bdlive24

অটোম্যানের সম্রাজ্ঞী হুররেম সুলতানের জীবনকথা

শনিবার আগস্ট ১২, ২০১৭, ১০:২৩ এএম.


অটোম্যানের সম্রাজ্ঞী হুররেম সুলতানের জীবনকথা

বিডিলাইভ ডেস্ক: উসমানীয় ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারীদের একজন ছিলেন হুররেম সুলতান। প্রথম সুলায়মানের শাসনকালে তিনি সুলতানের প্রধান স্ত্রী বা ‘হাসেকি সুলতান’ ছিলেন। তিনি স্বামীর মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জন করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।

জন্মসূত্রে তার আসল নাম ছিল আলেকজান্দ্রা রোক্সেলানা লিসোভস্কা এবং শৈশবে তার ডাকনাম ছিল নাস্তিয়া। অটোম্যানদের মধ্যে তিনি প্রধানত হাসেকি হুররেম সুলতান বা হুররেম হাসেকি সুলতান হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তুর্কি বিষয়ে গবেষক পোলিশ কবি সামুয়েল তারদভস্কির তথ্য অনুসারে, হুররেম সম্ভবত কোনো ইউক্রেনীয় অর্থোডক্স ধর্মযাজক পিতার ঘরে জন্মছিলেন। তিনি পোল্যান্ড রাজ্যের রুথেনীয় ভয়ভডেশিপের প্রধান শহরের ৬৮ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে রুহাটাইন নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন যা বর্তমানে পশ্চিম ইউক্রেন। ১৫২০-এর দশকে ক্রিমিয়ার তাতাররা ওই এলাকায় এক অভিযানের সময় তাকে বন্দি করে দাসী হিসেবে নিয়ে আসে। প্রথমে ক্রিমিয়ার নগরী কাফফায়, যা দাস ব্যবসার একটি প্রধান কেন্দ্র, এরপর কনোন্টিনোপলে এবং তাকে প্রথম সুলায়মানের হারেমের জন্য বাছাই করা হয়।

অল্প সময়ের মধ্যে রোক্সেলানা সুলায়মানের প্রিয়তম সঙ্গিনী বা হাসেকি সুলতান হয়ে ওঠেন। তিনি সুলতানের সর্বাধিক সন্তানের জন্ম দেন। দুইশ’ বছরের অটোম্যান ঐতিহ্য ভঙ্গ করে একজন উপপত্নী সুলতানের বৈধ পত্নী হন। ইস্তাম্বুলের হেরেমে সুলায়মানের প্রথম স্ত্রী মাহিদেভরান সুলতানের একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। ১৫২১ সালে হুররেম তার প্রথম পুত্র মেহমেদের জন্ম দেন। এরপর আরও চার পুত্র, যা সুলতানের একমাত্র পুত্রের মাতা হিসেবে অর্জিত মাহিদেভরানের মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে। সুলায়মানের মাতা আয়শে হাফসা সুলতান এ দুই মহিলার শত্রুতা গোপন রাখতেন। কিন্তু ১৫৩৪ সালে তার মৃত্যুর পর একটি তুমুল লড়াই হয়, মাহিদেভরান হুররেমকে মারধর করেন। এ ঘটনায় সুলায়মান ক্ষুব্ধ হয়ে মাহিদেভরানকে পুত্র মুস্তাফাসহ প্রাদেশিক রাজধানী মানিসায় পাঠিয়ে দেন।

হুররেম এবং মাহিদেভরানের ছয় পুত্রের ৪ জন ১৫৫০ সালের মধ্যে জীবিত ছিলেন- মুস্তাফা, সেলিম, বায়েজিদ ও জাহাঙ্গীর। মুস্তাফা বয়োজ্যেষ্ঠ উত্তরাধিকারী হিসেবে হুররেমের সন্তানের অগ্রবর্তী ছিলেন। হুররেম জানতেন, নিয়মানুসারে মুস্তাফাই সুলতান হবেন। পারগালি ইব্রাহিম পাশাও তাকে সমর্থন করতেন, যিনি ১৫২৩ সালে সুলতানের প্রধান উজির হন। ইব্রাহিম পাশা হুররেম সুলতানের চক্রান্ত ও প্রাসাদে তার উঠতি প্রভাবের একজন ভুক্তভোগী ছিলেন। মুস্তাফার সমর্থকদের নির্মূল করতে হুররেম নিজ প্রভাব কাজে লাগাতে শুরু করেন। তার প্ররোচনায় ক্ষমতার লড়াইয়ে সুলায়মান ১৫৩৬ সালে ইব্রাহিমকে খুন করেন এবং তার কন্যা মিহিরমার স্বামী ও তার স্নেহভাজন জামাতা রুস্তম পাশাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন।

সুলায়মানের দীর্ঘ শাসনামলের শেষের দিকে তার পুত্রদের শত্রুতা আরও স্পষ্ট ও প্রকট আকার ধারণ করে। রুস্তম পাশা ও হুররেম সুলতান উভয়ই সুলায়মানকে মুস্তাফার বিরুদ্ধে উসকে দেন এবং মুস্তাফাকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। ১৫৫৩ সালে সফভীয় ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানকালে সুলতান সুলায়মান মুস্তাফার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। একটি তথ্যসূত্র অনুসারে, সে বছর বাবাকে সিংহাসনচ্যুত করার চক্রান্তের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। মুস্তাফাকে প্রাণদণ্ড দেয়ার পর সৈন্যদের মধ্যে একটি বড় মাপের অসন্তুষ্টি ও অস্থিরতার উত্থান হয়। তারা রুস্তম পাশাকে মুস্তাফার মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন। সুলায়মান রুস্তম পাশাকে বরখাস্ত করেন এবং আহমেদ পাশাকে প্রধান উজির হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৫৫৫ সালে হুররেমের চক্রান্তে আহমেদ পাশাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় এবং রুস্তম পাশাকে ফের প্রধান উজির (১৫৫৫-১৫৬১) করা হয়। এদিকে মুস্তফার মৃত্যুর পরে মাহিদেভরান প্রাসাদে তার অবস্থান হারান এবং বুরসায় গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকেন। ১৫৫৮ সালে হুররেমের মৃত্যুর পরেই কেবল তার পুনর্বাসন সম্ভব হয়।

সুলায়মান হুররেম সুলতানকে অটোম্যান সম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী বানিয়ে তার সমান মর্যাদা দিয়েছিলেন। অটোম্যানের ইতিহাসে অন্য কোনো সুলতানের স্ত্রীকে এই মর্যাদা দেয়া হয়নি। এমনকি সুলতান সুলায়মান দরবারে হুররেমকে তার পাশে বসাতেন। সভায় কোনো বিষয়ে হুররেমের পরামর্শ নিতেন। এমনকি কোনো রাষ্ট্রীয় কাগজে সুলতানের পাশাপাশি সম্রাজ্ঞী হুররেম সুলতানেরও স্বাক্ষর আর সিল লাগত।

রাজনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি হুররেম মক্কা থেকে জেরুজালেম পর্যন্ত বহু রাষ্ট্রীয় স্থাপনার প্রধান কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তার প্রথম স্থাপনাসমূহের মধ্যে ছিল একটি মসজিদ, দুটি মাদ্রাসা, একটি জলের ফোয়ারা, কনস্টান্টিনোপলে নারী কৃতদাস বাজারের (আভরেত পাজারি) সন্নিকটে একটি মহিলা হাসপাতাল এবং হাজিয়া সোফিয়ার উপাসক সম্প্রদায়ের সেবায় হাসেকি হুররেম সুলতান হামামি নামে একটি স্নানাগার নির্মাণ। ১৫৫২ সালে তিনি জেরুজালেমে দুস্থ ও অসহায়দের খাদ্যাভাব মেটাতে হাসেকি সুলতান ইমারেত নামে একটি রাষ্ট্রীয় লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করেন।

হুররেম সুলতান ১৫ এপ্রিল ১৫৫৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন এবং মার্বেলপাথরে সুসজ্জিত গম্বুজবিশিষ্ট সমাধিতে তাকে সমাহিত করা হয়। এটি তার সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রকৃতির স্মৃতির প্রতি সম্মান রেখে করা হয়েছিল। সুলায়মানের সমাধির পাশেই তার সমাধি, যা সুলায়মানিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে অবস্থিত।

হুররেম সুলতান বিষয়ক কয়েকটি তথ্য

* ২০০৩ সালে তুরস্কের হুররেম সুলতান ধারাবাহিকে তুর্কি অভিনেত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী গুলবেন এরগেন রোক্সেলানার চরিত্রে অভিনয় করেন।

* ২০১১-১৪ সালের তুরস্কের টিভি ধারাবাহিক মুহতেশেম ইউজিউয়েলে তুর্কি-জার্মান অভিনেত্রী মেরিয়েম উজেরলি প্রথম থেকে তৃতীয় মৌসুম পর্যন্ত এবং অবশিষ্ট চতুর্থ মৌসুমে ওয়াহিদে পারচিন হুররেম সুলতানের ভূমিকায় অভিনয় করেন।

* ২০০৭ সালে ইউক্রেনের মারিয়ুপোল নামের একটি বন্দর নগরীর মুসলিমরা রোক্সেলানার সম্মানার্থে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন।

* ফরাসি লেখক গ্যাব্রিয়েল বোনিন মুস্তাফার মৃত্যুতে হুররেম সুলতানের ভূমিকা নিয়ে লা সুলতানে নামে একটি ট্র্যাজেডি নাটিকা লেখেন।

সূত্র:যুগান্তর


ঢাকা, আগস্ট ১২(বিডিলাইভ২৪)// পি ডি
 
        print

এই বিভাগের আরও কিছু খবর







মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.