bdlive24

চমেকে গুলি-আগুনে ঝলসানো রোহিঙ্গার লাইন

শনিবার সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৭, ০১:৪২ পিএম.


চমেকে গুলি-আগুনে ঝলসানো রোহিঙ্গার লাইন

চট্টগ্রাম ব্যুরো: মিয়ানমারে রাখাইনে সেনাদের বর্বর নির্যাতনে গুলিবিদ্ধ শতাধিক রোহিঙ্গা কাতরাচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আট ওয়ার্ডে। শুক্রবারও আহত তিন রোহিঙ্গা শিশু ভর্তি হয়েছে। কারো ঘাড়ে লেগেছে গুলি। কারো হাত পায়ে। আশি বছর বৃদ্ধের চোখেও লেগেছে গুলি। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুলিবিদ্ধ অনেকেই কথা বলতে পারেন না।

আগুনে পোড়া রোগীও আছেন প্রচুর। ওয়ার্ডের বেডে অনেকে আছেন নির্বিকারভাবে। পাশে স্বজনরা স্বল্প পরিসরে সেবা করে যাচ্ছেন। হাসপাতালের নার্সরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন সুস্থ্য করে তুলতে। স্বজন ও রোগীরা সহায় সম্বলহীন হওয়ায় হাসপাতালের দেওয়া খাবার খেয়েই দিনযাপন করছেন। বাড়তি কোন কিছু খাওয়া বা ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই বেশিরভাগ আহত রোহিঙ্গার স্বজনদের।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২৪ আগস্ট নতুন করে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর গুলিবিদ্ধ, আগুনে পোড়া, ধারালো অস্ত্রে জখম নিয়ে ভর্তি হয়েছেন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। তারা কোন মতে পালিয়ে সীমান্ত পথে বাংলাদেশে এসে প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য জড়ো হন। এদের মধ্যে কারো হাতে, কারো পায়ে, কারো বুকে গুলি ও আগুনে ঝলসে গেছে হাত-পা, মুখসহ পুরো শরীর। আবার কিরিচের কোপে মারাত্মক জখম হয়েছে অনেকেই। এতে কেউ কেউ হারিয়েছেন হাত-পা, কানসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ। চমেকে ভর্তির পরও বেডে লেগে আছে রক্তের দাগ। ওয়ার্ডে ঢকুলেই চোখে পড়ে বেডে চিকিৎসাধীন রোগীদের কান্নার রোল।

শুক্রবার ও শনিবার সরেজমিন চমেকের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, চমেক হাসপাতালের চার ওয়ার্ডে রোহিঙ্গা রোগীতে ঠাসা। রোগীদের কারো কারো অবস্থা উন্নতির দিকে। তবে বেশিরভাগের অবস্থা ভাল নয়। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘ সময় তাদের চিকিৎসায় রাখতে হবে। অন্যথায় দ্রুত সুস্থ্য করে তোলা সম্ভব নয়।

এ বিষয়ে চমেক হাসপাতালের উপ-সহকারী পরিচালক ডা. অজয় কুমার দে জানান, মিয়ানমারের মংডুতে সংহিসতায় গুলিবিদ্ধ, আগুনে পোড়া, কিরিচের কোপে জখম হওয়া যেসব রোহিঙ্গা চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাদের চিকিৎসা সেবার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রোগী কল্যাণ সমিতিও সহায়তা করছে। রোহিঙ্গারা চমেকে আসলেই আমরা দ্রুত নাম ঠিকানা অংশগ্রহ করে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি।

তিনি বলেন, কোন কোন সময় তিন থেকে চার মাস আগের অসুস্থ রোহিঙ্গারা সহিংসতায় আহত হয়েছে বলে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তবে তাদেরকে আমরা তালিকাভুক্ত করছি না। দিনদিন সহিংসতা বাড়তে থাকলে রোহিঙ্গাদের জন্য হাসপাতালে জায়গা সঙ্কট হয়ে পড়বে। বর্তমানে রোহিঙ্গারা হাসপাতালের ১৯, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ১১ (বি), (আই) ও ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

চমেক প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শতাধিক রোহিঙ্গা। এরমধ্যে ৫ রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা শেষে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ রোহিঙ্গা মারা গেছে। প্রতিদিন সহিংসতায় আহত ৪ থেকে ৫ জন রোহিঙ্গা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। শুক্রবারও তিন রোহিঙ্গা শিশু ভর্তি হয়েছেন।

চমেকের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সীমান্ত ওয়াদ্দেদার জানান, মেশিনগান, অ্যাসল্ট রাইফেল ও সেমি অটো রাইফেলের গুলিতে আহত হয়েছেন রোহিঙ্গারা। অস্ত্রেপাচারের সময় এসব গুলি বের করা হয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাই সেনাবাহিনী যে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে অন্তত চমেকের আহত রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখলেই তার প্রমাণ মেলে।

১৩ দিন আগে চিকিৎসার জন্য চমেকের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হন মংডুর মেহেদীপাড়ার নুর মোহাম্মদের ছেলে মুক্তার মিয়া। তিনি বলেন, আমাদের বাড়িতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আক্রমণ করলে পালিয়ে যাওয়ার সময় ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে পুরো হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কুতুপালং সীমান্ত দিয়ে বহু কষ্ট করে বাংলাদেশ আসি। এরপর স্বজনরা প্রথমে কক্সবাজার হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এ হাসপাতালে নিয়ে আসেন। বাংলাদেশ সরকার আমাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন। চিকিৎসা শেষে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চলে যাব।

মুক্তার বলেন, আমার পরিবারের মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ বেঁচে আছে কিনা জানি না। হয়তো তাদেরকে মেরে ফেলেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। মুক্তার পেশায় একজন কৃষক।

চমেকে কয়েকদিন আগে চিকিৎসার জন্য আসা মংডুর ডেবিন্নাপাড়ার মৃত এজাহার মিয়ার ছেলে বৃদ্ধ সৈয়দ করিম বলেন, কুতুপালং হয়ে বাংলাদেশে আসি।

সহিংসতায় জীবন বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পা পিছলে পড়ে কোমড় ভেঙ্গে গেছে। এরপর স্ত্রী ও সন্তানরা ঝুলিতে ভরে কুতুপালং হয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে আনে।

হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মংডুর জিম্মাখালীপাড়া এলাকার শেখ মোহাম্মদের ছেলে মো. শামসুল আলম। ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শামসুল আলম বলেন, নির্বিচারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের গুলি, আগুনে পুড়িয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করছে। ঘুমন্ত অবস্থায় ঘরবাড়ি আগুনে জালিয়ে দিচ্ছে। নিজের চোখে দেখা জিম্মাখালীতে ১০ থেকে ১৫ শিশুকে গুলি করে হত্যা করে ফেলে রেখেছে। কবরও দিতে পারলাম না। কোন মতে নিজের জীবনটা বাঁচাতে পারলাম। পরিবারের কে কোথায় আছে কোন খবরও পাইনি।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের নৌকা পার করতে প্রতিজন ২০ হাজার টাকা করে আদায় করছে দালালরা। এ অভিযোগ করে মংডুর সেদ্দী এলাকার ওসমানের ছেলে আয়াত উল্লাহ বলেন, নিজের ও মায়ের জীবন বাঁচাতে ডান হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েও টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি।

তিনি বলেন, সীমান্তে দালালরা রোহিঙ্গাদের জিম্মি করে মোটা অংকের টাকা আদায় করছেন। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে আমাদের আসতে হচ্ছে। টেকনাফ, উখিয়া, কুতুপালং এলাকায় রোহিঙ্গাদের স্রোত বয়ছে। দিনদিন আরো বাড়ছে। নিরুপায় হয়ে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন।

মংডু থেকে পালিয়ে আসা বৃদ্ধ সৈয়দ করিমের স্বজন মো. তাহের বলেন, আমার নানা বাড়ি মংডুর মেহেদীপাড়া। আমি চট্টগ্রামের রাউজানে বড় হয়েছি। মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞের করুণ চিত্র দেখে নানা-নানুকে বাংলাদেশে চলে আসতে বলি। ৪ দিন আগে সীমান্ত পেরিয়ে কুতুপালং আসলে আমি তাদের আনতে যাই। সহিংসতায় নানার কোমড় ভেঙ্গে গেছে। তাই চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসি। মিয়ানমারে হত্যাযজ্ঞে আমার মামা-মামীসহ ছেলে-মেয়েরা সবাই মারা গেছেন।



ঢাকা, সেপ্টেম্বর ০৯(বিডিলাইভ২৪)// এস এ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.