bdlive24

মুদ্রানীতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সুখানুভূতির জ্যামিতি

বৃহস্পতিবার আগস্ট ১৭, ২০১৭, ০৭:৩৮ এএম.


মুদ্রানীতি, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সুখানুভূতির জ্যামিতি

বিডিলাইভ রিপোর্ট: আপনার চাকুরীতে বদলী না হলে বা আপনার কর্মক্ষেত্রের অথবা ব্যবসার স্থানান্তর না হলে, সম্ভবতঃ বছর খানেক আগে যে পথ দিয়ে আপনি কাজে যেতেন, আজও হয়তো সে পথেই কাজে যাচ্ছেন।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই কাজে যাওয়ার ব্যস্ততার কারণে আর কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় কিংবা রাতে বাড়ি দ্রুত ফেরার প্রয়োজনে যে পথে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন, তার চারপাশ গভীরভাবে লক্ষ্য করার মতো সুযোগ হয়তো হয়ে ওঠেনি আপনার।

যা দেখছেন, দেখেছেন তা কেবলই ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে। আপনার যাওয়া আসার মাঝে যে পরিবর্তন হয়ে গেছে, আর যে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, তা গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করার সময় হয়তো আপনি বের করতে পারেননি ব্যস্ততার কারণে। নিজের গাড়ী, রিক্সা কিংবা অন্য কোন বাহন, বরাবরের মতো আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছে কর্মক্ষেত্রে। আপনার এই প্রতিদিনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়েই আমাদের এই দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।

এখন আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পনের কথা ভাবছি। আমদের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০২ মার্কিন ডলার হয়েছে (সূত্র: দ্য ডেইলী স্টার মে ১৪, ২০১৭)।  আপনার অজান্তেই নিরব বিপ্লব হয়ে যাচ্ছে দেশে। আপনিও এই বিপ্লবের অংশীদার। বিপ্লব যদি মানুষের জীবনে ধনাত্বক কিছু যোগ করতে পারে, তবে সে বিপ্লব নিয়ে আলোচনা সমালোচনা কমই হয়। কিন্তু বিপ্লব যদি, প্রাত্যহিক জীবনে ঋণাত্বক অনুভুতির সৃষ্টি করে, জনগনের অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে যায়।

বিপ্লবের সাথে মানুষের সুখের সম্পর্ক আছে। আবার সুখের সাথে, শান্তির সাথে, সুখের অনুভূতির সাথে অর্থের মূল্যের সম্পর্ক আছে। তাই বলে, টাকা পয়সা বিহনে যে সুখ একেবারেই আসে না, তা নয়। তবে, সুখের জন্য অর্থের প্রয়োজন আছে। আপনি যে রিক্সায় করে প্রতিদিন কর্মে যেতেন, সেই রিক্সাওয়ালাকে, আপনার কর্মক্ষেত্রে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তার শ্রমের মূল্য হিসেবে বিশ টাকা ভাড়া দিয়ে এসেছেন এতোদিন। রিক্সাওয়ালাও আপনার দেওয়া ভাড়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নি কোনদিন।

কিন্তু আজ, যদি সেই রিক্সাওয়ালা পঁচিশ টাকা ভাড়া দাবী করে বসে, তবে আপনি নিশ্চয় জিজ্ঞাসা করবেন, আজ সে বেশী ভাড়া নিতে চায় কেন? রিক্সাওয়ালা বলবেন, জিনিস পত্রের দাম বেড়ে গেছে, তাই ভাড়া বেশী দিতে হবে। বাজার হতে তেল, মসলা এতদিন যে দরে কিনেছিলেন, কয়েকদিন যাবৎ লক্ষ্য করছেন, এইসব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে, আপনি বিগত দিনগুলোতে যে রকম সুখে ছিলেন, পণ্য ক্রয়ের পিছনে অর্থ খরচ বেশী হওয়ায় আপনি আর সেই সুখানুভূতি পাচ্ছেন না। গত সপ্তাহে যখন বাজারে গিয়েছিলেন, তখন পেঁয়াজ কিনেছিলেন পঁচিশ টাকা কেজি দরে। আজ আপনার বন্ধু, যিনি কিনা আজকে বাজার করলেন, তিনি আপনাকে দেখে বললেন, আজকে বাজারে পেয়াঁজের কেজি পঁয়ত্রিশ টাকা মাত্র। আপনার বুঝতে বাকি নেই, বাজারে পেয়াঁজের দাম বেড়েছে। বাজারে গিয়ে দেখবেন, পেয়াঁজের সাথে সাথে আরো কিছু পণ্যের দাম বেশি হাঁকা হচ্ছে। আপনাকে অর্থের সাথে খরচের হিসাবের একটা আপোস করতে হচ্ছে।

