সর্বশেষ
সোমবার ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ১৯ নভেম্বর ২০১৮

দেশপ্রেমিক, দুর্নীতিবাজ শব্দ দুটো সাংঘর্ষিক নয় কি

রবিবার, জুলাই ৩১, ২০১৬

1474471343_1469913815.jpg
বিডিলাইভ রিপোর্ট :
আপনাদের যদি প্রশ্ন করা হয় দেশ প্রেম কি? আমার বিশ্বাস আপনারা সাজাইয়া-গোছাইয়া ছন্দে ছন্দে বলতে শুরু করলে তা আর শেষ হবে না। আমরা তো আবার কথা বলার সুযোগ পাইলে মাশআল্লাহ দাড়ি কমা চিন্তা না করেই সেই ৫২, ৫৪, ৬৬, ৭১, ৯০, সব আন্দোলনকে সাক্ষী রাখি। আবার এও বলি আমার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এখানেই শেষ করলাম। আমরা কি একটি বার চিন্তা করি আমাকে কি প্রশ্ন করা হয়েছিল?

সব কিছুতেই কেন এতো তাড়াহুড়া, কেন আমরা এতো প্রতিবাদী? ইমোশোনাল বা আবেগি! কেন আমরা কোনো বিষয় বোধগম্য হইবার আগেই দৌড় দেই? কেন একজনের কথা শেষ না হওয়ার পূর্বেই অনুমতি না নিয়েই নিজের বক্তব্য শুরু করিবার জন্য পাগল হইয়া- প্রায়ই শুরু করি? কথায় কথায় কেন সেই একি কথা এই দেশ আমার, আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, আমি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধাই নই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কেন কাজে কাজী না হয়ে দাঁড়ি রেখে কাজী হওয়ার দৌঁড়ে আমরা দিন কে রাত আর রাতকে দিন করছি। সমাজে কারো ভুল-ত্রুটি Identify করে সংশোধনের চেষ্টা করলে আপনি তো মহা-মসিবতে পড়েছেন। আপনাকে উল্টো প্রশ্ন ছোড়া হবে তুমি জানো কাকে জ্ঞান দিচ্ছ! আমি বি, কম অনার্স এম,কম -আরো কত ডিগ্রি অভিজ্ঞতার সয়লাব। আমি তোমার সিনিয়র, সিনিয়রদের জ্ঞান দিতে নাই তা জানা নাই? আজকাল জুনিয়র-সিনিয়র সমাজে একটা বিরাট সমস্যা। সিনিয়রদের কোনো ভুল জুনিয়ররা ধরতে পারবে না। এইসব প্রশ্নগুলো আজ অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

কিন্তু সমাধান কোথায়? আমরা কি একটি বার চিন্তা করি আমরা যেসব বিষয় নিয়ে দাবি তুলছি বা করছি, আমাদের আচার-আচরণে কর্মে আমরা তার প্রতিফলন ঘটাইতে পারছি। যদি ঘটিয়েই থাকি তাহলে এখানে দাবি কিসের?
 
ছোট একটি স্মৃতির কথা মনে পড়ে গেল যদি ও প্রাসঙ্গিক নয়। আজ থেকে ১৫ বছর পূর্বে লন্ডনে আসার পর আমি যখন কাজের জন্য ইন্টারভিউ দেই আমার ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজের ডেপুটি ম্যানেজার আমার ইন্টারভিউ নেয়। আমি সবে মাত্র লন্ডনে আসছি রাস্তা ঘাট জানা নেই, কোন ট্রেইন কোথায় কিভাবে যায় জানা নেই। একা যেতে গিয়ে যদি সময় মত ইন্টারভিউতে উপস্থিতি ব্যাহত হয় সেইজন্য আমার স্ত্রীও সেইদিন আমার সঙ্গে ছিলেন। যা হোক ইন্টারভিউ দিলাম হসপিটালে কাজও হল। দুই সপ্তাহ পরে কাজে যোগ দিলাম, আমাকে ট্রেনিংএ পাঠানোর আগে আমার ডেপুটি ম্যানেজার প্রাথমিকভাবে আমার ডিপার্টমেন্ট সহকর্মী/ কলিগস আমার অফিস এবং সমগ্র হাসপাতাল সম্পর্কে একটু ধারণা দিতে শুরু করলেন।

