সর্বশেষ
বুধবার ৩রা শ্রাবণ ১৪২৫ | ১৮ জুলাই ২০১৮

ফিরে দেখা ১ জুলাই

শনিবার, জুলাই ১, ২০১৭

510981666_1498907542.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
১ জুলাই, ২০১৬। রমজানের শেষ দিক। ইফতারের পরে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে স্ত্রীসহ বাসা থেকে বের হয়েছি একটা 'সোশাল কলে' অংশ নিতে। সময় আনুমানিক পৌনে ৮টা। ধানমণ্ডির পথে বাসা থেকে বেরিয়ে যখন কাকরাইল প্রধান বিচারপতি সাহেবের বাসার ওখানে, আমাকে র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন সহকর্মী অতিরিক্ত ডিআইজি লুৎফুল কবির ফোন করল। বলল, স্যার_ গুলশানে একটা হোটেল দখল করেছে টেররিস্টরা। আমি বললাম, তোমাকে কে বলল? সে জানায়, পশ্চিমা একটি দেশের অ্যাম্বাসি থেকে তাকে এখনই ফোন করে বলেছে। তার সঙ্গে প্রিভিয়াস পোস্টিংয়ের কারণে অনেক অ্যাম্বাসির যোগাযোগ ছিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি ঘোরাও।

আই ওয়েন্ট ব্যাক হোম। মুহূর্তের মধ্যে ইউনিফর্ম পরলাম। আমার সঙ্গে সিকিউরিটি ডিটেইল ছিল না। সিকিউরিটির সবাইকে ডাকলে আধঘণ্টা বসে থাকতে হবে। আমি ওদের ফোন করে বললাম, গুলশান যাচ্ছি_ তোমরা রেডি হয়ে চলে এসো। উইদাউট এনি সিকিউরিটি, শুধু ড্রাইভার আর বডিগার্ড নিয়ে রওনা দিলাম গুলশানের দিকে। আমার গাড়িতে সব সময় ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি গিয়ার থাকে। সেসব নিয়েই রওনা দিলাম।

গাড়িতে বসে প্রথমেই ফোন করলাম এডিজিকে (অপারেশন)। তাকে তৎক্ষণাৎ গুলশানে আসতে বললাম। তারপর ফোন করি র‌্যাব-১-এর কমান্ডিং অফিসারকে। সে-ও ঘটনাটা জানত না। আশপাশে র‌্যাবের যত টহল টিম আছে, সবাইকে ওখানে পাঠাতে বললাম। আরও বললাম, তুমি অ্যাডিশনাল টু হান্ড্রেড ট্রুপস নিয়ে ২০ মিনিটের মধ্যে ওখানে হাজির হবে। এর পর ফোন করি ডিরেক্টর অপারেশনকে। গাড়িতে ঘটনাস্থলে যেতে যেতেই আমি ফোনগুলো করছিলাম। প্রশ্ন করি, গুলশানের ঘটনা জানো? সে-ও বলল, জানি না। সে একটা ইফতার পার্টিতে ছিল। আমি বললাম, এক্ষুুণি গুলশানে এসো। এর পর ফোন করলাম আমার ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্সকে। সে-ও ইফতার পার্টিতে ছিল। ও বলল, স্যার, আমি ইফতার পার্টিতে, ক্যান্টনমেন্টে। ১০ মিনিট লাগবে। এর পর আমি উচ্চ পর্যায়ে জানানোর জন্য ফোন হাতে নিয়ে চিন্তা করলাম, আমাকে যে ইনফরমেশন দেওয়া হলো, আমি তো তা ভেরিফাই করলাম না। এ ধরনের তথ্য সম্পর্কে সর্বাংশে নিশ্চিত না হয়ে উচ্চ পর্যায়ে জানানো কি ঠিক হবে? এ চিন্তা করার পরপরই ফোন করি ডিসি গুলশানকে। কন্টিনিউয়াসলি ফোন ব্যস্ত। ফোন করলাম এডিসি গুলশানকে। ওই ফোনও ব্যস্ত। দেন আই কল্ড্ এসি গুলশান। সে ফোনটা ধরল। আমি বললাম, কোনো টেররিস্ট ইনসিডেন্ট আছে নাকি? সে বলল, জি স্যার। জিজ্ঞেস করলাম, কোথায়? সে জানাল, রোড নম্বর ৭৯-এর শেষ মাথায়। রেস্টুরেন্টের নাম হলি আর্টিসান। তখন আমি বুঝলাম, ইটস নট আ হোটেল, ইটস আ রেস্টুরেন্ট। কনফার্ম হয়ে শীর্ষ পর্যায়ে জানালাম, এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। অ্যান্ড আই অ্যাম অন ওয়ে টু দ্য স্পট।

