সর্বশেষ
বুধবার ৩রা শ্রাবণ ১৪২৫ | ১৮ জুলাই ২০১৮

মুঘল ইতিহাসে প্রভাবশালী নারী 'নূরজাহান'

মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৭

1182205177_1508224841.jpg
বিডিলাইভ ডেস্ক :
'নূরজাহান' মুঘল ইতিহাসের পাতায় যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরদিন। তার আসল নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। জন্মে ছিলেন উচ্চবংশে কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতিতে। ভাগ্যক্রমে আশ্রয় পেয়েছিলেন সম্রাট আকবরের হেরেমে। সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি। নাচ, গানসহ শিক্ষা লাভ করেন জ্ঞানের অন্যান্য শাখায়। রূপে-গুনে স্বয়ংসম্পূর্ণা যাকে বলে।

মুঘল শাহজাদা সেলিম তার রূপে দেওয়ানা হলে সম্রাট আকবর তার বিয়ে দেন বিহারের বীর শাসক আলি কুলি বেগ (শের আফগান) এর সাথে। তারপর অনেক নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে মেহেরুন্নিসা হয়ে ওঠেন মুঘল সম্রাজ্ঞী 'নূরজাহান'।

জন্ম-পরিচয়:
নূরজাহান বা জগতের আলো হচ্ছে সম্রাট জাহাঙ্গীর এর দেয়া নাম। তার আসল নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। ১৫৭৭ সালে ৩১ মে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মেহেরের বাবা গিয়াস বেগ ও মা যখন তেহেরান থেকে ভাগ্যের সন্ধানে হিন্দুস্তান আসছিলেন তখন পথের মধ্যেই নির্জন মরু প্রান্তে এক বাবলা গাছের তলায় জন্ম হয় মেহেরুন্নিসার।

গল্প আছে যে এই সময় গিয়াস বেগ ও তার পত্নী এমন দুর্দশায় পরেছিলেন যে মেয়েকে বাঁচানোর কোন উপায় না পেয়ে তারা পথের মাঝেই কচি মেয়েকে শুইয়ে রেখে রউনা হন। আশা ছিল কোন সহৃদয় ব্যক্তি যদি তাকে পায় নিয়ে আশ্রয় দিবে। কিন্তু বাপ মায়ের মন। কিছুদূর যাবার পর শিশু কন্যার কান্না শুনে আর থাকতে পারলেন না। ফিরে এসে মেয়েকে বুকে নিয়ে নিঃসহায়, নিঃসম্বল গিয়াস বেগ এসে পৌঁছালেন লাহোরে। এবার তার ভাগ্য পরিবর্তন হল। আকবর বাদশার সুনজরে পড়লেন তিনি, আর ছোট মেয়ে মেহেরের স্থান হল হেরেমে।

প্রথম বিয়ে:
মেহেরের বিয়ে ঠিক হয় তুর্কিস্তানের খানদানি বংশের আলি কুলি বেগ এর সঙ্গে। আলি কুলি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, নির্ভীক ও সচ্চরিত্র যুবক। মেহেরের বয়স তখন ষোল। বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে চলে যান বর্ধমান।

সম্রাট জাহাঙ্গীরের সাথে বিয়ে:
শেরের মৃত্যুর পর মেহেরকে আগ্রাতে নিয়ে আসা হয়। তখন মেহেরের বয়স তেত্রিশ। ওই বয়সেও তিনি অপূর্ব রূপসী ছিলেন। ৩৭ বছর বয়সে জাহাঙ্গীরকে বিয়ে করেন মেহেরে। জাহাঙ্গীর তার নাম দিলেন নূরজাহান বা জগতের আলো।

সম্রাজ্ঞী নূরজাহান:
নূরজাহান শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন। তিনি প্রায়ই সম্রাটের সাথে বাঘ শিকারে জেতেন। শক্তিশালী বাঘ শিকারি হিসেবে তার খ্যতি ছিল। কথিত আছে তিনি ৬টি গুলি দিয়ে ৪ টি বাঘ শিকার করেছিলেন।তার বীরত্বের কবিতাও লিখেছেন অনেক কবি।