আমি আমার ম্যানেজারকে স্যার বলে সম্ভোধন করায় তিনি আমাকে বললেন তুমি আমাকে স্যার বলে ডাকছো কেন? মাই নেইম ইজ  Petter Kharkam পিটার কারকাম। তুমি আমাকে পিটার Petter বলে ডাকবে। এছাড়াও আমাদের অফিস রুমে আমার ম্যানেজার (Petter Kharkam) পিটার কারকাম ঢোকার পর আমি তাকে সম্মান জানাতে প্রায়ই দাঁড়িয়ে যেতাম। আমার এই আচরণে পিটার (আমার ম্যানেজার) আমাকে একদিন জিজ্ঞেস করলো -আমি রুমে ঢুকলে তুমি দাঁড়িয়ে যাও কেন? আমি বললাম তোমাকে শ্রদ্ধা করি এই জন্য। আমার ম্যানেজার আমাকে বললো  You do respect me and I belief. You do not need to stand up every times I enter the office. সে আমাকে বললো আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তুমি আমাকে সম্মান কর, তোমাকে দাঁড়িয়ে বার বার সেটি প্রমাণ করতে হবে না।

আমি আপনাদের উৎসাহিত করছি না বিদেশের স্টাইল বা কালচার ফলো করার জন্য। সম্মান, শ্রদ্ধাবোধ, মায়া, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার মনের গহীন থেকে প্রকাশ পায় ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি উঠে-বসে শুয়ে কদম্বুচি করেও তা প্রমাণ করতে সক্ষম হবেন না। আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেক দেশের একটা নিজস্ব সৃষ্টি ও কালচার আছে। কিন্তু শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে জগতের সাথে আমাদের তাল মিলিয়েই চলতে হবে।

দেশ প্রেম নিয়ে কথা বলছিলাম। আমাদের প্রধান সমস্যা বিষয়বস্তু ঠিক রেখে আলোচনা-সমালোচনা করতে গিয়ে প্রায়-ই লাইনচ্যুত হয়ে পড়ি। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম দেখছিনা। আচ্ছা দেশপ্রেম আর দুর্নীতি শব্দ দুইটা অনেকটা সাংঘর্ষিক নয় কি? আপনারা কি বলেন? যদি মনের গহীন থেকে আপনার মধ্যে দেশপ্রেম দেশাত্ববোধ থাকে অনেকটা লাইলি-মজনু, শাজাহান-মমতাজের ভালোবাসার মত তাহলে আপনি দুর্নীতি নামক ক্যান্সার বিজনেসের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন না।

আর দেশের প্রতি আপনার ভালোবাসা, দেশপ্রেম, দেশাত্ববোধ যদি হয় ঐ প্রেমিক যুগলের মত-- সারাদিন ডেটিং শেষে একজন আরেক জনের কাছ থেকে বিদায় নেয়ার বেলায় প্রেমিক প্রেমিকাকে বলছেন - তোমার জন্য সাগর-নদী, বন-জঙ্গল পাড়ি দিতে পারি! প্রেমিকা বলছে ঠিক আছে ডার্লিং কাল সকালে সময় মত আসিয়ো তোমার জন্য অপেক্ষা করতে আমার ভাল লাগেনা!

প্রেমিক বলছেন -আমি আসবো ডার্লিং কিন্তু যদি বৃষ্টি হয় তাহলে একটু দেরি হবে! তাই বলছি দেশের প্রতি আপনার ভালোবাসা যদি ঐ প্রেমিকের মত এতটাই দুর্বল হয়, সাগর পাড়ি দিতে পারবেন কিন্তু বৃষ্টি হলে একটু দেরি হবে, তাহলে আপনি দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর এইরকম দেশপ্রেমিকের সংখ্যা দেশে আজ বিপৎসীমার উপর দিয়ে অতিক্রম করছে, যা নজর কাড়ার মত!

আমরা এতটাই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছি যে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার কু-মতলবে দেশের গন্ডি ভেদ করে বহিঃর্বিশ্বে আমাদের আত্মসম্মান বোধ বিসর্জন দিয়ে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে মারামারি শুরু করেছি। একটু সময় নিয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিৎ আমরা কিসের জন্য একজনের টাই ধরে অন্য জন টানছি। ঐ দিন আমেরিকান প্রবাসী রম্য লেখক বশির আহমেদ ফেইসবুক স্ট্যাটাসে একটি ভিডিও  ক্লিপ আপ্লোড দিয়েছেন যা আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে --আমেরিকাতে প্রবাসী বাঙালিরা- বাঙাল স্টাইলে মারা-মারি করতেছে -পুলিশ এসে এইসব তামাশা দেখে ইংরেজিতে বলতেছে 'এই প্রাণীগুলো কোন গ্রহ থেকে এসেছে, বড়ই হাসির এবং লজ্জার বিষয়।
 
আবেগি স্বরে মুখ দিয়ে দেশকে ভালোবাসি- এটাই কি দেশ প্রেম? নাকি এর সংজ্ঞা ভালবাসার থেকে আরও বেশি কিছু? প্রায় শুনতে পাই জাতি হিসাবে আমাদের দেশপ্রেমের বড়ই অভাব। বিষয়টা কি সত্যিই তাই? আসলেই দেশপ্রেমের অভাব আজ সর্বক্ষেত্রে পরিলক্ষিত। আমাদের অনেক দেশপ্রেমিক বন্ধু-বান্ধব আছেন যারা দেশকে অনেক ভালবাসেন, দেশের জন্য জান-প্রাণ দিতেও রাজি। শপথ করাটা সহজ, কিন্তু প্রতিশ্রূতি সফল ও কার্যকর বাস্তবায়নে আমরা প্রায়ই হোঁচট খাচ্ছি। জাতীয় স্বার্থে সবাই এক কাতারে দাঁড়ানোর নাম-ই  দেশ প্রেম। সরকারের সাফল্যের প্রশংসা করা আর ব্যর্থতাকে দেখিয়ে দেয়ার নাম-ই দেশ প্রেম। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, নিজের আদর্শকে মনেপ্রাণে ধারণ করে যুক্তিমেধা দিয়ে দেশের প্রতি বিরুপ প্রশ্নে বিরোধিতা করার নাম-ই দেশ প্রেম।

আপনাদের আরো একটি উদাহরণ দিতে চাই, সম্প্রতি যুক্তরাজ্য (ব্রিটেন) ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকবে কি থাকবে না এই প্রশ্নে রেফারেন্ডাম গণভোট হল, সমগ্র বিশ্ব ঐতিহাসিক ঐ গণভোট দেখল। বর্তমান ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন গত নির্বাচনে তার নির্বাচনী ইস্তেহারে বলেছিলেন/ জনগণকে কথা দিয়েছিলেন তার দল নির্বাচিত হলে পরে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকা না থাকার পক্ষে তিনি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের দাবির সফল বাস্তবায়ন করবেন।
 
যেমন কথা তেমন কাজ। প্রধানমন্ত্রী তার দল, বিরোধীদল লেবার পার্টিসহ দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল ব্যক্তি বিশেষ ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে থাকার পক্ষে দীর্ঘযুক্তি উপস্থাপন করে সমগ্র দেশে ক্যাম্পেইন করল। গণভোটের রেজাল্ট সকল রাজনৈতিক দলের যুক্তির বিপক্ষে চলে যায়। মেজরিটি জনগণ রায় প্রদান করে ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসার জন্য।

প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্রের /দেশপ্রেমের/ মানবপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করলেন এইজন্য যে, তারা দেশকে যে পথে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন ব্রিটিশ জনগণ তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন গণভোট রায়ই তা প্রমান করে।

