bdlive24

উন্নয়নের মহাসড়ক মসৃণ, না এবড়োখেবড়ো?

বৃহস্পতিবার জুন ০৮, ২০১৭, ০৩:২৭ পিএম.


উন্নয়নের মহাসড়ক মসৃণ, না এবড়োখেবড়ো?

সাজ্জাদ আলম খান: কালো ব্রিফকেসে ধরে রেখেছিলেন রঙিন স্বপ্নের ফানুস। অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন, কখন আকাশে উড়িয়ে দেবেন। অবশেষে এলো সেই ক্ষণ। ১ জুন দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি তা ছড়িয়ে দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এটি তার এগারোতম যাত্রা। ঘোষণা করলেন, ‘উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের’। সড়ক-মহাসড়কের বিড়ম্বনার অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জীবনেই কম-বেশি আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেনের গল্প শুনছি অনেকদিন ধরে। কাজ চলছে, মেয়াদ বেড়েছে কয়েক দফা, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খরচ হচ্ছে বাড়তি অর্থ। এবড়োখেবড়ো মহাসড়কে চলাচল করছি আমরা। মসৃণ পথযাত্রা কবে থেকে শুরু হবে, তা এখনও নিশ্চিত হয়নি।

অর্থমন্ত্রী নিজেও মনে করেন, চলার পথে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে; প্রতিবন্ধকতাও কম নয়। বাধার প্রাচীর ডিঙিয়ে স্বপ্নযাত্রায় জনসাধারণকে কতটুকু সম্পৃক্ত করতে পারবেন, তা বেশ প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা মসৃণ পথে চলতে চাই। উন্নয়ন মহাসড়কে বেশ খানাখন্দ দেখা যাচ্ছে। এতে যাত্রা-বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানে খরা আর বাস্তবায়নে অদক্ষতা। সাবলীলভাবে পথ চলতে প্রয়োজন সহায়ক অবকাঠামো। আকৃষ্ট করতে হবে বিনিয়োগ। বেসরকারি খাতে আকর্ষণ করতে না পারলেও সরকার তার বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাজেটে চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ হার ১ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ আর বেসরকারি বিনিয়োগ মাত্র শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। সরকারি বিনিয়োগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকে; সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা তৈরি হয়, এমনকি দেশি-বিদেশি অর্থ সংস্থানের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। বেসরকারি বিনিয়োগের এ লক্ষ্য নিয়ে কীভাবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ হবে? গবেষণা সংস্থা সিপিডি’র বিশ্লেষণ বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। কত পরিমাণ মানুষ এ শ্রমবাজারে ঢুকছেন সেটা অর্থমন্ত্রী এক জায়গায় বলেছেন ঠিকই। কিন্তু তার অনুমানের ভিত্তি কী, কত বেকারত্ব কমবে বা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে এ ধারণাটিও বাজেট বক্তব্যে থাকা দরকার ছিল। এত উচ্চ প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আশানুরূপ পরিস্থিতি নেই বলেও মনে করে সিপিডি। এখন দেখা যাচ্ছে, কাক্সিক্ষত মাত্রায় প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তেমনভাবে হচ্ছে না। শ্রমঘন শিল্পের পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভরতার জায়গা তৈরি হচ্ছে। আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে সেবা খাত। বিনিয়োগ বাড়াতে যে ধরনের সংস্কার এবং উৎসাহমূলক পদক্ষেপ দরকার, এ বাজেটেও সেটি নেই।

বড় বাজেট যেভাবে দেয়া হচ্ছে, সেভাবে সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে। সংস্কারের ব্যাপারে উদাসীন সরকার। আর্থিক খাত, পুঁজিবাজার, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পুরনো বৃত্তেই রয়ে গেছে। বাজেট বাস্তবায়নে অর্থ সংগ্রহ, ব্যয় ও ঘাটতি অর্থায়ন জড়িত। রাজস্ব আদায়ে সাড়ে ৩৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে। লক্ষ্য অর্জন বেশ কঠিন। গত কয়েক বছরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এবার বাজেটে ঘাটতি অর্থায়ন মেটাতে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮০ শতাংশ। এ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে বর্তমানে পাইপলাইনে জমে থাকা ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ ব্যবহার করতে হবে, বর্তমানে ব্যবহার করা যায় ১৬ শতাংশ। তবে স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহে সরকারের তেমন জটিলতা নেই। হাত বাড়ালে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়াতে পারবে, আর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তো রয়েই যাচ্ছে। বছরের পর বছর বাজেটের আকার বাড়ছে। এটা ন্যায়সঙ্গতও বটে। কিন্তু বাস্তবায়ন দক্ষতা না বাড়িয়ে শুধু আকার বাড়ানো কি রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি? বলা হচ্ছে, বড় বাজেট দেয়া হচ্ছে, কিন্তু আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব কতটুকু, তার আর পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে না। গেল অর্থবছরেও বাজেট বাস্তবায়নের পরিমাণ ৮০ শতাংশের ঘরে। ক্রমেই বাস্তবায়ন অদক্ষতা জটিল রোগে পরিণত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, জাতীয় সংসদে সংশোধিত বা সম্পূরক বাজেট নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। এ নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ নেই সংসদ সদস্যদের। অথচ এই বাজেট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেই বের হয়ে আসবে বাস্তবায়ন অদক্ষতার কারণ।

ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে জনসাধারণকে উৎসাহিত করছে সরকার। কোষাগার ভারি করতে ব্যক্তি সঞ্চয়ের দিকে হাত বাড়ানো হয়েছে। সম্পদশালী ব্যক্তির নতুন সংজ্ঞাও তৈরি করেছেন অর্থমন্ত্রী। স্ট্যাটাস বাড়িয়ে দিয়েছেন লাখপতিদের। ষাট দশকের পর থেকে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লাখপতিরা মর্যাদা হারাচ্ছিলেন। অর্ধশতক পরে, ব্যাংকে লাখ টাকা জমিয়েছেন যারা, তাদের ‘বিশেষ’ মর্যাদা দিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। বলছেন, এক লাখ টাকা ব্যাংকে জমিয়ে রাখা ব্যক্তির পক্ষে বাড়তি আবগারি শুল্ক দেয়া অসুবিধা হবে না। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় বেসরকারি খাতে। যার বেশিরভাগ আবার অনানুষ্ঠানিক খাত। কর্পোরেট সংস্কৃতির যুগে, আমরা দেখতে পাই এসব প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা তেমন নেই। প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্রাইচুইটি ছাড়াই এখানে বছরের পর বছর কাজ করতে হচ্ছে। তাদের একটা অংশ আপৎকালীন তহবিল গড়তে সঞ্চয় করে থাকেন। তাতে আবার নজর পড়েছে রাজস্ব বোর্ডের। সহজেই পাওয়া যাবে শুল্ক, তাতেই বসিয়ে দেয়া হলে। ব্যাংকগুলোতে এখন আমানতের সঞ্চয়ে সুদ হার বেশ কম। তারপরও আছে পুরনো সব কর, আর ব্যাংকের হিডেন চার্জ। ব্যাংকে সঞ্চয় না করলে এসব অর্থের গন্তব্য হতে পারে পুঁজিবাজার- যার কাঠামোগত সংস্কার এখনও হয়নি। এছাড়া বাজার সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেটীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পুঁজিবাজার উল্লম্ফনের পর ভূপাতিত হলে আবারও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কান্না ছাড়া তেমন কিছু করার নেই। টাকা সমবায় সমিতিতে রাখবেন, সেখানেও হায় হায় প্রতিষ্ঠানের ইয়ত্তা নেই। গুটিয়ে নেয়া প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের বিলাপ করতে হয়। ইকুইটি ফান্ডিং বিষয়ে বেশ আলোচনা হয়ে থাকে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দেশে তেমন অগ্রগতি নেই। ক্রাউডফান্ডিং-এর বিষয়টি নিয়ে আইনি কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি। এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি সঞ্চয় বিনিয়োগের স্থান হতে পারে। সেখান থেকে ব্যক্তি যেমন মুনাফা পেতে পারেন, তেমনি বিনিয়োগে তহবিল জোগানও সম্ভব।

বাড়তি ভ্যাটের শৃঙ্খলে তিন বছর জড়িয়ে পড়ল দেশ। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপিত হয়েছে। তাতে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। মূল্য সংযোজন কর বর্তমানে এক অভিন্ন হারে প্রয়োগ করা হবে। হারটি হবে ১৫ শতাংশ। এটি আগামী ৩ বছর অপরিবর্তিত থাকবে। মুহিতের বক্তব্য অনুযায়ী, পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হলে অনেক সেবার দাম বাড়বে। বিদায়ী অর্থবছরে বিদ্যুৎ বিলের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হতো গ্রাহককে। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এতে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা কমবে। শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে। সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমান সরকার পরিসংখ্যান নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন। প্রবৃদ্ধি অর্জনকে রাজনৈতিক প্রচারেও স্থান দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। গবেষণা সংস্থা সিপিডি এ সংক্রান্ত একটি কমিশন গঠনের দাবি তুলেছে, তাতে সরকারের তেমন আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। গেল মাসে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালী করতে সুইডেনের সহযোগিতা নেবে সরকার- এমন একটি চুক্তিও হয়েছে। তবে রাজনীতি প্রভাবিত পরিসংখ্যান তৈরি হলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক। প্রভাব বলয়ে পড়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, নিন্ম দারিদ্র্য ও নিন্ম মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান যেন তৈরি না হয়। আগামী অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চারটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণ। বলা হয়েছে, প্রকৃত মজুরি হ্রাসের ফলে ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে। প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা, প্রকৃত খাতগুলোর প্রবৃদ্ধির মন্থর গতি এবং সামাজিক খাতে ব্যয়হ্রাসের প্রবণতায় অর্থনীতি আগামীতে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রাজনৈতিক সুবিধাবাদের চর্চা শুধু মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়, দুর্নীতি ও মূলধন পাচারকে উৎসাহিত করছে।

সাজ্জাদ আলম খান: সাংবাদিক

sirajgonjbd@gmail.com


ঢাকা, জুন ০৮(বিডিলাইভ২৪)// আর কে
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.