bdlive24

কুটির শিল্পকে বাঁচাতে শুধু একটু ইচ্ছার প্রয়োজন

রবিবার মে ০৭, ২০১৭, ০৬:৪৯ পিএম.


কুটির শিল্পকে বাঁচাতে শুধু একটু ইচ্ছার প্রয়োজন

বিডিলাইভ ডেস্ক: ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মধ্যে কুঠির শিল্প অন্যতম। রং এবং হাজারো নকশার অবয়বে ফুটে উঠে বাংলার ঐতিহ্য। সে সাথে আবহমান বাংলার চিরায়ত রুপ ধরে রাখে এই ঐতিহ্যবাহী কুঠির শিল্প। যার নির্মাতা পল্লী অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষগুলো। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং নিজেদের শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এসব পণ্য উৎপাদন করে থাকে মানুষগুলো। এ কুঠির শিল্পকে অনেকের মুখে কারুশিল্প, হস্ত শিল্প, গ্রামীণ শিল্পও বলতে শুনা যায়। এ শিল্পের বিস্তার এখন শহর অঞ্চলেও লক্ষ্যণীয়।

দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি সাধনে কুটির শিল্পের গুরুত্ব নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে, কৃষিতে জনসংখ্যার চাপ হ্রাস করতে, জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা নিশ্চিতকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কুটির শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশিয় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মাত্রা সম্প্রসারিত হলে মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমতে পারে। সাথে সাথে একথা বলারও অপেক্ষা রাখে না যে, গ্রামীণ অর্থনীতি যত সচল হবে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে বিরাজমান অসমতা ততটাই কমে আসবে। আর এ কুঠির শিল্পই পারে আর্থিক সচ্ছলতা আনয়নে মাইলফলক ভূমিকা রাখতে।

কিন্তু বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটির নেই তেজদীপ্ত অবস্থান। প্রবৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করতে আমরা দেখতে পাই যে, ২০০০-২০০১ আর্থিক বছরে এ খাতের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৬.৬ ভাগ এবং ২০০৮-২০০৯ অর্থবছর্রে প্রভিশনাল হিসেবে ঐ হার একই অবস্থানে রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ফলাফল একথা বলে যে, দেশের যে গ্রামগুলো এক সময়ে কুটির শিল্পকে আঁকড়ে ধরে তাদের জীবন-জীবিকার গতিধারা ভরে রাখতো আনন্দ-উচ্ছাসে। সময়ের ব্যবধানে সে গ্রামগুলো হারিয়েছে দীর্ঘকালের লালিত ঐতিহ্য। পরিবর্তন এসেছে তাদের পেশায়। বাঁচার জন্য তারা পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় করেছে মনোনিবেশ। অবশ্য পেশা পরিবর্তনকারী গ্রামীণ জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে কিন্তু দক্ষতা অর্জন করেছে পুরানো পেশায়ই।

ইতিহাসের প্রচীন এ শিল্প শুধু যে বাংলার চিরায়ত রুপ ধরে রেখেছে তা কিন্তু না। সেই সাথে ধরে রেখে শিল্পের সবচেয়ে বড় নিদর্শন। প্রাক-ব্রিটিশ বাংলায় সেসময় তৈরি হত মসলিন সুতিবস্ত্র। মুঘল যুগে কুঠির শিল্প সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভের পাশাপাশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরা প্রথমদিকে বাংলার কুটির শিল্পে উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির জন্য এ শিল্পে অর্থ জোগান দিত। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এ শিল্প বস্ত্রের চাহিদা মিটিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মৃৎ শিল্প, বস্ত্র শিল্প, নকশি কাঁথা, পাটজাত শিল্প, বাঁশ-বেত শিল্প, শীতল পাটি, কাঁসা-পিতল শিল্প এখন বিশ্ব দরবারে বাংলার ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

মৃৎশিল্প: মৃৎশিল্পের সাথে সম্পৃক্ত বহু পরিবার বংশানুক্রমিকভাবে বরিশাল, ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, পাবনা, বগুড়া এবং কুমিল্লায় জীবনযাপন করত। কিন্তু বর্তমানে মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, বাসনপত্র, কলস ইত্যাদির পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার কমে যাওয়ায় মৃৎশিল্পের মালিকরা উল্লেখিত সামগ্রীসমূহের উৎপাদন পূর্বের তুলনায় কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে মূলত ফুলের টবসহ অন্যান্য সৌখিন সামগ্রী উৎপাদন করে এ শিল্পটি বেঁচে আছে।

বস্ত্র শিল্প: কুটির শিল্পে উৎপাদিত বস্ত্র শিল্পের কথা বলতে গেলেই বাঙালি মনে স্মরণে আসবে মসলিনের কথা, যা একদিন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁত শিল্পে এখন আর নেই সেই মসলিন। তবে তাঁত শিল্প শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা ইত্যাদি উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে।

বস্ত্র শিল্পের মধ্যে বাংলাদেশের বিখ্যাত এলাকা হলো- নরসিংদী, রায়পুরা, ডেমরা, টাঙ্গাইল, শাহজাদপুর, বেড়া, মুরাদনগর, কুমারখালি মাগুরা রাজশাহী, খাদিমনগর, মীরগড়, নাসিরনগর প্রভৃতি অঞ্চল। সাম্প্রতিককালে ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় বস্ত্র, মসলিন, জামদানী, পাবনার শাড়ি, টাঙ্গাইলের শাড়ি, রেশমবস্ত্র ও খদ্দর বস্ত্র থেকে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাশন পরিচ্ছদ প্রস্তুত হচ্ছে।

নকশি কাঁথা: বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ সুচিকর্ম হলো নকশি কাঁথা। ১৩ ধরনের নকশি কাঁথা এদেশে তৈরি হয়। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ চিত্রিত কাঁথা, মাটিকাঁথা ও পাইড় কাঁথা। বাংলাদেশের সর্বত্র কাঁথা প্রস্তুত হলেও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়ার কাঁথা সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট মানের। এসকল অঞ্চলে লেপ কাঁথা, দুজনী কাঁথা, দুরনীকাঁথা, আরশীলতা, ওড়কাঁথা, বাতায়নকাঁথা ও দস্তরখানা প্রস্তুত হয়।

পাটজাত শিল্প: পাটজাত দ্রব্যে হস্তশিল্পের কারুকার্যের মাধ্যমে ফুটে উঠে এক নিপুন শিল্প। সৌখিনতার সবচেয়ে বড় নিদর্শন এ পাটজাত শিল্প। পাট দিয়ে বিভিন্ন মোটিভের সিকা, টেবিলম্যাট, শতরঞ্জি, কার্পেট, সৌখিন হ্যান্ডব্যাগ, থলে ইত্যাদি তৈরি হয়।

বাঁশ-বেত শিল্প: কুটির শিল্পের মধ্যে চলতি সময়ে বাঁশ ও বেত শিল্পটির অবস্থা তুলনামূলক ভাল। সৌখিন ভোক্তাদের কাছে এ শিল্পটির কদর দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঠশিল্পটি দেশের সর্বত্রই চালু রয়েছে। যদিও ইদানীং কাঠের বিকল্প ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এ শিল্প তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। তবু দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষের জীবন-জীবিকা এ খাতের উপরে নির্ভরশীল। এ শিল্পে বরিশাল, খুলনা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার মানুষ তুলনামূলক বেশি জড়িত।

শীতল পাটি: শীতলপাটি এক ধরনের চাটাই যা মোরতা নামক গাছের বাকল দিয়ে তৈরি। এতে লাল, নীল, সবুজ, কালো ও বেগুনিরঙের বাহার থাকে। সিলেটের রাজনগর, বালাগঞ্জ, বড়লেখা ও মোল্লার বাজার নোয়াখালীর সোনাগাজী ও রায়পুর, বরিশালের স্বরূপকাঠি ও নীলগাতি এবং ফরিদপুরের সাতেচে উন্নতমানের শীতলপাটি তৈরি হয়। এদেশে এক সময় রৌপ্য ও হাঁতির দাঁতের পাতি দিয়ে শীতলপাটি তৈরি হতো।

কাঁসা-পিতল শিল্প: কাঁসা-পিতলজাত শিল্প এ দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঢাকার ধামরাই, সাভার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জামালপুরের ইসলামপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল ও শরিয়তপুরে পারিবারিক শিল্প হিসেবে বংশ পরম্পরায় তৈরি হয়ে আসছে।

শিল্প একটা দেশের সংস্কৃতিকে ফুঁটিয়ে তুলে। প্রাক-ব্রিটিশ সময় থেকে কুঠির শিল্প বাংলার ঐতিহ্য বহন আসছে। আর এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে কুঠির শিল্পের উৎপাদন ও ব্যবহারের বিকল্প নেই। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং পল্লী অঞ্চলের সহজ-সরল মানুষের মুখের হাঁসি ফুঁটাতে সরকারসহ আমাদের সকলের একটু ইচ্ছার প্রয়োজন। এ ইচ্ছাই পারে বাঁচিয়ে রাখতে আবহমান বাংলার চিরায়ত রুপসহ ঐতিহ্যবাহী শিল্প কুঠির শিল্পকে।

লেখক: কাহহার সামি
শিক্ষার্থী- মানারাত ইন্টান্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
সাংবাদিকতা বিভাগ


ঢাকা, মে ০৭(বিডিলাইভ২৪)// এস এ
 
        print


মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.