সর্বশেষ
শনিবার ৬ই মাঘ ১৪২৪ | ২০ জানুয়ারি ২০১৮

ছবি বানানোর গল্প ও একজন নায়করাজ রাজ্জাক (১ম পর্ব)

সোমবার ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৭

112297563_1505130248.jpg
লিপন মুস্তাফিজ :
ছবি বানানোর ইতিহাসঃ
বোধকরি মানুষ একদা নিজের ছায়া মাটিতে দেখে চমকে উঠেছিলো। ধারনা করা হয় যে, তখন থেকে চলচ্চিত্র বিষয়টা মানুষের মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করে। কৌতূহলী মানুষ ধীরে ধীরে ম্যাজিক লন্ঠন আবিষ্কার করে। এটা একটা যন্ত্র বিশেষ যা দিয়ে একটি স্বচ্ছ মাধ্যমে আঁকা কোন চিত্রকে আলো এবং লেন্সের সমন্বয়ে পর্দায় প্রতিফলিত করা হত। মূলত এটাই সিনেমাটোগ্রাফির মূল সূত্র।

১৮২০ সালে গ্রাস প্লেটে সংযোজিত ফিল্মে স্থানীয় ইমেজ ধরে রাখা হয়েছিল। ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তা ও গবেষণার ফসল হিসেবে। ১৮৮২ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী ফুসিল ফটোগ্রাফি নামে যে যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, আজকের মুভি ক্যামেরা নির্মিত হয়েছিল তার উপর ভিত্তি করে। পরবর্তীতে প্রযুক্তিতে বাপক উন্নতি সাধনের ফলে ডিজিটাল কামেরাতে এখন চিত্রগ্রহণ করা হয়। ফটোগান ছিল একটি বন্দুক বিশেষ, এতে ট্রিগার, ম্যাগাজিন সবই ছিল। শুধু কার্তুজের জায়গায় ছিল ফটোপ্লেট। ট্রিগারে চাপ পড়লেই এক এক করে ছবি তুলে যেত। তাই আমরা এখনও চিত্রগ্রহণের কাজটিকে সাধারণত শুটিং বলে থাকি।

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রের আগমনঃ
হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) প্রথম বাঙ্গালি হিসেবে হীরালাল সেন চলচ্চিত্র প্রদর্শক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি লন্ডনের একটি যন্ত্র সংগ্রহ করেন এবং অনেক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতার মাধ্যমে চলচ্চিত্র প্রদর্শন করেন। অক্লান্ত পরিশ্রম, অদম্য মনোবলের কারনে ১৮৯৮ সালে তিনি “দি রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানী” গড়েন। হীরালাল সেন প্রথম ভারতীয় যিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯০১ সালের গোড়ার দিকে তিনি তাঁর “আলীবাবা” নাটকের মর্জিনা ও আব্দুল্লাহ চরিত্র নৃত্য চলচ্চিত্র আকারে ধারণ করেন ও পরবর্তীতে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে এক নতুন ইতিহাসের সৃষ্টি হলো।

হীরালাল সেনের দীর্ঘতম ছবি আলীবাবা ও চল্লিশ চোর (১৯০৩)-এ নৃপেন্দ্র নাথ বসু ও কুসুম কুমারী ১৯০৪ সালের দিকে তিনি নির্মাণ করেন “আলীবাবা ও ৪০ চোর”। এরপর তিনিই প্রথম বাঙ্গালি যিনি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেন, উল্লেখ্য উনার জন্মস্থান বাংলাদেশের মানিকগঞ্জে। কালিশ মুখার্জি “বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাস” গ্রন্থে হীরালাল সেনকে ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পের জনক হিসেবে আখ্যা দেন। এরপরে সময় নামক পাগলা ঘোড়া ছুটে চলে।

১৯৫৫ সালে “পথের পাঁচালী” সিনেমার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেন যিনি তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। উনার হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র পেল নতুন ধারা, নতুন মাত্রা, পেল নতুন জীবন। এই ধারায় পরবর্তীতে ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, রাজেন তরফদার, তপন সিংহ, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ প্রমুখ পরিচালক ছবি নির্মাণ শুরু করেন।

