bdlive24

বেগম জিয়া কি আর ফিরে আসবেন!

বৃহস্পতিবার জুলাই ২০, ২০১৭, ০৪:১৪ পিএম.


বেগম জিয়া কি আর ফিরে আসবেন!

বিডিলাইভ ডেস্ক: খালেদা জিয়া লন্ডন গেছেন। তাঁর ছেলের কাছে তিনি যাবেন এতে মানুষের কী বলার আছে? তাছাড়া তিনি যদি চিকিৎসার জন্যও যান তাতেই বা দোষ কোথায়?

তিনি আমাদের দেশের একাধিকবারের প্রধানমন্ত্রী। একসময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। জয় যাঁকে স্পর্শ করার জন্য আকুল হয়ে থাকত সেই খালেদা জিয়া আজ বলতে গেলে মিডিয়ায় নেই। মাঝে-মধ্যে তাঁকে আমরা দেখি বটে, তবে সেটা না দেখার মতো।

রাজনীতির একটা বড় বিষয় আদর্শ। আজকাল আদর্শহীন রাজনীতির মহা উৎসবের কালে আমরা সেটা ভুলে গেলেও মানতে হবে কেবল তা থাকলেই মানুষ মানুষকে মাথায় তোলে, মুকুট করে রাখে। সেই কবে বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন মারা গেছেন। আজ এত বছর পরও তাদের আমরা স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হতে দেখি।

জিয়ার বিষয়টা বলতে পারলে ভালো লাগত। কিন্তু ‘খলনায়ক’ কি কখনও ‘নায়ক’ হতে পারেন? ইতিহাসে তাঁর যেমন অনুসারী আছে তেমনি আছে তাঁর হাতে নিহত এ দেশের ইতিহাস ও চেতনা। ফলে তাঁকে সেভাবে মূল্যায়ন করা যায় না।

বলছিলাম খালেদা জিয়ার কথা। একটা সময় মনে হত তিনি ছাড়া আর কেউ যাবে না দেশের শাসনভারে, যেতে পারবেন না।

মনে পড়ে তখন আমাদের ভরা যৌবন। এরশাদের পতনের পর শেখ হাসিনা না খালেদা জিয়া– এই যুদ্ধে আমরা ধরে নিয়েছিলাম আওয়ামী লীগই আসবে দেশশাসনে। সেসময় শেখ হাসিনা এতটা অভিজ্ঞ ও দূরদর্শী হয়ে ওঠেননি। তিনি ছিলেন প্রগলভ। সত্য বলতে অকুণ্ঠিত শেখ হাসিনা সময় বুঝতে চাননি। সময় তখন নানা ষড়যন্ত্র আর অপপ্রচারে এতটাই ক্লান্ত আর পর্যদুস্ত তাঁর সময় ছিল না সত্য ধারণের। ফলে তিনি হারলেন। হারার পর অযাচিতভাবে আরও একবার শাসনে যাওয়া বিএনপি হয়ে উঠল আরও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের চারপাশে ভীড় করা দালাল আর মোসাহেবরা বেগম জিয়াকে এমন বন্দনা আর স্তুতি করতে শুরু করলেন ক্রমে তিনি চলে গেলেন সাধারণের বাইরে। বেশি বলার দরকার নেই, এই সেদিনও তিনি যখন সিংহাসনে, গয়েশ্বর রায় বলেছিলেন:

খালেদা জিয়ার মুখে নাকি দেবীর ছাপ। তিনিই স্বয়ং দুর্গা।

আজ তাঁর সেই ক্যারিশমা আর নেই। হায় সময়! একদিন হুমায়ূন আহমেদও বলেছিলেন: তিনি সুন্দরের পূজারী। তাই সুন্দর মুখ দেখেই ভোট দেবেন।

আওয়ামী লীগ ছন্দপতন ঘটালেও খালেদা জিয়াকে থামাতে পারেনি। ছিয়ানব্বই সালে জয়ী হওয়ার পর ঐকমত্যের সরকার বলে যে সরকার আসল তার ভেতর ছিল অনেক ফাঁক। বেশকিছু পজেটিভ কাজ করার পরও দুর্বল প্রচার আর আওয়ামী লীগের ‘খাই খাই’ মনোভাবের নেতা-মন্ত্রীদের কারণে পতন হল তাদের। নৌকাডুবির পর সদলবলে ফিরে আসা বিএনপির সেই জয় ছিল তাদের পতনের ঘণ্টাধ্বনি। কারণ, ততদিনে তারা ধরে নিয়েছিল এ দেশে আর কোনোদিন আওয়ামী লীগ সরকারে যেতে পারবে না। এর কারণও অবশ্য ছিল একাধিক।একদিকে ভারতবিরোধী, হিন্দুবিরোধী মনোভাব। আরেকদিকে জামায়াতের উঠে আসা। জামায়াত-বিএনপির মহামিলনে পয়দা হল জগাখিচুড়ির ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ আর পাকিস্তানি মনোভাবের ককটেল ভালো গিলেছিল এই সমাজ।