নিকেতনের কাছে পৌঁছে দেখি, ওখানের পুলিশের চেকপোস্টে দুই রাস্তাই বন্ধ। গাড়ি থেকে নেমে ওদের বললাম, তোমরা দুটা রাস্তাই বন্ধ করে রেখেছ কেন? ইউ মাস্ট অ্যালাও দিজ ভেহিকেল গেটিং আউট ফ্রম গুলশান। কারণ গুলশান খালি করতে হবে। গুলশান থেকে যে গাড়িগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে যেতে দিতে হবে। গুলশানে গাড়ি ঢুকতে দেবে না, তবে যেগুলো বেরোচ্ছে বেরোতে দাও। আমার সঙ্গে যারা ছিল, বডিগার্ড, ড্রাইভার এবং চেকপোস্টের সদস্যদের নিয়ে রাস্তা খুলে দিলাম। আমি জরুরি অবস্থাদৃষ্টে উল্টো পথ দিয়ে ঘটনাস্থলে গেলাম। একেবারে ৭৯ নম্বর সড়কের চৌরাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। যেতে যেতে ডিএমপির ট্রাফিক চ্যানেলে গিয়ে ট্রাফিক কন্ট্রোলকে অনুরূপ আদেশ দিলাম। হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন রাস্তার চারপাশে ব্যারিকেড বসানোর নির্দেশ দিলাম।

রাত আনুমানিক ৯টা ২০ বা ২৫ বাজে তখন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখলাম, অনেক লোক আসছে। আমি প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করি। এর মধ্যে আমার ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্স (ঘটনাস্থল) পৌঁছে গেছে। ডিজিএফআই, এনএসআইর কিছু অফিসার পৌঁছে গেছে। গুলশান থানার কিছু অফিসার ছিল। এদের কাছ থেকে আমি প্রাথমিক ব্রিফিং নিচ্ছিলাম। ওরা বলল, স্যার, কয়েকজন ছেলে ঢুকছে ভেতরে। ঢোকার পর গুলি করেছে। প্যাট্রল পুলিশ ঘটনাস্থলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের ওপর গুলি ও একাধিক বোমা নিক্ষেপ করেছে। ওখানে অনেক লোক জিম্মি। কিছু বিদেশিও আছে। জিজ্ঞেস করলাম, কত? কিন্তু তাৎক্ষণিক সংখ্যা কেউ বলতে পারছিল না। দ্রুত আমি রেকি টিম গঠন করি এবং জঙ্গিদের গ্রেফতার ও জিম্মিদের উদ্ধারের জন্য অপারেশনের লক্ষ্যে স্বল্প সময়ের মধ্যে রেকি সম্পন্ন করে জানাতে বলি।

যারা পালিয়ে আসছিল রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে বা যাদেরকে আমরা তখন উদ্ধার করতে পেরেছি, তারা জানায়_ জঙ্গিরা গুলি করেছে কয়েকজনকে, তারপর স্ট্যাব করেছে। কিন্তু আহত-নিহত কতজন উদ্ধার হয়েছে, আমাদের বলতে পারেনি। অনেক পরে আমরা বুঝতে পারি, কিছু লোক ওখানে কিল্ড্ হয়েছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে জিম্মি উদ্ধারে অপারেশনের জন্য কিছু স্পেশালাইজ্ড্ ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিক প্রয়োজন। আমি বর্তমান দায়িত্বের আগে পুলিশ কমিশনার ছিলাম। ঢাকা মহানগর পুলিশের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা দীর্ঘতম সময়ের জন্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছিল। এই সময়ে আমার পরিকল্পনা, সরকারের সদয় অনুগ্রহ ও সুদৃঢ় সমর্থনে ওই প্রতিষ্ঠানে অনেক অত্যাধুনিক টেকনোলজি, ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিক সংগ্রহ করে সংযোজন করি। তাই ডিএমপির কাছে থাকা ইকুইপমেন্ট ও লজিস্টিকের তালিকা আমার জানা ছিল।

আমি ডিএমপিকে বেতারযোগে এপিসি পাঠানোর জন্য বলি। ওদের (ডিএমপি) সোয়াট টিম পাঠানোর জন্য বলি। আরও কিছু প্রয়োজনীয় লজিস্টিক পাঠাতে বলি। ইমিডিয়েটলি আই এস্টাবলিশড অ্যা টেমপোরারি কমান্ড পোস্ট; ওই চৌরাস্তার মোড়ে হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্ট থেকে ৩০০-৪০০ মিটার দূরে। এ জন্য চেয়ার-টেবিল ও তাবু নিয়ে এলাম। এটা নিয়ম, যখন কোথাও কোনো ঘটনা ঘটে তার কাছাকাছি স্থানে টেমপোরারি কমান্ড পোস্ট স্থাপন করতে হয়। তারপর ডিএমপির কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করে ডিএমপির সদস্যদের দিয়ে ওই এলাকাটা সিকিউরড করি। নিরাপত্তার জন্য একটি বহির্বেষ্টনী নির্ধারণ করে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েনের ব্যবস্থা করি। রেস্টুুরেন্টকে ঘিরে আক্রমণের জন্য সম্মুূখ পজিশনে র‌্যাব মোতায়েন করা হয়। দুটি লক্ষ্য ছিল_ এক. ওই এলাকায় পাবলিক বা গাড়ি যেন না ঢোকে; দুই. জঙ্গিরা যেন পালাতে না পারে। পাবলিক ঢুকলে ক্যাজুয়ালটি হতে পারে। আর গাড়ি ঢুকলে আমাদের অপারেশনে অসুবিধা হবে। জঙ্গিরা যেন না পালাতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে চাইছিলাম।

ওখানে রেস্টুরেন্টের পাশে লেক, লেকের পাড় দিয়ে রাস্তা। এনি টাইম দে (জঙ্গি) ক্যান ক্রস দ্য ব্যারিয়ার অর ফেঞ্চ অব দি রেস্টুুরেন্ট। আমরা ওই ওয়াকওয়ে রেস্টুরেন্টের দু'পাশ থেকে বন্ধ করি। রেস্টুরেন্টের ঠিক পেছনের ওয়াকওয়ের অংশটি জঙ্গিদের ফায়ার রেঞ্জের মধ্যে। তাই ২৫-৩০ মিটার ফাঁকা থেকে গেল। সেখানে পর্যাপ্ত আলো ছিল না। এক পর্যায়ে ধারণা হলো, কেউ যদি ক্রল করে ফাঁকা অংশ দিয়ে ওই পাশে গিয়ে পানির মধ্যে পড়ে, তাহলে সাঁতরিয়ে লেকের অপর পাড় দিয়ে পালিয়ে যেতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি ডিএমপিকে নির্দেশনা দিলাম_ তোমাদের কিছু লোক লেকের ওপারে রাখো। এভাবে লেকের অপর পাড়কেও সিকিউরড করি। বাকি থাকল লেক। আমাদের এদিকে যারা ছিল তারা রেস্টুরেন্ট বরাবর ওয়াকওয়েতে নেই। ফলে ওখানে দু'পাশে পুলিশ থাকলেও রাতের অন্ধকারে জঙ্গিদের লেকে ঝাঁপ দেওয়ার সুযোগ থেকেই গেল। তখন মনে হলো, লেকটা ব্লক করতে হবে। এ সময় বাংলাদেশ নেভির এসিএনএসও (অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ অব ন্যাভাল স্টাফ, অপস) রিয়ার অ্যাডমিরাল মকবুল হোসেইন সাহেব আমাকে ফোন করেন। তিনি বলেন, ভাই কোনো হেলপ লাগবে নাকি? আমি বললাম, নেভি সোয়াডস দরকার। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ব্যবস্থা করছি। উইদিন থার্টি মিনিট নেভি সোয়াডস চলে এলো। জরুরি মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এই অসামান্য ভূমিকার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করতে চাই না। সোয়াডস দলের কমান্ডারকে আমি প্রয়োজনীয় ব্রিফ প্রদান করি। তাকে যোগাযোগের সুবিধার জন্য আমাদের নেটের একটি বেতার যন্ত্র দেওয়া হয়। অতঃপর ওরা লেকে অবস্থান নেয়। এ সময়ে কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানালেন, রেস্টুরেন্ট সনি্নহিত হাসপাতালের ভেতরে কিছু জঙ্গি প্রবেশ করেছে। আমরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম, এখানে অনেক রোগী ও নার্স রয়েছে। আমরা জানার চেষ্টা করি, রেস্টুরেন্টের সামনের লেকভিউ ক্লিনিকে টেররিস্ট আছে কি-না? আমরা একটা র‌্যাব অ্যাসল্ট টিম হসপিটালে ঢুকিয়ে দিই। তারা অন্ধকারে পেছন দিক দিয়ে প্রবেশ করে দেখে, ওখানে টেররিস্ট নেই। আছে রোগী-নার্স। অন্যদিকে আমাদের রেকি টিম আক্রমণের জন্য রেকি সম্পন্ন করে ফিরে এসে হাতে আঁকা অপারেশনাল ম্যাপ তৈরি করে দেখায়। মাথায় তখন একটাই চিন্তা_ জিম্মিদের নিরাপত্তা, দ্রুত পরিস্থিতির অবসান ঘটানো এবং জঙ্গিদের আটক করা।

আমরা মোটামুটি মধ্যরাতের পর অ্যাটাকের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। র‌্যাবের রেগুলার ট্রুপসের সঙ্গে তিনটা স্নাইপার টিম প্রস্তুত করে প্রত্যেক টিমকে ব্রিফ করি। বাই দিস টাইম আমাদের ট্রুপস আসছে, পোশাক পরছে, পজিশন নিচ্ছে_ এসব টিভিতে দেখানো হচ্ছিল। আমাকে এক সহকর্মী বলল, স্যার, সব তো টেলিভিশনে দেখাচ্ছে! শীর্ষ পর্যায় থেকেও এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হলো। আমাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন আমার মনে পড়ল মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলের কথা। ওখানে দু'জন ডিআইজি মারা গিয়েছিলেন টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের কারণে। ভেতর থেকে টেররিস্টরা টিভিতে দেখেছিল_ দু'জন ডিআইজি গাড়ি থেকে নামছেন। তারপর নিকটবর্তী জানালা দিয়ে টেররিস্টরা গুলি করে তাদের হত্যা করে। আমি চিন্তা করলাম, সর্বনাশ! এভাবে চলতে থাকলে তো টেররিস্টরা আমাদের সব প্রস্তুতি জেনে যাবে। রেস্টুরেন্টে টিভি থাকতে পারে। তা ছাড়া যে কোনো জায়গায় যখন হামলা হয়, তখন ধরে নিতে হবে আশপাশে টেররিস্ট আছে। মে বি সেকেন্ডারি অ্যাটাক করতে পারে, টারশিয়ারি অ্যাটাক করতে পারে, মাল্টিপল অ্যাটাক হতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা এ চিন্তাও করছিলাম_ ঢাকা শহরে যদি মাল্টিপল অ্যাটাক হয় তাহলে হোয়াট উই শুড ডু? দ্যাট প্ল্যানিং অলসো উই হ্যাভ বিন ডুয়িং।

টিভিতে আমাদের লোকজনকে দেখাচ্ছিল; কে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরছে আর কে কোথায় পজিশন নিচ্ছে। এ পর্যায়ে আমি মিডিয়াতে ব্রিফ করি_ বলি, দয়া করে সরাসরি দেখাবেন না। সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করুন। এটা অনেকে দেখছে, টেররিস্টরাও দেখছে। সব চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করেছে, চারটা চ্যানেল বাদে। ওই চারটা চ্যানেল আমাদের পরে বন্ধ করতে হয়েছে। মিডিয়াকে ব্রিফ শেষে গুলশান থানার স্থানীয় কেবল টিভি বন্ধের নির্দেশ দিই।

