bdlive24

কালের বিবর্তনে ঐতিহ্য হারাচ্ছে বিউটি বোর্ডিং

শনিবার এপ্রিল ১৫, ২০১৭, ০১:১৩ পিএম.


কালের বিবর্তনে ঐতিহ্য হারাচ্ছে বিউটি বোর্ডিং

বিডিলাইভ ডেস্ক: বিউটি বোর্ডিং বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র বা ইতিহাসের ভিত্তিভূমি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য বিউটি বোর্ডিংকে বিভিন্ন সাহিত্য, কবিতার আঁতুড়ঘর বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না। পুরান ঢাকার যানজট মাড়িয়ে বাংলাবাজারে ঢুকেই প্যারিদাস রোডের পাশেই শ্রী শ্রী দাস লেন। এর একটু মোড় নিলেই চোখে পড়বে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ফিকে হলুদ রঙের একটি দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে প্রশস্ত উঠোন। শ্যামল-সবুজে ঘেরা। একেবারে আড্ডার উপযোগী জায়গা। বিউটি বোর্ডিং ও এর আড্ডার ইতিহাস চল্লিশের দশক থেকেই সুখ্যাতি লাভ করেছিল। সমমনা লোকদের তখন বিভিন্ন বিষয়ে চলত তোলপাড় করা সব আড্ডা।

বিউটি বোর্ডিং নিয়ে সাহিত্যিকদের স্মৃতিচারণ:
অনেক কবি-সাহিত্যিকেরই লেখা তৈরির বহু ইতিহাস রয়েছে এই বিউটি বোর্ডিংয়ে। বুলবুল চৌধুরী তার আত্মজীবনী মূলক বই ‘অতলের কথকতা’তে তার এক বন্ধু কায়েস আহমেদ সম্পর্কে লিখেছেন “কায়েস আহমেদই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল বিউটি বোর্ডিং এ জড়ো হওয়া কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিকের সামনে। বিউটি বোর্ডিং এ সমবেত হতে পারার মাধ্যমে দেশের অনেক নবীন প্রবীণ সাহিত্যিকের কাছাকাছি হতে পেরেছিলাম।”

সৈয়দ শামসুল হককে নিয়ে বলতে গিয়ে আসাদ চৌধুরী বলেছেন, ‘বেশ মনে পড়ে বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং এ তার সাথে প্রথম দেখা হয়।’

শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘মনে পড়ে একদা যেতাম প্রত্যহ দুবেলা বাংলা বাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই বিউটি বোর্ডিংয়ে পরস্পর মুখ দেখার আশায় আমরা ক'জন।’

বেলাল চৌধুরী তার ‘সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় ভেসে’ বইয়ে বেশ কয়েক জায়গায় বিউটি বোর্ডিং সম্পর্কে লিখেছেন।


বিউটি বোর্ডিংয়ের ইতিহাস:
বাড়িটি ছিল নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগে ওই দালানে গড়ে উঠেছিল ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার কার্যালয়, সঙ্গে ছিল ছাপাখানাও। সাপ্তাহিক পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়। এ সূত্রেই ভবন মুখর হয়ে ওঠে শিল্পী, কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণয়। সোনার বাংলা পত্রিকাতেই ছাপা হয় শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা। দেশ ভাগের সময় পত্রিকার কার্যালয়টি নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়।

১৯৪৭ পরবর্তী দুই বছর খালিই পড়েছিল ভবনটি। ১৯৪৯ সালে তা ভাড়া নেন মুন্সীগঞ্জের দুই ভাই নলিনী মোহন সাহা ও প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা। যাত্রাটা হল খুবই সাদামাটাভাবে। প্রথম দিকে দুই-একটি রুম ভাড়া দেওয়া হত। কিন্তু পরে চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কক্ষের সংখ্যা বাড়াতে হয়। ব্যবসা জমে উঠলে তৎকালীন জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের কাছ থেকে ১১ কাঠা জমি নিয়ে তাতে গড়ে তোলেন এই বিউটি বোর্ডিং। নলিনী মোহনের বড় মেয়ে বিউটির নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে। বর্তমানে এর মালিক প্রহ্লাদ সাহার দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহা।