গাড়িতে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে জামায়াত নেতারা ঘুরছেন। খালেদা জিয়া আয়েশ করে দেশ চালাচ্ছেন। আমলা, সামরিক বাহিনী, পুলিশ বা কর্তারা মনপ্রাণ ঢেলে সমর্থন দিচ্ছেন আবার লুটপাটও করছেন– এমন দিনগুলোতে তারেক জিয়া বসে আঙুল চুষবেন? আর সময় তাকিয়ে দেখবে অনাথ শিশুর মতো? তারাও তাদের কাজ করছিল।

তারেক জিয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল আরেক প্রাসাদ রাজনীতি। হাওয়া ভবনের আড়ালে-আবডালে, এমনকি প্রচ্ছন্ন দ্বিতীয় সরকারকে দমানোর জন্য যে আদর্শ যে মনোবল ও নৈতকিতা– সেটা না খালেদা জিয়া না বিএনপির নেতৃবৃন্দ কারোরই ছিল না। সেখানেই মূলত জন্ম নিয়েছিল বাবর থেকে গিয়াস নামের যত দানব। জনগণের একাংশে বিশেষত প্রান্তিক শ্রেণিতে হেভি পপুলার বিএনপির সর্বনাশ তখনই দানা বাঁধতে শুরু করে। তারপরও আওয়ামী লীগের সাধ্য ছিল না তাদের হটায়। লগি-বৈঠা বা তাদের রাজপথের শক্তি আর যা-ই হোক গ্রেনেডের চেয়ে বলশালী কিছু ছিল না। যার প্রমাণ আছে ঢাকার রাজপথে নিহত আইভি রহমান ও অন্যদের রক্তপ্রবাহে।

বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন ও বদলে যাওয়া রাজনীতিতে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের শ্রম ও তাদের আর্থিক উন্নতি ততদিনে সবার নজরে। আমেরিকা হারিয়েছে তার এক নম্বর আসন। অন্যদিকে চীন, ভারত, রাশিয়াসহ নানা শক্তি বিস্তার করছে নতুন আধিপত্য। মিসর, আরব এমনকি ইউরোপেও পালাবদলের ভেতর দিয়ে যেসব সরকার এল তাদের সঙ্গে জনগণের যতটা সম্পর্ক তারচেয়ে বেশি ছিল প্রশাসন ও বাহিনীর। ব্যাপারটা এমন: যেভাবেই হোক প্রগতিশীল তকমার দল ও নেতাদের সামনে রাখতেই হবে। কে দেশ চালাচ্ছে সেটা পরের কথা। ওয়ান-ইলেভেনের জন্ম সে কারণেই।

যেভাবেই দেখি না কেন এই সরকার না এলে বিএনপিকে সরানোর সাধ্য ছিল না কারো। তারা এল বটে। ভালো নামে পরিচিত সুধীদের দেশশাসনে আনলেও লাভ হল না। কারণ, গদি ও শাসন একটা চেইন ওয়ার্ক। সারা দেশে নেটওয়ার্ক না থাকলে সেটা অচল। তা-ই হল। মানুষ ভয়ে ঘুষ দিত না, নিতও না। আবার কাজও হত না। এই অবস্থা কতদিন? দুই নেতাকে জেলে পুরেও যখন লাভ হল না তখন নির্বাচনের বিকল্প কোথায়?

সেই নির্বাচনে বিএনপি জেতার কথা নয়। জিতল আওয়ামী লীগ। এর পরের ইতিহাস খালেদা জিয়ার ক্রমাগত শূন্যে পরিণত হওয়ার ইতিহাস। তাঁর ছোট ছেলে মারা গেলেন। গদি গেল। তাঁর জোট, তাঁর খুঁটি জামায়াতের নেতাদের এক এক করে ফাঁসিতে ঝোলানো হল। মুক্তিযুদ্ধের হারানো গৌরব কিছুদিনের জন্য আবার ফিরে এল।

তিনি সেই আপসহীন নামে নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। একজন মানুষ সব সময় নীরব থাকতে পারেন? তিনি কি বোবাদের নেতা? না, এ দেশের মানুষ কথা বলতে জানে না? সব সংকটে তিনি চুপ। যা একবার তিনি বেরিয়ে এলেন তা-ও হেফাজতকে সামনে এনে মসনদ দখলের জন্য। তাতে মতিঝিলের চুল নড়ল বটে সরকারের গদি নড়ল না।

