সর্বশেষ
রবিবার ১২ই ফাল্গুন ১৪২৪ | ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

জঙ্গি অর্থায়নের একটি কোড 'সদরঘাট ২৫৬'

বৃহঃস্পতিবার ২৪শে আগস্ট ২০১৭

1049749194_1503542177.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
সদরঘাট ২৫৬-এটা কোনও ঠিকানা নয়। এটা জঙ্গি অর্থায়নের একটি কোড। সিরিয়া থেকে ৪০ লাখ টাকা পাঠিয়েছিল সাইফুল হক সুজন। যে ওই কোড বলবে তার কাছেই টাকা দেওয়ার নির্দেশ ছিল। হুন্ডির মাধ্যমে চীন হয়ে এই টাকা আসে সুজনের বাবা আবুল হাসনাত ও ছোট ভাই গালিবের কাছে। টাকা দেওয়ার কথা ছিল নব্য জেএমবির প্রধান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীকে। তবে তার আগেই রাজধানী কাওরান বাজারে সুজনের প্রতিষ্ঠান আইব্যাকসের অফিসে হানা দেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সুজনের বাবা, ভাই, শ্যালক ও এক কর্মচারীকে গ্রেফতার করে এবং জঙ্গি অর্থায়নের জন্য পাঠানো ৩৮ লাখ টাকা উদ্ধার করে।

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি মার্কিন ‘ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেসটিগেশন’ (এফবিআই) যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এ সংক্রান্ত একটি নথিপত্র এফিডেভিট আকারে জমা দিয়েছে। সেই নথির সূত্র ধরেই জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের (ইসলামিক স্টেট) হয়ে যুদ্ধ করতে যাওয়া বাংলাদেশি নাগরিক সুজনের জঙ্গি অর্থায়নের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বছর দুই আগে সে সিরিয়ার রাক্কা নগরীতে নিহত হয়। একইসঙ্গে আলোচনায় এসেছে, স্পেনে থাকা সুজনের বড়ভাই আতাউল হক সবুজও।

ধারণা করা হচ্ছে, স্পেনের সম্প্রতি জঙ্গি হামলায় সবুজের অর্থায়ন বা তার সরাসরি যোগসাজোশ থাকতে পারে। জঙ্গি কার্যক্রম ও অর্থায়ন করায় সবুজকে গ্রেফতার করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ঢাকার সিটিটিসি ইউনিট ইন্টারপোলের মাধ্যমে চিঠিও পাঠিয়েছিল।

সিটিটিসি ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সুজন আসলে লন্ডনে পড়তে গিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। ২০০৩ সালে ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় সে ব্রিটেনে পাড়ি জমায়। সেখানকার সাউথ ওয়েলসের ইউনিভার্সিটি অব গ্ল্যামর্গানে কম্পিউটার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশুনা করে। পরে সেখানে একটি কম্পিউটার ফার্ম তৈরি করে ব্যবসা শুরু করে। মূলত এই প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সে জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করতো। বাংলাদেশে নব্য জেএমবির কার্যক্রমের শুরুর দিকে এর শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর কাছেও টাকা পাঠিয়েছিল সে।’

সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আমরা নব্য জেএমবির মধ্যম পর্যায়ের অন্তত দুজন জঙ্গি সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সুজনের অর্থ পাঠানোর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। যাদের সঙ্গে জঙ্গি সাইফুল হক সুজনের সরাসরি দেখাও হয়েছে। এমনকি, তারা সুজনের বাবা আবুল হাসনাতকেও চিনতো। আবুল হাসনাত সম্প্রতি কারাগারে আটক অবস্থায় মারা যায়।সুজনের পরিবারের সদস্যরা সবাই জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত।’

