bdlive24

সেদিন স্টেশনে

বৃহস্পতিবার আগস্ট ৩১, ২০১৭, ১২:১৬ পিএম.


সেদিন স্টেশনে

বিডিলাইভ ডেস্ক: রানা অনেক দিন পর ওর বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছে। ওর বোন সাথী লক্ষ্মীপুর সদরে পলিটেকনিক্যাল ইনটিটিউটে চাকুরি করে। বোনের স্বামী লিমন চাকুরি করে লক্ষ্মীপুর একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। সাথে ছোট মেয়েটি নিয়ে ওদের বেশ ছোট পরিবার। বড় মেয়েটি রানাদের বাড়িতে ওর মা অর্থাৎ নানীর কাছে থাকে। নাম তানজিন। তানজিনকে নিয়ে বেড়াতে বিকালে এসেছে। যে বাড়িতে সাথী ভাড়া থাকে সে বাড়িটি একতলা। উপরে ছাদ দেয়া। সাথী বিকালে ছাদে ওঠে আড্ডা দেয় প্রায়ই বাড়িওয়ালার মেয়েসহ। আকাশে মুঠি মুঠি মেঘ। এ পাশ থেকে ওপাশে যায় আর আসে মনের সুখে। রানাও ছাদে ওঠল। ছাদে গিয়ে পরিচয় হয় বাড়িওয়ালার ছেলে শাকিলের সাথে। শাকিল সবে মাত্র এইচএসসি পাশ করেছে। কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা হয়। এর মধ্যে সাথী ভাইকে ডাকতে ডাকতে ছাদে আসে। হাতে চায়ের ট্রে। সঙ্গে একটি মেয়ে, বাড়িওয়ালার মেয়ে। সাথী রানার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। মেয়েটির নাম রত্মা। শাকিলের বোন। রানা মেয়েটিকে দেখে। রানা মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়েটি লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। মেয়েটির গায়ের রং ফর্সা না হলেও শ্যাম বর্ণের। অবশ্য গায়ের রঙ ছেলে হোক মেয়ে হোক কি যায় আসে। সভ্যতা মানুষকে এখন মানুষের গায়ের রং বাদ দিয়ে পড়াশুনার প্রতি আকৃষ্ট করছে। মানুষের মনুষ্যবোধ তার আচরণে গায়ের রঙে নয়। লেখাপড়া থাকলেই হলো। ওরা চারজনে চা খেতে খেতে অনেক গল্প করে। রানার পড়াশুনার গল্প। রানা বিবিএ পড়ছে। ঢাকার একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। ক্লাস এখন বন্ধ, সামনে পরীক্ষা আছে তাই বোনের সাথে দেখা করতে এসেছে।

রাতে রানা শুয়ে শুয়ে মেয়েটির কথা চিন্তা করছে। মেয়েটি দেখতে ফর্সা না হলেও চেহারায় একটা মায়া আছে। শ্যামলা রঙ তাতে তার চোখ, মুখ শ্রাবণের বৃষ্টির কথা বলে, শরতের থোকা থোকা মেঘের চাদরে জড়িয়ে দেয়, গ্রীস্ম তাপদাহে প্রশান্তি দেয়ার মত। কিছুতেই ওই চোখ মুখের ভাবনা থেকে মন সরে না রানার। এ কোন মদিরা তাকে আচ্ছন্ন করেছে কে জানে। খুব একটা কথা না হলেও দু’একটি কথায় মেয়েটিকে কেমন যেনো তৃষ্ণার্ত মন টেনে নিতে চায় এ মায়ার ঘোর কাটে না সহজেই রানার। মনে মনে অনেক ভাবে কিভাবে মেয়েটির সাথে কথা বলা যায়। কাউকে বলাও যাবে না। তাছাড়া আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলে যদি মেয়েটি না বলে। তাহলে আবার উল্টো অপমান সইতে হবে। এই ভেবে রানা নিজের মনের ইচ্ছাটাকে অবদমন করে। রানা ভেবেছিলো পরদিন চলে আসবে। কিন্তু না কেন জানি যেতে ইচ্ছে করছে না। ওর বোনও অনেক বলল। এতদিন পর এলি থাক আর দু, একদিন। ব্যস ; সাড়া পাওয়ায় থাকল আরও একদিন। মেয়েটিকে দেখার ছলে কিছুক্ষণ পর পর বাইরে হাটা চলা করে। দেখা হয়, মেয়েটিও ওকে দেখে। আবার চলে যায়।

