bdlive24

অর্থবছরের পুনর্বিন্যাস কেন জরুরি?

মঙ্গলবার জুলাই ১৮, ২০১৭, ০৫:২০ পিএম.


অর্থবছরের পুনর্বিন্যাস কেন জরুরি?

সাজ্জাদ আলম খান: সময় অখণ্ড; অবিভাজ্য এই সময়ের শ্রেণীবিন্যাস করেছে মানবসমাজ। সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, মাস, বছর এককে শনাক্ত করা হয়েছে। সময়ে বাঁধা পড়েছে যাপিত জীবন। অতীতের ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণ আর ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা সবই সময়ের ছকে বেঁধে ফেলতে হয়। আর সেসব আয়োজন বর্তমানকে ঘিরে। আমাদের স্বল্পকালীন জীবনে প্রতিক্ষণই বেশ গুরুত্বপূর্ণ; তবে মহাকালের কাছে তা তেমন কিছু নয়। সময়কে ঘিরে বেঁধে ফেলা এ জীবনে গুরুত্ব পায় হিসাব-নিকাশ। কবে কখন কোন কাজ শুরু করব, সে নিয়েও আছে ক্ষণগণনা। তাইতো অপেক্ষার প্রহর হিসাব করে শুভ কাজের জন্য আয়োজন করা হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি। আর দুঃখ জাগানিয়া ঘটনা প্রবাহ হাজির হয় অসময়েই।

এবার অর্থবছরের দিন-ক্ষণ নির্ধারণী বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনবিতর্ক আস্থায় নিতে চায় তার সরকার। এখন চলছে জুলাই-জুন অর্থবছর। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে অর্থবছর শুরু হয়। পঞ্জিকাবর্ষ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ১৬৬ দেশে, এপ্রিল-মার্চ ৩৬ দেশে, জুলাই-জুন ১৯ দেশে, অক্টোবর-সেপ্টেম্বর ১১ দেশে অর্থবছর গণনা করা হয়ে থাকে। সার্কভুক্ত আটটি দেশের চারটি- বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটান, জুলাই-জুন অর্থবছর অনুসরণ করে। শ্রীলংকা ও মালদ্বীপ পঞ্জিকাবর্ষ জানুয়ারি-ডিসেম্বর, আফগানিস্তানের অর্থবছর ২১ মার্চ থেকে-২০ মার্চ। আর ভারত এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। যদিও ভারত সরকার তার অর্থবছর পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার কথা নতুন অর্থবছরের। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, উন্নত দেশগুলোর অধিকাংশই জানুয়ারি থেকে তাদের অর্থবছর শুরু করে থাকে। এতে ভারতে কর্মরত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে হিসাবে সমস্যা হয়। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানকে দুটি অর্থবছর মেনে চলতে হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করার বিষয়ে কথা বলেন। এর সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। এপ্রিলের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে অর্থবছর শুরু করা সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ওই কমিটি। সরকার ইতিমধ্যে নতুন অর্থবছরে যাওয়ার বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করা শুরু করেছে। এদিকে আর্থিক বছর বদলাতে হলে বাজেট পেশ, ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট ও সংসদের অধিবেশনের সময়ও বদলাতে হবে।

বাংলায় বছর গণনা শুরু হয়েছিল ফসল মৌসুম বিবেচনায়। মোগল আমলে ফসলি সন বিবেচনায় নিয়ে রাজকার্য পরিচালনা হতো। ভারতবর্ষে বাজেট প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল এপ্রিল মাসকে ঘিরে। বাংলা নববর্ষও শুরু হয় এ মাসে। দেশ বিভাজনের পর, ভারত এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর চালু রাখলেও পাকিস্তান পরিবর্তন করে ফেলে তার অর্থবছর। সে সময় অবশ্যই এই জনপদে এ বিষয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল কিনা, বা প্রতিবাদ হয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। তবে এ সিদ্ধান্ত স্বাধীন বাংলাদেশেও কার্যকর আছে। মাঝে-মধ্যে জাতীয় সংসদ ও বাইরে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও তা নীতিনির্ধারকদের খুব একটা ভাবাতে পারেনি। অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে অর্থবছর নির্ধারণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে জলবায়ু, জীবনযাপনের সময়চক্রও গুরুত্ব পেতে পারে।

এই জনপদে আধুনিক বাজেট ব্যবস্থা শুরু হয় ব্রিটিশ ভারতে। অর্থমন্ত্রী জেমস উইলসন ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল ভারতের প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন। ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহের শিখা জ্বলে উঠে। সে সময় অনেকটা ভড়কে গিয়েছিল তখনকার রাজ কর্মকর্তারা; কোনোভাবে তারা টিকিয়ে রাখে শাসনব্যবস্থা। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনব্যবস্থা রদ হয়। কিন্তু ভারতের ভাগ্যবিধাতা হয়ে যান ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়া। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় ‘ভারত শাসন আইন’। রানীর হয়ে ভারতের শাসনভার দেখাশোনার দায়িত্ব দেয়া হয় ভাইসরয়কে। ভাইসরয়কে পরামর্শ দেয়ার জন্য তৈরি হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল। তারই অর্থসংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করতেন জেমস উইলসন। সেই সূত্রে প্রথম বাজেটটি তিনিই করেছিলেন। সম্রাট আকবরের প্রবর্তিত ফসলি সনের আদলে তখন এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর নির্ধারণ করা হয়। তিনি সরকার ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক কর্মধারার পথনকশা তৈরি করেছিলেন। এর আগে ভারতবর্ষে অর্থনীতি বরাবরই চলত রাজা-বাদশাহ আর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দৃষ্টিভঙ্গিতে। প্রথম বাজেটেই জেমস উইলসন এদেশে আধুনিক আয়কর ব্যবস্থা প্রথম প্রবর্তন করেন। এর আগে এদেশে অন্য বিভিন্ন প্রকার কর বা খাজনা প্রকৃতির রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা ছিল। প্রাচীন ভারতের মনুসংহিতা থেকে রাজস্ব আদায়ের সূত্র উল্লেখ করেছিলেন জেমস উইলসন। তিনি ব্রিটেনের রাজস্ব আইনের কাঠামোয় আয়কর আরোপের রূপরেখা দেন। এপ্রিল মাস থেকেই বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যায়। জেমস উইলসন করবর্ষের একটি সাধারণ ধারণা দিয়েছিলেন। ২০০ টাকা থেকে ৪৯৯ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কর হবে ২ শতাংশ হারে। আর এর উপরের অধিক আয়ের জন্য দিতে হবে ৫ শতাংশ হারে কর। এই আয়কর আইনটি সে সময় বেশ সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ৫ বছর পর এটি বাতিল করা হলেও ২ বছর পর আবারও বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়। সে সময় সরকার বাধ্য হয়ে লাইসেন্স ট্যাক্স নামে নতুন করে আয়কর প্রবর্তন করে। তবে অর্থবছর নির্ধারণে বাংলাদেশের কৃষি কার্যক্রম কোনোভাবেই বিবেচনায় নেয়নি পাকিস্তান। কৃষি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মৌসুমভিত্তিক বাংলা সন অর্থবছরের সাযুজ্যতায় মর্যাদার প্রশ্নে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি বা উৎপাদন মৌসুম, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সব কিছুই ছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিন্ন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও অর্থবছরে পরিবর্তন আনা হয়নি।

বৃষ্টি আর বন্যার মাঝে শুরু হয় দেশের অর্থবছর। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষাকাল। অর্থবছরের প্রথম তিন মাস বর্ষার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা যায় না। আয়কর আইন অনুযায়ী আগের অর্থবছর শেষ হওয়ার এ সময়ে কর প্রদানের বাধ্যবাধকতা চলে আসে। অথচ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই রিটার্ন দাখিলের সময় আসে। অথচ কৃষিতে তেমন কোনো কাজ নেই। আর বৈরী আবহাওয়ায় উৎপাদনশীলতায়ও বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে।
উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি, একনেকে অনুমোদন, আর টেন্ডারিং প্রক্রিয়া শেষ করতেই চলে যায় অর্থবছরের শুরুর সময়। এরপর শুরু হয় কার্যক্রম। তখন তাগিদ আসতে থাকে অর্থব্যয় ত্বরান্বিত করতে। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উন্নয়ন অর্থনীতির দর্শন আর পকেট ভারির চিন্তাভাবনা। উন্নয়ন কার্যক্রমের গুণমান যাই হোক না কেন, অর্থব্যয়ের অংকটা ভারি না হলে স্বচ্ছন্দবোধ করেন না নীতিনির্ধারকরা। এসব তৎপরতার মধ্যে প্রকৃতিতে আসে বর্ষা। এ সময় মেরামত-সংস্কার কাজে জনভোগান্তি যেমন বাড়ে, কাজের গুণগতমান পরিবীক্ষণেও ঘটে বিপত্তি। অর্থবছরের শেষে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ শেষ করার তাগিদে কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানো জরুরি হওয়ায় নানা অনিয়ম-অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়াটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিদায়ী অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৯০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এ সময়ে এক হাজার ৬৬৮টি প্রকল্পের জন্য এক লাখ ১৯ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এর মধ্যে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৭৭ হাজার ২০৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর বাকি অংশ বাস্তবায়ন হয়েছে অর্থবছরের শেষ মাস অর্থাৎ জুনে। তড়িঘড়ি করে অর্থব্যয়ের কারণে গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ রয়েই যায়।

অথচ অর্থবছরের ব্যাপ্তিটা জুলাই-জুনের পরিবর্তে যদি জানুয়ারি-ডিসেম্বর হয়, তাহলে প্রথম মাসেই কাজ শুরু করে পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা যায়। বাংলাদেশের জন্য এই সময়টিই সব কাজের জন্য অনুকূল, সহনশীল ও উৎপাদনমুখী। সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান জানুয়ারি টু ডিসেম্বর অর্থবছরে ক্লোজিং করে থাকে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মিল রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এবং আবহাওয়া উপযোগী সময় বিবেচনায় জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর অর্থবছর চালু করা প্রয়োজন। অর্থবছর পরিবর্তনের পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় সুশাসন বজায় রাখতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া প্রকল্প থেকে দূরে থাকার সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে জনচাহিদা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণও জরুরি। সেই সঙ্গে সরকারি সংস্থার সেবার মানও বাড়ানো প্রয়োজন। রাজস্ববান্ধব পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব সরকারের। নাগরিকরা যাতে সেবা পেতে হয়রানির শিকার না হয়, তা নিশ্চিতের দাবি বিবেচনায় নিতে হবে।


ঢাকা, জুলাই ১৮(বিডিলাইভ২৪)// আর কে
 
        print


মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.