আসলে, আপনি বুঝতে পারেন আর নাই পারেন, আপনার কিংবা রিক্সাওয়ালার সুখানুভূতির পরিবর্তনের পিছনে মূল্যস্ফীতি কাজ করছে। আবার, আপনি চাকুরি করেন, মোটা অঙ্কের বেতন পান বিধায়, জিনিস পত্রের দাম বৃদ্ধি পেলে আপনার কেনা কাটায় তেমন একটা প্রভাব পড়ে না। আপনি বাড়তি মূল্য দিয়েই চুপচাপ বাজার করে যান। কিন্তু আর আট দশজন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যাদের হাতে সব সময় পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না, তারা বাজারে গিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এক ধরনের হতাশায় পড়ে যান। দেখা যায়, মূল্য বৃদ্ধির কারণে প্রায়ই দোকানির সাথে এক শ্রেনীর লোকের কথা কাটাকাটি, বাক-বিতন্ডা হচ্ছে। যারা চুপচাপ থেকে বাজার হতে কেনাকাটা করেন এবং যারা দোকানির সাথে বাক-বিতন্ডায় মাতেন, তারা উভয়ই কিন্তু ক্রেতা। ক্রেতার দুই রকমের আচরণের পিছনে আসলে অদৃশ্যভাবে মূল্যস্ফীতিই কাজ করছে। যিনি চুপচাপ বাজার করে চলেছেন তিনি মূল্যস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে পেরেছেন আর অন্যজন যিনি কিনা দোকানির সাথে বাক-বিতন্ডায় মেতেছেন তিনি মূল্যস্ফীতির সাথে তাল মেলাতে পারছেন না।

তাহলে মূল্যস্ফীতি কি? সহজ সাধারণভাবে বলতে গেলে, বাজারে অর্থের সরবরাহ বেশি হলে মূল্যস্ফীতি হয়। সরবরাহের দিক হতেও মূল্যস্ফীতির বিষয়টা ভাবা যেতে পারে। একজন জেলে জীবন বাজি রেখে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ উপেক্ষা করে যে মাছ ধরে, তা কখনই শুধু মাত্র মানুষকে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে নয়, বরং সে তা করে মুনাফা লাভের আশায়। জেলে মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণ যেমন নৌকা, জাল ইত্যাদিতে যে বিনিয়োগ করে, তার সাথে মাছ ধরার জন্য যে শ্রম তার ব্যয় হয়, সে শ্রমের মূল্য এবং বিনিয়োগ সমেত টাকা যদি ধৃত মাছ বিক্রি করে উঠে না আসে, তবে জেলে মাছ ধরতে যাবে না। ফলে, এক সময় বাজারে মাছের সরবরাহ হ্রাস পাবে। তারপর মাছের দাম বৃদ্ধি পাবে। মানুষ মাছের বিকল্প খুজতে গেলে, সেই পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাবে।

ফলে, বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে থাকবে। বাজারে মূল্যস্ফীতি সহনশীল পর্যায়ে না থাকলে, আপনার অর্থ বেশী খরচ হবে। বাজার অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেলে তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে, আপনার আয় রোজগার বৃদ্ধি করতে হবে। আয় বৃদ্ধি যদি করতে না পারেন, তবে এতোদিনের সঞ্চয় ভেঙ্গে আপনাকে খরচ করতে হবে। সঞ্চয় মানুষ ভবিষ্যতের জন্য করে থাকে। ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত তহবিলে যখনই আপনাকে হাত দিতে হচ্ছে, তখনই আপনি চিন্তিত হয়ে পড়ছেন।

এভাবে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি সাধারণ জনগণকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে। মুদ্রার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মুদ্রাস্ফীতি এমনিতেই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। বাংলাদেশে মুদ্রার এই গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের কাজটি, কেন্দ্রিয় ব্যাংক হিসাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক করে থাকে। মুদ্রার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রিয় ব্যাংক এক অর্থবছরে দুই বার মুদ্রানীতি ঘোষণা করে থাকে। অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য অর্থাৎ জুলাই হতে ডিসেম্বর এই ছয় মাসের জন্য একবার এবং অন্য ছয় মাসের জন্য আরেকবার মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়।

কেন্দ্রিয় ব্যাংক বৈশ্বিক, অভ্যন্তরীণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতি বিবেচনায় রেখেই জাতীয় মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে থাকে। মুদ্রানীতি প্রণয়ন কালে দারিদ্র বিমোচন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণের প্রবাহ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর মতো সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাসমূহ বিবেচনায় নেওয়া হয়। মুদ্রানীতির অন্যতম কাজগুলো হলো- মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, ঋণের প্রক্ষেপণের মাধ্যমে সরকারী-বেসরকারী খাতে ঋণের যোগান ধার্য করা এবং মুদ্রার প্রচলন নিয়ন্ত্রণ করা।

