bdlive24

প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কমছে কর্মসংস্থান

রবিবার অক্টোবর ১৫, ২০১৭, ০৪:৩০ এএম.


প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কমছে কর্মসংস্থান

সাজ্জাদ আলম খান: রাতের আকাশে সূর্য নেই, কিন্তু আলো বিকিরণকারী অজস্র নক্ষত্র তো আছে! তাহলে রাতের পৃথিবী এত অন্ধকার কেন? সতের শতকের শেষদিকে এমন এক প্যারাডক্স বা কূটাভাস তুলে ধরেছিলেন জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডমুন্ড হেলি অলবার্স, যার কূলকিনারা আজও করা যায়নি। বাংলাদেশের উন্নয়ন অর্থনীতিতে এখন কর্মসংস্থানে মন্দা সত্ত্বেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির কূটাভাস চলছে।

প্যারাডক্স হল বড় ধরনের অসঙ্গতি। সাধারণ দৃষ্টিতে এটি সহসা ধরা পড়ে না। এখানে যে সমস্যা আছে, তা সহজবোধ্য নয়। তবে একটু চিন্তা করলে মনে নানা প্রশ্নের উদয় হয় এবং এটিকে তখন সাংঘর্ষিক মনে হয়। যদিও কূটাভাসের মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলছে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের অর্থনীতি। অবশ্য বিষয়টিকে কেউ কেউ ধাঁধা মনে করে থাকেন, কিন্তু আসলে তা নয়।

স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে ফরাসি অর্থনীতিবিদ রেনে ডু্যঁমো উন্নয়ন পরামর্শক হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে এসে বললেন- দেশে তো অনেক কাজ করার ক্ষেত্র আছে। কিন্তু বেকারের সংখ্যা তো কম নয়! অর্থাৎ কাজের সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের সংযোগ হচ্ছে না। এটাকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। আর এই কূটাভাসের সমাধান দিতে পারলে সমৃদ্ধি আসবে দেশে, এমন অভিমত প্রকাশ করেন এই অর্থনীতিবিদ।

দেশে কর্মসংস্থানের গতি বেশ মন্থর। মানসম্মত কর্মসংস্থানের অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা পড়ানো হচ্ছে, তার সঙ্গে কর্মবাজারের সঙ্গে তা খাপ খাইয়ে নেয়া বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। কারিগরি শিক্ষার বিস্তৃতিতে নানা ধরনের উদ্যোগ রয়েছে, কিন্তু বাজার ও শিল্প উপযোগিতা নিয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আর আমরা যে বিষয়ে পড়াশোনা করি, তা অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করা যাবে- এ কথা আজকাল কেউ হলফ করে বলতে পারছে না। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ইত্যাকার বিষয় নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা চলছে। গণমুখী শিক্ষানীতি তৈরিতে এ জনপদের অগ্রসর ছাত্রসমাজ রক্তও ঝরিয়েছে। কিন্তু তেমন অগ্রগতি হয়েছে বলা যাবে না।

বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। সেখানে এখন কর্মসংস্থানে ধীরগতি চলছে। ২০০৩ সালের পরবর্তী সাত বছরে এ শিল্পে গড়ে প্রতিবছর ৩ লাখ শ্রমিক যোগ হয়েছে। আর ২০১০ সালের পরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজারে। দুটি কারণে পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এক প্রতিবেদনে বলছে, শ্রমিক সংকট পোশাক খাত উন্নয়নে অন্যতম বাধা। শ্রমিকদের দক্ষতার ঘাটতিও প্রকট। প্রথমত, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় শ্রমনির্ভরতা কমেছে। দ্বিতীয়ত, সার্বিক মান বা কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পেরে অনেক ছোট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চামড়া ও ওষুধের মতো কিছু খাতে রফতানির সম্ভাবনা বেশ। তবে এসব খাতও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না।

মানসম্মত কর্মসংস্থানের মানদণ্ড কী- এ প্রশ্নের উত্তরে বিশ্লেষকরা বলেন, শ্রমিকের মাথাপিছু আয় এ ক্ষেত্রে বড় বিচেনার বিষয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মাসে শ্রমিকের গড় আয় ছিল ১৩ হাজার টাকা। আবার এর মধ্যে নারী-পুরুষের ব্যবধান রয়েছে। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও বেতন-ভাতা বৈষম্যের বিষয়টি অনেকটা প্রতিষ্ঠিত অরাজকতা হিসেবে বহাল রয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যে হারে হচ্ছে, সেই গতিতে শ্রমিকের আয় বৃদ্ধি হচ্ছে না। দেশে অনানুষ্ঠানিক খাতেও অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৬ শতাংশ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানে ১০ জনের কম শ্রমিক কাজ করে। এমন প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত কর্মসংস্থান আশা করে না কেউ।

কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো মোকাবেলার কর্মকৌশলে কতটুকু এগিয়ে আছে দেশ, তা তুলে ধরছে না সরকার। মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরিতে করণীয় সম্পর্কে ধারণা এখনও স্পষ্ট নয়। কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানো যায়নি।

কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে কর্মবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা হ্রাস করার পদক্ষেপ তেমন নেই বললেই চলে। বিদেশের শ্রমশক্তির বাজারেও তেমন নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা যায়নি। এ অবস্থার উত্তরণে সমন্বিত নীতিমালা তৈরির তাগিদ উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলছে, কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ আর কর্মক্ষম পুরুষের ৩৫ শতাংশ কৃষি কাজ করে। শহরের শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কিছুটা বাড়লেও সার্বিকভাবে রয়েছে ব্যাপক বৈষম্য। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেই তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়েনি। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সাত বছরে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ হারে।

প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান একটি বিরাট চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় হ্রাসের জন্য পণ্য ও সেবা আউট সোর্সিং করে থাকে। ওই পণ্য ও সেবা যিনি সৃষ্টি করছেন, প্রতিষ্ঠানের কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না। এমনকি জানেন না যে, তিনি আসলে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য পণ্য তৈরি করছেন! তা জানানোর সুযোগও রুদ্ধ করে দিয়েছে আউউ সোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো। এক সময় জাতীয় বাজেটে কর্মসংস্থানের বিষয়টি বেশ গুরুত্ব সহকারে স্থান পেত। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যও তুলে ধরতেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু কালের পরিক্রমায় তা যেন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। সাধারণত আমরা দেখি বাজেট পেশের আগে এবং পরে এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলে। বাজেট পাস হলেই এটা অনেকটা ফাইলবন্দি হয়ে পড়ার উপক্রম হয়।

এ ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন অনেকে। বস্তুত বাজেটের গুণগত বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা, তা খুব একটা বিশ্লেষণ করা হয় না। কর্মসংস্থান তৈরি, মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখা এবং বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কী ভূমিকা রাখা হচ্ছে- এসব বিষয় নিয়ে কাজ করলে সঠিক অর্থনীতির হালচিত্র নিশ্চয়ই যথাযথভাবে ফুটে উঠত। এ দেশে তিন-চার বছর পরপর কর্মসংস্থানের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়। এটা মাসিক, ত্রৈমাসিক কিংবা বার্ষিক ভিত্তিতে হওয়া উচিত। দেশে কর্মরত মোট জনগোষ্ঠী ৫ কোটি ৮০ লাখ। এর মধ্যে হকার, ফেরিওয়ালা, গৃহকর্মী, গাড়িচালক ও সহযোগী এবং নির্মাণ শ্রমিকের মতো অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে ৫ কোটি ৭ লাখ। আর আনুষ্ঠানিক খাতে ৭৩ লাখ মানুষ কাজ করেন।

দেশে ধারাবাহিকভাবে ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। বিনিয়োগে তেমন সাড়া নেই। রেমিটেন্স প্রবাহেও ভাটা। অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রম আধিক্য, নগরায়ণের ঘাটতি, শ্রমঘন ভারি শিল্প-কারখানার স্বল্পতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে মানসম্মত কর্মসংস্থান কমছে। আবার জনমিতিক লভ্যাংশও সংকুচিত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘এমপ্লয়মেন্ট ডায়াগনস্টিক’ প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০০৪-০৬ সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর ২০১০ সাল পর্যন্ত গড় প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় ৬ দশমিক ১১ শতাংশে। আর এ সময় কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। ২০১০ থেকে ২০১৩ সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে হয় ৬ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি না বেড়ে বরং কমে যায়।

এ সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয় ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান না বাড়লে প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। এ ক্ষেত্রে সামষ্টিক শ্রম কৌশলপত্র প্রয়োজন। এতে সরকারি, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রবৃদ্ধির শর্ত হচ্ছে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে।

যেহেতু এর সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা জড়িত। কিন্তু অর্থনীতিতে যে ধরনের বৈচিত্র্যায়ন দরকার, যার মাধ্যমে অধিকসংখ্যক মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়া যাবে, সেখানে বড় ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে। দেশের আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য হ্রাসে এখনও তেমন সাফল্য অর্জিত হয়নি। জোর দিয়ে যা বলা প্রয়োজন তা হল- দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের তাণ্ডব যদি কমানো যেত, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমপক্ষে আরও ১ শতাংশ বেশি হতো।

বৈষম্য নিরসনকারী প্রবৃদ্ধিকেই দেশের উন্নয়নের মূল দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায়, বাজেটে সুস্পষ্ট নীতি ও কর্মকৌশল ঘোষণা করতে হবে এবং প্রতি বছর তা কতখানি কমিয়ে আনা হবে, সেটাও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাস্তবতা হল, জিডিপি ও কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির উৎসের মধ্যে তারতম্য দেখা যাচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ছে না। সেবা, কৃষি ও নির্মাণের মতো খাতগুলোয়ও কর্মসংস্থান কমেছে। আবার কর্মসংস্থানে প্রবাসীদের তথ্যও প্রতিফলিত হচ্ছে না। সাজ্জাদ আলম খান : সাংবাদিক


ঢাকা, অক্টোবর ১৫(বিডিলাইভ২৪)// এ এম
 
        print



মোবাইল থেকে অ্যাপস ডাউনলোড করুন
android iphone windows




bdlive24.com © 2010-2014
Powered By: NRB Investment Ltd.