ঢাকা শহরে চলচ্চিত্রঃ
এভাবে ঢাকার মানুষও স্বপ্ন দেখত যে তারা ছবি বানাচ্ছে। কিন্তু জাতীয়ভাবে উদ্যোগ না থাকায় এরা পিছেয়ে পড়ে বারবার। তবে ১৮৯৮ সালে ঢাকাতে প্রথম ছবি প্রদর্শিত হয়। ১৯১৯ সালে প্রথম পূর্নাঙ্গ চিত্র নির্মিত হয় ঢাকাতে। ঢাকাতে জিন্নাহর প্রথম সফরের উপর ভিত্তি করে ১৯২৮ সালের আগে বা পরে “সুকুমারী” নামের মাত্র চার রিলের একটি ছবি তৈরি হয়। এই ছবিটি নির্মান করেন পরিচালক ছিলেন নজির আহমেদ। একাধারে তিনি ছিলেন পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা। ১৯৪৮ সালের দিকে ঢাকাসহ পুরো পাকিস্তানে এটা প্রদর্শিত হয়। ১৯৫৩ সালের দিকে বাংলাদেশে চলচ্চিত্রকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন আব্দুল জব্বার খান।

মোটামুটিভাবে তিনি একে আন্দোলন হিসেবে নেন। সেই সময় গুলিস্তান সিনেমা হলের মালিক বিরোধিতা করেন এবং তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চান যে পূর্ব পাকিস্তানের আবহাওয়া চলচ্চিত্র নির্মানের অন্তরায়। কিন্তু আব্দুল জব্বার খান এই মিথ্যাকে সত্য প্রমান করেন। আব্দুল জব্বার খানের একক প্রচেষ্টায় ১৯৫৪ সালে গঠিত হয় ইকবাল ফিল্মস এবং  পরে কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড। ইকবাল ফিল্মস-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মোহাম্মদ মোদাব্বের, মহিউদ্দিন, শহীদুল আলম, আবদুল জব্বার খান, কাজী নুরুজ্জামান প্রমুখ। কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেডের সঙ্গে ছিলেন ড. আবদুস সাদেক, দলিল আহমদ, আজিজুল হক, দুদু মিয়া, কবি জসীমউদ্দীন, কাজী খালেক, সারওয়ার হোসেন প্রমুখ। দলিল আহমেদের পুত্র বুলবুল আহমেদ এবং দুদু মিয়ার পুত্র আলমগীর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।

“মুখ ও মুখোশ” ছবির পোষ্টার বাংলার স্বপ্নের প্রথম ফসল বুনেন আব্দুল জব্বার খান। কথিত আছে মরিচা ধরা একটি আইসো ক্যামেরা এবং একটি অতি সাধারণ ফিলিপ্স টেপ রেকর্ডারকে সম্বল করে “মুখ ও মুখোশ” চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। আব্দুল জব্বার খানের লেখা “ডাকাত” গল্প থেকে “মুখ ও মুখোশ” চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য করা হয় এবং ১৯৫৬ সালে এটা মুক্তি দেয়া হয়। অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়ে ছবিটি মাত্র চারটি ছবিঘরে প্রদর্শনের অনুমতি মেলে। বাংলাদেশের চিন্তা, ক্ষুদ্র প্রযুক্তির সাহায্য আর নানাবিধ প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আলোর মুখ দেখা চলচ্চিত্র আজ ইতিহাস।