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমরা জঙ্গি অর্থায়ন নিয়ে অনেক তথ্য পাচ্ছি। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। অর্থায়ন বন্ধ করতে পারলেও জঙ্গিবাদ কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, আইব্যাকস টেকনোলজিস লিমিটেড নামে সাইফুল হক সুজনের প্রতিষ্ঠানটির ১০টি শাখা ছিল। প্রিন্টার বিক্রয়ের নামে সে মূলত জঙ্গি অর্থায়নের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতো। ২০১৫ সালের ১১ ডিসেম্বর এলশিনাওয়িকে গ্রেফতারের পর এফবিআই জঙ্গিদের অর্থপাচারের এই নেটওয়ার্কের বিষয়ে জানতে পারে, যার একদিন আগে সিরিয়ার রাক্কায় যুক্তরাষ্ট্রের এক ড্রোন হামলায় মারা যায় সাইফুল হক সুজন। যদিও বিষয়টি প্রকাশ হয় সুজন মারা যাওয়ার ১৯ দিন পর ওই বছরেরই ২৯ ডিসেম্বর।ওই বছরই সুজনের অফিসে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ।

সিটিটিসি ইউনিট বলছে, সুজন যেমন ব্রিটেন থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সিরিয়াতে পাঠিয়েছে, তেমনি সিরিয়া থেকেও বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রমের জন্য টাকা পাঠিয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকায় নিজের প্রতিষ্ঠান আইব্যাকস ও বাবা-ভাইকে ব্যবহার করেছে সে। সুজনের জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়টি জেনে তার পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের পাঁচ জনকে গ্রেফতারের পর দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। যার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে, অন্যটি মানি লন্ডারিং আইনে। মামলা দু’টির এখনও তদন্ত চলছে। তদন্ত করছে সিটিটিসি ইউনিট।

তামিম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সুজনের
২০১৪ সালের জুলাইয়ে ব্রিটেন থেকে ঢাকায় আসার পর তামিম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ হয় সুজনের। সুজনই তামিম চৌধুরীকে বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম বিস্তারের জন্য অর্থ আসার রুটগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। সিটিটিসি যে দুজন জঙ্গির ভাষ্য থেকে এই তথ্য পেয়েছে তারা নিজেরাও সুজনের মাধ্যমেই নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। জঙ্গিদের নিজস্ব মেসেজিং অ্যাপসের মাধ্যমে যোগাযোগ করার জন্য তাদের দুজনকে দুটি আইডিও দিয়েছিল সুজন। যাদের একজন পরবর্তীতে তামিম চৌধুরীর নির্দেশে নব্য জেএমবির আর্থিক দিকটাও দেখভাল করতো।

সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘গুলশান হামলার আগে তামিম চৌধুরীর কাছে প্রথম দফায় যে ১৪ লাখ টাকা এসেছিল, তা সুজনের দেখানো পথেই আসে। যদিও এর আগেই সুজন মারা যায়। কিন্তু সেই চ্যানেলেই নব্য জেএমবির কাছে অর্থ আসতে থাকে। পরবর্তীতে ওই চ্যানেলের মধ্যস্থতাকারী হুন্ডি ব্যবসায়ীকে শনাক্ত করে অর্থ আসার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার ও সুজনের জঙ্গি অর্থায়নের এক মামলার তদন্ত কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা আহমেদুল ইসলাম বলেন,‘আমরা সুজন ও তার ভাই সবুজের জঙ্গি অর্থায়নের বিষয়ে অনেক তথ্য পেয়েছি। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। জঙ্গি অর্থায়নে তাদের সঙ্গে আরও যারা জড়িত আছে, তাদেরও শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’

সুজনের পরিবারের সবাই জঙ্গিবাদে জড়িত
খুলনার পাকুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সুজন সিরিয়ায় আইএসের শীর্ষ ১০ নেতাদের একজন ছিল। আইএসের তথ্যপ্রযুক্তি ও হ্যাকিং শাখার প্রধান সুজন, তার স্ত্রী ও বড়ভাই সবুজ ও তার সাবেক স্ত্রী, বাবা আবুল হাসনাত, ছোটভাই গালিবকেও জঙ্গিবাদে নিয়ে আসে। সবুজ ও সুজন প্রায় একই সময়ে ব্রিটেনে যায়। সেখান থেকে স্পেনে গিয়ে সবুজ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সেখান থেকেই সে সুজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং জঙ্গিবাদে অর্থায়ন করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সবুজ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

সূত্র:বাংলাট্রিবিউন

ঢাকা, বৃহঃস্পতিবার ২৪শে আগস্ট ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // পি ডি এই লেখাটি 18 বার পড়া হয়েছে