সর্বশেষ
বুধবার ১১ই আশ্বিন ১৪২৫ | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রবীন্দ্রনাথ কেন জাতীয় জীবনে এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক

শনিবার, আগস্ট ৬, ২০১৬

1114945818_1470483455.jpg
আবদুল গাফফার চৌধুরী :
বাইশে শ্রাবণ (বাংলা সন ১৩৪৮) রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণ দিবস। ইংরেজি আগস্ট মাসে তার মৃত্যু হয়েছিল। সেই শ্রাবণ এবং আগস্ট মাসটি ফিরে এসেছে। ৭৫ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর যে চেহারা দেখে গিয়েছিলেন, তার সবকিছু সম্পূর্ণ বদলে গেছে। কিন্তু একটি চেহারা বদলায়নি। রবীন্দ্রনাথ যখন মারা যান, তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। তিনি লিখেছিলেন- 'হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী'। এখন বিশ্বযুদ্ধ নেই। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ যুদ্ধ আছে। রবীন্দ্রনাথ আজ বেঁচে থাকলে কী লিখতেন? এই শ্রাবণ মাসের স্মরণ দিবসে সে কথাই আজ ভাবছি।

রবীন্দ্রনাথ সত্যিই ছিলেন বিশ্বমানবতার কবি। এই মানবতার বিরুদ্ধে 'মানুষ-জন্তুর হুঙ্কারের' বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন। বিস্ময়ের কথা এই যে, সে সময়ের জন্য সেই সতর্কবাণীটি যেমন সত্য ছিল, আজও তেমনি সত্য। পৃথিবী বদলেছে। সভ্যতা এগিয়েছে। কিন্তু মানবতা ও মানব সভ্যতার বিপদ কাটেনি। শতবর্ষ আগেও তিনি 'সভ্যতার সংকট' উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাকে বলা হয় একালের 'পোয়েট অ্যান্ড প্রোফেট'।

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে তার বিশ্বভারতী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চারজন মহাপুরুষের স্মরণ দিবস পালন করতেন। এই চারজন মহাপুরুষ হলেন- বুদ্ধ, যিশুখ্রিস্ট, নানক এবং মুহাম্মদ (সা.)। এই চারজনের স্মরণ দিবসে চারটি গান গাওয়া হতো। তারই লেখা গান। বুদ্ধের স্মরণ দিবসে গাওয়া হতো- 'হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী'। যিশুর স্মরণ দিবসে- 'সেদিন যাহারা মেরেছিল তারে গিয়ে, রাজার দোহাই দিয়ে।' নানকের স্মরণ দিবসের গানের কথা আমার স্মরণ নেই। মহানবীর (সা.) স্মরণ দিবসে গাওয়া হতো- 'কোন্ আলোকে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় এলে।'

এখনও শান্তিনিকেতনে এভাবে স্মরণ দিবসগুলো পালন করা হয় কি-না তা জানি না। তবে রবীন্দ্রনাথের আমলে শান্তিনিকেতনে চার ধর্মের (বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ ও ইসলাম) প্রবর্তকের স্মরণ দিবস পালন দ্বারা হয়তো শিক্ষার্থীদের মনে এই সত্যটিই তিনি প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন যে, তাদের দ্বারা প্রচারিত শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং সমন্বয়ের আদর্শের মধ্যেই রয়েছে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং মানবতা ও সভ্যতার অগ্রগতির মূলমন্ত্র।

একে ফজলুল হক যখন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, তখন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে যা বলেছিলেন, তার মর্মকথা- ভারতবর্ষের সভ্যতা ও সংস্কৃতি হলো বহুত্ববাদী এবং সমন্বয়বাদী। লুণ্ঠন ও শাসনের জন্য বহু বহিরাগত শক্তি ভারতে এসেছে। তারা লুণ্ঠন এবং শাসনও করেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এ দেশে বপন করে গেছে নতুন নতুন সংস্কৃতির ফসল। এই ফসলে সবার অধিকার। এই ফসল ভাগাভাগি করতে গেলে, ধর্মের ভিত্তিতে হানাহানি করে সমন্বয়ের শক্তিকে ধ্বংস করলে এই উপমহাদেশে কখনও শান্তি আসবে না, মানবতার বিকাশ ঘটবে না।