সম্রাজ্ঞী নূরজাহান ও জাহাঙ্গীরের ন্যায় বিচারের একটি প্রচলিত গল্প:
মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম শোনেনি এমন কোন শিক্ষিত লোক পাকভারত-বাংলাদেশে আছে কিনা সন্দেহ। মহান সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম ৩৮ বছর বয়সে ১০৩৪ হিজরীতে জাহাঙ্গীর উপাধি নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

সম্রাট জাহাঙ্গীর জন্মগতভাবে বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। একদিকে যেমন ছিলেন বিরাট প্রতাপশালী সম্রাট, অপরদিকে তেমনি ছিলেন উন্মুক্ত হৃদয়ের প্রজা বৎসল শাসক। তিনি মনে প্রাণে সাধারণ প্রজাদের সুখ শান্তি ও মঙ্গল কামনা করতেন।

বাদশাহ জাহাঙ্গীর রাজ্যে ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক ও তৎপর। সাধারণ প্রজারা যেন সহজে বিচার প্রার্থী হওয়ার সুযোগ লাভ করে ন্যায় বিচার লাভ করতে পারে এ লক্ষ্যে রাজদরবারে ইনসাফের জিঞ্জির ঝুলিয়ে ছিলেন।

তিনি লিখেছেন, 'সিংহাসনে উপবিষ্ট হবার পরে সর্বপ্রথম যে নির্দেশ আমি জারি করেছি তা হলো- 'ইনসাফের জিঞ্জির' লটকানো হোক। উৎপীড়িত মজলুম জনগণের বিচারে বিচারালয় থেকে কোন প্রকার ত্রুটি কিংবা অবহেলা পরিলক্ষিত হলে তারা যেন সরাসরি জিঞ্জিরের কড়া বাজিয়ে আমাকে অবগত করাতে পারে।'

এই জিঞ্জিরটির এক প্রান্ত ছিল আগ্রার শাহী মহলের চূড়ার উপরে অবস্থিত, আর অপর প্রান্ত ছিল যমুনা নদীর অপর পাড়ে পাথরের একটি স্তম্ভের উপর লটকানো। এ শিকল টেনে বহু লোক জাহাঙ্গীরের ন্যায়পরায়ণতার প্রমাণ দিয়েছে।

সম্রাট ন্যায়পরায়ণতা ছিল মায়া মমতার ঊর্ধ্বে। তিনি এ ব্যাপারেও এত কঠিন ছিলেন যে তা উপলব্ধি করা যায় সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের বিচারের কাহিনী থেকে। নূরজাহান ছিলেন জাহাঙ্গীরের চোখের জ্যোতি ও অন্তর মস্তিষ্কের মালিক।

একদা বেগম নূরজাহান রাজপ্রাসাদের উপরে খোলা জায়গায় বসা ছিলেন। তার সৌন্দর্যের জ্যোতি চারদিক আলোকিত করে ঠিকরে পড়ে ছিল। এমন সময় এক হতভাগা পথিকের দৃষ্টি পড়ে সম্রাজ্ঞীর উপর। নূরজাহান ব্যাপারটিকে সাধারণভাবে গ্রহণ করতে পারলেন না। তার প্রতি পরপুরুষের নজরকে অপরাধ মনে করে রাগান্বিত হয়ে পথিকে গুলি করলেন। সাথে সাথে হতভাগা পথিকটির মৃত্যু ঘটে।

কিন্তু এমন ঘটনাটি চাপা রইল না। খবরটি পৌঁছল গিয়ে জাহাঙ্গীরের কানে। মহামতি সম্রাট ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিলেন। বেগম নূরজাহান অত্যন্ত খোলা মনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেন। জাহাঙ্গীর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনে এ অপরাধের বিচারের ফয়সালা চেয়ে পাঠান মুফতী সাহেবের কাছে। মুফতি বিচারের রায়ে সম্রাজ্ঞী নূরজাহানকে হত্যার নির্দেশ দিলেন স্বয়ং সম্রাট জাহাঙ্গীর। সম্রাজ্ঞীর প্রতি এমন কঠোর আদেশ শুনে দরবারেরর সকলের অন্তর কেঁপে উঠল।

