bdlive24

কর্পোরেট পুঁজির অক্টোপাসে মানবিক রাজনীতি

বুধবার সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭, ০৫:০৯ পিএম.


কর্পোরেট পুঁজির অক্টোপাসে মানবিক রাজনীতি

সাজ্জাদ আলম খান: পুঁজির অনিবার্যতা এমন, কার্ল মার্কসের কালজয়ী বই ‘ডাস ক্যাপিটাল’ ছাপাতে প্রয়োজন হয়েছিল ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের ক্যাপিটাল বা অর্থ। সামন্তবাদী অবস্থান থেকে পুঁজিবাদে উত্তরণে মানুষের এক ধরনের আগ্রাসী অবস্থানই কাজ করেছে। ভোগনির্ভর সমাজ মুনাফামুখী হয়ে পড়ে। এতে মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। আর এখন চলছে কর্পোরেট পুঁজির সর্বগ্রাসী থাবা। মানবিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, দর্শন- এসব পদদলিত করেই কাঙ্ক্ষিত পথে এগিয়ে চলেছে পুঁজির যাত্রা। আর অবধারিতভাবে কর্পোরেট গ্রাসের মুখে রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শে ঘটে এর প্রতিফলন। এতেই বিপত্তি ঘটছে মানবিক চেতনার রাজনীতিতে।

কর্পোরেট পুঁজি শুরুতেই আঘাত হানে দুর্বল স্থানে। যেমন এখন হানছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে, যার লক্ষ্যবস্তু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। দীর্ঘ পথপ্রক্রিমায় এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূলে কাজ করছে দেশটির সামরিক জান্তা। এখন এটাকে গণতান্ত্রিক লেবাস দেয়ার চেষ্টা চলছে। মিয়ানমারের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্যে এখনও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চলছে। বাস্তুচ্যুত হয়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে।

ধর্মীয় ও জাতিগত পার্থক্য এই নিপীড়নের বড় কারণ। এর অন্য কারণও রয়েছে। মিয়ানমারের স্বীকৃত ১৩৫ জাতিগোষ্ঠী থেকে ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাম বাদ দেয়া হয়। কাচিন, শান, কারেন ও অন্য সংখ্যালঘুদেরও মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্নকরণে কাজ করছে দেশটির সরকার। ভূমি দখলের প্রক্রিয়া চলছে অব্যাহতভাবে। ১৯৯০ সাল থেকে দেশটির সামরিক জান্তা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ দেয়া ছাড়াই উচ্ছেদ করছে। সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ, প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ, বড় বড় কৃষি প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ এবং পর্যটনের নামে ভূমি উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করে। রাখাইনের পাশাপাশি কাচিন রাজ্যে সোনার খনির জন্য ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এসব করতে গিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও থাইল্যান্ডের সীমান্ত অতিক্রমে বাধ্য করে দেশটির ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যদের। অথবা সীমান্তের হাজার হাজার মানুষকে জোরপূর্বক অবরুদ্ধ করে সমুদ্রপথে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় যেতে ভূমিকা রাখে।

২০১১ সালে মিয়ানমার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্র করা হয় উন্মুক্ত। ২০১২ সালে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়া হয়। দেশটির সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি আইন প্রণয়ন করে। বড় কর্পোরেশনের জন্য বাড়তি মুনাফা লুটে নিতে দেয়া হয় বেশ ছাড়। পসকো, দায়ুউ’র মতো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে কৃষি ব্যবসায় চলে আসে। এর আগে ১৯৯০-এর দশক থেকে চীনের কোম্পানি শান প্রদেশে কাঠ, নদী ও খনিজসম্পদ ব্যবহার শুরু করে। প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর দৃষ্টি যেতে থাকে এসব সম্পদের দিকে। এর ফলে পূর্ব কাচিন এবং উত্তর শান রাজ্যে অস্থিরতাও তৈরি হয়। রাখাইন রাজ্যে চীনা ও ভারতীয় স্বার্থ এ দুই দেশেরই সম্পর্কের অংশ। অবকাঠামো ও পাইপলাইন নির্মাণ নিয়ে তৈরি হয় আধিপত্য বিস্তারের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। চীনের জাতীয় পেট্রোলিয়াম কোম্পানি নির্মিত ট্রান্সন্যাশনাল পাইপলাইন ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে অপারেশন শুরু করে। রাখাইনের রাজধানী সিটুওয়ের মধ্য দিয়ে চীনের কুংমিং পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে এ সেবা। শাই গ্যাস ক্ষেত্র থেকে মিয়ানমার তেল ও গ্যাস গ্রহণের ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ধরনের জ্বালানি চীনের গুয়াংঝো পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়।