চলতি বছরের জুলাই - ডিসেম্বর সময়ে অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য জুলাই ২৬,২০১৭ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষনা করেছে। কেন্দ্রিয় ব্যাংকের পক্ষ হতে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখার পাশাপাশি দেশজ উৎপাদনে অন্তর্ভূক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব গতিশীল প্রবৃদ্ধির সরকারি অভীষ্ট অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমান প্রেক্ষাপটে নতুন ২০১৮ অর্থবছরের জন্য মুদ্রনীতি কার্যক্রম এবং অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য মুদ্রানীতিভংগী প্রনয়ণ করা হয়েছে।

এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি সরকার কর্তৃক প্রক্ষেপিত হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রবৃদ্ধি সাত দশমিক ২৪ শতাংশ অর্জিত হয়েছে (সূত্র: ডেইলি স্টার মে ১৪, ২০১৭)। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে জুলাই - ডিসেম্বর সময়ের জন্য বেসরকারী খাতে ঋণের জোগান ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ২ শতাংশ আর জুন পর্যন্ত জোগান ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। গেল মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের যোগান ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মে ২০১৭ পর্যন্ত অর্জিত হয়েছে ১৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছিল, বর্তমানে তা লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে রয়েছে। জুন ২০১৭ তে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে গড় বার্ষিক ভোক্তামূল্যস্ফীতি ৫.৫ শতাংশে পরিমিত রাখার এবং ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রকৃত দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা ব্যক্ত করা হয়েছে। অবশ্য এ জন্য কৃষি, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তাদের কম সুদে সহজ ঋণের জোগান অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে।

বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হলো মুদ্রানীতি। অনেকে মনে করছেন, বর্তমানে যেহেতু দেশে ঋণের সুদের হার কম এবং ব্যাংকগুলোতে প্রচুর অর্থ আছে, সেহেতু বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি আর একটু বেশী হলে ভালো হতো। আবার একথাও শোনা যাচ্ছে যে, বিনিয়োগ পরিস্থিতির এমন কোন উন্নতির প্রকাশ ঘটেনি যে ঘোষিত প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়ে যাবে।

গত মুদ্রানীতিতে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বিপরীতে মে পর্যন্ত ১৬ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। তবে, মুদ্রানীতির বিষয়ে যে কথাই আসুক না কেন, একটা বিষয়ে সবাই একমত যে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান না বাড়ালে কাঙ্খিত উন্নয়ন কোন মতেই সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের সাথে ব্যবসায়-বাণিজ্যের একটা সম্পর্ক আছে। শিল্পায়নের সম্পর্ক আছে। শিল্পায়ন যত বেশী হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ তত বৃদ্ধি পায়। ফলে, বেকারত্বের হার কমতে থাকে। সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। উৎপাদনমুখী এবং বিনিয়োগ বান্ধব মুদ্রানীতি থাকলে শিল্পায়ন তথা বিনিয়োগ ত্বরান্বিত হয়। ফলে, কর্মসংস্থানের পরিধি বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং কৃষিখাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি করতে পারলে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সহজ হবে বলে আশা করা যায়। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে, কর্মসংস্থান বাড়বে।

ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অধিক ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের জন্য যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি কিছু বাধাও রয়ে গেছে। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো সুবিধা মতো জমির অভাব, অবকাঠামোগত বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বিদ্যুৎ তথা জ্বালানীর সহজলভ্যতার অভাব ইত্যাদি। দেশের কয়েকটি হাইওয়ের উন্নয়নের দিকে যেমন নজর দিতে হবে, তেমনি অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে। দেশে ক্যাপিটাল মেশিনারীজ এনে উৎপাদনে কাজে লাগানো হলো, কাঙ্খিত পণ্যও উৎপাদিত হলো। কিন্তু, সরবরাহ পর্যায়ে, দেশের সব অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ার কারণে যাত্রা পথে যানজট লেগে থাকল। পণ্য পরিবহনে একদিকে যেমন বেশি সময় লাগলো, তেমনি পণ্যের মূল্য, সময় বিবেচনায় বেশী হলো। কারণ, উৎপাদিত পণ্য যখন বাজারে বিক্রির জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়, তখন পরিবহন সময় এবং পরিবহন খরচও হিসাবায়ন করা হয়।

সুতরাং দেশের ভিতরে সুষম উন্নয়ন নিয়ে ভাবতে হবে। শিল্প কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, প্রধান প্রধান অফিস আদালত ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর আর তার আশেপাশে এলাকায় হওয়ায় সুষম উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। উন্নয়ন সুষম করতে হলে, শিল্প কারখানা বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। শিল্প কারখানা বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হলে শিল্প পণ্যের উৎপাদন খরচ কমে আসবে।

কারণ, ক্যাপিটাল মেশিনারিজের খরচ স্থির হওয়ায়, উৎপাদনের মূল উপাদান- শ্রম, যা কিনা একজন শ্রমিক বিক্রি করে থাকেন, তার মূল্য স্থানীয়ভাবে কম হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমে আসবে। আবার স্থানীয় শ্রমিকের দক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে। বড় শিল্প কারখনার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ছোট ছোট ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে এলাকা ভিত্তিক অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠবে।

আমরা যে উন্নয়নের কথা ভাবছি, তা অবশ্যই সমতা ভিত্তিক হতে হবে। সমতা ভিত্তিক উন্নয়ন না হলে, সে উন্নয়ন টেকসই নাও হতে পারে। দেশে অঞ্চল ভিত্তিক গবীর মানুষের সংখ্যা কমাতে হবে। অবকাঠামোগত ব্যবস্থা বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে দারিদ্রের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বাজারে প্রবেশযোগ্যতা সহজ করে দেয়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ঢাকা, চট্টগ্রাম বা উন্নত এলাকার কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের মধ্যে দারিদ্রের হার, তুলনামূলকভাবে এসব শহর হতে দূরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের দারিদ্রের হারের চেয়ে কম।

সুতরাং যোগাযোগ বা অবকাঠামোগত খাতে যাতে অধিক পরিমান বিনিয়োগ করা যায় সেদিকে নজর দিতে হবে। একজন গ্রাহক ব্যাংক হতে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় না খাটিয়ে, উৎপাদনে ব্যবহার না করে, ভোগে ব্যবহার করতে যেন না পারেন সেদিকে নজরদারীও বৃদ্ধি করতে হবে। অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ দেশের জন্য তেমন একটা উপকারে আসে না। শিল্পখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরী হয়। আবার কর্মসংস্থান শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক হলে হবে না। দেশের অনুন্নত অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, জ্বালানী ইত্যাদিসহ উৎপাদনের জরুরী উপকরনের সহজলভ্যতা কিভাবে সৃষ্টি করা যায়, সে বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

দেখা যাচ্ছে, দেশের এক অঞ্চল উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করলেও অন্য অঞ্চল সুবিধাবঞ্চিত হয়ে আসছে। অঞ্চল ভিত্তিক এই বৈষম্য হতে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। ঘোষিত মুদ্রানীতির দ্বারা উৎপাদনশীল খাতে ঋণের প্রবাহ অব্যাহত রাখতে পারলে, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগকারীগণ উৎসাহ পাবেন বলে আশা করা যায়।

রাজনীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি, এই দুই চলকের স্থিতিশীলতা (যদিও সাম্প্রতিক বন্যা মুদ্রাস্ফীতির উপর প্রভাব ফেলেছে), বেসরকারি বিনিয়োগকারীগণকে বিনিয়োগে সহায়তা বা সাহস যোগাবে বলে আশা করা যায়। তবে, বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বিবেচনায় আনতে হবে। ঋণের উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে, শ্রেনীকৃত ঋণগুলো বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকগুলোর জন্য। এই শ্রেনীকৃত ঋণের বোঝার কারণে ব্যাংক তার ঋণের সুদের হার কমাতে পারছে না। খেলাপী ঋণ সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ঋণ আদায়ে আইনী জটিলতাও রয়েছে। ভালো ঋণ গ্রহীতাদের প্রণোদনা দিয়ে খেলাপী সংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসার উপায় খোঁজা যেতে পারে। খেলাপী সংস্কৃতি হতে বের হয়ে আসতে পারলে, ঋণের সুদের হার এমনিতেই কমে যাবে বলে মনে করা হয়।

আমাদের দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ, বিশেষ করে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোন বিকল্প নাই। কারণ, আমাদের দেশের মোট অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সিংহভাগই বেসরকারি খাত কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছে। আমাদের বিপুল জনসংখ্যাকে, বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র তৈরী করে যদি দক্ষ করে তোলা যায়, তবে, উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য্য করা হয়েছে, তা অর্জন করা যেতেই পারে। আমরা আশা করি, ঘোষিত মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে রেখে, ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সহায়ক ভূমিকা পালন করে, মানুষের যাপিত জীবনে সুখের বাতাস বয়ে আনবে।


লেখক: খন্দকার রাহাত মাহমুদ।


ঢাকা, আগস্ট ১৭(বিডিলাইভ২৪)// জেড ইউ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.