সর্বশেষ
বুধবার ৮ই ফাল্গুন ১৪২৪ | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

টাটকা খেজুরের রস আর ফুলের রাজ্যের অতিথি

শনিবার ২১শে জানুয়ারী ২০১৭

1945016892_1484991432.jpg
কাশেম বিন হুসাইন :
এইচএসসিতে আমাদের ব্যাচে (২০১১) আর্টস-সায়েন্স মিলিয়ে শিক্ষার্থী ছিলো ৪৫০ এরও বেশী। আর সৌভাগ্যের বিষয় হলো এই ব্যাচের অর্ধেকেরও বেশী শিক্ষার্থী শুধুমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। তারই সুবাদে ক্যাম্পাসের প্রতিটি জায়গায় কাউকে না কাউকে পাওয়া যায়।

এইচএসসিতে সবার সাথে খুব নিবিড় সম্পর্ক না থাকলেও ক্যাম্পাসে আসার পর সবার সাথে ভালোভাবে পরিচয় হয়। আর আমাদের বিভাগে একসাথে অনেকজন থাকার কারণে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক দিন দিন দৃঢ় হয়। গত চারটি বছর ক্যাম্পাসে দাপিয়ে বেড়িয়েছি একসাথে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণের নেশায় সামিল হয়েছি একসাথেই।

তারই সূত্র ধরে সবাই একমত যে আমরা ক্যাম্পাসে আছি আর একটা বছর। এই বছর সবাই সবার বাড়িতে বেড়াতে যেতে হবে। অনেকদিন ধরেই পরিকল্পনা করলেও কারো চাকরি, কারো টিউশনি সহ নানা ব্যস্ততার কারণে হয়ে উঠছিলো না।

তবে সম্প্রতি শেষ হওয়া শীতের ছুটিতে ঝটপট সিদ্ধান্ত হলো সবাই আমাদের বাড়িতে যাবে। কারণ আমাদের ১০ জনের ছোট দলের সবার বাড়ি ঢাকার আশেপাশের জেলায় হলেও আমার বাড়ি যশোর। সবচেয়ে দূরে। যে কথা সেই কাজ। ভ্রমণের দিনের ১০ দিন আগেই ট্রেনের ১০ টি টিকেট সংগ্রহ করা হলো। তবে সমস্যা হলো দিন যতই কাছে আসে ততই লোক কমতে থাকে। সর্বশেষ ৬ জন নির্দিষ্ট হয়। বাকি চার টিকিট ঐদিন কমলাপুর গিয়ে অনেক কষ্ট করে বিক্রি করতে হয়। সে আরেক ঘটনা।



এ ভ্রমণের দিন ঠিক হতেই ফেসবুকে আমাদের মধ্যে চলতে থাকে লোভনীয় খাবার (খেজুরের রস, গুড়, বিভিন্ন রকমের পিঠা) এর ছবি দিয়ে রবিউল আর শরীফকে লোভ দেখানো। কারণ, টাটকা খেজুরের রস ওরা কখনো খায়নি। আর ফুলের রাজধানী যশোরের গদখালির বিভিন্ন ফুল ক্ষেতের ছবি। ভালোই জমছিলো।

অবশেষে গত ১২ জানুয়ারি কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রাত ৮.১৫ টায় আমরা রওনা দিলাম যশোরের উদ্দেশ্যে। নতুন ট্রেন দেখে সবাই খুব খুশি হলেও একটু পর শুরু হলো চরম বিরক্তিকর অবস্থা। চেয়ারকোচ কামরা হলেও ভিতরে লোকাল বাসের মত প্রচুর লোক দাঁড়ানো আর একটু পরপরই থামে। মজার বিষয় হলো অপর দিক থেকে আসা সব ট্রেনকেই জায়গা করে দিয়ে দাড়িয়ে থাকে আমাদের ট্রেনটি। কিন্তু কোথাও সে নিজে সাইড নেয়নি। এভাবে চলতে চলতে আমরা যশোর পৌঁছাই সকাল ৬ টায়।



কিন্তু সেখানে পৌঁছে সবার অবস্থা শোচনীয়। কারণ, ঐদিন থেকেই শুরু হয়েছিলো শৈত্যপ্রবাহ। আর যশোরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বিরাজ করছিলো।

সেখান থেকে ইজি বাইকে সোজা আমাদের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। একটু পরই হাজির হলো টাটকা রস। আব্বু কেবলই সেটা গাছ থেকে নামিয়ে এনেছে। সেই রসের স্বাদে তো রবিউল-শরীফ মুগ্ধ। মারুফ, জাহাঙ্গীর ভাই আর মোস্তফা-ও কম যায়না। যাই হোক রস পর্ব শেষে সামনে এলো আম্মুর নিজের হাতে বানানো রসে ভেজানো পিঠা।



অনেকজন যাবো বলে পিঠার পরিমাণ ছিলো অনেক। অল্প কিছু খাওয়ার পর সবার পেট ফুল কিন্তু মন যেনো ভরে না। এরপর সকালের নাস্তা করে রওনা হলাম ফুলের রাজধানী খ্যাত যশোরের গদখালীতে। অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় আমরা রিজার্ভ গাড়ি না নিয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেলাম।

সেখানে গিয়ে সবাই খুশিতে আত্মহারা।  মাঠের পর মাঠ ফুল আর ফুল। বিভিন্ন ধরণের ফুল। শুরু হলো ছবি তোলার পালা। এক গুচ্ছ গোলাপ বা রজনীগন্ধার দাম মাত্র ১০ টাকা। সেখানে আমাদের সাথে যুক্ত হলো আমার প্রাণের বন্ধু তবিবুর। আনন্দ যেন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।



সেখান থেকে ফিরে যাওয়া হলো মধুসূদন দত্তের বাড়ি। আমরা মনে করেছিলাম একই জেলার ভিতরে যেহেতু খুব বেশি দূর হবে না। তবে ধারণার চেয়েও দূরে সেটি। এত ভিতরে কিভাবে এমন জমিদার বাড়ি গড়ে উঠেছিলো তা সবার মনেই প্রশ্ন জাগলো। সেখান থেকে আমাদের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে রাত দশটা। তার উপর প্রচণ্ড শীত।

পরেরদিন খুব ভোরে উঠে চললো রস খাওয়ার প্রতিযোগীতা। শীতের আবহ কাটতে কাটতেই বেলা দশটা। তারপর রওনা হলাম বাগেরহাটে খানজাহান আলীর মাজার এবং ষাট গম্বুজ মসজিদ পরিদর্শনে। খুলনায় পৌছার পর বন্ধু ইমরানের মাধ্যমে জানলাম যে ষাট গম্বুজ মসজিদের ইমাম আমাদের ডিপার্টমেন্টের। তিনি খুবই মিশুক মানুষ। সেখানে গিয়ে মাজারে টাকা উঠানোর ব্যবসা আর ঠকবাজদের দেখে খুব খারাপ লাগলেও আমরা মাজার জিয়ারত করে ষাট গম্বুজ মসজিদ ঘুরে রওনা হতে হতে সন্ধ্যা।



বাগেরহাট থেকে খুলনা আসার পর ছিলো আমাদের জন্য বড় চমক। বন্ধু ইমরান তাদের নিজেদের দোকানের কয়েক প্যাকেট বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। 'বউ সাগর', 'ক্ষির চপ', অসাধারণ স্বাদের দই যেন এখনো মুখে লেগে রয়েছে। বাসায় যাওয়ার অনেক অনুরোধ করলেও যাওয়া সম্ভব হলো না। কারণ পরদিন ভোরেই ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা দিতে হবে।



সবাই আমাদের বাড়িতে গেলেও গ্রাম ঘুরে দেখার সময় হয়নি। তাই তৃতীয় দিন ঘুম থেকে উঠেই গ্রামটা ঘুরে দেখলো সবাই। কত আনন্দ আর ছবি তোলার পর বিদায় নিতে হলো।



আসার সময় মাওয়া হয়ে ফেরার পথে পদ্মা সেতুর বিশাল কর্মযজ্ঞ চোখে পড়লো। আর মাওয়া এসে হলো ইলিশ ভোজ। পছন্দের ইলিশ দিয়ে পেটপুরে খেয়ে একসাগর আনন্দ নিয়ে ফিরে এলাম ঢাকায়।



ঢাকা, শনিবার ২১শে জানুয়ারী ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি 3863 বার পড়া হয়েছে