সর্বশেষ
শনিবার ১১ই ফাল্গুন ১৪২৪ | ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সিনিয়র সিটিজেন-এর প্রতি অবহেলা নয়

বুধবার ১২ই এপ্রিল ২০১৭

1631289352_1491993741.jpg
খুলনা ব্যুরো :
জন্মিলে মরিতে হবে যেমন সত্য তেমনি বেঁচে থাকলে বার্ধক্য আসবেই এ কথাটাও সত্য। অমৃত আর গরলে মিশানো মানুষের জীবন চক্রের শৈশব, কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে সর্বশেষ এবং স্বাভাবিক পরিণতি হচ্ছে বার্ধক্য।

বার্ধক্য স্বর্বজনীন। বেঁচে থাকলে বার্ধক্যের স্বাদ নিতে হবেই। আপনার আমার চারপাশের বৃক্ষ, লতা, গুল্ম, পশু, পাখি সব কিছুরই বয়স প্রতিদিনই বাড়ছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন বিষয়। বলা হয়ে থাকে, যদি তোমার চেয়ে কারো বয়স একদিন বেশি হয়ে থাকে, তবে তোমার চেয়ে তার কমপক্ষে একটি অভিজ্ঞতা বেশি আছে। মানুষ বয়স্কদের নিকট হতেই বেশি শেখে।

বয়স্ক ব্যক্তিগণ তাদের জীবনের নানান অভিজ্ঞতার আলোকে অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কদের উপদেশ দিয়ে থাকেন, আদব কায়দা শিখিয়ে থাকেন। এইসব বয়স্ক মুরুব্বী লোকজনের নিকট হতে সুপরামর্শ নিয়ে যাপিত জীবনের অনেক সমস্যাকেই সমাধান অথবা পাশ কাটানো সম্ভব। বয়স্ক ব্যক্তিগণ সমাজের বোঝা নয়, সম্পদ। আজকে বয়স্ক, বৃদ্ধ, বলে যাদের ভালো মন্দের খোঁজ খবর আমরা নিচ্ছি না, আমাদের মনে রাখা উচিত, তাদের কারণেই তো আমাদের এই পৃথিবীতে আসা।

তারাই তো আমাদের বড় করার জন্য তাদের জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেছেন। হয়তো না খেয়ে থেকেছেন, সন্তানকে পেট ভরে খাওয়ানের জন্য। আজ তারা প্রবীণ। আজ তারা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। অবহেলা, বঞ্চনা নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি নানান কারণে আমরা তাদের সমাজের বোঝা হিসেবে দেখছি।

প্রবীণ ব্যক্তিগণ শারিরিক শক্তির অভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। অথচ আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পিছনে তাদের ভূমিকাই প্রবল। আমাদের পারিবারিক বন্ধনগুলো এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, যেখানে আমরা যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, নিজেকে ছাড়া আর কোনো কিছু চিন্তা করতে পারছি না। চিন্তা করার মতো পর্যাপ্ত সময়ও আমাদের নেই। যে যার প্রয়োজনে ছুটছি তো ছুটছিই। পাশের মানুষটি কেমন আছে তা জানার সময় নাই, উপলব্ধির সময় নাই। সময় আজ আমাদের বলে দিচ্ছে, আমরা কতটা আত্মমগ্ন হয়ে যাচ্ছি। এই আত্ম মগ্নতা, আত্ম-কেন্দ্রিকতার কারণে ঘরের বৃদ্ধ মানুষটি, যিনি কিনা আপনার অসুখ-বিসুখে, সুখে-দুঃখে, বিপদে আপদে ছায়ার মতো থেকে আপনাকে বড় করে তুললো, সেই মানুষটি এখন অসহায় জীবন-যাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

চাকরি আর জীবনের নানান ক্ষেত্রে আজকাল যে হারে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষকে অনেক শ্রম ও সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে, বেশীরভাগ চাকরিজীবীরা পরিবারে প্রয়োজন মতো সময় দিতে পারছেন না। পরিবারের ছোট শিশুটিরও ব্যস্ততা কম কিসে? সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় লেখাপড়ার চাপ। তারপর স্কুল, কলেজ, কোচিং, প্রাইভেট নিয়ে কেটে যায় সারাদিন। প্রতিদিন একই দিন, একই রুটিন। শিক্ষা ব্যবস্থার এই অবস্থার কারণে আমাদের সন্তানদের মানসিক অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে। শিশুরা নিজের মতো করে খেলাধূলা করবে, সে সুযোগ পাচ্ছে না তারা।

প্রতিদিন একই ফর্মূলায় চালিত হচ্ছে আমাদের শিশুরা। ফলে, ঘরের বৃদ্ধ দাদা-দাদী বা নানা-নানীর জন্য সময় বের করতে পারছে না তারাও। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজনরাও এমন জীবন অতিবাহিত করছেন যে, পাশের বাড়ির মানুষটির খোঁজ করার মতো সময় তারা বের করতে পাচ্ছেন না। যার দরুণ ঘরের বৃদ্ধ মানুষটি নিজেকে সম্পূর্ণ একা আর অসহায় মনে করছেন। যে সন্তানকে ঘিরে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন বুনেছিলেন, বাবা-মা, সেই সন্তান আজ বড় হয়ে চাকরি করছেন দূরে কোথাও, আর তাদের পিতা মাতা চির পরিচিত মাঠ, ঘাট, পথ-প্রান্তর, বৃক্ষ-লতাদি, হাস-মুরগী, পশু, পাখির মমতা ছেড়ে যেখানে যেতে পারছেন না। আবার সন্তানের কাছে গেলেও পরিবেশগত নানান কারণে সেখানে তারা মেনে নিতে পারছেন না। অথবা সন্তান বা স্বামী-স্ত্রী উভয়ই চাকরি করায় বৃদ্ধ মা-বাবাকেও একাকীই থাকতে হচ্ছে।

ফলে, তারা সেখানেও নিঃসঙ্গতায় ভুগছেন। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাও প্রবীণদের নিঃসঙ্গতায় ফেলে দিয়েছে। আগে যৌথ পরিবার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ছিল, এখন তা ভেঙ্গে একক পরিবার ভিত্তিক রূপ নিয়েছে। এই একক পরিবার ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের নীরব শিকার হচ্ছেন প্রবীণ জনগোষ্ঠী। অশিক্ষা, দরিদ্র্যতা, ভূমিহীনতা, বস্তুতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা, ব্যক্তি স্বতন্ত্র্যবোধ, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিবর্তন, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, গ্রাম হতে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা, ইত্যাদি নানাবিধ কারণেও প্রবীণ জনগোষ্ঠী অবহেলার শিকার হচ্ছেন। দরিদ্র পরিবারের প্রবীণরা অনেকটা নিরুপায় হয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে নানান কঠিন ও শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লিপ্ত হচ্ছেন। অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তির মতো মানবেতর পেশাও বেছে নিচ্ছেন।

বর্তমানে চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে, পুষ্টি আর স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের কারণে মানুষের মৃত্যুহার যেমন একদিকে কমেছে, তেমনি মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে। মানুষের গড় আয়ু বাড়ার কারণে পৃথিবীতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০০ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ ছিল প্রবীণ জনগোষ্ঠী আর বর্তমানে এ হার প্রায় ১২.৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ২১ শতাংশে উন্নীত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের এক হিসাবে বলা হয়েছে, ১৯৫০ সালে বিশ্বে ৬০ বছর এবং তার উর্ধ্বের মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ২০ কোটি, ১৯৭৫ সালে তা ৩৫ কোটি এবং ২০১০ সালে বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ কোটি। বলা হচ্ছে, এই প্রবীণের সংখ্যা ২০২৫ সালে একশত ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে নাকি প্রতি মাসে ১০ লক্ষ বা ১ মিলিয়ন মানুষ মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সাথে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। ২০০০ সালে বিশ্বে প্রবীণদের শতকরা ৬২ শতাংশের বসবাস ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। আর ২০২৫ সাল নাগাদ এই হার ৭১ শতাংশে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রবীণদের প্রায় ৮০ শতাংশেরই বসবাস হবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ জনসংখ্যায় ভরপুর একটি দেশ, ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ।

এদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে প্রায় এক হাজার ২০০ জনের উপরে মানুষ বসবাস করে। এই মানুষগুলোর মধ্যে প্রবীণ জনসংখ্যার হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা উদ্বেগজনক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে সামাল না দেওয়া যায়। বর্তমানে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ। দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি হলে প্রবীণের শতকরা হার হয় ৮ শতাংশের উপরে। মনে করা হচ্ছে, প্রবীণের এই হার ২০২৫ সালে ১৭ মিলিয়ন বা এক কোটি ৭০ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে এবং ২০৫০ সাল নাগাদ তা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার হিসাবে কোনো অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ হতে ১২ ভাগ প্রবীণ হলে ঐ জনসংখ্যাকে প্রবীণ জনসংখ্যা বলা হয়। এই প্রবীণদের সমাজ ও পরিবারে মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠা করা, শেষ জীবন আনন্দময় করা এবং তাদের কর্মমুখী করে রাখাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিতে ২০১৩ সালে তৎকালীন সরকার (বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার) উদ্যোগ গ্রহন করে। এই উদ্যোগের অংশ হিসাবে ৬০ বছর এবং এর বেশী বয়ষী নাগরিকদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসাবে স্বীকৃতির বিধান রেখে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩’ প্রস্তুত করা হয়।

২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ঐ বছরের নভেম্বর মাসে মহামান্য রাষ্ট্রপতি দেশের এক কোটি ৩০ লাখ ব্যক্তিকে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসাবে ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে প্রবীণ নীতিমালার আলোকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে কর্মপরিকল্পনাও করে সরকার। তবে তার সুফল এখনো প্রবীণ এই জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় নাই। প্রবীণরা যেন নামেই সিনিয়র সিটিজেন হয়ে আছেন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, এই আজকের প্রবীণ মানুষগুলোই এক সময় আমাদের জন্য তাদের জীবন অতিবাহিত করেছেন। আমরা যদি তাদের জন্য সময় বের করতে না পারি তবে, ভবিষ্যতে আমাদের সাথে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম একই ব্যবহার করতে পারে। যে ঘরে মা বাবা ভাই বোন একত্রে একসাথে মিলেমিশে বেড়ে ওঠে, সেই ঘরেই যদি বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার এতটুকু স্থান না হয়, সেই মা বাবাকে যদি শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধাশ্রমেই থাকতে হয়, তবে বাঙালী সংস্কৃতির যে বন্ধন, যুগ যুগ ধরে চলে আসা আমাদের পারিবারিক যে দায়বদ্ধতা, তা হুমকির মুখে পড়বে এবং তা শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিশৃঙ্খলতার সৃষ্টি করতে পারে। ব্যস্ততা থাকবে, ব্যস্ততা আরো বাড়বে। এটাই স্বাভাবিক।

তদুপরি, পরিবারের প্রতিটি সদস্য যদি একটু সহানুভূতিশীল হয়, বাইরের ব্যস্ততা শেষে বাড়িতে এসে যদি কিছুটা সময় বাড়ির বৃদ্ধ মানুষের সাথে দুটো কথা বলে ব্যয় করা যায়, তাহলে সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি হয়। আলাপচারিতার মাঝেই প্রবীণদের অভিজ্ঞতা হতে আমরা অনেক কিছু শিখতেও পারি। ঘরের অভিভাবকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের এ বিষয়ে উৎসাহিত করতে হবে। সমাজে আন্তঃ প্রজন্ম যোগাযোগের চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তঃ প্রজন্ম যোগাযোগ বৃদ্ধি পেলে নবীণ-প্রবীণের সেতু বন্ধন তৈরি হবে, মানবিকতাবোধ জাগ্রত হবে। ফলে, সামাজিক ভারসাম্য বজায় থাকবে।

প্রবীনদের জীবনের বিভিন্ন দিক এবং মর্যাদা সম্পর্কে গণসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এ সকল সিনিয়র সিটিজেনদের এক কালের যৌবনের নিরলস শ্রম আর কঠোর নিষ্ঠার কারণেই আমরা আজ এই অবস্থানে আসতে পেরেছি। আমাদের সন্তানদের বৃঝাতে হবে, তারাও বৃদ্ধ হবে। তাদেরও একই রকম অবস্থা হতে পারে। ঘরের অন্য সদস্যদের, আমাদের সন্তানদের যদি এখন থেকেই এ শিক্ষাটি দিতে না পারি, তবে আমাদের অবস্থা আরো ভয়াবহ হতে পারে।

আরেকটা বিষয়, আজও বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই গ্রামে বসবাস করে। স্বভাবতই, গ্রামাঞ্চলেই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বা সিনিয়র সিটিজেন-এর সংখ্যাও বেশি। গ্রামের এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী, তাদের জন্য প্রাপ্য বিভিন্ন সেবা বিশেষ করে চিকিৎসা সেবা শহরের প্রবীণগণের চেয়ে কম পেয়ে থাকেন। গ্রামের প্রবীণ জনগোষ্ঠী পারিবারের অন্য সদস্যদের নিকট হতে সাধারণত কম মনোযোগ পেয়ে থাকেন।

এই সমস্ত সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য আমাদের উপর অর্পিত কর্তব্য, আমাদের দায়-দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না যে উন্নয়নের কথাই আমরা বলি না কেন, তা টেকসই হবে বলে মনে হয় না। অগ্রজ জনগোষ্ঠীকে পিছনে না রেখে, মনের সাথে, মানের সাথে নিয়ে চলাই ভালো।

খন্দকার রাহাত মাহমুদ

ঢাকা, বুধবার ১২ই এপ্রিল ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এ এম এই লেখাটি 904 বার পড়া হয়েছে