bdlive24

যে কারণে জীবন দিতে হয়েছিলো ফিলিস্তিনি কার্টুনিস্টকে

শনিবার সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৭, ০৫:৩৩ পিএম.


যে কারণে জীবন দিতে হয়েছিলো ফিলিস্তিনি কার্টুনিস্টকে

বিডিলাইভ ডেস্ক: ১৯৮৭ সালের গ্রীষ্মকালে কিংবদন্তী ফিলিস্তিনি কার্টুনিস্ট নাজি আল আলিকে লন্ডনের কেন্দ্রে এক রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়। খবরে বলা হয় একজন ফিলিস্তিনিকে লন্ডনের এক রাস্তায় খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছে। তিনি গুরুতর আহত। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বলছে সন্ত্রাসদমন শাখা তদন্ত চালাচ্ছে।

সারা আরব বিশ্বে রাজনৈতিক কাটুর্নিস্ট হিসাবে নাজি আলি খুবই পরিচিত ছিলেন। কুয়েতী সংবাদপত্র আল কাবাসের লন্ডন দপ্তরের সামনে তাকে গুলি করা হয় ১৯৮৭ সালের ২২শে জুলাই। তার ছেলে খালিদ আল আলি বলেছিলেন তার বাবা জানতেন তার কাজ তার মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। কিন্তু ভয় পেয়ে বসে থাকার মানুষ ছিলেন না।

"তিনি মনে করতেন না কাটুর্নিস্ট হিসাবে তার দায়িত্ব মানুষকে শুধু হাসানো। তিনি চাইতেন বিষয়গুলো নিয়ে আপনি ভাবুন।''

''তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না- যদিও জীবনকে তিনি নিশ্চয়ই ভালবাসতেন। কিন্তু তার ছবির মাধ্যমে তিনি যে বার্তা দিতে চাইতেন - তার সঙ্গে আপোষ করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। যা বলা দরকার- তিনি বলতেন- যা আঁকা দরকার -তিনি আঁকতেন।''

নাজি আল আলি ব্রিটেনে কাজ করতে এসেছিলেন তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে। প্রায় প্রত্যেক আরব দেশের সরকারের সমালোচক হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন এই রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট- এমনকী ফিলিস্তিনি নেতারও সমালোচনা করে তিনি কার্টুন একেঁছিলেন।

আল কাবাস পত্রিকার সম্পাদক ঘটনার সময় বলেন যে নাজি আলিকে মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বেশ কয়েকবার হুমকি দেওয়া হয়ছিল। কিন্তু তিনি বাড়ির ভেতর বসে থাকতে নারাজ ছিলেন। তিনি তখন আল কাবাস সংবাদপত্রের জন্য কার্টুন আঁকতেন।

১৯৩৬ সালে গ্যালালির এক গ্রামে জন্মেছিলেন নাজি আল আলি- সেটা তখন ছিল প্যালেস্টাইন। খালিদ আল আলি নাজির বড় ছলে। তিনি বলেন তাদের গ্রামে মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদীরা একসঙ্গে বসবাস করতেন। তাদের বাচ্চারা একসঙ্গে খেলত, তারা নিজেদের মধ্যে সবকিছু ভাগাভাগি করে নিত। তারা খুশিতে ছিল- স্বাভাবিক জীবন ছিল তাদের।

কিন্তু ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠিত হবার পর এবং তার ফলশ্রুতিতে সৃষ্ট সংঘাতে অন্তত সাড়ে সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি আরব তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে হয় পালিয়ে যান নয়ত তাদের ঘরছাড়া করা হয়।

নাজি ও তার পরিবার এবং সেইসঙ্গে তাদের গ্রামের অন্যান্য ফিলিস্তিনি আরব পরিবারগুলোকে ঘর ছাড়তে হয়, তারা পরিণত হন শরণার্থীতে। নাজির আশ্রয় হয় দক্ষিণ লেবাননের এক শরণার্থী শিবিরে। সেই অভিজ্ঞতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়।

খালিদ আল আলি বলেন সেই সময় তাদের নিজের পরিবেশে জীবনধারণ, নিজের গ্রামে আত্মীয়বন্ধুদের মধ্যে বেড়ে ওঠা, আশপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে মেলামেশার যে পরিচিত পরিবেশ তা রাতারাতি পুরো হারিয়ে যায়।

''সেটা ছিল একটা মস্ত বড় আঘাত। হঠাৎ করে শরণার্থী হয়ে সবার বাসস্থান হয় তাঁবুতে। তাদের তখন কোন আয় রোজগার নেই। যারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছে, তারা জমিজমা হারিয়েছে, ব্যবসাপত্র খুইয়েছে। পরিস্থিতির কোন সমাধান নেই। তাদের চোখমুখে সবসময় থাকত হতাশার ছাপ। আমার আব্বার লক্ষ্য ছিল একটাই। জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত তিনি ফিলিস্তিনে নিজের গ্রামে ফিরে যেতে চেয়েছেন। তার কাছে মনে হতো এটা তো জটিল কোন বিষয় নয়- কেন তিনি ফিরতে পারবেন না?'' বলেন খালিদ আল আলি।

জর্দানে নাজি আল আলির ব্যঙ্গচিত্র আঁকা ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ বিক্ষোভ

তরুণ নাজি প্রথম চাকরি নেন উপসাগরীয় এলাকায় একজন মেকানিক হিসাবে। লেবাননে ফেরার আগে তিনি আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন।

১৯৬০ এর দশকের গোড়ার দিকে তিনি আবার দেশ ছেড়ে যান- কাজ নেন কুয়েতে সাংবাদিক হিসাবে। তিনি খুব ভাল ছবি আঁকতেন। তার প্রতিভা ক্রমশ প্রকাশ পাবার পর কয়েকবছরের মধ্যেই তিনি সংবাদপত্রের জন্য কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র আঁকতে শুরু করেন। তার কার্টুনগুলো খুব শক্তিশালী ছিল। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মত প্রকাশের জন্য কার্টুন খুব শক্তিশালী একটা মাধ্যম ছিল ।

নাজি আল আলির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক বড় একটি সংবাদপত্রের লন্ডন সম্পাদক আবদুল বারি আতওয়ান বলেন মধ্যপ্রাচ্যে নিরক্ষরতার হার যেহেতু খুব বেশি, তাই মধ্যপ্রাচ্যের প্রত্যেকটি সংবাদপত্রে কার্টুনিস্টের তখন একটা বড় কদর ছিল, বিশেষ করে রাজনৈতিক কার্টুনিস্টদের জন্য।

নাজি আলি তার কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্রের মূল চরিত্রের নাম দেন 'হানদালা'- যাকে দেখা যায় তার সব কার্টুনে। হানদালার অর্থ 'তিক্ততা'।

হানদালা একটি দরিদ্র শরণার্থী শিশুর ছবি। মাথায় তার খোঁচা খোঁচা চুল, পাঠকের দিকে সবসময় পিঠ ফেরানো এই শিশু চরিত্র হাত দুটো পেছনে জড়ো করে কার্টুনে তুলে ধরা ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করছে। নাজি আল আলি তার সৃষ্ট এই চরিত্র সম্পর্কে একবার লিখেছিলেন:

''সর্বপ্রথমে সে ফিলিস্তিনি শিশু। কিন্তু তার বিবেক তৈরি করা হয়েছে একইসঙ্গে তার দেশ জাতি, বিশ্বজগত ও সর্বোপরি মানবিক চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে। সে খুবই সাদাসিধে ছেলে- কিন্তু খুবই শক্তমনের। তাই মানুষ তাকে গ্রহণ করেছে। তাদের মনে হয়েছে সে তাদেরই বিবেকের প্রতিনিধি।''

কার্টুনের চরিত্র হানদালার বয়স ১০- তার বয়স বাড়ে না- সময় তার শরীরে থমকে গেছে।

''আসলে ওই দশবছর বয়সেই আমার আব্বা ফিলিস্তিন ছেড়ে এসেছিলেন। ছেলেটির খালি পা- সে গরীব- তার গায়ে ছেঁড়াখোঁড়া জামা। ছোট্ট সেই শিশু - সবসময়েই তার মনকে সে প্রশ্ন করছে,'' বলেন খালিদ আল আলি।

নাজি আল আলি কাজের কারণে কখনও গেছেন লেবাননে- কখনও কুয়েতে। কিন্তু শুধু কাজের তাগিদেই নয়, কাজের কারণে তার জীবন নিয়ে যে ঝুঁকি তৈরি হতো তার কারণেও তাকে ছুটে বেড়াতে হয়েছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে । লেবাননে যখন গৃহযুদ্ধ চলছে তখন সেই বেশিরভাগ সময়টাই তিনি ছিলেন লেবাননে, বলছিলেন খালিদ।

জেরুসালেমের দেওয়ালে হানদালার ম্যুরাল

''অনেকসময়ই তিনি আমাদের কাছে আসতে পারতেন না। এমনকী আমরা যখন একইসময়ে লেবাননে থাকতাম, তখনও মাঝে মাঝে আব্বা আমাদের কাছে বাড়িতে আসতে পারতেন না। তার জন্য আসা ছিল বিপজ্জনক - আমরা দুশ্চিন্তায় থাকতাম সীমান্ত চৌকিতে তাকে যদি কিছু করে। আমার আম্মাই ছিলেন পরিবারের মাথা। তিনিই আমাদের দেখাশোনা করতেন- একইসঙ্গে তাকে আব্বা আর আম্মার দায়িত্ব পালন করতে হতো।''