১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট আবদুল জব্বার খান পরিচালিত বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ মুক্তি পায়। পরিচালক নিজেই নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেন। নায়িকা চরিত্রে ছিলেন চট্টগ্রামের পূর্ণিমা সেন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন ইনাম আহমেদ, নাজমা (পিয়ারী), জহরত আরা, আলী মনসুর, রফিক, নুরুল আনাম খান, সাইফুদ্দীন, বিলকিস বারী প্রমুখ। চিত্রগ্রাহক কিউ.এম জামান, সুরকার সমর দাস, কণ্ঠশিল্পী আবদুল আলীম ও মাহবুবা হাসানাত এই চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখানে ডাকাতের ভূমিকায় ইনাম আহমেদ এর অভিনয় অনেকের মনে দাগ কাটে। বলা হয় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনক আব্দুল জব্বার খান এই ছবির মাধ্যমে তরুণদেরকে উৎসাহিত করেন। এই ছবিটি ব্যাপক সমাদৃত, প্রশংসিত, ও প্রদর্শিত হয় নানা শহরে। দর্শক নন্দিত এই ছবির কারনে অনেকেই চলচ্চিত্রে আসার চিন্তাভাবনা শুরু করেন।

১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক আইন পরিষদে “পুর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল” উত্থাপন করেন, বিলটি বিনা বাধায় তৎকালীন আইন পরিষদে পাশ হয়। ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্মেষ ঘটনার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এফডিসির সহযোগিতায়  ১৯৫৯ সালে  “আকাশ মাটি দেশ” ছিল পূর্ব-পাকিস্তানে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি। ঐ একই বছর আরো তিনটি বাংলা ছবি মুক্তি লাভ করে। এফডিসি প্রতিষ্ঠার পরে চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় অনেক যোগ্য ব্যক্তি এগিয়ে আসেন। ১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানীর ‘আকাশ আর মাটি,’ মহিউদ্দিনের ‘মাটির পাহাড়,’ এহতেশামের ‘এদেশ তোমার আমার’ এই তিনটি বাংলা চলচ্চিত্র ছাড়াও এ.জে. কারদারের ‘জাগো হুয়া সাভেরা ‘উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তন্মধ্যে খান আতাউর রহমান অভিনীত ‘জাগো হুয়া সাভেরা” আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দশকে নির্মিত ৫টি চলচ্চিত্রের প্রতিটিই নানান সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও শিল্পমানে উত্তীর্ণ বলেই চলচ্চিত্র বোদ্ধারা মনে করেন। অর্থাৎ আমাদের চলচ্চিত্রের অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল শুদ্ধতার অঙ্গীকার নিয়েই। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত।

১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত শিল্পসম্মত ছবি নিমার্নের ধারা অব্যাহত থাকে। তার মধ্যে ‘সুতরাং’, ‘কাঁচের দেয়াল’, ‘কখনো আসেনি’, ‘সূর্যস্নান’, ইত্যাদি ছবিগুলো বিশেষভাবে আলোচিত। বাংলা ছবির পাশাপাশি উর্দু ছবির নির্মান চলতে থাকে। এহতেশাম ‘চান্দা’ ছবি মুক্তি দিয়ে ব্যাবসায়িক সাফল্য পেলে উর্দু ছবির নির্মান বেড়ে যায়।

১৯৬৫ সালে জহির রায়হান ‘বাহানা’ নির্মান করেন। কিছুদিন পরে উর্দু ছবির নির্মান কমতে থাকে। উর্দু ভাষায় দখল কম থাকায় এবং অনেক ছবির আশানুরূপ সাফল্য না এলে অনেকেই বাংলা ছবির নির্মানের দিকে চলে যান। ১৯৬৫ সালাহউদ্দিন ‘রূপবান’ নামে ছবি নির্মান করে আলোড়ন তুলেছিল। এর ফলে রূপবান নাম ব্যবহার করে অনেক ছবি বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে। যেমনঃ ‘রূপবান কন্যা’, ‘রহিম বাদশাহ ও রূপবান কন্যা’, ‘বনবাসে রূপবান’ ইত্যাদি। এমনকি কোলকাতাতেও নির্মান হয়েছিল। এরপর অনেক পরিচালক লোককাহিনী ভিত্তিক ছবি নির্মানে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তার ধারাবাহিকতায় জহির রায়হান তৈরি করেন ‘বেহুলা’। এই ছবির মাধ্যমে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন রাজ্জাক। প্রথম ছবিতেই আমাদের বাংলার সবার মন জয় করে নেন নায়করাজ রাজ্জাক।