যাদের পদচারণ হতো বিউটি বোর্ডিংয়ে:
পঞ্চাশ, ষাট আর সত্তরের দশক ছিল বিউটি বোর্ডিং এর যৌবনকাল। এ সময় আড্ডা দিতে আসতেন সে সময়ের প্রথিতযশা সাহিত্যিকেরা।

কবি শামসুর রাহমান থাকতেন আশেক লেনে এবং কবি সৈয়দ শামসুল হক থাকতেন লক্ষ্মীবাজারে। কবি শামসুর রাহমানের সাথে এই বিউটি বোর্ডিং'ই পরিচয় হয়েছিল কবি সৈয়দ শামসুল হকের। আর বিউটি বোর্ডিং'র সাথেই অন্য আর একটা পুরনো দালানের দোতলায় থাকতেন কবি শহীদ কাদরী। বিকেলে বোর্ডিং'র সবুজ চত্বরে এক কাপ চা কয়েকজনে ভাগ করে খেতে খেতে তখনকার শিল্পী সাহিত্যিকেরা মেতে উঠতেন জমজমাট আড্ডায়।

এখানে আড্ডা দিতে আসতেন হাসান হাফিজুর রহমান, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, ফজলে লোহানী, কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্য সাহা, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী, ভাস্কর নিতুন কুণ্ডু, কবি আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সমর দাশ, রণেশ দাসগুপ্ত, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সত্য সাহা, গোলাম মুস্তফা, বেলাল চৌধুরী, আনিসুজ্জামান, খান আতাউর রহমান, প্রবীর মিত্র, নায়করাজ রাজ্জাক, সন্তোষ গুপ্ত, ফজল শাহাবুদ্দিন, কবি ইমরুল চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, শফিক রেহমান, আসাদ চৌধুরী, ফয়েজ আহমদ প্রমুখ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই ঐতিহাসিক স্থানে এসেছিলেন নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু ও পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। এসেছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।

বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডায় সৃষ্ট সাহিত্যকর্ম:
আড্ডা বা ইতিহাসের কেন্দ্রভূমি যাই বলি না কেন, তৎকালীন প্রগতিশীল লেখকদের আড্ডার জন্য এটি ছিল সবার প্রিয় স্থান। আর আড্ডা দিতে দিতেই অনেকেই লিখে ফেলতেন তার বিখ্যাত কোনো লেখা বা কোনো কর্ম।

এখান থেকেই ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় কবিতাপত্র ‘কবি কণ্ঠ’। তারপর আহমদ ছফার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘স্বদেশ’ এবং আরো বেশ কয়েকটি সাহিত্য সাময়িকী। কবি সৈয়দ শামসুল হকের লেখালেখি করার জন্য একটা নির্দিষ্ট টেবিল এবং চেয়ার ছিল। এই বিউটি বোর্ডিং'এ বসেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর পরিকল্পনা করেছিলেন পরিচালক আব্দুল জব্বার খান।

সমর দাস অনেক বিখ্যাত গানের কথায় সুর বসিয়েছেন এখানে আড্ডা দেয়ার ফাঁকেই। ১৯৭১ সালে সেই আড্ডায় ছেদ পড়ে। পাক হানাদার বাহিনী জেনে যায় বাঙালির এই সাহিত্য সংস্কৃতির মানুষদের মিলন মেলার কথা।

একাত্তর পরবর্তী আড্ডায় বসেই সৈয়দ শামসুল হক লিখেছেন তার বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলো, যার মধ্যে অন্যতম অনুপম দিন, এক মহিলার ছবি, কয়েকটি মানুষের সোনালী ছবি, জনক ও কালো কফিন, সীমানা ছাড়িয়ে ও রক্ত গোলাপ প্রভৃতি।

বিউটি বোর্ডিংয়ের বর্তমান অবস্থা:
সময়ের বিবর্তনে বিউটি বোর্ডিং আগের মত আর জমেনি। আগের মত আড্ডা কিংবা লেখকেরা আসেন না। পুরান ঢাকার যানজট পেরিয়ে কেউ আর আসতে চায় না। তাছাড়া নতুন লেখকেরা সবাই নতুন ঢাকা থেকে আসতে চায় না। তবে আসে পাশে যারা থাকেন তারা মাঝে মাঝে আসেন। তবে মাঝে মাঝে কিছু বিউটিয়ান পরিবার এই স্মৃতি বিজড়িত স্থানে আসেন।

পশ্চিম বঙ্গের সাহিত্যিকদের মাঝে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার এসেছিলেন, সমরেশ মজুমদার ঢাকা আসলেই এখানে আসেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও এসেছিলেন।

বিউটি বোর্ডিং নিয়ে সমর সাহার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানান, একাত্তরে আমার বাবাসহ যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি মুর‍্যাল, একটি পাঠাগার এবং বিউটিয়ানদের একটি সংগ্রহশালা করতে চাই। যাতে করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাদের কিছু স্মৃতি ধরে রাখতে পারি।

বিউটি বোর্ডিংয়ের খাবার-দাবার:
এখানে আগের মতই খাবারের মূল্য একেবারে কম রাখা হয় তবে খাবারের মান ঠিক আছে। খাবারের তালিকায় দেখা যায় অনেক পদ। খিচুড়ি, মুরগির মাংস, খাসির মাংস, সবজি, বড়া, চচ্চড়ি, পোলাও, মুড়িঘণ্ট।

এছাড়া বাইলা, কাতলা, রুই, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুঁটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, আইড়, বোয়াল, কোড়ালসহ প্রায় সব ধরনের মাছ পাওয়া যায় এখানে। সকালের নাস্তা ২০ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে, দুপুর ও রাতের খাবার ৫০ থেকে ৬০ টাকা হলে যথেষ্ট। তবে সরষে ইলিশ খেতে ১০০ টাকা গুনতে হবে।

এখানে সবজি হয় নানা রকমের। বেগুনভাজি, করলা ভাজি, কচুশাক, লালশাক, কলাভর্তা, শিম ও মউ-শিমভর্তা আর ধনেপাতার ভর্তা প্রতিদিনকার মেন্যু। সকালে একসময় আটার রুটির রেওয়াজ ছিল। এখন সকালের রুটির জায়গা নিয়েছে ভাত, আলুভর্তা, ডিমভাজি আর ডাল। রাতের রান্না সীমিত আকারের। এক পদ মাছ, সবজি আর ডাল। তবে দধি এখানে তিন বেলাই পাওয়া যায়। বিউটি বোর্ডিংয়ের দধির খুব চাহিদা।

বিউটি বোর্ডিংয়ে এখনও থাকার ব্যবস্থা আছে। রয়েছে ২৫টি কক্ষ। এক বিছানায়ালা রয়েছে ১২টি কক্ষ, এক রাতের জন্য ভাড়া ২০০ টাকা। বাকিগুলো দুই বিছানায়ালা কক্ষ, ভাড়া ৩০০ টাকা।

বিউটি বোডিংয়ের যে সোনালী অতীত ছিল তা হয়তো আমরা ফিরে পাব না তবে আমরা চাই যেন এই ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়। নতুন প্রজন্মের কবি-সাহিত্যিকদের পদচারণয় আবারও জমে উঠবে বিউটি বোর্ডিংয়ের সেই সরস আড্ডা, প্রাণ ফিরে পাবে ইতিহাস ঐতিহ্যের বিউটি বোর্ডিং।


ঢাকা, এপ্রিল ১৫(বিডিলাইভ২৪)// এস আর
 
        print

এই বিভাগের আরও কিছু খবর







মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.