন সকালে এক সাংবাদিক নিজেকে সংবাদ বিশ্লেষক দাবি করে এত বড় একটি স্পর্শকাতর প্রশ্নাতীত ভয়াবহ বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করছেন। আমার কাছে মনে হইছে তিনি খুবই তাড়া-হুড়া করে বিশ্লেষণ শুরু করিয়া দিয়েছেন! একটু সময় নিয়ে স্টাডি করে বিশ্লেষণ করলে ভালই হত? সব সেক্টরেই এখন তাড়া-হুড়া, কে কাকে বিট করবে, যুক্তিতর্কে মেধায় মননে ধান্দায় একটা খাই খাই অবস্থা। একটি শোনা ঘটনা নিয়ে নিম্নতম স্টাডি না করে, নিজের বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ না করে সঙ্গে সঙ্গে আহম্মক এর মতো স্টেটমেন্ট বাণী বিবৃতি দেয়া এখন হাতের মুঠোয় যা অতি ডিজিটালের আহাম্মকি বহি:প্রকাশ। আমাকে প্লিজ একটু বলেন আমরা কি আমাদের নিজ গুনে বিচার-বুদ্ধিতে আচার-আচরণে নীতি-নৈতিকতায় দেশপ্রেমে আদৌ ডিজিটাল হয়ে উঠেছি বা সে দিকে এগুচ্ছি? নাকি ফেইসবুক টুইটার, সেলফি, কথা বার্তার ধান্দায়, ফটো এডিটিং, ফোটোগ্রাফি, এইসব কাজের ন্যায় নিজেদের অতি ডিজিটাল মনে করছি।

সমাজ বিনির্মাণে দেশ গঠনে যুব সমাজের ভূমিকা অপরিসীম। তাই তাদের প্রতি শৈশব, কৈশোর থেকেই আমাদের অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া জরুরি। মানবিক কল্যাণ, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলাবোধ, নীতি-নৈতিকতা বোধ, এই ধরনের সফ্টওয়্যার একটি নির্দিষ্ট বয়সে তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার দায়িত্ব কর্তব্য পারিবারিকভাবে আমরা এড়িয়ে যেতে পারিনা। আমরা কি এই বিষয়গুলো আমাদের যুব সমাজের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে মানবিক-মানসিক বিকাশে কাজ করবে সেই চিন্তা ভাবনা থেকে তাদের জন্য করছি? যে যুবকরাই আমাদের আগামীর স্বপ্ন। যারা নিষ্ঠাবান সৎ চরিত্রবান ও সঠিক জ্ঞানের অধিকারী হলে তাদের শক্তি উদ্ভাবনী মেধা চিন্তা-ভাবনা ও যোগ্যতা দেশ-জাতি-সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। এটা আশা করা আজকের দুনিয়ায় কোনো রকেট সায়েন্স নয়। প্রশ্ন ,আমরা কি তাদের সম্ভবনাময় আগামী নিয়ে ভাবছি?

দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেধাবী ছাত্রদের হতাশা, গ্লানি, চিন্তা-চেতনা জাতিকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। আমাদের যুব সমাজের অধ:পতনের কারণ উৎঘাটন করতে হবে, শুধু শুধু দেশ সমাজ রাজনীতিকে দোষারোপ করে এর সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। পারিবারিকভাবে আমরা এর দায়-দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারি না। যুব সমাজ যখন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, সৎ ও সঠিক কর্ম সম্পাদন করবে, তাদের মর্যাদা ও অবস্থান সম্পর্কে তারা অবগত হবে, তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, তখনই এই দেশ ও জাতি সমাজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আমরা কি যুব সমাজকে তাদের ভাল কাজের স্বীকৃতি উৎসাহ প্রদান করছি?