রবীন্দ্রনাথ তাই লিখেছিলেন-

'রণধারা বাহি জয়গান গাহি

উন্মাদ কলরবে

ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত

যারা এসেছিল সবে।

তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে

কেহ নহে নহে দূর

আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিত

তার বিচিত্র সুর।'

রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ছয় বছরের মধ্যে ধর্মের ছুরিতে তার ভারত-তীর্থ ভাগ হয়। ভাগ হয় বাংলা প্রদেশও। কিন্তু অবিভক্ত রয়ে গেলেন একজন। তিনি রবীন্দ্রনাথ। তার দুটি গান এখন ভারত ও বাংলার জাতীয় সঙ্গীত। ভারত এবং বাংলাদেশ এখন যুক্তভাবে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করে। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশ (তখনকার পূর্ব পাকিস্তান) থেকে রবীন্দ্রনাথকে বিতাড়ন করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকরা। রবীন্দ্রনাথ যাননি। তার গান গেয়ে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার জন্য হাতে অস্ত্র নিয়েছে। বাংলাদেশে এখন স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল্যবোধগুলো আবার বিপন্ন। কিন্তু তা আগলে এখনও দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। ধর্মান্ধতা ও হিংসাকবলিত বর্তমান বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথই যেন এখন গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ।

রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে 'ফাতেহায়ে দোয়াজদাহম' (নবী দিবস) পালন করতেন। কারণ, ইসলামের মহানবীর মধ্যেও তিনি পেয়েছিলেন শান্তি ও মানবতার এক কল্যাণ পুরুষের সন্ধান। ইসলাম সত্যই শান্তি ও মানবতার ধর্ম। এই ধর্মের বিকৃতি ঘটিয়েছে ওয়াহাবিজম। এই ওয়াহাবিজমের আরও হিংস্র চেহারা মওদুদীবাদ ও জামায়াতি দর্শন। ইসলামে নামাজের অর্থ স্রষ্টার উপাসনা এবং তার সানি্নধ্য লাভ। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদুদী নামাজের অর্থ করেছেন, যুদ্ধের জন্য (জিহাদের জন্য) ট্রেনিং। ইসলামে আজানের অর্থ স্রষ্টার সানি্নধ্য লাভের জন্য আহ্বান। মওদুদী আজানের অর্থ করেছেন, যুদ্ধ শুরু হলে যেমন সামরিক বাহিনী বিউগল বাজায়, তেমনি আজান যুদ্ধে বা জিহাদে যোগদানের ডাক। ইসলামে জিহাদের অর্থ হচ্ছে ধর্মরক্ষা বা মানবকল্যাণের জন্য যুদ্ধ করা। জামায়াতের কাছে জিহাদের অর্থ ধর্মাধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য হত্যা।

যে কোনো ধর্মের এই বিকৃতি এবং 'মানুষ-জন্তুর' হুঙ্কার সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন তার কবিতা ও গানে। রক্তপাত তিনি এতটাই অপছন্দ করতেন যে, হিন্দুধর্মের পশু বলিদান-প্রথার বিরুদ্ধেও তিনি কলম ধরেছিলেন। সেই কবে অবিভক্ত বাংলার জনসংখ্যা যখন ছিল সাত কোটি, তখন তিনি লিখেছিলেন- 'সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করোনি।' আজ বিভক্ত বাংলার পূর্বাংশেরই জনসংখ্যা ১৬ কোটি। এখন বেঁচে থাকলে তিনি হয়তো লিখতেন- '১৬ কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো সন্ত্রাসী করে মানুষ করোনি।'

পঁচিশে বৈশাখ এলে আমরা সাড়ম্বরে কবির জন্মদিবস পালন করি। বাইশে শ্রাবণের প্রয়াণ দিবসটি তেমন করে কোথাও পালন করা হয় না। তার কারণ সম্ভবত এই যে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু এখন পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের কোনো বাঙালি মেনে নেয়নি। বাঙালির নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে, সর্ব উপলব্ধিতে মিশে আছেন রবীন্দ্রনাথ। আমাকে একবার এক হিন্দু পুরোহিত বলেছিলেন, আমাদের কোনো জাগ্রত দেবতাও রবীন্দ্রনাথের মতো এত জাগ্রত নয়। আমাদের সর্বচৈতন্যে জাগ্রত রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ।