রাজ্জাকের পূর্বকথাঃ
১৯৬৪ সালের কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে এক রাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এক হিন্দু পরিবারের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরের দিন পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তার সাথে ছিল তার স্ত্রী লক্ষী ও পুত্র বাপ্পারাজ এবং পীযূষ বসুর দেওয়া একটি চিঠি ও পরিচালক আব্দুল জব্বার খান ও শব্দগ্রাহক মণি বোসের ঠিকানা। স্ত্রী পুত্রকে শরনার্থী শিবিরে রেখে তিনি আব্দুল জব্বার খানের সাথে সাক্ষাৎ করলে খান তাকে আশ্বাস দেন। তখন রাজ্জাক ৮০ টাকা মাসিক ভাড়ায় স্ত্রী-পুত্র নিয়ে কমলাপুরে এক বাসা ভাড়া করেন। পরে তিনি সুভাষ দত্ত, সৈয়দ আওয়াল, এহতেশামসহ আরও চলচ্চিত্রকারদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তবে আব্দুল জব্বার খানই তাকে ইকবাল ফিল্মসে কাজ করার সুযোগ দেন। ১৯৬৪ সালে তিনি কামাল আহমেদের সাথে সহকারী পরিচালক হিসেবে ‘উজালা’ চলচ্চিত্রে কাজ করার সুযোগ পান। সহকারী পরিচালক হিসেবে তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ছিল ‘পরওয়ানা’ এখানে হাসান ইমাম নায়কের ভুমিকায় অভিনয় করেন। কিন্তু ৮০ ভাগ কাজ হওয়ার পর তিনি এই ছবির কাজ ছেড়ে দেন।

রাজ্জাক হয়ে ওঠাঃ
তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে রাজ্জাক "ঘরোয়া" নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয়তা পান। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’ এবং ‘কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরী স্টেশন’-সহ আরও বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৬৬ সালে জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে সুচন্দার বিপরীতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে লখিন্দর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যেম তিনি চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পৌরাণিক কাহিনীধর্মী এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক। এই ছবির সফলতার পরে জহির রায়হান রাজ্জাক-সুচন্দাকে নিয়ে নির্মাণ করেন ‘আনোয়ারা’ এবং ‘সুয়োরাণী দুয়োরাণী’। সাহিত্যিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান রচিত

‘আনোয়ারা’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আনোয়ারা চলচ্চিত্রটিতে তাকে আনোয়ারা চরিত্রের স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। লোককাহিনীধর্মী ‘সুয়োরাণী দুয়োরাণী’ ছবিতে তাকে রাখালের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানো এক শাহজাদার চরিত্রে দেখা যায়। ১৯৬৭ সালে তিনি সুজাতার বিপরীতে আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘আগুন নিয়ে খেলা’ এবং ম. হামিদ পরিচালিত ‘অপরাজেয় ‘ছবিতে। এই সময়ে সুচন্দার বিপরীতে তিনি আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘জুলেখা’ ও ‘সংসার’, রহিম নেওয়াজ ও নূরুল হক পরিচালিত ‘দুই ভাই’ , নুরুল হক বাচ্চু পরিচালিত ‘কুচবরণ কন্যা’ , রহিম নেওয়াজ পরিচালিত ‘মনের মত বউ’ এবং আমির হোসেন পরিচালিত রোম্যান্টিকধর্মী ‘যে আগুনে পুড়ি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। রাজ্জাক, সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আবির্ভাব’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জুটি গড়েন কবরীর সাথে। এই জুটিকে একই বছর দেখা যায় আব্দুল জব্বার খানের ‘বাঁশরী’ ছবিতে। এছাড়া তিনি মোহসীন পরিচালিত ‘গৌরী’ ছবিতে অভিনয় করেন। পরের বছর তিনি নারায়ণ ঘোষ মিতার রোম্যান্টিকধর্মী ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে মামুন চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে তার বিপরীতে ছিলেন কবরী এবং এই ছবি দিয়ে রাজ্জাক-কবরী জুটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। একই বছর তাদের কাজী জহিরের ‘ময়নামতি’ চলচ্চিত্রে দেখা যায়। ১৯৭০ সালে রাজ্জাক প্রখ্যাত পরিচালক জহির রায়হান পরিচালিত রাজনৈতিক-ব্যঙ্গধর্মী ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে অভিনয় করেন। গণঅভ্যুত্থান এবং আইয়ুবের সামরিক শাসন নিয়ে রাজনৈতিক-ব্যঙ্গধর্মী এই ছবিতে রাজ্জাককে পরাধীন দেশের একজন সচেতন নাগরিক ফারুক চরিত্রে দেখা যায়। এতে তার বিপরীতে ছিলেন সুচন্দা।