আমাদের পারিবারিক সামাজিক জীবনে প্রধান সমস্যা সমস্যাই রয়েই গেছে। সব কিছুতেই আধুনিকতার পরশ লেগেছে কিন্তু আচার- আচরণ চাল-চলন সেই মান্দাতার আমলেরই রয়ে গেছে। আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে আমাদের স্ব -বিরোধী আচরণ নীতি, চিন্তা-চেতনা যা সব সময়ই আমাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক করে রেখেছে। দুইটা প্রিন্সিপাল আমরা মেনটেইন করি একটা আমাদের নিজের জন্য, অন্যটা সবার জন্য -জনস্বার্থে। যেটা যেখানে প্রয়োগ করলে আমরা সব সময়ই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারি। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সাথে মোকাবেলা করতে গিয়ে ঈমান আমলের সাথে প্রায় -ই আমরা ধাক্কা খাচ্ছি, স্বজ্ঞানে আমরা পুরাই অন্ধ। তিল কে তাল বানাইতে আমাদের খুবই পছন্দ। আকাশ কুসুম কথা-বার্তা, রূপ কথার গল্প, আষাঢ়ে গল্প আমাদের পছন্দের যা আমাদের ডেইলি মেন্যুতে আছেই।

নীতি-নৈতিকতা চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়াদিতে আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকি। সবসময় বিজয়ীকে সাপোর্ট করতে ভালবাসি। বিজয় নিশ্চিতে আমাদের চিন্তা-চেতনা, চেষ্টা একেবারে অপ্রতুল, কিন্তু পরাজয়ও নেনে নিতে পারি না, সাথে সাথেই দাঙ্গা হাঙ্গামা বাজাইতে উঠে পরে লাগি। আমাদের নিজের ঈমান ঠিক নাই অন্যের বিষয় নিয়ে ঘুম হারাম। পর নিন্দা গীবত আমাদেরকে ক্যান্সারের মত আক্রমণ করছে। ভুল উপদেশ আদেশ-প্রদান আমাদের কমন সমস্যা যা থেকে আমরা ইচ্ছা করলেই বের হতে পারছি না।

আমরা আমাদের নিজ স্বার্থকে চরীতার্থ করার মানসে স্বল্প সময়ে হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার মত হয়ে যাই। নদী পার হইতে গিয়ে মানুষের ধর্মের ভাই-বোন, বাবা-জেডা, কাকা সম্পর্ক তৈরি করছি, সময় শেষেই নিমিষেই আমাদের আসল চেহারা প্রকাশ পাচ্ছে নিজেদের বান্দরি স্বভাবের কারণেই। তাই ইন্সানের এইসব লাফালাফি ঝাপাঝাপি দেখে আমার কাছে প্রায়ই মনে হয় বান্দর থেকেই বোধ হয় ইন্সানের জন্ম হইছে। বাপ রে বাপ।

সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ তো বিপদ সীমার উপর অতিক্রম করছে। কেউ কাউরে মেনে নিতে পারি না, কারো সাফল্য দেখলে আমাদের শরীর চুল্কানি শুরু হয়, শরীর খারাপ হওয়ার মত অবস্থা। অন্যের সাফল্যে আমরা অভিনন্দন তো দেয়া দূরের কথা নেগেটিভ সমালোচনা করতে করতে মুখে ফেনা তুলি। আমরা একদিকে মানুষরে উপদেশ বাণী দিয়ে নিজেরে মহান বানাইবার চেষ্টা করি, অন্যদিকে নিজ থেকে প্রদত্ত বাণীর বিপক্ষে কাজ করছি। কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ এক গল্পে বলেছিলেন নাটক সিনেমা উপন্যাস পড়িয়া নিজের চরিত্র অভ্যাস বদলানো আর কুকুরের লেজকে মাজাইয়া সোজা করা সমান কথা। এক যুগ পরেও কথাটি মনে পড়িয়া গেল।