মৃত্যুর ৭৫ বছর পরেও রবীন্দ্রনাথ সারা উপমহাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। ভাষা ও সংস্কৃতির আবরণে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জন্য যে জীবন-বৃত্ত গড়ে দিয়ে গেছেন, তাকে বারবার ধর্মান্ধতা, অপসংস্কৃতি এসে ভাঙতে চাইছে; কিন্তু পারছে না। বাঙালির এই অদম্য প্রাণশক্তির উৎস রবীন্দ্রনাথ।

দীর্ঘকাল পর পাকিস্তান আমলের একটি মজার ঘটনা আমার মনে পড়ছে। বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান। ভারত সরকার তখন গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানকে তার প্রাপ্য পানি থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে।

পাকিস্তান সরকার ভারতের সঙ্গে সিন্ধু অববাহিকার পানি চুক্তির মতো ফারাক্কার পানি নিয়েও কোনো চুক্তি না করে বিরোধটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইছিল। অর্থাৎ ভারত গঙ্গার পানির প্রাপ্য অংশ পূর্ব পাকিস্তানকে দিতে চাইছে না- এই ধুয়া তুলে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মন ভারতের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তোলাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে পাকিস্তানের বেতার ও টেলিভিশন, বিশেষ করে ঢাকার বেতার ও টেলিভিশনে ফারাক্কা প্রসঙ্গ তুলে রোজ রবীন্দ্রনাথের একটি গান বাজানো হতো- 'বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ।'

আমি তখনকার ঢাকা টেলিভিশনের কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা একদিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত বর্জনের অভিযান চালাচ্ছেন, রবীন্দ্রসাহিত্যের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন; আর ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে রোজ রবীন্দ্রনাথের গান বাজাচ্ছেন- তার কারণটা কী? তিনি এক কথায় জনাব দিয়েছিলেন_ ওপরের হুকুম। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শুধু পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকরা নয়, অবিভক্ত বাংলার বামপন্থিরাও এককালে কম অর্বাচীনতার প্রমাণ দেননি। রবীন্দ্রনাথকে বুর্জোয়াদের কবি, তিনি গণশত্রুদের কবি; তিনি জনগণকে বর্জন করে একলা চলার কবি ইত্যাদি অপবাদ দিয়ে কলকাতায় তার মূর্তি ভাঙারও চেষ্টা হয়েছিল। সিপিএম সরকার পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসে রবীন্দ্রনাথের 'সহজ পাঠ' বইটি স্কুলের পাঠ্যবইয়ের তালিকা থেকে বাদ দিতে চেয়েছিল।

যে বামপন্থিরা এ কাজটি করেছিলেন। তারাই আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছেন। বরং রবীন্দ্রনাথ দুই বাংলাতেই আরও বড় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। এমনকি বামপন্থিদের কাছেও। ষাটের দশকের পূর্ব পাকিস্তানে যখন অবাঙালি শাসকচক্র রবীন্দ্র-বর্জনের চক্রান্ত শুরু করেছিল, তখন সেই চক্রান্ত ব্যর্থ করার জন্য যে আন্দোলন হয় তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তরুণ বামপন্থি বুদ্ধিজীবীরাই।

গোটা ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করেছিলেন আধুনিক ভারতের নির্মাতা জওয়াহেরলাল নেহরু। তাই তিনি বন্দে মাতরম ও জনগণমন গানটির মধ্যে রবীন্দ্রনাথের 'জনগণমন' গানটিই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। আবার ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাষ্ট্রাদর্শের উৎস হিসেবে জাতীয় সঙ্গীত করার জন্য বেছে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের 'আমার সোনার বাংলা' গানটি। নেহরুর ভারত এবং মুজিবের বাংলা_ এই দুই দেশেই আজ তাদের গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার রাষ্ট্রাদর্শ হুমকির সম্মুখীন। কিন্তু এই হুমকির মুখে প্রতিরোধের দুর্গ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। সঙ্গে দুটি গান।

রবীন্দ্রনাথ তাই আমাদের জীবনে এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। বাইশে শ্রাবণ তার মৃত্যুদিবস হলেও আমাদের জাতীয় চেতনায় তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী।

লন্ডন, ৫ আগস্ট শুক্রবার, ২০১৬


ঢাকা, শনিবার, আগস্ট ৬, ২০১৬ (বিডিলাইভ২৪) // আর কে এই লেখাটি ৭২২ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন