bdlive24

আল মাহমুদ: একা তবু সর্বজনীন

মঙ্গলবার জুলাই ১১, ২০১৭, ১২:০৭ পিএম.


আল মাহমুদ: একা তবু সর্বজনীন

বিডিলাইভ ডেস্ক:   
কতদূর যে যেতে হবে কেউ বলেনি
সঙ্গী-সাথী ছিল না কেউ, কেউ চলেনি,
একাই তবে পার হয়েছি দুখের গলি
কেউ আসেনি, কেউ হাসেনি একলা চলি।
তোমার রক্তে তোমার গন্ধে

এই ‘একলা চলা’ই তাঁর নিয়তি। একলাই চলেছেন সারাজীবন। তবু কী নিখুঁতভাবেই না সবার হয়েছেন! সর্বজনীন হয়েছেন ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সময়ের সমস্ত পরিমাপে। ‘সঙ্গী-সাথী’ কেউ ছিল না। তবু কতোটা পথ পাড়ি দিয়েছেন। কতোদূর যেতে পেরেছেন। সেই দূরত্ব নির্ণয়ের ভার মহাকালের কাছেই তিনি সোপর্দ করেছেন। আসলে তো তা-ই। যাঁরা বিস্ময় নিয়ে পৃথিবীতে আসেন, এসে আরো আরো বিস্ময়ের জন্ম দেন; শুধুমাত্র একটি প্রজন্ম সেই বিস্ময়ের ব্যাখ্যা  তৈরি করতে সক্ষম হয় না। কালের পরিক্রমায় তিনি আস্তে আস্তে ধরা দেন। কেউ কেউ হয়ত, কে জানে, অধরাই রয়ে যান!

বলছি কবি আল মাহমুদের কথা। তিনি কি ধরা দিয়েছেন? কে জানে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত তাঁর কাছেও নেই! তিনি শুধু ‘কারও না-বলা পথে’ হেঁটেছেন। হেঁটে চলেছেন আশিটি বছর ধরে। পালাবদল হয়েছে অনেককিছুরই। বিশ্বাস, আদর্শ, চেতনার পালাবদলের মধ্য দিয়ে নিজেকে বারবার পরখ করেছেন। শেষ পর্যন্ত একজন বিশ্বাসী কবি হিসেবেই নিজের পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন। কবিতার জন্য একটি বিশ্বাস থাকা জরুরিও বটে। বিশ্বাস কবিকে একটি জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বিশ্বাস কবিকে তৃপ্ত করে। অবিশ্বাস করে দিকভ্রান্ত।

আল মাহমুদ জন্মেছেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায়। বাবার নাম মীর আবদুল রব, মায়ের নাম রওশন আরা মীর। পারিবারিক ঐতিহ্য অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত। আত্মজৈবনিক উপন্যাস যেভাবে বেড়ে উঠি’তে বলেছেন, “সুলতান শামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ ১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে সিলেট ও উত্তর কুমিল্লা দখলে আনারও প্রায় দুই শতাব্দী পর আমার পূর্বপুরুষগণ একটি ইসলাম প্রচারক দলের সঙ্গে বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে প্রবেশ করেন। এই অঞ্চলের দক্ষিণ দিকে শাহ রাস্তি, উত্তর-পূর্ব দিকে শাহ গেছু দারাজ ও নুরনগর- বরদাখাত অঞ্চলে কাইতলার মীর পরিবারের ব্যাপক প্রচার-প্রচেষ্টায় গ্রামের পর গ্রাম ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কাইতলার মীরদেরই একটি শাখায় আমার উদ্ভব।”

লেখালেখি শুরু করেন ১৯৫৪ সালের দিকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তরপ্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে। ১৯৭২ সালে ‘গণকণ্ঠ’ নামের দৈনিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ছিলেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য সাহিত্য পুরস্কার। বাংলা একাডেমি পুরস্কারটি পেয়েছেন ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত কালের কলস কাব্যগ্রন্থের জন্য। তখন তাঁর বয়স ৩৫ বছর।

লেখাটা কি ‘আল মাহমুদের জীবনী’ টাইপ হয়ে যাচ্ছে? উদ্দেশ্য মোটেও সেরকম নয়। কিংবা আল মাহমুদের সাহিত্য পর্যালোচনাও নয়। সেটি মহাকালের উপর আগেই ন্যাস্ত করা হয়েছে। বরং কবি আল মাহমুদ সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভাবনা-ই হতে পারে এই লেখার উপজীব্য।
আল মাহমুদ কী ধরনের কবি? প্রেমের? প্রকৃতির? নগরের? বিপ্লবের? নাকি এসবের অভূতপূর্ব মিশ্রণে সৃষ্ট এক অন্যধারার কবি। যিনি প্রেমের কথা বলেছেন, নারীর কথা বলেছেন, আবার জেহাদের কথাও বলেছেন। নারী ও প্রেম আল মাহমুদের কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। নারী প্রায়ই তাঁর কবিতায় একাকার হয়ে গিয়েছে। কী চমৎকার করেই না বলেছেন,
      
    ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা,
    সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে
     কবিতা বোঝে না!   
  
কখনো কখনো কবিতাকেই বলেছেন নারী-
 
     গোপন চিঠির প্যাডে নীল খাম সাজানো অক্ষর
      কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।

আবার নারীকে ভেবেছেন নদীর বিকল্পও-
          
           নদীর মরণ দেখে তোমাকেই জীবনের জল হতে বলি
            বসন উদ্ভিদ হোক, অলঙ্কার শৈবাল যেমন।
            একভাগ মাংসমেদ তিনভাগ রক্তের অঞ্জলি,
            এরি মাঝে স্নাপান প্রক্ষালন, বাঁচার বেদন।
            তোমাকেই পান করি।

তাই বলে আত্মমর্যাদা বিলিয়ে দেননি নারীর হাতে। ‘সোনালী কাবিন’ এ বলেছেন-
       
           সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়োনা হরিণী
           যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দুটি,
           আত্মবিক্রয়ের স্বর্ণ কোনকালে সঞ্চয় করিনি
           আহত বিক্ষত করে চারদিক চতুর ভ্রুকুটি;
           ভালবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন
           ছলনা জানি না বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;

নারী-অন্তপ্রাণ, তবু নারীর কাছে পরাজিত হতে চাননি কখনো। এই কবিতাতেই বলেছেন-
      
           পরাজিত নই নারী, পরাজিত হয় না কবিরা;
           দারুন আহত বটে আর্ত আজ শিরা-উপশিরা।

তবে প্রেম-নারী আল মাহমুদের প্রথম জীবনের কবিতার অনুষঙ্গ। পরিণত জীবনে তিনি বরাবরই বিশ্বাসের কথা বলেছেন। “আল মাহমুদের কবিতা”র ভূমিকায় তিনি নিজেই বলেছেন, “শেষের দিকের কবিতায় আমি আমার গন্তব্য সম্বন্ধে আমার বিশ্বাসকে ব্যক্ত করেছি। আমি মনে করি কবি হিসাবে আমার এই বিশ্বাসই আমার সার্থকতা।” কবিকে বিশ্বাসী করেছে মূলত পবিত্র কুরআন অধ্যয়ন। ঐ ভূমিকাতেই তিনি বলেছেন, “পবিত্র কোরান পাঠ জগত ও জীবন সম্বন্ধে আমার অতীতের সর্বপ্রকার ধ্যান-ধারণা ও মূল্যবোধকেই পাল্টে দেয়। এমনকি সৌন্দর্যচেতনা ও কবিসভাবকেও।”

‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ কবিতায় সেই বিশ্বাসেরই অনুরণন-
       
           মাঝেমাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে
          মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;
          আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে উঠি।

অবশ্য কবিকে বিশ্বাসের মূল্য দিতে হয়েছে। অবিশ্বাসীদের কাছ থেকে পেয়েছেন উপেক্ষা উপহার। তবু পরাজিত হননি। বরং কবিকে যারা উপেক্ষা করেছেন, তারাই পেছনে পড়ে রয়েছেন। ‘প্রতিশ্রুতি’ কবিতায় সে কথাই বলেছেন-
            
             চলার ছিল প্রতিশ্রুতি, চলেছিলাম
            তোমায় সঙ্গে নেব বলে- বলেছিলাম
            সঙ্গে তুমি এলে নাকো, চলার গতি
            তাই বলে কি থামতে পারে? প্রজাপতি
            উড়তে উড়তে জড়িয়ে গেল পায়ের নিচে
            এখন দেখি আমি আগে তুমিই পিছে

কবি হিসেবে আল মাহমুদ তাঁর শক্তির জায়গাটি নির্মাণ করেছেন মূলত শব্দের অনিন্দ্য সুন্দর ব্যবহারে। কবিরা শব্দ নিয়েই খেলা করেন। তবে আল মাহমুদের বিশেষত্ব হলো শব্দকে দিয়ে তিনি যেন কথা বলিয়েছেন। একটি স্বাভাবিক শব্দও তাঁর কবিতায় কী প্রাণময় হয়ে গেঁথে যায়! এই যেমন “কবিতা এমন” কবিতায় বলেছেন-
            
             কবিতা তো কৈশরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
            আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
            পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন
            আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি- রাবেয়া রাবেয়া-
কিংবা
            কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
             ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
              চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
            নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা।
কিংবা
               কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
                ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেড়া হারানো বাছুর

আল মাহমুদ এক জীবন্ত কিংবদন্তী। অপরাজিত কাব্য-সৈনিক। কিন্তু কবিতাই কি সব! একমাত্র বিশ্বাসী কবিই কবিতার এবং কবির অক্ষমতার পাঠ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। এই জায়গাটিতে  এসে আল মাহমুদ সবটুকু কৃত্রিমতার আড়াল ছিন্ন করে অনন্য সাধারণ হয়ে উঠেছেন। “আল মাহমুদের কবিতা”র ভূমিকায় তিনি বলেছেন, “ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কবির অসহায়তা ও জীবিকার অনিশ্চয়তা অন্যান্য কবির মত আমাকেও কোথাও স্থিরভাবে দাঁড়াতে দেয়নি। আর আমি তো জন্মেছি পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্রতম দেশে। কৈশোর ও যৌবনকাল কেটেছে এর প্রতিকার চিন্তায়। এর প্রতিকার যে মানুষের হাতেই, এতে আমার সন্দেহ নেই। তবে মানবরচিত কোনো নীতিমালা বা সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের কাম্য সুখ, আত্মার শান্তি বা স্বাধীনতা কোনোটাই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। হলে কবির স্বপ্ন, দার্শনিকের অনুসন্ধিৎসা বা সমাজবিজ্ঞানীর বিপ্লবচিন্তা পৃথিবীতে স্বর্গরাজ্য নামিয়ে আনতে পারতো। পারেনি যে এতে কবি বা বিজ্ঞানীর কোনো হাত নেই। এতে যাঁর হাত তিনি কবি, দার্শনিক বা বিজ্ঞানীর প্রতি করুণাধারা প্রবাহিত করলেও পক্ষপাত দেখিয়েছেন অন্যধরনের মানব শিক্ষকগণের প্রতি। সেই মহামানবগণ হলেন নবী সম্প্রদায়।” এই বোধেরই অনিবার্য স্বীকারোক্তি আমাদের মিছিল কবিতায়-
   
                              আমরা তো বলেছি আমাদের যাত্রা অনন্ত কালের।
                             উদয় ও অস্তের ক্লান্তি আমাদের কোনদিনই বিহবল করতে পারেনি।
                             আমাদের দেহ ক্ষত-বিক্ষত
                             আমাদের রক্তে সবুজ হয়ে উঠেছিল মূতার প্রান্তর।
                            পৃথিবীতে যত গোলাপ ফুল ফোটে তার লাল বর্ণ আমাদের রক্ত,
                             তার সুগন্ধ আমাদের নিঃশ্বাসবায়ু।
                             আমাদের হাতে একটি মাত্র গ্রন্থ আল কুরআন,
                             এই পবিত্র গ্রন্থ কোনদিন, কোন অবস্থায়, কোন তৌহিদবাদীকে থামতে দেয়নি।
                             আমি কি করে থামি?
                             আমাদের গন্তব্য তো এক সোনার তোরণের দিকে যা এই ভূ-পৃষ্ঠে নেই।

আল মাহমুদের মতো কবিকে উপেক্ষা করা যায়; অবহেলা করা যায় না। পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া যায়; অস্বীকার করা যায় না। বাংলা কবিতার আলোচনায় আল মাহমুদ তাই অনিবার্য। যারা শুধুমাত্র আদর্শের কারণে/বিশ্বাসের কারণে আল মাহমুদকে ‘শত্রু’ মনে করেছেন, তাদের ব্যক্তি আল মাহমুদকে দূরে সরিয়ে দিতে পারলেও কবি আল মাহমুদকে শ্রদ্ধা করতে হয়েছে, তাঁর কাব্য প্রতিভাকে হিংসা করতে হয়েছে। ‘কালের কলস’, ‘সোনলী কাবিন’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’- এই কাব্যগ্রন্থগুলো বাংলা ভাষার কালজয়ী সম্পদ। আল মাহমুদ উপন্যাস, ছোটগল্পেও মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে ঋণি হয়েই থাকবে।
জন্মদিনের অশেষ শুভকামনা প্রিয় কিংবদস্তী!

 লেখক: রফিকুজজামান রুমান
 বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক


ঢাকা, জুলাই ১১(বিডিলাইভ২৪)// এস এ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.