একটি সমান্তরাল পাইপলাইন চীন থেকে কোয়াকফু (Kyaukphyu) বন্দর হয়ে মধ্যপ্রাচ্য যাবে। আর এই পাইপলাইন রাখাইন রাজ্যের স্থানীয় সম্প্রদায়কে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির পরিবর্তে জমিজমা অধিগ্রহণ, ক্ষয়ক্ষতির অপর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, পরিবেশগত অবনতি এবং বিদেশি শ্রমিকদের আধিপত্য বাড়ছে। এদিকে সিটুওয়েতে গভীর সমুদ্রবন্দরে অর্থায়ন করছে ভারত। এটি কালান্দা মাল্টি-মোডল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকা স্পষ্টতই ভারত ও চীনের জন্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে মিয়ানমার। এরপর থেকেই দেশটির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে আসছে সেনাবাহিনী। ১৯৯০-এর দশকে দেশটিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মুখে পড়তে হয়। ২০১২ সালে মিয়ারমারে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময় দেশটির ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এখনও অস্ত্র বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা রেখেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। টেলিভিশন চ্যানেল আল জাজিরার তথ্য বলছে, মিয়ানমারের অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলো হচ্ছে চীন, রাশিয়া, ভারত, ইসরাইল ও ইউক্রেন। দেশটির বেশিরভাগ যুদ্ধবিমান, সাজোঁয়া যান, আগ্নেয়াস্ত্র আর যুদ্ধজাহাজ আনা হয়েছে চীন থেকে। অন্যদিকে, তাদের ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইলের মূল যোগানদাতা রাশিয়া।

চলতি অর্থবছরে ৮০০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে মিয়ানমার। এর আগের অর্থবছরে মোট ৯৫০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল দেশটিতে। মূলত তেল, গ্যাস, ম্যানুফ্যাকচারিং ও টেলিকম খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেশি। এর আগে মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগ আসার হার তুলনামূলক অনেক কম ছিল। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৪১ কোটি ডলার বিনিয়োগ আসে। দেশটির ডিরেক্টোরেট অব ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড কোম্পানি অ্যাডমিনেস্ট্রেশন বলছে, ১৯৮৮ সালের শেষদিক থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মিয়ানমারে ৬ হাজার ৩৭১ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এতে শীর্ষ বিনিয়োগকারী হিসেবে উঠে এসেছে চীনের নাম। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। ভারতের অবস্থানও বেশ শক্তিশালী।

মিয়ানমার ইনভেস্টমেন্ট কমিশন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে বাণিজ্য, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে আরও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে। রোহিঙ্গা গণহত্যায় বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ী মহলে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা ছড়িয়ে পড়ছে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে মিয়ানমারের অর্থনীতিতেও। নাইপিদোতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মিয়ানমার গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে দেশটির বিনিয়োগ কমিশনও এমন মনোভাব প্রকাশ করেছে। গত বছরই প্রথম ইয়াংগুন স্টক এক্সচেঞ্জ চালু করে মিয়ানমার, যেটা এখনও তেমন উন্নতি করতে পারেনি। মাত্র ৪টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়েছে। বর্তমানের এ সহিংসতায় সেই অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট সামনে চলে আসায় ‘শরণার্থী’ আর ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দচয়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিভ্রান্তি। মূলধারার গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষ রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবেই দেখছেন। তবে সরকারের নথিতে এরা অনুপ্রবেশকারী। চোরাপথে প্রবেশ করে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনই অনুপ্রবেশকারীদের লক্ষ্য। কিন্তু প্রটোকল অনুযায়ী শরণার্থীরা জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, নাগরিক মতাদর্শগত কারণে নিজ দেশের বাইরে অবস্থান করছে। নিজ দেশে নিরাপত্তা নেই, সে কারণে ফেরত যেতে ইচ্ছুক নয়। শরণার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষাসেবা পাওয়া, সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২৪ আগস্ট থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আসছে এখনও। মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো শরণার্থীবিষয়ক কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি। এই কনভেনশনে সই করলে কেউ আশ্রয় নিতে এলে তাকে তার অমতে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে রাষ্ট্রগুলো এ দায়িত্ব নিতে চায় না। আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের শরণার্থীর মর্যাদা দিলে ঋণ ও সহায়তা দিতে চায়; কিন্ত সরকার সেক্ষেত্রে নমনীয় নয়।

প্রথমে রাজি না হলেও সিরিয়ার শরণার্থীরা ইউরোপে আশ্রয় পেয়েছে। জনমতের চাপে রুদ্ধ পথ খুলে দেয় সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। রোহিঙ্গা প্রশ্নে তেমন তৎপরতা নেই। আসলে বৃহৎ শক্তিগুলো মিয়ানমারকে চটাতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মিয়ানমারের। আছে বাণিজ্য-বিনিয়োগের সম্পর্ক। কৌশলগত কারণে ভারত ও চীন মিয়ানমারকে কাজে লাগাতে চায়। এ দুই দেশের নজর রয়েছে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদেও। আসলে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কাছে পরাভূত হচ্ছে মানবিকতা। কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এ সংকট সমাধান করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক
sirajgonjbd@gmail.com


ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২৭(বিডিলাইভ২৪)// কে এইচ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.