কিন্তু আগ বাড়িয়ে কোন কথা বলেনা। মেয়েটির বাবা খুব কড়া মানুষ। বোঝা যায় মাঝে মাঝেই রত্মাকে ডাকে। ডাকের স্বর কেমন গম্ভীর। রত্মা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। এই ফাঁকে কোচিং করে আর ছোট ভাইকে পড়ায়। ছোট ভাইটি ক্লাস ফাইভে পড়ে। কিন্তু খুব দুষ্ট প্রকৃতির। রানা অল্প সময়েই তা বুঝে ফেলেছে। ওর দুষ্টুমি এমন পর্যায়ের নাকি শয়তান উল্টো ওকে দেখলে পালায়। পড়ার সময় কান ধরে এনে বসাতে হয়। রানা এসব লক্ষ্য করে। তবুও ফাঁক খোঁজে যদি রত্মার সাথে একটু কথা বলা যায়। না মেয়েটি মাঝে মধ্যে বাইরে এসে দেখে যায়। কিন্তু তেমন মুখ খুলে কিছু বলে না। রানা অস্থির হয়ে যায়। মেয়েটি আচরণে সাড়া পাচ্ছে না। কি করে সে সাহস করে বন্ধুত্বের হাত বাড়াবে। মেয়েটিকে বন্ধুত্বের কথা বললে যদি মেয়েটি সবাইকে বলে দেয়। তাহলে কি লজ্জা। এখানে ওর বোন থাকে ভাড়া। তাছাড়া মেয়েদের সাথে সাবধানে কথা বলতে হবে। ইদানিং নারীদের প্রতি সামাজিক নির্যাতন বেড়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রীয় ভাবে বিভিন্ন আইন প্রণীত হয়েছে। শেষে কোন ঝামেলায় পড়ে কে জানে। এসব সাত পাঁচ ভাবতে থাকে রানা। সে সিদ্ধান্ত নেয় আগামীকাল সে চলে যাবে।

সকালে যথারীতি ঘুম থেকে ওঠে ওর বোনকে বললঃ আপা আমি বিকালে বাড়ি চলে যাবো।

শুনে ওর বোন বলল: সেকি এলি তো কাল; আজই চলে যাবি ?

রানা : হ্যাঁ । আবার সময় পেলে আসব বলতে বলতে রানা দরজার বাইরে এসে দেখে মেয়েটি ওদের রুমের সামনে বারান্দায় দাড়ানো। দেখেই রানা থতমত খেয়ে একটু মুচকি হেসেই এদিক ওদিক তাকিয়ে দরজার দাঁড়াল। মেয়েটি মাঝে মাঝে ওদের রুমের ভেতর তাকাচ্ছে। কিছু একটা বলতে যাবে রানা অমনি ঘরের ভেতর থেকে রত্মা... রত্মা ...। জি - মা ... বলে যেতে উদ্যত হলে রানা তাড়াতাড়ি ফোন নম্বরটি পকেট থেকে বের করে দূর থেকে ছুঁড়ে দিল। যা আগেই রানা দেয়ার জন্য লিখে পকেটে রেখেছিল। রত্মা সেটি কুড়িয়ে নিয়ে দ্রুত ঘরের ভেতর চলে যায়।

বিকালে যথারীতি রানা বাড়ী চলে আসল। দু’তিন দিন বাড়ি থেকে আবার ঢাকায় চলে আসল। ঢাকায় আসার পরদিন বিকালে রানা একা একা বসে আছে টিএসসি-তে ডাস -এর পিছনে। ফেরিওয়ালা চা নিয়ে মাছির মত ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে বেড়াচেছ। রানার কাছে আসতেই এককাপ ‘র’-টি হাতে নিয়ে খুব আয়েশ করে পা দুলিয়ে পান করতে লাগল। বৈকালের আকাশ ধবধবে সাদা মেঘ, মেঘ গুলো স্থির, মনে হয় সাদা পেইন্ট করা হয়েছে। এমন সময় বেজে ওঠল ফোন। বাম হাত পকেটে ঢুকিয়ে ফোন বের করে দেখল অচেনা নম্বর। দ্বিধা দ্বন্ধে ফোনটি রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চিকন নরম আর নমনীয় সুর ; হ্যালো আমি রত্মা। কেমন আছেন। রানা বুঝতে পারল কণ্ঠস্বরটি। তবুও বলল ঃ কোন রত্মা ভাই ? আরে চিনতে পারছেনা আপনার বোন যে বাসায় থাকে। সে বাসা থেকে।

রানা : ও . . . ও . . . হ্যাঁ রত্মা। কেমন আছেন ;

রত্মা : জি ভাল । আপনি কেমন আছেন। ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা। পরে বলল : আমি সুযোগ পেলে ফোন করব। এটা দোকানের ফোন। এ নাম্বারে ফোন দিবেন না।

রানা : আচ্ছা ঠিক আছে।

এতক্ষনে রানার হাতে থাকা আয়েশী চা জুড়িয়ে ঠান্ডা জল হয়ে গেছে। মুখে দিয়ে থু মেরে ফেলে দিল। ‘র’-টি আবার ঠান্ডা ; তেতো আর কি। তাতে কি ; মনে মনে সে ভীষণ খুশি। রত্মা তাকে নিজেই ফোন করেছে। ভাবতেই মন উচ্ছসিত হয়ে ওঠে বারে বার। দু’হাত মুঠি করে গা ঝাঁকুনি দিয়ে বুক টান করে একটা জয়ের হাসি একা একাই

দিয়ে যাচ্ছে। ভাবে সে রত্মাকে জয় করেছে। আশে পাশের লোক গুলো ছেলেটির কান্ড দেখে ভাবছে হয়ত মাথায় সিট আছে। প্রতিনিয়ত কত পাগল কত ভাবে ঘুরে বেড়ায়। কে আর এসব পাগলা বাতাসকে মনে রাখে। কার দায় ঠেকে এসব আবোল তাবোল ভাবনা গুলো বিশ্লেষণ করে। রানা দেখছে আকাশের মেঘ যেনো নীল শাড়ী পরে রত্মারূপে ভাসছে। রত্মা সম্পর্কে অনেক স্বপ্ন তৈরী করতে শুরু করল রানা।

কিছুদিন পর রানার পরীক্ষা আরম্ভ হলো। পড়ার দারুণ চাপ। রতœার সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। পরীক্ষা চলছে সময় খুব কম পাওয়া যায়। পরীক্ষা শেষ হলেই রানা এখন বাঁচে। তারপর একটা চাকুরীর ব্যবস্থা করতে হবে। এসব স্বপ্নে কেটে যাচেছ রানার সময়।

রত্মা কিছুতেই রানার বোনকে বিষয়টি বুঝতে দেয়নি। তবে আগের তুলনায় রানার বোনের বাসায় খুব ঘন ঘন আসা-যাওয়া করে রত্মা। তাতে রানার ছোট্র ভাগ্নিটির বেশ সময় কাটে রত্মার সাথে। তারপর প্রায়ই রত্মা রানাকে ফোন দেয় দোকান থেকে ; অনেক লম্বা সময় কথা হয়। রানা রত্মার কাছ থেকে মাঝে মধ্যে বোনের খোঁজ খবরও নেয়। মাঝে মাঝে রানা নিজেও ফোন কেটে দিয়ে দোকানদারের ফোনে ফোন দিয়ে কথা বলে। তিন চার মাস হয়ে গেল। এরই মধ্যে রানার বিবিএ রেজাল্ট হয়েছে। রানা ফার্স্ট হয়েছে। রত্মাকে খবরটি জানায়। রত্মা শুনে খুব খুশি হয়। দুজনে খুব স্বপ্ন রচনা করতে থাকে মোবাইল ফোনে। চাকুরী খুজতে থাকে। এ দিকে রানা খুব দ্রুতই এমবিএ ভর্তি হয়। ক্লাস শেষ হয় রাত ৯:০০টায়। পাবলিক বাসে বাসায় আসতে আসতে ১০-১১ টা বেজে যায়। একদিন ফিরছিল ক্লাস শেষে। হঠাৎ ফোন চুরি হয়ে যায় পকেট থেকে। এদিকে রত্মা পরদিন দুপুরে ওদের বাসার ফোন থেকে ফোন দেয়। ঘরের সব দিক খেয়াল করে দেখে ওর মা দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছে। এ সুযোগে সে রানাকে ফোন দেয়। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করতেই ওর মা এসে ফোনটি নিয়ে কথা বলে। রত্মা বুঝতে পারেনি যে মা চোখ বুঁজে ছিল। ততক্ষনে রত্মা ভয়ে নীল হয়ে যায়। ওর হাত পা কাঁপছিল। গলার স্বর ভারি হয়ে গেল ভয়ে। মার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এমনিতেই মাকে সে যমের মত ভয় পায়। আবার ধরা পড়ল মার কাছেই। ওর মার কণ্ঠ শুনে ওপাশ থেকে একটি ছেলে বলে ওঠল আমি জসীম।

রত্মার মা আয়শা বেগম প্রশ্ন করে : তুমি কি কর ?

জসীম : জসিম বুঝতে পারে ভারী গলা। বয়স্ক মহিলা নিশ্চয়ই। ভদ্র ভাবে বলে ; আমি একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করি।

আয়শা বেগম : পড়াশুনা করেছ।

জসীম : জি

আয়শা বেগম : কতদূর

জসীম : ইন্টারমিডিয়েট পাশ

আয়েশা বেগম : কোথায় চাকুরি কর।

জসীম : ঢাকায়।

আয়েশা বেগম : রত্মাকে কতদিন ধরে জানো ?

জসীম : রত্মা নাম শুনে জসীম নিশ্চিত হয় মেয়ের মা। আমতা আমতা করে বলে জানি. . .

আয়েশা বেগম : বাড়ী কোথায় ?

জসীম : কুমিল্লা সদর।

আয়েশা বেগম শুনে মনে একটু খুশী হন। চাকুরী জীবি ছেলে। বলল: তুমি রত্মা সম্পর্কে আগ্রহী ?

জসীম : জি খালাম্মা

আয়েশা বেগম : তোমার পরিবারে কে কে আছে ...

জসীম : মা, বাবা, ছোট এক ভাই এক বোন।

আয়েশা বেগম : তুমি সবার বড় ?

জসীম : জি

আয়েশা বেগম : তাহলে আমাদের বাড়ী চলে আসো তোমার গার্ডিয়ান নিয়ে। এভাবে চুপি চুপি কথার বলার দরকার নেই।

জসীম : জি খালাম্মা। কখন আসব।

আয়েশা বেগম : সম্ভব হলে কাল।

জসীম : জসীমের হঠাৎ ফোনটির কথা মনে পড়ল। ফোনটি তো সে চুরি করেছে। যার সে যদি কোন ভাবে খোঁজ পায় তাহলে রক্ষা নেই। যে করে হোক ফোনটি বন্ধ রাখতে হবে। তাই বলে দিল খালাম্মা কাল বিকালেই আসব। আরেকটি ফোন আছে বলেই তড়ি গড়ি বলল : নম্বরটি লিখে নেন। আর এ নাম্বারটি মাঝে মাঝে খোলা থাকে।

আয়েশা বেগম : ঠিক আছে বলো ... বলেই নাম্বারটি লিখে নিলো।

জসীম ফোনটি রেখে দুই ঘন্টার মধ্যেই রেডি হয়ে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যেতে বেশীক্ষণ লাগবে না। ঢাকা থেকে কুমিল্লা খুব একটা দুরত্ব নয়। বাড়ী গিয়ে রাতে গুছিয়ে পরদিন ঠিক সময়ে রত্মাদের বাড়ীর দিকে যাবে। এদিকে মার মেয়ে দেখার ঝামেলা কমে গেল। অনেক দিন ধরেই বিয়ে দেয়ার জন্য মা ওঠে পড়ে লেগেছে। এবার মার কষ্ট কমে গেল। ভালই হলো। মনে মনে তার সেয়ানামি চিন্তা করেই হাসে জসীম। মার ইচ্ছাও পূরণ হবে আবার ফোনটাও পাওয়া গেল সাথে মেয়েটিকে। এক ঢিলে দুই পাখি নয় তিন পাখি মারা আর কি।

এদিকে রত্মা রাতটা কোন মতে অস্থিরতায় কাটিয়ে সকালে দোকানে গিয়ে ফোন দিল। ফোনটি বন্ধ। আয়েশা বেগম মেয়েকে কিছুই আর বললো না। রাতে ওর বাবার কানে কথাটা দিয়েছে। আর পরদিন ছেলে দেখতে আসবে এও বলেছে। ব্যস্ কাজ সারা। স্বামীকে আয়েশা বেগম বলেছে দুপুরের পরে যেভাবেই হোক দোকান পাঠ বন্ধ করে বাসায় আসে যেনো। এদিকে রত্মার অবস্থা খুবই খারাপ সে এখন কি করবে। ভাবছে রানার বোনকে বলবে। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছেনা। যদি তার মাকে বলে দেয়। ওদিকে রানার বোনকে আয়েশা বেগম সকালে বিষয়টি বলেছে। বিকালে মেহমান আসবে যেনো এদিকে একটু থাকে মেহমানের সামনে। কথা বার্তা বলার জন্য। রানার বোন কথাটি শুনে সায় জানাল। বিকালে জসীম হাজির। তার বাবা মাকে নিয়ে। সবাই খুব খুশি। ছেলে দেখতে সুন্দর আয়েশা বেগমের পছন্দ হয়। ছেলেরও রত্মাকে দেখে পছন্দ হয়। জসীম তার মাকে ইশারা করলে মা মেয়েকে আংটি পরিয়ে দেয়। তারপর জসীম মার সাথে বোঝা পড়া করে বলে আজই বিয়ে হয়ে যাক। কারণ জসীমের মনে দূবলতা কেবল জসীমই জানে। সে ফোনটির সাথে মেয়েটিকেও চুরি করেছে। ফোনটি যার সে একটি ছেলে। তার ফোনে অনেক ম্যাসেজ ছিল। বেশ কিছু দিনের প্রেমের সম্পর্ক রত্মা আর ছেলেটির।

ওদিকে রত্মার অঝোর ধারা দু’চোখে। সবাই ভাবছে বিয়ের সময় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সব মেয়েরাই এভাবে কাঁদে। ছেলে পক্ষের প্রস্তাবে আজ রাতেই বিয়ে। আয়োজন শুরু করল আয়েশা বেগম। স্বামীকে বাজারে পাঠাল। ছেলে শাকিলকে দিয়ে এবং ফোনে আত্মীয়

স্বজন যাকে যাকে পাওয়া গেল সবাইকে জরুরী ভাবে দাওয়াত দিয়ে আসতে বলল : মহা খুশীতে বিয়ে হয়ে গেল। রত্মা ভেবে পায় না কি করবে। সে কি পালাবে। কিন্তু কোথায় পালাবে। সেতো কিছুই চেনেনা। রানার ঠিকানাও জানেনা। তাছাড়া রাতের বেলা। ভাবতে ভাবতে চোখের হলে নদী হয়ে যাচ্ছে।

জসীম বিয়ে করে দু’তিন দিন শ্বশুর বাড়ী থেকে বউকে নিয়ে নিজের কুমিল্লার বাড়ীতে এসে আরো দু’তিন দিন থেকে মাকে বলল ঃ মা রত্মাকে ঢাকায় নিয়ে যাই। পরে কিছু দিন থেকে আবার চলে আসবে। ছেলের কথায় রাজী প্রথমে রাজী হয়নি মমতাজ বেগম। জসীম মাকে বুঝিয়ে বললে পরে একসময় রাজী হয়। জসীম বিয়ের প্রায় আট দশদিন পর বউ নিয়ে ঢাকায় আসল। সায়েদাবাদ গাড়ী থেকে নেমে বউকে এক জায়গায় বসিয়ে সি.এন.জি ডাকতে গেল।

রানার ফোন হারানোর পর রত্মা সহ সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সে টেনশনে পড়ে গেল। নিজের নাম্বারে ফোন দিয়ে দেখে ফোনটি বন্ধ। তাই ভাবল আজ নম্বরটি উঠাবে। কাষ্টমার কেয়ার সার্ভিস থেকে। ফোনের কাগজ পত্র সায়েদাবাদ ওর দুসম্পর্কে চাচাত ভাইর বাসায় রেখে আসছে তার অন্যান্য দরকারী জিনিস সহ। কারণ সে কলা বাগান মেসে থাকে। মেসে গুরুত্ব পূর্ন কোন কিছু রাখা নিরাপদ নয়। হরেক রকম ছেলেরা একসাথে থাকে। তাই গুরুত্ব পূর্ন কাগজ পত্রও মালামাল সে এই ভাইর বাসায় রাখে সব সময়। বিকালে সে ভাইর বাসার দিকে যাচ্ছে। সায়েদাবাদ টার্মিনালে নেমে হাঁটছে। হঠাৎ পাশে চোখ পড়তেই দেখে শাড়ী পরা একটি মেয়ে বসে আছে। সামনে লাগেজ। দেখে সে বিশ্বাস করে না। না রত্মা তো সালোয়ার কামিজ পরে। আবার এক পা বাড়ায়। কিন্তু ওর মন সায় দেয় না। আবার ফিরে তাকায়। সাহস করে সামনে যায়। হ্যাঁ এইতো রত্মা অস্পষ্ট স্বরে নামটি মুখ থেকে ফসকে গেলে রত্মা সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। রানা আশ্বস্ত হয়। এই-ই রত্মা। কাছে যেতেই রত্মা চিনতে পারে ; রাগে বলে ওঠে খবরদার এক পাও আসবেন না। আমি এখন অন্যের স্ত্রী। রানা কিছুই বুঝতে পারে না। হ্যাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে। রত্মাকে বুঝাতে চায়। তার মোবাইল ফোন চুরি হয়ে গেছে। রত্মা কিছুতেই এসব বিশ্বাস করে না। রত্মা বলে ফোন চুরি হলে সেটা জানাতে তো পারতেন। হতবাক হয়ে মাটিতে বসে পড়ে রানা রত্মার কথা শুনে। কিভাবে সে জানাবে রত্মার তো কোন নির্দিষ্ট নম্বর ছিল না। তবুও রতœা তার মত করে কথা বলেই যাচ্ছে। বলতে বলতে রত্মার দু’চোখ ভিজে যায়। আষাঢ়ের বৃষ্টির মত ঝর ঝর করে অঝোর ধারায় শব্দহীন ঝরছে। দেখতে পায় দূরে জসীম আসছে সি.এন.জি নিয়ে। তাড়াতাড়ি চোখ মুছে। ঢোক গিলে রানার দিকে তাকিয়ে রত্মা দ্রুত বলে ওই যে আমার স্বামী। একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করে। বাড়ী কুমিল্লায় তারপর গোমটা টেনে দেয়। জসীম এসে হাত ধরে রত্মাকে গাড়ীতে উঠিয়ে দেয়। সি.এন.জি চলে যায় সামনের রাস্তা ধরে ...।

রানার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আহত পাখির মতো তাকিয়ে থাকে সুদূর পথের দিকে ... । আর ভাবে আজ এ দিক না এলেই ভাল হতো। এমন পরাজয় দেখতে হতো না। অনেক সময় রানা একা একা ষ্টেশনে বসে থাকে। ভাবে কিছুদিন আগের যে মানুষটি তার স্বপ্নের সাথে একাত্ম হয়ে ছিল। তার প্রতিটি সময়কে যে মানুষটির সাথে সে ভাগ করে নিতো। তাকে হারাতে হলো অঙ্কুরেই। এমন গ্লানি জীবনের শুরুতেই। এ পরাজয় সে মেনে নিতে পারছে না। তারপর ডানা ভাঙ্গা পাখির মত আবার ফিরে আসে কাঁঠাল বাগান মেসে। মনে মনে ঠিক করে কোন দিনই আর ওই মোবাইল ফোনের সিম সে তুলবেনা ... ।

মোবাইল ফোনটি নিজে হারিয়ে হয়ত সে বার্তা দিয়েছে যে তার কোন প্রিয় মানুষও হারিয়ে যাবে। হয়ত নিজের অলক্ষ্যে রানা তা বুঝতে পারে নি। যে যায় সে চিরদিনের জন্যই যায়। রেখে যায় না কিছুই। বৃথাই স্বপ্ন ... তবুও স্বপ্নবাস ... যাবার পর যে গ্লানি থাকে সেটাই শুধু দেয়ার মত। তাই গ্লানিই দিয়ে যায় সবাই। আর এভাবে পাঁজর ভেঙ্গে চুরমার হয়ে আবার গড়ে ওঠে নতুন এক স্বপ্ন, নতুন এক পৃথিবী। মানুষ তবুও স্বপ্নের পূজারী। স্বপ্ন দেখে কাঙাল বেশে। বার বার ঘা খেয়েও স্বপ্নকেই আঁকড়ে থাকে আজীবন নদীর তীরবর্তী বুক আঁকড়ে থাকা মাটির মত...

লেখিকা: রীনা তালুকদার


ঢাকা, আগস্ট ৩১(বিডিলাইভ২৪)// এস এ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.