বেগম নূরজাহান ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রাণপ্রিয়া। তার নির্দেশেই প্রকৃতপক্ষে সম্রাজ্য পরিচালিত হত। সেই প্রতাপশালিনী প্রাণপ্রিয়া রাণীর বিরুদ্ধে শিরচ্ছেদের আদেশ, রাজদরবারের সকলের কষ্ট পেল। কিন্তু হৃদয়ে ভাবান্তর হল না একমাত্র জাহাঙ্গীরের।

তিনি অন্দরমহলে প্রবেশ করে দাসীদের হুকুম দিলেন নূরজাহানকে শিকল পড়িয়ে রাজদরবারে হাজির করতে। যেই হুকুম সেই কাজ। অন্তরে ব্যথা নিয়ে দাসীরা তাদের প্রিয় সম্রাজ্ঞীকে বাদশার হুকুমে শিকল পড়িয়ে রাজদরবারে হাজির করল।

নূরজাহান এমন আচরণের কোন বিরোধিতা করলেন না। বাদশাহর হুকুমে জল্লাদ এলো তলোয়ার নিয়ে। নূরজাহানের শিরচ্ছেদ করতে। নূরজাহান অসহায়। বুদ্ধিমতী বেগম সাহস করে জাহাঙ্গীরের কাছে প্রস্তাব পাঠালেন, 'জাঁহাপনা, শরিয়তে বিধান রয়েছ খুনের বদলা পরিশোধ করার। আমি খুনের বদলা পরিশোধ করে মুক্তি পেতে পারি কি না?'

এ সওয়ালের জওয়াব দিতে জাহাঙ্গীর আবার মুফতির কাছে ফতোয়া চাইলেন। মুফতি জওয়াব দিলেন, হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তির আপনজনেরা যদি রাজি হয় তা হলে খুনের বদলা দেয়ার বিধান শরিয়তে রয়েছে।

শরিয়তের বিধান অনুযায়ী বেগম নূরজাহান নিহত ব্যক্তির ওয়ারিশগণকে এক লক্ষ দিরহাম দিয়ে খুশি করলেন। তারা এ ভাবে খুনের বদলা গ্রহণ করে সম্রাটকে বলল, 'আমরা কিসাস চাই না। আমরা আপনাকে অনুরোধ করছি আপনি সম্রাজ্ঞীর ওপর থেকে কিসাসের হুকুম বাতিল করুন।'

সম্রাট জাহাঙ্গীর তাদের এমন ব্যবহারে খুশি হয়ে প্রিয়তমা সম্রাজ্ঞীকে কঠিন শাস্তির হাত থেকে মুক্তি দিলেন। এমন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ হত্যার ইনসাফের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে সারা বিশ্বকে আলোকিত করে আজও মানুষের অন্তরে শ্রদ্ধাসিক্ত হয়ে বেঁচে আছেন।

লাহোরে নূরজাহানের সমাধি:
১৬৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৮ বছর বয়সে নূরজাহান পরপারে পাড়ি জমান। লাহোরের শাহদারা বাগে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সমাধির অদূরেই নূরজাহানের সমাধি। তার কবরের উপরে খচিত আছে, 'এই নগন্য আগন্তুকের কবরের উপর না কোনো প্রদীপ থাক, না কোনো গোলাপ। না কোনো প্রজাপতির পাখা পুড়ুক, না কোনো বুলবুলি গান গাক।'

কী গভীর দার্শনিক উক্তি! সমাধিক্ষেত্রটি তারই তৈরি করানো ছিল, পঙ্কতিটিও সম্ভবত তারই কাব্য থেকে নেয়া। কাব্য ও দর্শনের কোমলতা ও কাঠিন্যের জটিল সংমিশ্রণ, সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার অধিকারিনী, সুগভীর কূটনৈতিক জ্ঞানসম্পন্না এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুঘল ইতিহাসে তো বটেই, সমগ্র ভারতবর্ষের ইতিহাসেই স্মরণীয়া এক নারী।

ঢাকা, মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৭, ২০১৭ (বিডিলাইভ২৪) // এস আর এই লেখাটি ৪৮৯ বার পড়া হয়েছে


মোবাইল থেকে খবর পড়তে অ্যাপস ডাউনলোড করুন