এক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আক্রান্ত এলাকায় মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সার্ভিস বন্ধ করার জন্য বিটিআরসি'কে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে জেনেছি, আমার ঘটনাস্থলে পৌঁছার কিছু পরে ডিএমপি কমিশনার ঘটনাস্থলে হাজির হন। তিনি সরাসরি রেস্টুরেন্টের পাশে অবস্থিত একটি ছয়তলা বিল্ডিংয়ের নিচে অবস্থান নেন। সেখানে আগে থেকেই গুলশান থানা পুলিশ, গুলশান জোনের ডিসি, এসি, র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক, কিছু ফোর্স ও কিছু গোয়েন্দা কর্মকর্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য অবস্থান করছিলেন। কমিশনার তাদের সবাইকে নিয়ে হলি আর্টিসান রেস্টুরেন্টের মেইন গেটের সামনে উপস্থিত হলে সেখানে একটি আইইডি বিস্ফােরিত হয়। সবাই দ্রুত ওই এলাকা ত্যাগ করে পূর্বোক্ত ছয়তলা বিল্ডিংয়ে নিচের বেজমেন্টে প্রবেশ করে। এ ঘটনায় র‌্যাব-১-এর অধিনায়কসহ অনেকে আহত হন। কয়েক মিনিট পর র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মাসুদ মারাত্মক আহত অবস্থায় বেজমেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপর আমাদের দু'জন পুলিশ সহকর্মীকে আহত অবস্থায় দেখেন। তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসিকতার পরিচয় দিয়ে দু'জন র‌্যাব সদস্যের সহযোগিতায় একজনকে উদ্ধার করেন। পরে গুলশানের ডিসি ও অপর একজন সোয়াট সদস্য তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে রাস্তায় অপর পাশে থাকা আরেক সহকর্মীকে উদ্ধার করেন। আমাদের ওই দু'জন পুলিশ সহকর্মী হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করেন।

এ পর্যায়ে যৌথভাবে আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়নের সুবিধার্থে আমার আশপাশে থাকা কয়েকজন সদস্যকে পাঠিয়ে পূর্বোক্ত বিল্ডিং থেকে কমিশনারকে আমার টেম্পোরারি কমান্ড পোস্টে নিয়ে আসি। আমাদের সমন্বিত আক্রমণ পরিকল্পনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে ডিএমপি কমিশনার ও ডিএমপি সোয়াট টিমের অন্যতম কমান্ডার এডিসি সানোয়ার হোসেন সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। প্ল্যান তৈরি করে আমরা হসপিটালের দোতলায় র‌্যাবের স্নাইপার টিমকে পজিশন নিতে পাঠাই। ঘটনাস্থল পার্শ্ববর্তী ছয়তলা বিল্ডিংয়ে র‌্যাবের অপর একটি টিম পজিশন নেয়। রাস্তার এপারেও র‌্যাবের একটি দল পজিশন নেয়। আমরা তিনদিক থেকে অ্যাটাক করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় সম্মুখ পজিশন নিই।