দেশের প্রতি সবসময় আমরা নেগেটিভ মনোভাব প্রকাশ করি, ঘুষ দেয়া নেয়া, কার কি করা উচিৎ অনুচিৎ, এইসব নিয়ে প্রায়ই আমরা যুক্তি প্রদর্শন করে নিজেরে আলোচনার মধ্যে মনি জাহির করছি। একটা বার হলফ করে আপনি আমাকে বলেন আমরা প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ভাবে এইসব বেআইনি কাজের সাথে জড়িত নয়কি? যখন পুলিশ অফিসার আপনার ইচ্ছের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে তখনি আমরা তাদের বিরুদ্ধে লেখালেখি শুরু করি প্রতিবাদী হই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমরাই আপোষহীন। আবার প্রতিটি লোকাল পুলিশ স্টেশনের সাথে আমাদের সমাজের মুখোশ ধারি ডজন ডজন দেশ প্রেমিক দালাল-বাটপার মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে দুই পক্ষের কাছ থেকে আইনি সহায়তার নামে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষের হয়রানির শেষ নেই। আপনারাই আমাকে বলেন আমাদের মধ্যে কি কোনো মানবিক নৈতিক-চারিত্রিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তাই বলি নিজে থেকেই এই কঠিন কাজ শুরু করতে হবে। দুনিয়ারে বদলাইতে হলে আগে নিজেরে বদলাইতে হবে। আপনি নিজে ভাল থাকলে জগৎও ভালো থাকবে।

আমাদের দেশে সহজ-সরল সাধারণ আবেগি মানুষের ধারণা যে উকিল কোর্টে জজের সাথে চিল্লাই-চিল্লাই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে পারে সে-ই সেরা উকিল, এই ধারণা কিন্তু ঠিক না, মামলার বিষয় বস্তুর সাথে মামলার ধারা-উপধারা আইন কি বলে এইসব বিষয় নোট করে মামলাটি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলেই আপনি যদি চিল্লা-চিল্লি কমই করেন রায় কিন্তু সঠিকই হবে। সমাজে সু-বক্তার অভাব নেই। আপনাকে মনোযোগ নিয়ে শুনতে হবে, বুঝতে হবে আপনার এবং সমাজের কল্যাণ কোথায় নিহিত রয়েছে।

অনেক কিছু লিখে ফেলেছি আপনারা হয়তো ভাববেন এই মিয়াসাবের আবির্ভাব কোথা থেকে। আমাকে আবার আপনারা নব্য কলামিস্ট সাংবাদিক ভেবে সমালোচনা করতে করতে মুখে ফেনা তুলবেন না প্লিজ। মেসিন দিয়ে বাংলা টাইপিং করতে পারছি বলেই সাহস করে অগোছালোভাবে আমাদের হাল-চাল নিয়ে মনের ভাব প্রকাশের চেষ্টা মাত্র। বুড়ো বয়সে বাংলা টাইপিং শিখেছি নতুন লিখা শিখলে যা হয় আর কি! শুধু শুধু লিখতে ইচ্ছে করছে। আপনাদের কথা দিচ্ছি নিজের স্বজ্ঞানে এত স্বল্প জ্ঞানে নিজেকে কলামিস্ট দাবি করবো না। মনের ভাব প্রকাশের জন্যই আমার এ মতামত, কিন্তু মনের ভাব প্রকাশের জন্য যে ধরনের বাক্য খুঁজছি পেয়েও তার সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারছি না বলে আপনাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।

যা আলোচনা করার চেষ্টা করেছি এই সমস্যা গুলো শুধু আপনার আর আমার নয়, এ সমস্যা গুলো আমাদের সকলেরই। আমরা কেউই এর দায় এড়িয়ে যেতে পারিনা। সবাই মিলে কাজ করতে হবে, খুঁজে বের করতে হবে একটি সঠিক রাস্তা যা দিয়ে হাঁটলে, বা ড্রাইভ করলে ট্রাফিক জ্যাম থাকবে কিন্তু দেরিতে হলেও আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাব। সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে দেশ-সমাজ এগিয়ে যাবে। যুব সমাজকে সঠিক দিক-নির্দেশনা, কর্ম পরিবেশ সৃষ্টি করে দিতে হবে। হতাশ না হয়ে স্ব স্ব অবস্থান থেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারব।

নজরুল ইসলাম
ওয়ার্কিং ফর ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস, লন্ডন।
মেম্বার দি ন্যাশনাল অটিষ্টিক সোসাইটি ইউনাটেড কিংডম।

ঢাকা, বুধবার, জুলাই ২৭, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // এ এম এই লেখাটি ৭৮০ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন