bdlive24

কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

বুধবার এপ্রিল ১২, ২০১৭, ০৬:৪৭ পিএম.


কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি ও বাস্তবতা

বিডিলাইভ ডেস্ক: অবশেষে অনেক দিনের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদ্রাসাকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে। আরো সুস্পষ্ট করে বললে কওমি দাওরায়ে হাদিস সনদকে স্নাতকোত্তর মর্যাদা দেওয়ার কথা। আপাত দৃষ্টিতে ভালো ও আশাব্যঞ্জক।

এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ। দেশের এই পরিস্থিতিতে এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়াটাকে তার দূরদৃষ্টি হিসেবেই আমরা গ্রহণ করছি।

এ স্বীকৃতিতে আমরা, সম্ভবত দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠি, খুশি। কারণ –

১. দেরিতে হলেও কওমি শিক্ষাকে দেশের মূলধারায় আনার একটা বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হল।

২. আলেমদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করা হল (কওমি আলেমগণ যেহেতু প্রত্যক্ষভাবে এর সাথে যুক্ত এবং তারা নিজেরাই তা চাচ্ছেন, সেক্ষেত্রে তাদের দাবি পূরণ হওয়ায় তাদের খুশিতে আমরাও খুশি বৈকি)।

৩. সামাজিক অবস্থানের দিক থেকেও এ স্বীকৃতি কাজ দেবে দাবি করা হচ্ছে। যদিও বাস্তবতা হচ্ছে, তাদের সামাজিক অবস্থান আগের মতই থাকবে বলে মনে হচ্ছে।

৪. একটা জাতীয় ঐক্যের সূচনাও এতে হতে পারে। যদি ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তবেই।

সিদ্ধান্তটিকে নেতিবাচকভাবে না দেখে, ইতিবাচকভাবে দেখলেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। যেমন-

ক. দাওরায়ে হাদীসকেই যদি শুধু স্নাতকোত্তর মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার বাকী স্তরের কি অবস্থা হবে। স্নাতক না করেই কীভাবে একজন স্নাতকোত্তর হন? কিংবা কোন নিয়োগে প্রার্থী কীভাবে এসএসসি কিংবা এইসএসসি এর সার্টিফিকেট দেখাবে? এমতাবস্থায় স্নাতকোত্তরের কি দাম?

খ. সমমান বা মর্যাদা দেওয়ার প্রেক্ষিতটাও সমান হওয়া দরকার। আছে কি? দু’চারজন ব্যতিক্রমকে ধরে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সাধারণ/এভারেজ অবস্থাটাই কি বিবেচ্য নয়?

গ. একমুখী শিক্ষার আন্দোলন যখন আবারো জোরদার হবে, তখন এই ধারার শিক্ষার কি হবে? পরিবর্তন নাকি আবারো নীড়ে ফিরে যাওয়া? কোনটাই আমাদের জন্য সুখকর হবে না, এটা নিশ্চিত। ইত্যাদি।

আরো কিছু বিষয় সম্ভবত ভাবার আছে। সম্ভবত এইগুলোই নির্ধারণ করবে এই সিদ্ধান্তের সফলতা ও ব্যর্থতা। যেমন-

১. সমতার প্রশ্নে যদি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রমকে আধুনিকায়ন করা হয় তখন কেমন হবে? আধুনিকায়ন বলতে আমি, প্রচলিত পাঠক্রমের সাথে প্রতিটি শ্রেণিতেই নতুন কিছু পাঠ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি বুঝাচ্ছি। এতে শিক্ষার্থীরা মূল দীনী বিষয়ের জ্ঞানার্জনে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, সন্দেহ নেই।

২. সরকারি নজরদারী বা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন আসবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন শিক্ষাবিদ সরকারি প্রতিনিধি রাখার কথা বলেছে। এখন হয়ত কওমি আলেমদের শর্ত মেনে নিয়ে দেওবদী নিসাবেই (পাঠ্যক্রমে) স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ভবিষ্যতে এই দাবি জোরদার হবে না তার নিশ্চয়তা কি? আর এটা যৌক্তিকও বটে।

৩. সমাজ-সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীনভাবে বলার যে স্বাধীনতা কিংবা আত্মশক্তি এতদিন কওমি আলেমগণ লালন করছিলেন, সেটা থাকবে তো? সরকার ও রাজশক্তি থেকে দূরে থাকার যে আদর্শ সালাফগণের ছিল, এটা থেকে বিচ্যুত হয়ে আমাদের আলেমগণ ভুল করলেন কি না এটা সময়ই বলে দেবে।

আমার অভিজ্ঞতা বলে, শুধু মসজিদের চাকুরী বাঁচানোর জন্য অনেক ইমাম ও আলেম সত্য এড়িয়ে যান। এক্ষেত্রে সরকারি সার্টিফিকেটের প্রভাবে দীন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সত্য কথা বলায় যে কিছু না কিছু প্রভাব আসবে তা বলার জন্য গণক হতে হয় না।

মন্তব্য:
মোটের উপর, কওমি মাদ্রাসার এ স্বীকৃতি খুবই ইতিবাচক, সন্দেহ নেই। দেশের প্রায় ১৫ লক্ষ শিক্ষার্থীর সাথে সাথে সবার জন্যই এটি একটি আনন্দবার্তা। এতে আমাদের সরকারের সদিচ্ছারও প্রমাণ। এজন্য তারা ধন্যবাদার্হ।

কিন্তু সন্দেহ, কাজটা বিজ্ঞজনোচিত হলো তো? কিংবা এর সফলতা কি এর ব্যর্থতাকে ছাপিয়ে যেতে পারবে? আমাদের এখনই চিন্তা করা উচিত। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, শিক্ষার অবস্থান ইত্যাদি সার্বিক দিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে হয়ত ভবিষ্যতের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এর কথাও মাথায় রাখা একান্ত কর্তব্য। ''এতদিন যখন চলে এসেছে, তখন এখনই বা কি এমন দরকার পড়ল সরকারি মর্যাদার?'' - এর উত্তরও সম্ভবত জানার ও মূল্যায়নের সময় এসেছে। তাছাড়া সমমান দরকার নাকি বিশেষ মর্যাদা ও সুযোগের দরকার এটাও ভাবার বিষয়।

আমরা আশা রাখি, আমাদের সকল সন্দেহ সন্দেহ হিসেবেই থাকবে, বাস্তব রূপ লাভ করবে না। আমাদের নীতিনির্ধারকগণ, আমাদের আলেমগণ এ বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। তা না হলে, সাময়িক প্রাপ্তির আনন্দে খাওয়া মিষ্টি অসুস্থতাও বাঁধিয়ে দিতে পারে; ডায়াবেটিস হলে তো সারা জীবনের জন্যই আফসোস করা ছাড়া আর কিছু থাকবে না।

বি.দ্র.– আম ব্যক্তিগতভাবে কওমি কিংবা সরকার, কোনটার সাথেই প্রতক্ষ্যভাবে জড়িত নই। কিন্তু যেহেতু এদের উভয়কে নিয়েই আমরা, সেহেতু নিরপেক্ষ অবস্থান থেকেই বলার চেষ্টা করেছি যেন উভয় দিকেরই কল্যাণ হয়। আর এটাই সম্ভবত সকলের কাম্য। যদি সবাই মিলে ভালো মনে করেন, তাহলে আমরাও একে আন্তরিক স্বাগত জানাই।

লেখক:
মোস্তফা মনজুর,
সহকারী অধ্যাপক,
ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ।


ঢাকা, এপ্রিল ১২(বিডিলাইভ২৪)// কে এইচ
 
        print


মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.