bdlive24

বাজেট: দেশপ্রেম দাতানির্ভরতা ও নেতাবন্দনা

শুক্রবার মে ১২, ২০১৭, ০৬:২৬ পিএম.


বাজেট: দেশপ্রেম দাতানির্ভরতা ও নেতাবন্দনা

সাজ্জাদ আলম খান: ‘আমরা এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিব যাহাতে প্রত্যেকে সমানাধিকার লাভ করিবে। সকলকে উদ্বুদ্ধ করা, সকলের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন করাই আমাদের লক্ষ্য হইবে।?’ এমন অন্তঃসারশূন্য প্রতিশ্রুতি মিলেছিল ১৯৪৮ সালের মার্চে। পূর্ববঙ্গের জন্যে ১৯৪৮-৪৯ সালের প্রথম বাজেট পেশকালে হামিদুল হক চৌধুরী এমন অঙ্গীকার করেছিলেন। এর পরের ইতিহাস শোষণ-বঞ্চনার, যা সবারই জানা। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ পাকিস্তান জমানায় পূর্ববঙ্গের প্রথম বাজেট ঢাকায় পেশ করা হয়। ওই অর্থবছরে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বাজেট ঘাটতি ছিল। সেখানে সীমান্তরক্ষায় ৭৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেয়। পাট চাষের ওপর লাইসেন্স ফি ধার্যের প্রস্তাবও দেয়া হয়। ব্যয় বিবেচনায় ওই বাজেটের আকার ছিল সাড়ে ৪১ কোটি টাকা।

পরিসংখ্যান বলছে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ঋণ খাতে আদায় ২৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তবে রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি সাড়ে ৮ লাখ টাকা। আর পরিশোধে ব্যয় ১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশের প্রথম বাজেট মুসলিম লীগ সরকার উপস্থাপন করে। সে সময় অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হতো। যদিও পরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার জুলাই-জুন অর্থবছর ঘোষণা করে। কৃষিনির্ভর সাল গণনার ঐতিহ্যটা সুকৌশলে ধ্বংস করে দেয়া হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে এ বিষয়ে অনেক আলোচনা হলেও, ঔপনিবেশিক এ ধারা এখনও অব্যাহত আছে। তবে ওই বাজেট অধিবেশন পাট খাতে কর আরোপের বিষয় নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারি দল মুসলিম লীগের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরাও প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। মওলানা ভাসানী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন, ‘... আমরা কি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গোলাম? ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের গোলামি করি নাই, ন্যায়সঙ্গত অধিকারের জন্য চিরকাল লড়াই করেছি, আজও করব। আমরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে পাট উৎপাদন করব আর... ট্যাক্স নিয়ে যাবে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট। এসব ট্যাক্স শতকরা ৭৫ ভাগ প্রদেশের জন্য রেখে বাকি অংশ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টকে দেয়া হোক।’ কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক নেতাদের এ দাবিতে সাড়া দেয়নি।

এ জনপদে আধুনিক বাজেট ব্যবস্থা শুরু হয় ব্রিটিশ ভারতে। অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহের শিখা জ্বলে ওঠে। সে সময় অনেকটা ভড়কে গিয়েছিল তখনকার রাজকর্মকর্তারা; কোনোভাবে টিকিয়ে রাখে শাসন ব্যবস্থা। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ব্যবস্থা রদ হয়। কিন্তু ভারতের ভাগ্যবিধাতা হয়ে যান ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় ‘ভারত শাসন আইন’। রানীর হয়ে ভারতের শাসনভার দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয় ভাইসরয়কে। ভাইসরয়কে পরামর্শ দেয়ার জন্য তৈরি হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল। তারই অর্থসংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করতেন জেমস উইলসন। সেই সূত্রে প্রথম বাজেটটি তিনিই করেছিলেন। স্কটল্যান্ডে জন্ম জেমসের। বাবার অমতেই অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা। ব্যবসার পাশাপাশি হাত পাকিয়েছিলেন সাংবাদিকতায়ও। মুক্তবাণিজ্যে বিশ্বাসী জেমস উইলসন ১৮৪৩ সালে প্রকাশ করেন ‘দি ইকোনমিস্ট’। নামেন ব্যাংক ব্যবসায়। ১৮৫৩-এ প্রতিষ্ঠা করেন চার্টার্ড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া। এই ব্যাংক ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও চীনে শাখা খোলে। ১৯৬৯-এ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে তৈরি হয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।

জেমস উইলসন কলকাতায় ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতা দেন এবং ১৮৬০-৬১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন। সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ফসলি সনের আদলে তখন এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর নির্ধারণ করা হয়। তিনি সরকার ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক কর্মধারার পথনকশা তৈরি করেছিলেন। এর আগে ভারতবর্ষে অর্থনীতি বরাবরই ছিল রাজা-বাদশাহ আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দৃষ্টিভঙ্গিতে। প্রথম বাজেটেই জেমস উইলসন এ দেশে আধুনিক আয়কর ব্যবস্থা প্রথম প্রবর্তন করেন। এর আগে এ দেশে বিভিন্ন প্রকার কর বা খাজনা প্রকৃতির রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা ছিল। প্রাচীন ভারতের মনুসংহিতা থেকে রাজস্ব আদায়ের সূত্র উল্লেখ করেছিলেন জেমস উইলসন। তবে ব্রিটেনের রাজস্ব আইনের কাঠামোয় আয়কর আরোপের রূপরেখা দেন। এপ্রিল মাস থেকেই বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়। জেমস উইলসন করবর্ষের একটি সাধারণ ধারণা দিয়েছিলেন। ২০০ থেকে ৪৯৯ টাকা পর্যন্ত আয়ের উপর কর হবে ২ শতাংশ হারে। আর এর উপরের অধিক আয়ের জন্য দিতে হবে ৫ শতাংশ হারে কর। এ আয়কর আইনটি সে সময় বেশ সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ৫ বছর পর এটি বাতিল করা হলেও, ২ বছর পর আবারও বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়। সে সময় সরকার বাধ্য হয়ে লাইসেন্স ট্যাক্স নামে নতুন করে আয়কর প্রবর্তন করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট তৈরি করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করেন তিনি। বলেন, ‘আমরা যে সুখী ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গঠনের চেষ্টা করছি, তার জন্য আমাদের আজ কষ্ট স্বীকার করতে হবে; যাতে আগামীকাল আমাদের সন্তানের কষ্ট আমরা লাঘব করতে পারি।’ একজন নিখাদ রাজনীতিবিদ হিসেবে মাটি-মানুষের কথাই স্থান পেয়েছিল সেই বাজেটে। বাংলাদেশের পথচলায় আর কোনো নিখাদ রাজনীতিবিদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাননি। পলিটিকো ব্যুরোক্র্যাট, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, অর্থনীতির শিক্ষক, আর হিসাববিদরা বাজেট দিয়েছেন। অবশ্যই এদের বেশিরভাগই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে পড়েন। সাধারণ মানুষের ভাবনা প্রতিফলিত হতো তাজউদ্দীন আহমদের দর্শনে। তাই তো তার বাজেট বক্তৃতায় দাতাগোষ্ঠীর সনদ বা মনীষীদের বক্তব্য জুড়ে দেননি তিনি। এমনকি নেতা বন্দনা আর স্তুতি বাক্যও স্থান পায়নি তার বক্তব্যে। দৃঢ়চেতা এ নেতা দাতাগোষ্ঠীর দুরভিসন্ধি নিয়ে বরাবরই সতর্ক ছিলেন। তার সময়ে, বহু ঘোরাফেরা করেও ঋণ জালে দেশকে বেঁধে ফেলার অপচেষ্টায় সফল হয়নি বহুজাতিক বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকানমারা ঢাকায় এসেছিলেন। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে ম্যাকানমারা বলেন, বাংলাদেশকে কি ধরনের সহায়তা দেয়া যায়। এর জবাবে তাজউদ্দীন বলেছিলেন, আমাদের যা দরকার তা হয় তো দিতে পারবেন না। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বললেন, চেষ্টা করে দেখব। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘মিস্টার ম্যাকানমারা আমার গরু ও দড়ি দরকার। যুদ্ধের সময় সব গরু হারিয়ে গেছে। এখানে-ওখানে চলে গেছে, মরে গেছে। পাকিস্তান যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। চাষীরা সব এদিক-সেদিক পালিয়ে গেছে। তখন সব গরু হারিয়ে গেছে। এখন যুদ্ধ শেষ, চাষী ফিরছে কিন্তু গরু নেই। চাষ করবে কিভাবে? তাই আমাদের অগ্রাধিকার হল গরু। আর পাকিস্তানিরা তো সব দড়ি নষ্ট করে ফেলেছে। এখন গরু পেলে গরু বাঁধতে দড়ি প্রয়োজন। এ কথা শুনে ম্যাকানমারার চোখ-মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল। আত্মমর্যদাবোধসম্পন্ন জাতি বিনির্মাণে তার রাজনৈতিক প্রত্যয়ের ছাপ পড়ে সরকারি কার্যক্রমে। যা প্রস্ফুটিত হয় বাজেট দলিলে।

স্বাধীনতার পর জাতীয় সংসদ ছিল না। তাই বেতার ও টেলিভিশনে ১৯৭১-৭২ (’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ’৭২ সালের ৩১ জুন) ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ওই বাজেট পেশের কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আগামী তিন বছর আপনাদের কিছু দিতে পারব না।’ প্রথম বাজেটে বঙ্গবন্ধুর ওই নির্দেশনায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনই ছিল ওই বাজেটের মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের বাজেটে মনোযোগ দিতে হয়েছিল অবকাঠামো পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। এ বাজেটে রাজস্ব আয় ২৮৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৫৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩১৮ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পল্লী অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়। জোর দেয়া হয় গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে। নতুন করে কোনো খাতে করারোপ করা হয়নি। নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক ক্ষেত্রভেদে হ্রাস ও প্রত্যাহার করা হয়। শিক্ষা ও সমাজকল্যাণে সর্বোচ্চ বরাদ্দ ছিল ৪৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এরপরে প্রতিরক্ষায় ছিল ৪০ কোটি টাকা।

লেখক: সাংবাদিক
sirajgonjbd@gmail.com


ঢাকা, মে ১২(বিডিলাইভ২৪)// এস এ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.