এরপর বিএনপি চলে গেল জ্বালাও-পোড়াও আর ছারখারের রাজনীতিতে। ম্যাডাম জিয়াকে কেউ বলল না সে রাজনীতি এখন অচল। তিনি বুঝতে পারলেন না বিশ্বায়ন নামের এক বিশাল আশীর্বাদ আমাদের জীবন গ্রাস করে নিয়েছে। এখন আর মানুষের হাতে সময় নেই মাঠে-ময়দানে যাওয়ার। তাদের সময় নেই ভাষণ শোনার।

বিএনপি যখন তারেক জিয়াকে সামনে এনেছিল তখন কৌশল ও ষড়যন্ত্রের ব্যাপারগুলো প্রাধান্য পেলেও বয়স্ক নেতারা সেগুলো ধারণ করতে পারেননি। আর তারেক তো ততদিনে ‘খাম্বা তারেক’ নামে পরিচিত হয়ে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। এখন কি আর বিলেতে বসে দেশে ছড়ি ঘোরানো সম্ভব? সে দিন এখন গত। তাঁর মাথায় ঝুলছে আইন-বিচার-শাস্তি। দেশে আসাই প্রায় নিষিদ্ধ তাঁর।

খালেদা জিয়া মুখে যা-ই বলুন তাঁর সেই ক্যারিশমা আর নেই। তিনি বয়সের ভারে ক্লান্ত। আধুনিক মননের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় বা ধৈর্যও তাঁর নেই। তাঁকেও নানাবিধ ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। একের পর এক বিচারে হাজিরা দেওয়া কতদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন তিনি?

নিন্দুকেরা মনে করেছিল বিজেপি ভারতে শাসনে আসলে আওয়ামী লীগের ১২টা বাজবে। হয়েছে তার উল্টো। কারণ, মাড়োয়ারিরা ব্যবসার বাইরে কিছু বোঝে না। তাদের যা যা পাওয়ার যা যা নেওয়ার নিলেই তারা খুশি। সেটা কে দিচ্ছে বা কারা দিচ্ছে সেটা বিবেচ্য নয় তাদের কাছে।

এমন জটিল সমীকরণের কালে খালেদা জিয়ার বিলেত গমন নিঃসন্দেহে গরম খবর।

মানুষ আসলে এতটাই রাজনীতিবিমুখ তিনি আসলে বা না আসলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। সবাই জানে আওয়ামী নেতারা কেমন, কতটা লোভ আর লালসা তাদের। দেশের কোথায় অশান্তি, কোথায় দুর্নীতি, কোথায় মস্তানি– সব আমাদের জানা। কিন্তু কী করার আছে আমজনতার? তারা তো উন্নয়নও দেখছে। ভিখারি কমছে। মানুষের হাতে টাকাপয়সা আছে। তারা জীবনকে উপভোগ করতে পারছে, করবে– এটাই তাদের চাওয়া। এখন সেটা শেখ হাসিনার আমল না খালেদা জিয়ার আমল কে তার ধার ধারে?

এদিকে শেখ হাসিনা তাঁর ইমেজ বাড়িয়ে নিয়েছেন আপন মহিমায়। তাঁকে টেক্কা দেওয়ার সাধ্য খালেদা জিয়ার আর নেই। নানা কারণে, প্রজ্ঞা, মেধা ও দূরদর্শিতায় অনেক এগিয়ে শেখ হাসিনা। সরকার না থাকলেও তাঁর মর্যাদা থাকবেই।

রেষারেষির রাজনীতিতে পরাজিত ক্লান্ত খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা তাই আজ আর কোনো বিষয় নয়। বয়স হয়েছে ম্যাডামের। ঝুটঝামেলা এড়াতে তিনি যদি আর নাও আসেন– সেটা কি আসলেই অবাক হওয়ার ব্যাপার? তিনি না থাকলে বিএনপির কী হবে, সেটা বুঝবেন দলের নেতারা। তবে মনে করি বিএনপি এমন একটা দল যার তৃণমূলে নেতাকর্মীর অভাব নেই। হয়তো এরাই টিকিয়ে রাখবে নতুন দল, নতুন নেতাদের। কারণ, আওয়ামী লীগের মোকাবেলা করতে পারে এমন দল আর একটিও নেই দেশে।

খালেদা জিয়া ফিরবেন কি ফিরবেন না, সেটা বলে দেবে সময়। তবে মিডিয়ায় দেখলাম স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন:

“দেখেন উনি ফিরে আসেন কি না।”

এই কথা উড়িয়ে দেওয়ার সাধ্য আমাদের আছে? জানতে ইচ্ছে করে খালেদা জিয়ার এই বিলেতযাত্রা কি সাময়িক গমন না মহাপ্রস্থান? এমন ঘটনা উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু নয়। তাই প্রশ্ন থেকে যাবে বৈকি।

অজয় দাশগুপ্ত, কলামিস্ট।


ঢাকা, জুলাই ২০(বিডিলাইভ২৪)// আর কে
 
        print


মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.