প্রধানমন্ত্রী বললেন, আই লাভ দিস কান্ট্রি! আমি মনে করি এই দেশে ফ্রেশ নেতৃত্ব প্রয়োজন। যদিও আমিসহ রাজনৈতিক দল গুলোর  চিন্তা ভাবনা ছিল 'ব্রিটেন উইল বি মোর স্ট্রংগার উইথ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন'। আমি জনগণের রায়কে সম্মান জানাই। দেশের জন্য দেশপ্রেমের জন্য জনগণের জন্য প্রধান মন্ত্রিত্ব ছাড়তে ভদ্রলোক সময় নেননি, পিছু হাঁটেননি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরণের একটি পরিস্তিতি মোকাবেলা করতে কত যে প্রাণ চলে যেত, আপনারাই বেশি জানেন। তাই যা বলতে চাচ্ছি -কাজ দিয়েই দেশ প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

আমাদের দেশ বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ বা নির্মূলে সরকার রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ব্যক্তি পরিবার সমাজ পর্যায়ে কর্তব্য-নিষ্ঠা ও সততা খুব দরকার। এজন্য প্রচলিত আইন নিয়ম-নীতির সঙ্গে দুর্নীতি দমনকে একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প আমি খোঁজে পাচ্ছি না। আর তা সফল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের সদিচ্ছা জনগণের প্রচেষ্টার একটি সম্মিলিত সংমিশ্রণ নিয়ে কাজ করতে হবে সমাজ থেকে দুর্নীতি নামক এই ক্যান্সার ব্যাধিকে নির্মূলে। ঘুষ প্রদান, সম্পত্তির আত্মসাৎ এবং সরকারি রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার দুর্নীতি নামক বাণিজ্য আমাদের দেশে একটা মহামারি আকার ধারণ করেছে।

দেশের বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতি প্রতিরোধে অঙ্গীকার করা হয়, কিন্তু একটি Stable রাজনৈতিক পরিবেশ কার্যকর শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনি রাজনৈতিক সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা কার্যকর ভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন। ঘুষ অনুপার্জিত আয় কালো টাকা চাঁদাবাজি ঋণখেলাপি টেন্ডারবাজি পেশি শক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নিজেদের সম্পদ আয় রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি Business অফিসিয়ালদের একটি Database তৈরি করতে হবে যেখানে ক্লিক করলেই তাদের সম্পর্কে একটি প্রাথমিক ধারনা তত্ত্ব ও সঠিক ইনফরমেশন পাওয়া যাবে।  

বর্তমান সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত অনুসন্ধান জবাবদিহিতা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী আমলাসহ যে কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে, স্বাধীনভাবে সেখানে আরো কাজ করতে হবে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসগুলো বন্ধ করার লক্ষ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার দুর্নীতির সর্বগ্রাসী আক্রমণ অনেকটা হ্রাস করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আমাদের দেশে কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের আর্থ সামাজিক অর্থনৈতিক কল্যাণে কথা বলেন পরামর্শ দেন (খাইছে) তখন তিনি নিজ দলে হন আলোচিত সমালোচিত, এছাড়াও যেসব প্রশ্নের সম্মুখীন হন যা বর্হি:বিশ্বে ব্যতিক্রম। এই ধরণের সংকীর্ণ রাজনৈতিক আদর্শবাদ থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক সরকার বিভিন্ন ধরনের আইন করে ও দুর্নীতি দমনে খুব একটা এগোতে পারেনি। তিনি ঠিকই বলেছেন- সরকারের চেষ্টা অব্যাহত ছিল আছেও কিন্তু দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়নি। তার একটি অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে ওই দিন বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে অনলাইনে অর্থ লেনদেন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং সরকারের সব ক্ষেত্রে যদি এ ব্যবস্থা চালু করা যায় তাহলে দুর্নীতি অনেকটা কমানো সম্ভব।

তিনি আরো বলেছেন, আমি সিলেটের একটি কলেজের সভাপতি ছিলাম-ঐ কলেজে আগে যেখানে ভর্তি কার্যক্রম থেকে আয় হতো ৮ লাখ টাকা সেখানে যখন অনলাইন পদ্ধতি ভর্তি চালু করা হলো সেই আয় বেড়ে হলো ৮৩ লাখ টাকা। অনলাইনে লেনদেন হলে চুরি ঠেকানো সম্ভব। সরকারের সকল বিভাগকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে যতটা সম্ভব কাজের ক্ষেত্রে অনলাইন পদ্ধতি চালু দুর্নীতি প্রতিরোধে অনেকটা সময়ের দাবি বলে আমি মনে করি এবং যা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। পাশাপাশি এই ধরণের একটি ক্যান্সার ব্যাধিকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে দেশপ্রেমে উদ্বদ্ধ হয়ে জাতীয় স্বার্থে দেশের কল্যাণে একি প্লাটফর্মে থেকে কাজ করতে হবে। নীতি নৈতিকতার যে চরম অধঃপতন হয়েছে তা থেকে আমাদের নিজেদেরই উত্তরণ ঘটাতে হবে।

আগামী দশকে এ দেশে থাকবে না ক্ষুধা-দারিদ্র্য বেকারত্ব অশিক্ষা-বঞ্চনা, দেশে বিরাজ করবে সুখ শান্তি সম্প্রীতি সমৃদ্ধি। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণ মুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হবে যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাম্যবাদীতা, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে। যা অর্জনে রাষ্ট্রের ভূমিকা হবে প্রধান, পাশাপাশি যে কোনো দেশে সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কেবল আইন প্রয়োগ শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন নির্মূল করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যাতে নাগরিকরা চরিত্রনিষ্ঠ হয় রাষ্ট্রীয় ব্যক্তি মালিকানাধীন সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশপ্রেমে নিয়ে দেশ গঠনে কাজ করে। দুর্নীতি প্রতিরোধে মানুষকে নৈতিক জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সততা ও নিষ্ঠার চর্চাকে সমাজে প্রতিটি কর্নারে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।

সারাবছর রাষ্ট্রের টাকা আত্মসাৎ করে ঘুষ দুর্নীতি কুকর্ম করাই সমাজদ্রোহী ও দেশদ্রোহীর কাজ। প্রতিবছর একটি উমরা একটি হজ্জ্ব পবিত্র মক্কা মদিনা ভ্রমণ করলেই কি আমাদের পাপ মোচন হবে? এই ধরণের হীন চিন্তা ভাবনাই আমাদেরকে দুর্নীতির সাগরে ডুবিয়ে রেখেছে। মরহুম সমাজ কল্যান মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী সাহেব রেগে গিয়ে প্রায়ই খবিস গালি দিতেন কেন দিতেন তা বোধগম্য! আমাদের চিন্তা চেতনা এতটাই সস্তা! এটা অনেকটা আমার সহকর্মী /কলিগের কাজ থেকে শুনা আফ্রিকার সেই হাসির জোকস এর মতো- আফ্রিকাতে এক চোর রাতে বাড়িতে চুরি করতে গিয়ে অনেক কৌশলে মালিকের বাসায় ঢোকার পর যে রুমে চুরি শুরু করবে সেখানে গিয়ে প্রথমেই তার চোখে পড়লো জিসেস ক্রাইস (যীশু ক্রিস্টের) বড় ফটো ওয়ালের মধ্যে রাখা! চোর প্রথমেই একটি টায়াল চাদর খুঁজে নিয়ে এসে যীশু ক্রিস্টের সেই ফটোটি কাভার করে ঢেকে রাখল যাতে যীশু ক্রিস্ট না দেখেন সে চুরি করছে! এই যে আমাদের চিন্তা চেতনা নৈতিকতা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ঈমান আকিদা আমল এতটাই হালকা হয়েছে আমরা এর থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।

যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত অপরিপক্ষ মনের গহীনে দেশপ্রেম মানবপ্রেম আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস সৃষ্টি হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের মধ্যে মনুষ্য উপলব্ধি কাজ করবে না আমরা এই সুন্দর পৃথিবীতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রেরিত, আমরা সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাত, বনের প্রাণী আর আমাদের মধ্যে অনেক ফারাক, আমাদের সকল কাজের হিসেব-নিকেশ হচ্ছে যা ডে অফ জাজমেন্টের দিনে হাশরের মাঠে Blanch Sheet হবে- ততক্ষণ পর্যন্ত অনেকটাই সেই---- 'সাত খন্ড রামায়ণ পড়িয়া সকালে আবার প্রশ্ন করা' সীতা কার বাপ?

আমাকে শেষ করতে হবে শুরুতে নিজেই বলেছি আমরা শুরু করলে আর শেষ করতে পারি না। আপনাদের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটাতে চাই না। ইতিমধ্যে আপনারা হয়ত ভাবছেন এই ভদ্রলোক বেশি কথা বলছেন। যা বলে আজকের মত পরিসমাপ্তি ঘটাইতে চাই তাহল -- দুর্নীতিকে কেবল আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, সংগঠন সুশীল নাগরিক, সমাজ গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস দরকার।

পাশাপাশি নিজেকে তৈরি করতে হবে একজন কার্যকর সুনাগরিক হিসেবে, যার মধ্যে সমাজ কল্যাণে কাজ করার মতো সুন্দর মানসিকতা আছে। নিজেকে বিশ্বাসী বিশ্বস্ত ইন্সান হিসেবে তৈরি করতে হবে। দেশের প্রচলিত আইন-কানুন মেনে চলার জন্য আপনার বোধশক্তি সর্বোপরি বড় একখান মন থাকা দরকার। অন্যের অধিকারের প্রতি আপনার শ্রদ্ধেয় সম্মান প্রদানের মানসিকতা থাকতে হবে। বিশাল এই দুনিয়াকে জানতে হবে, জানার ইচ্ছা আগ্রহ থাকতে হবে।

শুধু আপনার পরিবার, বাড়ি, আত্বীয়-স্বজনদের জানলে আপনি তুলনা করতে পারবেন না দুনিয়া কিভাবে ঘুরে। অন্যের সম্পদ এর প্রতি আপনার সম্মান বোধ থাকতে হবে। আপনাকে দায়িত্বশীল মনোভাবের ইন্সান হইতে হবে। আপনার দ্বারা সৃষ্ট জঞ্জাল এর দায় ভার আপনাকেই মানিয়া নেওয়ার জন্য সুন্দর একখান পজেটিভ মন থাকিতে হইবে।

'বিচার মানি তাল গাছ আমার', এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। আপনার প্রতিবেশী কেমন আছেন, কি করছেন না করছেন প্রতিবেশী হিসেবে তার সুখে-দুঃখে, শুধু সুখে নয়, ঈদে-চান্দে নয়, সব সময় আপনার সু সম্পর্ক অপরিবর্তিত থাকা প্রয়োজন। এই পৃথিবীটা হোক সকলের জন্য বসবাসযোগ্য যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি থাকবে অটুট যা আপনার চিন্তা চেতনায় পরিলক্ষিত হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে আপনার ভূমিকা হতে হবে সর্বজন প্রসংশিত। এই পজেটিভ বিষয়গুলো যদি আমাদের মধ্যে বিদ্যমান থাকে তাহলে আর কোনো সন্দেহ নেই আপনার মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব আছে। আপনার মত একজন সুনাগরিক দেশপ্রেমিক কোনো ভাবেই দুর্নীতি, স্বজন-প্রীতি দেশবিরোধী, কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে না। এই বিশ্বাস নিয়েই কাজ করতে হবে, সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

নজরুল ইসলাম
ওয়ার্কিং ফর ন্যাশনাল হেল্থ সার্ভিস, লন্ডন।
মেম্বার দি ন্যাশনাল অটিষ্টিক সোসাইটি ইউনাটেড কিংডম।

ঢাকা, রবিবার, জুলাই ৩১, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // এ এম এই লেখাটি ২৬৪৩ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন