bdlive24

তাদেরও রয়েছে ভালোভাবে বাঁচার অধিকার

বুধবার জুন ১৪, ২০১৭, ০৩:২৮ পিএম.


তাদেরও রয়েছে ভালোভাবে বাঁচার অধিকার

বিডিলাইভ ডেস্ক: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছে- ''সাম্যের গান গাই যত পাপী-তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।''

মহান আল্লাহ পাক মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়। একজন বড় লোকের সন্তান যেভাবে এ ধরায় আগমন করেন ঠিক তেমনি আজ সমাজ যাকে অপাংক্তেয় বলছে সেও একইভাবে এ দুনিয়ায় এসেছে। তিনি সৃষ্টিকূলের মধ্যে মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

যখন মানুষ ভালো কাজ করে, অপরের উপকার করে, অসহায়ের পাশে দাড়ায়, বঞ্চিতদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে, রোগীর সেবা করে তখন সে সৃষ্টির সেরা। সকল সৃষ্টিকূল তাকে ভালবাসে। পছন্দ করে। তার জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয় সবাই। প্রকৃতিও তার পক্ষে কাজ করে। আর যখন সে খারাপ কাজ করে, অপরের ক্ষতি করে, অপর কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করে, অপমান করে, মানুষ তথা সৃষ্টিকুলকে যথার্থ সম্মান প্রদর্শন না করে, অসহায় নারী-শিশুকে ভোগের বস্তু মনে করে, অসহায়ের পাশে না দাড়ায় তখন সে  সৃষ্টির মধ্যে নিকৃষ্ট। গোটা জগৎ তাকে ঘৃণা করে। সকল ভালো মানুষ তাকে এড়িয়ে চলে।

বিধাতা এ ধরার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানবজাতির সেবার জন্য। সকলেই এখানে সমানভাবে বাঁচার এবং চলা-ফেরার অধিকার পাবে। এ ধরায় সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সকলের সমানভাবে বাঁচার অধিকার রয়েছে। একজন ধনী ব্যাক্তির সন্তানের যেমন অধিকার আছে অ্যাপোলো বা স্কয়ার-এর মত হাসপাতালে জন্মানোর, তেমনি রাস্তার পাশের একটি শিশুর বা পতিতালয়ে জন্মানো একটি শিশুরও একই অধিকার ছিল।

পার্থক্য শুধু বড়লোকের সন্তান মানুষ হয় খুব উন্নত পরিবেশে। অপরদিকে রাস্তার বা পতিতালয়ে জন্ম নেয়া এ সন্তানটি উপবাস বা অর্ধাহারে তাদের জীবন অতিবাহিত করছে। হয়ত সকলের কাছে ঘৃণিত বা অপাংক্তেয় একটি জায়গায় তার জন্ম হয়। পায় না তেমন কোনো ভাল পরিবেশ বা সুবিধাদি।

বড়লোকের আদরের সন্তানটি যেমন জন্মের পরেই অগণিত উপহার পায়। হয়ত তার কয়েকটি তার ব্যবহার করা হয়। বাকি সব পড়েই থাকে। কিন্তু, হতভাগা এ শিশুটির ভাগ্যে ভাল পোশাক পড়া তো দূরের কথা এক মুঠো ভাল খাবারও তার ভাগ্যে জোটেনা। ধনীদের ফেলে দেয়া ডাস্টবিনের খাবার খেয়ে তারা দিন অতিবাহিত করছে। কিংবা বাঁচার তাগিদে বড়লোকদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেতে হচ্ছে তাদেরকে। তাদের ফেলে দেয়া পোশাক পড়ে তীব্র শীতের হাত হতে বাঁচতে হচেছ এ হতভাগাদের।

বিশ্বে যে যখানে থাকুক সকলের সমানভাবে বাঁচার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কেন তারা আজ এ অবস্থায়? কেন একটি শিশুকে আজ পতিতালয়ে জন্মাতে হচ্ছে? কেন একজন মা-বোন আজ পতিতা হচ্ছেন? তার জন্মানো শিশুটি কেন আজ মূল সমাজের বাইরে? কেন এ শিশুটি অন্যান্য শিশুদের মত স্কুলে যেতে পারছে না, খেলতে পারেনা, নাচতে- গাইতে পারেনা, অন্যান্য শিশুদের মত সুযোগ-সুবিধা পায়না? ধনীর সন্তানরা যখন ভালো খায়, পড়ে, নাচে, গায় তারা দূর হতে চাতক পাখির মত চেয়ে থাকে! কখনও হয়ত দেখারও সৌভাগ্য তাদের হয়না! কি নির্মমতা এ ভোগবাদী সমাজের! কেন তারা ধনীর সন্তানের মত স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারেনা? সমাজের কোন শ্রেণি এ পতিতাদেরকে ভোগের বস্তু বানিয়েছে?

এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট যে, সমাজের পুৃঁজিবাদী শ্রেণি তাদের ভোগের জন্য, লালসা-লিপ্সা বা বেপরোয়া চাহিদা মেটানোর জন্য কিংবা সম্পদ আহরণের জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল এ নারীদের ব্যবহার করছে। তাদের কোমল দেহকে নিয়ে করছে রমরমা ব্যবসা। সমাজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত নারীদের মত আজ তাদেরও অধিকার ছিল বাঁচার, স্বপ্ন দেখার, সমাজে স্বাভাবিকভাবে চলার। কিন্তু, পুঁজিবাদীদের রক্ত চক্ষু এড়িয়ে তারা চলতে পারছেনা। পারছেনা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে। ভোগবাদীদের ভোগ্যপণ্য হতে বাধ্য হচ্ছে।

আজ সমাজের যারা কর্ণধার তারাই তাদেরকে এ পথে নানা কৌশলে পরিচালিত করছে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সমাজ আজ তাদেরকে পাপী ভাবছে, ঘৃণা করছে, পরিত্যাক্তা হিসেবে ঘোষণা করছে, সমাজের সকল সুবিধা হতে বঞ্চিত করছে এ পুঁজিবাদী সমাজ। যারা তাদেরকে আজ পাপী বানাচ্ছে তারা আজ লোক চক্ষুর অন্তরালে থেকে বেপরোয়া ভোগে লিপ্ত আছে। সমাজে তারা আজ উচ্চাসনে আসীন।

সমাজ কেন তাদেরকে মানব দেবতা মনে করছে? শুধু টাকা-পয়সা সরবরাহ করে বলে তারা আজ সমাজে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত? তাই কাজী নজরুলের ভাষায় বলতে হয়-
''হেথা সবে সম পাপী- আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি।
ধর্মান্ধরা শোন- অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজের পাপ গোন।''

সমাজের এ সুবিধা বঞ্চিত, অবহেলিত শ্রেণিটি সমাজের মানুষের কাছে অপরাধী হলেও তাদের সন্তানরা তো কোন দোষ করেনি। কোন পাপ কাজে লিপ্ত হয়নি। তাহলে কেন আজ তারা সুযোগ সুবিধা হতে বঞ্চিত? কেন অন্যান্যদের মত জীবন-যাপন করতে পারছেনা?  তবে সমাজের এসব সুবিধা বঞ্চিত সন্তানদের জন্য হ্যাবিট্যাট ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট কাজ করে যাচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া লোকদের জন্য যারা কাজ করতে আগ্রহী তাদের সহায়তায়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। গত ১০ জুন ২০১৭ ইং তারিখে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়াস্থ কেকেএস শিশু বিদ্যালয়ে কর্মজীবী কল্যাণ সংস্থা এর সহযোগিতায় হ্যাবিট্যাট ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট -এর আয়োজনে শিশু অধিকার বিষয়ক আলোচনা করা হয়।

এসব শিশু দৌলতদিয়া পতিতালয়ের পতিতাদের সন্তান। কেকেএস তাদেরকে মূল সমাজে আনার জন্য সেফ হোম প্রতিষ্ঠা করেছে। হ্যাবিট্যাট ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট এর সহায়তায় কিছুদিন আগে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি কম্পিউটার প্রদান করা হয়েছে। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এ সংগঠনটি আরো নানারকম কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। আমরা সকলেই এগিয়ে আসলে সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশু-নারী তাদের অধিকার ফিরে পাবে।

সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে এসব শিশু ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সবকিছুর উর্ধ্বে। মানুষ হিসেবে তাদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী তৈরি করতে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। কাজ করতে হবে একসাথে। আসুন আমরা একসাথে বজ্র কণ্ঠে উচ্চারণ করি  বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের সেই অগ্নিবাণী-
''গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।''

মোঃ আব্দুর রশিদ
সহকারী ব্যবস্থাপক (কাযক্রম বিভাগ)
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), আগারগাঁও, ঢাকা।



ঢাকা, জুন ১৪(বিডিলাইভ২৪)// জে এস
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.