একই সালে মধ্যবিত্ত ঢাকার নাগরিক সমস্যা ও যাপিত জীবনের গল্প নিয়ে এহতেশাম পরিচালিত রোম্যান্টিক-নাট্যধর্মী ‘পীচ ঢালা পথ ছবিতে’ তার বিপরীতে প্রথমবার দেখা যায় ববিতাকে। ববিতা এর পূর্বে তার এবং সুচন্দার মেয়ের ভূমিকায় সংসার ছবিতে অভিনয় করেন। এই ছবির সফলতার ধারাবাহিকতায় রাজ্জাকার ববিতা জুটিকে নিয়ে বাবুল চৌধুরী নির্মাণ করেন টাকা আনা পাই, নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন ‘স্বরলিপি’। পিতা-পুত্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে নির্মিত ‘টাকা আনা পাই’ ছবিতে তিনি শহীদ চরিত্রে অভিনয় করেন।

রাজ্জাক-কবরী জুটি জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় এই জুটিকে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ও ‘দ্বীপ নেভে নাই’, নজরুল ইসলামের দর্পচূর্ণ, নূরুল হক বাচ্চুর যোগ বিয়োগ, আব্দুল জব্বার খানের ‘কাঁচ কাটা হীরা’, কামাল আহমেদের ‘অধিকার’, বাবুল চৌধুরীর ‘আঁকা বাকা’, আলমগীর কুমকুমের ‘স্মৃতিটুকু থাক’ এবং আলী কাউসারে ‘গাঁয়ের বধূ’ চলচ্চিত্রে দেখা যায়। ‘ক খ গ ঘ ঙ’ ছবিতে তাকে দেখা যায় এক দুরন্ত যুবক মন্টু চরিত্রে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লাভের পর ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তি পায় রাজ্জাক অভিনীত ‘মানুষের মন’ ছবিটি। মোস্তফা মেহমুদ পরিচালিত এই ছবির ব্যবসায়িক সফলতার মধ্য দিয়ে রাজ্জাকের যুগের সূচনা হয় । এতে তার বিপরীতে অভিনয় করেন ববিতা। পরের বছর রাজ্জাক আর ববিতা জুটিকে নিয়ে অশোক ঘোষ নির্মাণ করেন ‘প্রিয়তমা’ এবং কবীর আনোয়ার নির্মাণ করেন ‘স্লোগান’।

১৯৭২ সালে রাজ্জাক অভিনয় করেন ‘ওরা ১১ জন’ ছবিতে। মাসুদ পারভেজ প্রযোজিত এবং চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘ওরা ১১ জন’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র। এছাড়া ১৯৭২ সালে তিনি বাবুল চৌধুরীর ‘প্রতিশোধ’, ইবনে মিজানের ‘কমলা রাণীর দীঘি’, এবং নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘এরাও মানুষ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৬ সালে রাজ্জাক জহিরুল হক পরিচালিত ‘কি যে করি’ ছবিতে বাদশাহ চরিত্রে অভিনয় করেন। এক ধনী ব্যক্তির নাতনী শাহানা তার দাদুর সম্পত্তি ভোগ করার জন্য ফাঁসির আসামী বাদশাহকে বিয়ে করে কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে খালাস পেলে তাকে গ্রহণ করে শাহানা। ছবিতে তার বিপরীতে শাহানা চরিত্রে ছিলেন ববিতা। রাজ্জাক এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তার প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন । একই বছর তিনি আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘গুন্ডা’ ছবিতে বাহাদুর চরিত্রে অভিনয় করেন। এতে দেখা যায় তিনি একজন রাস্তার গুন্ডা থেকে ভালো মানুষে রূপান্তরিত হন।

১৯৭৭ সালে তিনি আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘অমর প্রেম’, অশোক ঘোষ পরিচালিত ‘মতি মহল’ এবং আব্দুল লতিফ বাচ্চুর ‘যাদুর বাঁশি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৭৮ সালে রাজ্জাক আজিজুর রহমান পরিচালিত ‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রে গ্রামের একজন পাহারাদার চরিত্রে অভিনয় করেন। এই ছবিতে রহমত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বিভাগে তার দ্বিতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত জিঞ্জির ছবিতে তিনি প্রথমে কলেজ ছাত্র রাজন চরিত্রে এবং তার স্ত্রীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে ডাকু ফরহাদে পরিণত হন। একের পর এক রাজ্জাক অভিনীত ছবিগুলো দর্শকপ্রিয়তা পেতে থাকে।

রাজ্জাক এই দশকের শুরুতে অনন্ত জলিল-বর্ষা অভিনীত ‘হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ’ এবং ‘মোস্ট ওয়েলকাম’ ছবিতে অভিনয় করেন। পরের বছরগুলোতে রাজ্জাক পরিচালক জুটি শাহীন-সুমন পরিচালিত এবং মাহিয়া মাহি ও বাপ্পি চৌধুরী ‘ভালোবাসার রঙ’ ছবিতে শামসুদ্দীন চৌধুরী চরিত্রে এবং ‘অন্যরকম ভালোবাসা’ ছবিতে অভিনয় করেন।

২০১৩ সালে তিনি তার পুত্র সম্রাটকে নিয়ে নির্মাণ করেন’আয়না কাহিনী’। ইমদাদুল হক মিলন রচিত কাহিনী অবলম্বনে ছবিটির চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনা করেছেন রাজ্জাক নিজেই। ছবিতে সামাজিক ব্যধি হিসেবে যৌতুক প্রথার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। এই বছর তিনি পার্শ্বচরিত্রে শফি উদ্দিন শফি পরিচালিত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’ ছবিতে সামাদ শিকদার এবং অনন্ত জলিল পরিচালিত ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ ছবিতে বর্ষার দাদুর ভূমিকায় অভিনয় করেন। ২০১৪ সালে নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল পরিচালিত এবং ফেরদৌস আহমেদ প্রযোজিত ‘এক কাপ চা’ চলচ্চিত্রে অতিথি চরিত্রে এবং সামিয়া জামান পরিচালিত ‘আকাশ কত দূরে’ ছবিতে অভিনয় করেন। ২০১৫ সালে তার বড়পুত্র বাপ্পারাজ পরিচালিত ‘কার্তুজ ‘ছবিতে অভিনয় করেন। এতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেন তারই ছোট পুত্র সম্রাট। ২০১৬ সালে রাজ্জাক’ চেয়ারম্যানের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র ‘টেলিভিশন চলচ্চিত্রে চেয়ারম্যানের ভূমিকায় অভিনয় করেন। এটি তার নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রাজলক্ষী প্রডাকশন্স থেকে নির্মিত হয় এবং পরিচালনা করেন তার সম্রাট। এর আগেও রাজ্জাক সম্রাটের পরিচালনায় দায়ভার টেলিভিশন চলচ্চিত্রে কাজ করেন।

লেখক: পিএইচডি গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা ।



ঢাকা, সোমবার ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // কে এইচ এই লেখাটি 18 বার পড়া হয়েছে