bdlive24

চিকিৎসা বিজ্ঞানের মহীয়সীরা

বুধবার মার্চ ০৮, ২০১৭, ০৬:৩৮ পিএম.


চিকিৎসা বিজ্ঞানের মহীয়সীরা

বিডিলাইভ রিপোর্ট: চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস মানবজাতির ইতিহাসের মতো পুরনো। সৃষ্টির শুরু থেকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক সমস্যার সাথে সাথে আমাদের বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সেই সমস্যার সমাধানেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসের শুরু।

চিকিৎসাশাস্ত্রের সর্বক্ষেত্রে নারীদের অন্তর্ভূক্তি খুব সাম্প্রতিক একটা ব্যাপার হলেও অনেক আদিকাল থেকেই নারীদের বিচরণ ছিলো। কত আগে থেকে এই প্রশ্নটা মাথায় আসতে পারে কারণ উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক পর্যন্তও নারীরা চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়ালেখা করতে পারতেন না। বাধাটা অবশ্যই সামাজিক ও ধর্মীয় ছিলো। কিন্তু প্রাচীন মিশরের একজন মহিলা মেরি ‘তাহ-এর কবরের ফলকে লিখা ছিলো 'চিফ ফিজিসিয়ান'। সেই মহিলা ছিলেন তখনকার সময়ের মিশরের দেবতাতূল্য চিকিৎসক ইমোটেপ 'তাহ-র মা'। ইমোটেপ তাহকে মৃত্যুর পর মিশরীয়রা স্বাস্থ্যের দেবতা বলে পূজো করতো'। সেই ইমোটেপ তাহের মায়ের কবরেও লিখা ছিলো 'চিফ ফিজিসিয়ান'। তার মানে ইমোটেপ তাহের আগেই একজন মহিলা 'চিফ ফিজিসিয়ান' পদে ছিলেন! সেটা আজ থেকে প্রায় ৫০০০ বছর আগের ঘটনা!

কালের বিবর্তনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে মহিলাদের অন্তর্ভূক্তি উঠানামা করেছে অনেক। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের আগ পর্যন্ত নারীরা চিকিৎসা বিজ্ঞানে আসতে পারতো না কারণ এই সময়ের আগে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা প্রায় নিষিদ্ধ ছিলো। কিন্তু আজ থেকে ৩৫০০ বছর আগে নারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্লাসে যেতে পারতো প্রাচীন গ্রিসে। বিখ্যাত মহাকবি হোমার তার ইলিয়াডে ইপিনাসের রাজা অগিয়াসের মেয়ে আগামেডের বর্ণনা দিয়েছেন এমন এক নারী হিসেবে যে সব ঔষদের কথা জানতো।
                    'Fair-haired Agamede who knew of all
                     the medicines that are grown in the broad earth…'
মেট্রোডোরা প্রায় ২৩০০ বছর পূর্বে 'On the disease and cures of Women' নামে বইটি লিখেন, যেটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নারীদের দ্বারা লিখা প্রথম দিকের বইগুলোর একটি। গ্রিক সমাজে নারীরা নারীদের রোগ নিয়েই কাজ করতেন। বর্তমান সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রায় সকল শাখায় গর্বের সাথে কাজ করছেন। যদিও এখনো আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ নারী চিকিৎসক মানেই গাইনোকোলজিষ্ট মনে করেন!

এখানে আরেক মহিলা গ্রিক ফিজিসিয়ানের কথা বলা যায়, এগনোডাইস। তিনি সেই সময়ে মহিলা চিকিৎসক হওয়ার সীমাবদ্ধতা থেকে বাঁচতে পুরুষ বেশে প্রায় সব রোগেরই চিকিৎসা করতেন। এক্ষেত্রে মহিলাদের কোনো চিকিৎসা করতে গেলে ছদ্ধবেশ খুলে তাদের বোঝাতেন যে তিনি পুরুষ নন।

একসময় তিনি ধরা পড়ে যান। শাস্তি হয় মৃত্যুদন্ড। কিন্তু নারী রোগীদের দাবির মুখে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়, একই সাথে তখনকার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নারীদের আরো একটু বেশি প্রবেশের সুযোগ করে দেয়া হয়। মুসলিম বিশ্বে অষ্টম শতাব্দীর শুরুর দিকেই নারীরা মেডিসিন পড়তে পারতেন। যদিও সুযোগ কম ছিলো। কিন্তু আল-রাজি ও ইবনে সিনার চিকিৎসা বিজ্ঞানের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের ফলে মুসলিম নারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান আহরনের সুযোগ আরো বেশি পান।

দ্বাদশ শতাব্দীর দিকে জার্মান নারী চিকিৎসক হিলদেগার লিখেন, Liber Simplicis Medicinae (Book of Simple Medicine) তারপর লিখেন Liber Compositae Medicinae (Book of Composite Medicines) যেখানে তিনি রোগকে শরীর ও মনের সাম্যাবস্থার সাময়িক ব্যাঘাত বলে বর্ণনা করেন যা রোগতত্ত্বের বৈপ্লবিক 'হলিস্টিক কন্সেপ্ট' এর জন্ম দেয়।

সেই সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নারীদের এতো অবদানের পরও ইউরোপের ডার্ক এজে নারীদের মেডিকেল স্কুলে ঢোকা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ধর্মও একটা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খ্রিষ্টানরা মনে করতো বেহেশতের বাগানে ইভের নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পাপের ফল হিসেবে মহিলারা সন্তান জন্মদানের সময় বা অন্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে যে কষ্ট পায় সেটা তাদের প্রাপ্য সূতরাং মহিলা চিকিৎসকের দরকার নেই!

১২২০ সালে প্যারিস ইউনিভার্সিটি নারীদের মেডিকেলে পড়া নিষিদ্ধ করে। ১৩৯০ সালের দিকে লন্ডনের মেডিকেল স্কুলগুলো নারীদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়। ষোড়শ শতাব্দীর দিকে ইউরোপের বেশিরভাগ ইউনিভার্সিটি আবারো নারীদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। সবাইকে চমকে দিয়ে ১৭৩২ সালে লরা বাসসি নামক রমনী মাত্র ২১ বছর বয়সে ইউনিভার্সিটি অব বলগানার এনাটমির প্রফেসর হয়ে যান! ১৭৫৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব প্রুসিয়া থেকে আরক্সলেভেন নামে এক মহিলা 'কোয়ালিফাইড ডক্টর' হিসেবে পড়া শেষ করে বের হন। অবশ্য সেখানে ঢুকতে তাকে রাজার কাছে 'মেয়েরা কেনো মেডিসিন পড়তে পারবে না?' জিজ্ঞাসা করে সাহসী এবং 'কেন পড়া উচিত' ব্যাখ্যা করে বেশ বড় একটা চিঠি লিখতে হয়েছিল!

উপরের সবগুলোই একক সাফল্যের ইতিহাস। বিংশ শতাব্দীর আগের এরকম ঘটনা হাতেগোনা কয়েকটাই মাত্র।
১৮৪৭ সালে এলিজাবেথ ব্লাকওয়েল জেনেভা মেডিকেল কলেজ, নিউইওয়র্কে পড়ার সুযোগ পান। ১৮৪৯ সালে মেডিসিনে ডিগ্রি পান। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম নারী যিনি মেডিসিনে কোনো ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর তিনি লন্ডন ও প্যারিসে কিছু জায়গায় সুনামের সাথে কাজ করে আবারো নিউওইয়র্কে ফিরে যান। সেখানে ছোটখাটো একটা ম্যাটারনিটি ক্লিনিক খুলেন। এই ক্লিনিক এতো জনপ্রিয়তা পায় যে প্রতি বছর এর সাইজ বৃদ্ধি করতে হতো যা বর্তমানে নিউওইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ডাউনটাউন হসপিটালে রূপ নিয়েছে!

১৮৬৯ সালে ব্লাকওয়েল ইংল্যান্ড ফিরে আসেন। সেখানে তিনি সোফিয়া জেক্স ব্লেইক ও এলিজাবেথ ব্যারেট এর সাথে 'লন্ডন স্কুল অব মেডিসিন ফর ওম্যান' প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন। সোফিয়া জেক্স ইংল্যান্ডের প্রথম দিকের মহিলা চিকিৎসকদের একজন যিনি পরে এডিনবরা স্কুল অব মেডিসিন ফর ওম্যান প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যদিকে এলিজাবেথ গ্যারেট ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন। ১৮৮২ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডন স্কুল অব মেডিসিন ফর ওম্যান এর ডীন পদে প্রথম মহিলা হিসেবে কাজ করেন। ১৮৭৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চিকিৎসা পেশায় নারীদের পূর্ণ প্রবেশের বিল পাশ করে। তারপর একে একে অন্য দেশগুলোও নারীদের চিকিৎসা পেশায় পূর্ণ প্রবেশের অনুমতি দিতে থাকে।

কিন্তু চিকিৎসাসেবায় পুরুষের সমঅধিকার পাওয়ার জন্য আরো অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রায় মাঝামাঝি সময়ে এসে পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীদের কিছুটা সমঅধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়।

চিকিৎসা পেশায় বর্তমানে নারীদের যে অবস্থান সেটা একদিনে অর্জিত হয়। পৃথিবীর অন্যতম চ্যালেঞ্জিং এই পেশায় নারীরা শুধু সাফল্যই দেখাচ্ছেন না, একইসাথে নেতৃত্বে আসছেন। ৩০-৪০ বছর আগেও যেখানে আমাদের দেশে নারী চিকিৎসক খুঁজে পাওয়া যেতো না সেখানে আজ মেডিকেল কলেজগুলোতে প্রায় অর্ধেক কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি নারী শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন।

এটা কারো দয়ায় হয় নি, এটা তারা করতে পেরেছেন তাদের যোগ্যতা ও চিকিৎসাসেবার জন্য। এছাড়াও ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার ও দৃঢ় মানসিকতার পরিচয় তো ছিলই। এই মহীয়সীরা একইসাথে পারিবারিক, সামাজিক ও খুব কঠিন একটি পেশাগত জীবন একইসাথে চালিয়ে নেয়ার জন্য প্রাণপন কষ্ট করে যান। যারা তাদের মৃত্যু পথযাত্রী রোগীদের বাঁচাতে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ছোট-বড় আনন্দের মুহূর্তগুলোকে ত্যাগ করেন এবং অন্য একজন নারী যাতে নিরাপদভাবে তার সন্তানের মুখ দেখতে পারে সেজন্য নিজের সন্তানকে ঘুমে রেখে গভীর রাতে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারগুলোতে নির্ঘূম রাত কাটান কৃতজ্ঞতা রইলো সেইসব মহিয়সী নারীদের প্রতি।

ডা. কামরুল ইসলাম শিপু
শিক্ষানবিস চিকিৎসক


ঢাকা, মার্চ ০৮(বিডিলাইভ২৪)// এ এম
 
        print


মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.