১৯৮২ সালে নাজি ছিলেন বৈরুতে- লেবাননে ইসরায়েলী আক্রমণের সময়। সেসময় সাব্রা আর শাতিলা শরণার্থী শিবিরে গণহত্যার ঘটনা তার মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিল -বলছিলেন খালিদ আল আলি।

''চারিদিকে বোমাহামলা আর হত্যার যে মর্মান্তিক পরিস্থিতি তা তার শিল্পী মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেখানে সাব্রা আর শাতিলার হত্যাযজ্ঞে যে অশ্রু ঝরেছিল সেটা বাদ দিয়ে তার পক্ষে তখন আকাশ ফুল এসব নিয়ে ছবি আঁকা অসম্ভব ছিল।''

১৯৮২র পর আঁকা তার ছবিগুলো ছিল খুবই প্রতীকী- খুবই শক্তিশালী। এসময় তার কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি যে বার্তা তুলে ধরেছিলেন তা মানুষের মনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল বলে বলেন তার ছেলে খালিদ।

কার্টুনিস্ট নাজি আল আলির মূল উদ্দেশ্য শুধু ইসরায়েল আর আমেরিকার নীতি ও পদক্ষেপকে টার্গেট করা ছিল না, যেটা সেসময় বেশিরভাগ আরব সংবাদমাধ্যমেই দেখা যেত। তার কার্টুনে অনেকসময়ই থাকত আরব লীগ নেতাদের এবং আরব দেশগুলোতে তেলসম্পদ নিয়ে দুর্নীতির সমালোচনা। পরের দিকে ইয়াসের আরাফাত এবং ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা পিএলওর নেতৃত্ব নিয়ে কড়া সমালোচনা করতেও তিনি পিছপা হননি।

বাবার কথা বলতে গিয়ে খালিদ আলি বলেন তার বাবা সবসময় ছিলেন গরীব ও নিপীড়িত মানুষের পাশে। ''পৃথিবীর যে কোন দেশে নিপীড়িত মানুষের বেদনা তাকে উদ্বেলিত করত। তার জন্য গৃহযুদ্ধটা মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে ছিল না। যুদ্ধটা ছিল দরিদ্রের বিরুদ্ধে ধনীর। গরীব মুসলমান, গরীব খ্রিস্টান, গরীব সুন্নি- তাঁর কাছে তাদের সবার মধ্যে একটা জায়গায় মিল ছিল- তারা সবাই ছিল অধিকার বঞ্চিত- যে অধিকার ধনী শাসক সমাজের কাছ থেকে তারা পেতে চাইতো।''

অভিজাত আরবদের বিরুদ্ধে আলির সমালোচনা অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। তার খ্যাতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে তার ব্যঙ্গচিত্র। তার ছবি যতই মানুষের কাছে পৌঁছতে শুরু করে, ততই বাড়তে থাকে তার শত্রু, তার প্রতি হুমকি।

১৯৮৫ সালে কুয়েতী সরকার তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। তিনি লন্ডনে চলে আসেন এবং তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু ১৯৮৭ সালে ২২শে জুলাই তার শত্রুরা তার ওপর আঘাত হানে। লন্ডনের রাস্তায় নাজি আল আলিকে মুখে গুলি করা হয়। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় প্রায় ৫ সপ্তাহ হাসপাতালে কাটানোর পর তিনি মারা যান।

ঘটনার পরপর পুলিশ ২০ বছর বয়সী একজন আরব বা ভূমধ্যসাগরীয় চেহারার লোককে খুঁজলেও শেষ পর্যন্ত তার খুনের জন্য কাউকেই দায়ী করা হয়নি। মামলা হয়নি কারও বিরুদ্ধে। মারা যাবার আগে পর্যন্ত নাজি আল আলি ১২ হাজার কার্টুন আঁকেন। এছাড়াও সেন্সরের কারণে হারিয়ে যায় তার আঁকা বহু কার্টুন বা ব্যঙ্গচিত্র।

কার্টুনের চরিত্র হানদালার বয়স ১০- সময় তার শরীরে থমকে গেছে- সে তিক্ততার প্রতীক।

তার কার্টুনের সংগ্রহ বই আকারে প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে তার ছেলে খালিদ একটি বই প্রকাশ করেছেন ইংরেজিতে। বইটির নাম আ চাইল্ড অফ প্যালেস্টাইন- ফিলিস্তিনের একটি শিশু। মৃত্যুর বহু দশক পরেও তার শিল্প, তার ব্যঙ্গচিত্র আজও কিংবদন্তী হয়ে আছে।

সূত্র: বিবিসি


ঢাকা, সেপ্টেম্বর ৩০(বিডিলাইভ২৪)// কে এইচ
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.