bdlive24

দলের নয় দেশের অধিনায়ক “মাশরাফি”

বুধবার এপ্রিল ১২, ২০১৭, ১২:৫৭ এএম.


দলের নয় দেশের অধিনায়ক “মাশরাফি”

বিডিলাইভ ডেস্ক: অধিনায়ক কৌশিক! জানিনা এই নাম সবার জানা কিনা? তবে বাংলাদেশে তার চেয়ে বড় সেলেব্রেটি আর কেউ নাই। তিনি শুধু ক্রিকেট প্রেমীদের নয় বরং পুরো দেশে তার অগণিত সমর্থক যা ইতিমধ্যে প্রমাণ হয়ে গেল। বাংলাদেশের সমর্থকদের তো বটেই ক্রিকেট বিশ্বের অনেকের মনোযোগের কেন্দ্রে এখন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেট তার দখলে। ব্যথা-যন্ত্রণা তো তার নিত্যসঙ্গী। শুধু মনে নয়, ব্যথা ছিল শরীরেও। চোটের সঙ্গে লড়তে লড়তে ক্লান্ত হননি, ভেঙে পড়েননি; সংশপ্তকের মতো উঠে দাঁড়িয়েছেন বারবার। নতুন উদ্যমে ফিরেছেন মাঠে। দেখিয়েছেন সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স। হাঁটুর চোটের কারণে নি-ক্যাপ পরে মাঠে নামতে হয়। নামেন। কিন্তু এতকিছুর পরও নিজেকে শতভাগ উজাড় করে দিতে এতটুকু কার্পণ্য করেন না তিনি। কারণ তিনি অপরাজেয়। তিনিই মাশরাফি বিন মুর্তূজা।

বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ও ডানহাতি ফাস্ট বোলার মাশরাফি বিন মর্তুজা ১৯৮৩ সালের ৫ অক্টোবর নড়াইলে তার নানাবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। নানাবাড়ীতেই বড় হয়েছেন মাশরাফি। কারণ তার নানীর ধারণা-বিশ্বাস ছিল মাশরাফির মা সে সময় বাচ্চা-লালন পালনের উপযুক্ত নয়। আসলে বাবা-মার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় সে সময় মাশরাফির মার যেন কোনো কষ্ট না হয়, সেজন্য মাশরাফিকে নিজের কাছেই রেখেছিলেন তার নানী। মাশরাফির বাবার বাড়ি আর নানার বাড়ির দূরত্ব পাঁচ মিনিটেরও ছিল না। তাই শিশু মাশরাফির নানির কাছে থাকতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি।

গত ৪ এপ্রিল প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের নিজের ভ্যারিফায়েড ফ্যান পেজে বিদায়ের বার্তাটি দেন। পরে শ্রীলংকার বিরুদ্ধে প্রথম টি-টোয়েন্টির টসকালে মাশরাফি জানান চলমান সিরিজই তার শেষ টি-টোয়েন্টি খেলা। মাশরাফির এই বিদায়ে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল বাংলাদেশি ক্রিকেট দর্শকদের মাথায়। স্বাভাবিকভাবে এটা এক বড় ধাক্কা তাদের জন্য। কারণ মাশরাফির মতো খেলোয়াড়ের যে কোনো ফরম্যাট থেকেই বিদায় দর্শকদের মাঝে প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে এটাই স্বাভাবিক।

ক্রিকেটারদের নিয়ে দেশের দর্শকদের এক ধরনের উম্মাদনা আছে। আছে মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা। আছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিতর্কও। কিন্তু মাশরাফিই বোধহয় একমাত্র খেলোয়াড় যাকে দলমত নির্বিশেষে সবাই ভালবাসেন। এমনকি ক্রিকেট বোঝেন না তারাও অনেকে মাশরাফিকে পছন্দ করেন। খেলোয়াড় মাশরাফির চেয়ে অনেকগুণ বেশি জনপ্রিয় ব্যক্তি মাশরাফিও। যার কারণে মাশরাফির বিদায়ে বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়াটা স্বাভাবিক। এর মধ্যে অনেকে মাশরাফির বিদায়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড প্রধানের নেপথ্য ভূমিকা আছে বলেও অভিযোগ করছেন। অভিযোগের তীর আছে হাথুরুর দিকেও।

অনেকেই ভেবে রেখেছিল মাশরাফি ২০১৯ বিশ্বকাপের পর সব ধরণের ক্রিকেটকেই বিদায় বলবেন। বা হয়তো খুব জলদি হলেও ২০১৭ এর জুনে আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর শেষ বলবেন। কিন্তু শুধু টি-টোয়েন্টি যে তিনি এভাবে ছাড়বেন তা ভাবেননি অনেকেই। কারণ, তিনি তো ২০ ওভারের ক্রিকেটকেও সেভাবে আলাদা করে দেখেন না। যদিও ফরম্যাটটাকে যে খুব বেশি ভালোবাসেন না অন্য দুই ফরম্যাটের মতো তা নিজেই বলেন। কিন্তু খেলতে নামলে সব সমান। দেন জান-প্রাণ উজাড় করে।

মাশরাফি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গতির বোলার এবং সমর্থকদের কাছে "নড়াইল এক্সপ্রেস" নামে পরিচিত। তবে নড়াইল এক্সপ্রেস এমন এক ক্রিকেটার, পরিসংখ্যান দিয়ে তার অবদান কোনভাবেই মাপা যাবে না। মাশরাফি মাঠে থাকা মানেই যেন বাড়তি কিছু। সে ম্যাশই আর টি-টোয়েন্টিতে নামবেন না লাল সবুজের জার্সি পড়ে। এটাই এখন নির্মম বাস্তবতা।

বাংলাদেশের গর্ব, বাংলাদেশ দলের সেরা অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা যার পা দুটো বেইমানি করলেও ঘাড়ের রগ বাঁকা করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন প্রতিপক্ষ দলগুলোকে। আমরা সবাই কম বেশি জানি, মাশরাফিকে এখনও মাঠে নামার আগে আধঘণ্টার বেশি সময় নিয়ে হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বাঁধতে হয়। মাশরাফি নিজ হাতে সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে বের করেন তার হাঁটুতে জমে থাকা পানি। তবুও দেশের টানে খেলে গেছেন এতোটা বছর। তার অসাধারণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এত দূরে আসতে পেরেছে।

সেই ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে আমরা বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে দেখতে পেরেছি ওয়ানডেতে। কিন্তু এই বদলে যাওয়ার পেছনের নায়কটির কষ্টের অবদানটা হয়তো আমাদের চোখে খুব কমই পরেছে। প্রত্যেকটি খেলা শেষে যখন দলের খেলোয়াড়রা জয়ে উল্লাশ করতে থাকেন তখন আমাদের চোখের মনি মাশরাফি ড্রেসিং রুমে বসে সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে বের করেন তার হাঁটুতে জমে থাকা পানি। কিন্তু তখন জয়ের পেছনের নায়কের কষ্ট আমরা কেউই মনে রাখি না।

এই আমাদের মাশরাফি, যিনি দেশের জন্য অনবরত খেলে যাচ্ছেন নিজেকে উজাড় করে। যিনি নিজেও জানেন আর একবার হাঁটুর ইনজুরিতে পড়লে তিনি আর দাঁড়াতে পারবেন না। ছোট-বড় মিলিয়ে তার হাঁটুতে অন্তত ১১ বার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। তবুও খেলে গেছেন বাংলাদেশ দলের এই রঙ্গিন জার্সির অধিনায়ক।

আজ ১১ই এপ্রিল, এই মুহূর্তে একটি বিষয় মনে পড়ছে। গত ৬ই এপ্রিল পাশের বাড়ির মেয়েখ্যাত দুই বাংলার তুমুল জনপ্রিয় মহানায়িকা সূচিত্রা সেনের জন্মদিন। অপ্রাসঙ্গিক তারপরও এখানে সূচিত্রা সেনকে আনলাম এই কারণে যে, সূচিত্রা সেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা থাকতেই হঠাৎ অন্তরালে চলে গেলেন। এই কথা সেই কথা অনেক কথা হল। কত গল্প কাহিনী হল। কিন্তু সূচিত্রা জীবিত অবস্থায় আর জনসম্মুখ্যে আসলেন না। সারা জীবনের জন্য দর্শকদের কাছে একটা আক্ষেপ রেখে গেলেন।

এমনও তো হতে পারত সুচিত্রার অভিনয় করা পরের সিনেমাগুলো দিয়ে আর দর্শকদের মন জয় করতে পারতেন না। ফ্লপ কিংবা সুপার ফ্লপ হতেন। হওয়াটা তো অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। সম্ভাবনার কথা বললাম। কিন্তু সুচিত্রা একটা জায়গায় গিয়ে থেমে গেলেন। তাই মৃত্যুর পরও একই রকম জনপ্রিয় রয়ে গেলেন তিনি। ঠিক সময়ে থামতে পারাটাও জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কখনো কখনো। তাই আমি মনে করি টি-টোয়েন্টি থেকে মাশরাফির এই বিদায় খেলোয়াড় মাশরাফিকে নিয়ে আমাদের মানে দর্শকদের মাঝে একটা আক্ষেপ তৈরি কিংবা আপ্লুত করলেও ক্রিকেটের জন্য মাশরাফির জন্য ঠিক হয়েছে। আরেক দিক দিয়ে ভাবলে মাশরাফিও থেকে গেলেন মানুষের ভালবাসায়।

সংক্ষেপে “মাশরাফি বিন মর্তুজা”র পরিচয়

পূর্ণ নাম: মাশরাফি বিন মর্তুজা
জন্ম: ৫ই অক্টোবর ১৯৮৩ (বয়স ৩৩) নড়াইল, বাংলাদেশ
ডাকনাম: কৌশিক
উচ্চতা: ৬”৩ (১.৯২ মি)
ব্যাটিংয়ের ধরণ: ডানহাতি
বোলিংয়ের ধরণ: ডানহাতি মিডিয়াম ফাস্ট
দলে প্রধান ভূমিকা: বোলার
স্ত্রীর নাম: সুমনা হক সুমি
বিবাহ: ২০০৬ সাল।


লেখক: মুজাহিদুল ইসলাম (জিহাদ)

শিক্ষার্থী- সাংবাদিকতা বিভাগ
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।


ঢাকা, এপ্রিল ১২(বিডিলাইভ২৪)// জেড ইউ
 
        print


মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.