আমাদের সরকারের তরফে অ্যাডভাইজ করা হলো আরও কিছু কাজ করার জন্য। সেগুলোর মধ্যে একটা ছিল নেগোশিয়েট করা। আমাদের সিভিল সার্ভিসের এক ব্যাচমেটের এক আত্মীয় ভেতরে ছিল। সে আমাকে ফোন করে তার আত্মীয়ের নম্বরটা দিলে ওই টেলিফোন নম্বরে কল করি। তার নম্বরে ফোন করে দেখি, রিং হয় কিন্তু কিছুক্ষণ পর ওপাশ থেকে কেটে দেয়। কয়েকবার রিং করলাম, বারবারই কেটে দিচ্ছে। তখন আমি একটা টেক্সট করলাম, 'দিস ইস ডিজি র‌্যাব, প্লিজ টক টু মি'। টেক্সট করার পর আবার রিং করলাম, কিন্তু কেটে দেয়। কিন্তু কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কেটে দেয়। প্রায় হাফ অ্যান আওয়ার আমি চেষ্টা করলাম টু কমিউনিকেট উইথ দেম (জঙ্গিদের সঙ্গে)। বুঝলাম, ওরা (জঙ্গি) রেসপন্স করবে না। এর মধ্যে মেজর জেনারেল খালেদ (অব.), তৎকালীন বিজেএমসির চেয়ারম্যান, আমরা যে চৌরাস্তায় টেম্পোরারি কমান্ড পোস্ট তৈরি করেছি, তার উল্টো পাশে বাসা। তিনি যখন শুনেছেন_ আমি ওখানে আছি, বাসা থেকে বের হয়ে এসেছেন। বললেন, বেনজীর ভাই, কোনো হেলপ লাগবে নাকি? পানি-টানি? আমি বললাম, পানি লাগবে না, আমাকে অন্য একটা সাহায্য করেন। আপনার বাসার ড্রয়িং রুমটাকে আই ওয়ান্ট টু ইউজ অ্যাজ মাই টেম্পোরারি কমান্ড পোস্ট। একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে হ্যাপিলি তিনি সঙ্গে সঙ্গে ড্রয়িং রুম তাৎক্ষণিক আমাদের ছেড়ে দেন। এই ঔদার্যের জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। তখন থেকে সকালের অপারেশন পর্যন্ত ওখানেই আমাদের কমান্ড পোস্ট ছিল। সেখানে আমরা হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করি। যত লোক রিকভার করছি বা ধরে নিয়ে আসছি, সব আমরা ওই বাসায় রেখেছি। তা ছাড়া আইজিপিসহ সব সংস্থার সিনিয়র অফিসাররা সারারাত সেখানেই যাওয়া-আসার মধ্যে ছিলেন।

এদিকে রাত ১টার দিকে ওই হোটেলের সিসি ক্যামেরা র‌্যাবের সাইবার টিম হ্যাক করতে সক্ষম হয়। সো উই কুড অলসো সি হোয়াট দে (জঙ্গি) আর ডুয়িং ইনসাইড। দোতলার ক্যামেরাগুলো হ্যাক করতে পেরেছিলাম। মধ্যরাতের দিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। আইজিপি, এসবি-প্রধান ও ডিএমপি কমিশনারসহ ওখানে গিয়ে দেখি, সেনাপ্রধানসহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আছেন। সিদ্ধান্ত হয়, মূল অ্যাসল্টটা করবে সেনাবাহিনীর ১ নম্বর প্যারা কমান্ডো ইউনিট। আমরা তাদের রেগুলার ও ইমার্জেন্সি ব্যাকআপ দেব। আমরা তো আগে থেকে চারদিকে সিকিউর করেই রেখেছি। তারপর ভোররাতে সিলেট থেকে আসা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের অফিসাররা এসে আমার কাছ থেকে ব্রিফ নেয়।

এর কিছু আগে সেনাবাহিনীর পরিচালক, মিলিটারি অপারেশন আমাদের কাছে ব্রিফিং গ্রহণ করেন। তারা আমাদের পজিশন দেখেন। সিকিউরিটি কর্ডন কোথায় কী আছে সব জানানো হয়। ব্রিফ করার পর তারা ফিরে গিয়ে সেনাবাহিনীর নিজস্ব ব্রিফিং শেষ করে অ্যারাউন্ড সেভেন ও ক্লক ইন দ্য মর্নিং কমান্ডোরা পূর্ণ আক্রমণ প্রস্তুতি নিয়ে ঘটনাস্থলে আসে। প্রথম প্ল্যান ছিল, তারা ফাইনাল রেকি করবে। রেকি করার জন্য দু'জন সিনিয়র কর্মকর্তা সামনে যান। দিনের আলো ছিল। ভেতর থেকে টেররিস্টরা দেখতে পায়। দেখেই গ্রেনেড ছোড়ে আর গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন শুরু হয়। সেনা কমান্ডোরা এপিসি নিয়ে সরাসরি রেস্টুরেন্টে অ্যাটাক করে। এপিসি দেখে জঙ্গিরা দৌড়ে বেরিয়ে আসতে গেলে র‌্যাবের স্নাইপাররাও গুলি ছুড়তে শুরু করে।

অপারেশন শেষ হওয়ার পর সেনাপ্রধান, আইজিপিসহ বাহিনীপ্রধানরা সবাই ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে গিয়ে বিদেশিদের ডেডবডিগুলো দেখতে পাই। আমরা ভবনের একেবারে ভেতরে ঢুকিনি। ভেতরে কোনো ট্র্যাপ কিংবা আইইডি থাকতে পারে। এ জন্য কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে থেকে আমরা দেখি। পাঁচটা টেররিস্টের ডেডবডি পড়ে ছিল মাঠটাতে; ঠিক লেক ভিউ হসপিটালের সামনে।

এ রকম ঘটনা ঘটতে পারে_ তা সব সময় আমাদের ভাবনায় ছিল। কেননা বিশ্বব্যাপী, সেই সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোতে এ রকম ঘটনা হচ্ছিল। আমাদের দেশে পাদ্রি, পুরোহিত ও বিদেশিদের হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ইন্ডিভিজুয়ালি। এতে আমাদের মধ্যে ধারণা সৃষ্টি হয়_ দে ক্যান ট্রাই টু ডু সামথিং ইনসাইড ঢাকা সিটি। তাই যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটল, তখন পার্সোনালি বলতে পারি, আমি কিন্তু মোটেও হতবিহ্বল হইনি। আমি জানতাম, আমাকে কী করতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে ও মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আমরা পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও অন্যদের তুলনায় স্বল্পতম সময়ে জিম্মি পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে সক্ষম হই, যা বিশ্ববাসী প্রশংসার চোখে দেখেছে। এ অপারেশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১ প্যারা কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সদস্যবৃন্দ ও র‌্যাবের সম্মুখ অবস্থানে থাকা সদস্যরা অপরিসীম সাহস, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। নেভি সোয়াডস, পুলিশ, বিজিবিসহ সব গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও সদস্যরা প্রশংসনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখেন। এদের প্রত্যেকের জন্য জাতি গর্ব অনুভব করতে পারে।

জঙ্গিদের রক্তপিপাসুর কারণে যেসব নিরীহ প্রাণ অকালে ঝরে যায়, তাদের জন্য আমাদের শোক ও পরিবারের জন্য অশেষ সমবেদনা। বিগত এক বছরে আমরা ডজন ডজন জঙ্গি সেল বিনষ্ট করেছি। এই জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রধান সারোয়ার জাহান মানিক, ইব্রাহিম আবু আল হানিফ র‌্যাব কর্তৃক গ্রেফতারকালে পঞ্চমতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হয়েছে।

এদের দাওয়াত শাখা, প্রশিক্ষণ শাখা ও মিডিয়া শাখাকে ভঙ্গুর করা হয়েছে। জঙ্গিদের আর্থিক মেরুদণ্ড দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। র‌্যাব জঙ্গিদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ৬৭ লাখ টাকা উদ্ধার করেছে। অর্থ সহায়তাকারী অনেকে গ্রেফতার হয়েছে। জঙ্গিদের নারী শাখার নেতৃবৃন্দকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।

যদি ফিরে তাকাই, গত ১ জুলাই থেকে অদ্যাবধি শুধু র‌্যাব এককভাবে ১৫৭ জন নেতৃস্থানীয়সহ বিভিন্ন স্তরের জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছে, ৭ জন গোলাগুলিতে নিহত হয়েছে। এটা শুধু র‌্যাবের পরিসংখ্যান। এর সঙ্গে পুলিশের সাফল্য যোগ করলে এ সংখ্যা স্ফীত হবে। কিন্তু আত্মতুষ্টির সামান্যতম অবকাশ নেই। এরা যে কোনো সময় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সে জন্য র‌্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার সম্মিলিত প্রয়াস চলমান এবং অব্যাহত থাকবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জঙ্গিদের প্রতি 'শূন্য সহিষুষ্ণতা'র নীতি ও নিয়ত নির্দেশনা, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিরবছিন্ন তত্ত্বাবধান ও অনুপ্রেরণা, সেই সঙ্গে ১৬ কোটি শান্তিপ্রিয় দেশপ্রেমিক মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন আমাদের নিরন্তর শক্তির উৎস। দেশ থেকে জঙ্গিবাদের সর্বশেষ বীজটি উপড়ে ফেলা না পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবেই। ২০১৭ সালের ১ জুলাইয়ে এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।

লেখক: বেনজির অাহমেদ,
মহাপরিচালক, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

ঢাকা, শনিবার, জুলাই ১, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি ১২৬ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন